[কবিতাগুলো ২০১৯-২১-এর করোনা বিশ্বমারীকালে লেখা]
১.
গুটিপোকার গান
গুটির ভেতর গুটিয়ে গেছে সব
পরান জুড়ে তুমুল কলরব
তাকিয়ে থাকা বিস্ফারিত চোখে
শ্রাবণ নামে বিবিক্ততার শোকে
লাগাতে যায় যখন জোড়াতালি
চারটে দেয়াল বাজায় করতালি
মুঠির মধ্যে গুটিয়ে নিয়ে প্রাণ
প্রাণ বাঁচাতে পাঠায় মৃদু ত্রাণ
তবুও ভবে বেড়েই চলে দেনা
আইসোলেশান থেকে সে ডাকবে না
মুখটাকে সে মুখোশ ভেবেছিলো
মুখোশ এসে মুখ চিনিয়ে দিলো
সে-মুখে আজ মুখোশ বসায় থাবা
চেনা মুখ কি চিনতে পারবে বাবা
এতদিনে চিনলে যখন মুখ
সে-মুখ তখন মুখোশচাপা মূক।
যদি-বা কাল ফুরোয় মুখোশের
ও মুখ হবে মুখোশ বুঝি ফের
আবার সেই পুরোনো মন্ত্রণা
নিরন্তর আত্মপ্রবঞ্চনা…
২.
খাঁচায় এবং মুখোশে
খাঁচায় এবং মুখোশে
ঘিরেছে জীবন, ঢেকেছে সব মুখ
দেখে না কেউ, চোখের আড়ালে খাচ্ছে খাবি
নাকি নেহায়েতই উপোসে
সবাই সবই জানতে এবং জানাতে পরাঙ্মুখ
মুখোশে এবং খাঁচায়
কিমাশ্চর্য বাঁচায়
মুখোশটাকেই ভাবছে সবাই মুখ
খাঁচাটাকেই ধরে নিচ্ছে আকাশ
এমন বাঁচায় কেমনতরো সুখ
কেমন করে দূর দিগন্তে তাকাস
মনের মধ্যে কতদিনের মুখোশ
চেপেছে আজ মুখে
অন্ধ চোখে কতদিনের প্রদোষ
দিয়েছে পথ রুখে
সব ভাব আজ হয়ে বস্তুগত
সব অনুভব করছে সংযত
মুখোশটাকেই মুখ নিয়েছি মেনে
দানাপানি পেলে খাঁচাটাকেই
পরমাগতি জেনে
৩.
করোনা করুণা
কমেছে এখন হালুম হুলুম
অনেক কমেছে হম্বিতম্বি
করুণা বেড়েছে, কমেছে জুলুম,
মানুষ এখন বেঁচেও জোম্বি
এখন প্রতিটি পদক্ষেপে
ছায়া হয়েছে মৃত্যুচিন্তা
হাতধরাধরি করে হাঁটছে
জীবন এবং মৃত্যুদিনটা
তবু কেউ কেউ যখন সাজায়
জীবন স্বপ্ন আলিম্পনে
মনের গভীরে প্রাণ শুয়ে থাকে
হিমেল মৃত্যু আলিঙ্গনে
এতদিনে যেন ফিরে এসেছে
জীবনে মরণে ভারসাম্য
মানুষ না চাক এমন নিয়তি
প্রকৃতির ছিলো এটাই কাম্য
কমেছে দূষণ এবং শোষণ
প্রকৃতি হচ্ছে সুস্থ দ্রুত
করোনা করুণা হয়ে করছে
ভেতর বাহির পরিশ্রুত
৪.
সেরে ওঠার সময়
কর্কটক্রান্তি রেখার কিনারায় এসে যাওয়া সূর্যের
ক্রমোষ্ণ হয়ে ওঠা রোদ্দুরে গা এলিয়ে দিয়ে
প্রকৃতি চাটছিলো তার ক্ষতবিক্ষত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো
বহু অঙ্গ গলিত কুষ্ঠের মতো দগদগে ঘায়ে ভরা
কিছু অঙ্গ ইতোমধ্যেই খসে গেছে
তার অরণ্যকেশরাজি
স্তনগিরিমালা
অশ্রু-স্বেদ-শোণিতধারার নদী-সমুদ্র…
সব বিষাক্ত অথবা বিলীয়মান কিংবা বিলুপ্ত নিঃশেষে
শুধু একটা জীবের জন্যে
প্রকৃতিজাত হয়েও যে মাতৃপরিচয় অস্বীকার করে
অপ্রাকৃত রীতিতে যে মাতৃগামী হতে চায়
প্রকৃতি জয়ের কথা বলতে বলতে
প্রকৃতি হত্যাকেই যে নিজের ব্রত বানিয়েছে
পৃথিবী নামের গ্রহটাকে বানিয়েছে শয়তানের চুল্লি
তবে কিনা প্রকৃতির প্রাণশক্তি বিপুল!
ইতোমধ্যেই সে সারিয়ে তুলেছে তার বহু ক্ষত
ফিরিয়ে এনেছে বহু হারিয়ে যাওয়া প্রত্যঙ্গকে
সাগরগুলোর কিনারার কাছে ফিরে এসেছে ডলফিনরা
নদীতে আনন্দে ডিগবাজি খাচ্ছে অন্ধ শুশুক
সৈকতগুলো ভরে যাচ্ছে লাল ফুল সবুজ পাতায় ভরা সাগরলতায়
ধোঁয়াশাহীন আকাশ আর দূষণহীন সাগর
পরস্পর পাল্লা দিচ্ছে নীলিমার বিভঙ্গ সৃজনে
বহুদিন পর প্রকৃতি তার গায়ে জড়ানো ওজোনের চাদরটা
সারাই করে নিতে পেরেছে
অ্যান্টার্কটিকায় আবার জমে উঠেছে তুহিনতার আসর
বরফ আর তেমন গলছে না
কারণ গত কদিন ওই জীবটা দৃশ্যপটে নেই
প্রকৃতির পাঠানো সর্বশেষ প্রতিশোধ বাহিনীটা
তাদের অনেককে হত্য করেছে
তবে তার চেয়েও সফলভাবে করেছে
বেঁচে থাকাদের সবাইকেই প্রায় গৃহবন্দী
পারস্পরিক সংযোগবিহীন
ফাঁকেফোকরে গেরিলা হামলা চালিয়ে
জীবগুলোকে এখনও হত্যা করে চলেছে ওরা
তবে ওরা সবচেয়ে বেশি সফল মৃত্যুভীতি সৃষ্টিতে
যারা বেঁচে আছে, তারাও আতঙ্কে মৃতপ্রায়
রোদ্দুরে গা এলিয়ে দিয়ে
প্রকৃতি ক্ষতবিক্ষত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো চাটে, আর
অর্ধনিমীলিত চোখে সানন্দে ভাবে তার
সাম্প্রতিকতম সফল অভিযানের কথা
ভাবে
একদিন তার জলে পোকার মতো জন্মেছিলো
এই জীবগুলোর পূর্বপুরুষ, আর
দরকার হলে, দলে দলে মেরে
তাদের নিশ্চিহ্ন করতে হবে
পোকার মতোই
“আত্মরক্ষার অধিকার আমার নিশ্চয় আছে,”
অস্ফূটে বলে সে
তাকে ঘিরে তখন সোল্লাস কলরবে মাতোয়ারা
অন্যসব প্রাণী ও উদ্ভিদ
যারা প্রকৃতির প্রকৃত সন্তান
৫.
করোনাকাল শেষ হলেও
করোনাকাল শেষ হয়ে গেলেও আর আগের মতো তোমাকে চুমু খেতে পারবো না, করুণা
চুমু খেতে গেলেই মনে আসবে এই কোয়ারেন্টাইন আইসোলেশানের কাল
এই যে কেউ কাউকে ছুঁই না, শুধু ড্রপলেট যাতে না ছড়ায় সতর্কভাবে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়ি
এই যে এক ঘরে, এক ছাদের নিচে থেকেও আমাদের মধ্যে একসমুদ্র ব্যবধান
এই যে এতদিনের সম্পর্ক ভুলে দুজন দুজনের কাছে আগন্তুক হয়ে যাওয়া
এতসবকিছু রাতারাতি ভুলে গিয়ে ফের দুজন দুজনের কাছে চলে যেতে
আগ্রাসী বাহুবন্ধনে বেঁধে নিতে পরস্পরকে
আশ্লিষ্ট চুম্বনে একাকার হয়ে যেতে আর হয়তো ঠিক পারবো না
এই করোনাকাল কোয়ারেন্টাইন শেষ হয়ে গেলেও
তোমাকে চুমু খেতে গেলেই মনে হবে হয়তো, ওই সুঠাম ঠোঁটের কোণায় হামাগুড়ি দিচ্ছে কুৎসিত কোভিড-১৯
আর আমার হৃৎপিণ্ড সংকুচিত হয়ে যাবে, ফুসফুস খুঁজে পাবে না শ্বাসরোধী চুম্বন করতে পারার মতো যথেষ্ট বাতাস
তুমিও আর আমাকে তোমার বুকে টেনে নিতে পারবে না আগের মতো আবেগের কূল ছাপানো বন্যায়
করোনাকাল কোয়ারেন্টাইন শেষ হলেও আমাদের মাঝখানে বহুদিন ধরে ঝুলে থাকবে কুৎসিত শুঁয়োপোকার মতো কিছু বীজাণু
অদৃশ্য, অথচ অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ ভীষণ
আমাদের মনে পড়ে যাবে করোনা সনাক্ত হলে ছেঁড়া জুতোর মতো পরস্পরকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে
ভালোবাসার শুশ্রূষার ন্যূনতম স্পর্শ ছাড়াই, নির্মম একাকিত্বে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে দিতে
মৃত্যুর পর আগুনের শিখায় বা মাটির গহ্বরে একটা কাঠের গুঁড়ির মতো ঠেলে দিতে তৈরি হয়েছিলাম আমরা
আমরা প্রস্তুত হয়েছিলাম আমাদের মধ্যেকার সব সম্পর্ক, সব পরিচয় নিঃশেষে মুছে ফেলতে
কালের কোবিদ যেন কোভিড-১৯
প্রকৃত কবির মতোই আমাদের চিনিয়ে দিয়েছে নিজেদের প্রকৃত স্বরূপ
জানিয়ে দিয়েছে আমাদের পরিচয়ের, প্রেমের, সম্পর্কের অন্তঃসারশূন্যতা
দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের আত্মকামিতার নগ্ন নির্লজ্জ চেহারাটা
করোনাকাল শেষ হয়ে গেলেও তোমাকে আর আগের মতো চুমু খেতে পারবো না, করুণা
বরং চুমুটা গিলেই ফেলবো অক্ষমতার ব্যর্থ কান্নার মতো…