Poemকবিতাসাহিত্য

কবিতা বাজার

শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)
Bengali Voice Audioএইচডি কণ্ঠ (HD Voice)

সম্পূর্ণ সাহিত্যকর্মটি স্পষ্ট বাংলায় শুনুন

কবিতার বাজার বসেছে মহানগরীর চৌরাস্তার মোড়ে।

একপাশে মাতৃভাষা ও অন্যান্য ভাষার মান্যগণ্য বিদেশি কবিরা
তাঁদের কবিতাবলী নিয়ে বসে আছেন সম্মানের আসনে,
তাঁদের সামনে বেজায় ভিড় জমিয়েছে দেশি ক্রেতার দল।
দেখে মনে হলো, এদেশের মানুষ বংশ-বংশানুক্রমে
বিদেশি মালের কদর করতে জানে বটে!

দেশি প্রবীণ প্রতিষ্ঠিত কবিরাও বসেছেন উচ্চাসনে।
তবে আজকাল তাঁদের কবিতার তেমন কাটতি নেই,
নতুন লেখাজোকাও তেমন দেখা যায় না।

তা ছাড়া পুরস্কার ও বিদেশ ভ্রমণের তদবিরেও
তাঁদের বেশির ভাগ সময় কেটে যায়।
পুরোনো মালপত্র নিয়ে তবুও তাঁরা বাজারে এসে বসেছেন
গোবরগাদায় চড়ে বসা মোরগের দল,
আর তাঁদের সামনে বেজায় শোরগোল পাকিয়েছে
ঝুঁটি ওঁচানো, পালক ফোলানো চ্যাংড়া কবিরা।
তারা ধারালো ঠেঁটে ঠুকরে বাজার থেকে
বের করে দিতে চাইছে বুড়ো মোরগগুলোকে।

আরেক পাশে গেঁয়ো পোশাক-আশাকে কয়েকজন
যারা নাকি ঠিক কবি নন—কবিয়াল।
শহরের যত রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, গাড়িচালক,
টোকাই, মুটে-মজুরেরা ভিড় জমিয়েছে তাদের সামনে।
ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে, সুরে সুরে কাব্য গেয়ে
কবিয়ালরা মাত করছেন আমজনতাকে।
ওদিকে নাগরিক কবিরা কেন জানি
তাদেরকে দেখে বেজায় নাক সিঁটকাচ্ছে,
গোপন ঈর্ষায় কালচে মেরে গেছে কয়েকজনের মুখ।

গম্ভীর মুখে কয়েক জন বসেছেন খানিকটা তফাতে—
অনিশ্চিত তাঁদের চেহারাসুরত—শ্মশ্রূগুম্ফ সমাচ্ছন্ন মুখমণ্ডল।
তাঁরা নাকি সব পরাবাস্তব কবি, চর্চা করেন বিমূর্ততার।
তাঁদের ধারেকাছে কেউ নেই, কয়েকটা কাক আর
চায়ের পেয়ালা ফেরত নিতে আসা হোটেল বালকেরা ছাড়া।

উত্তরাধুনিকতার দাবিদার কয়েকজনের চেহারা আরো ভয়াবহ।
তাঁদের হাই-পাওয়ার চশমায় ঝলকে যায় আলোকরশ্মি,
বাকি কবিজগতের প্রতি তাঁদের সুতীক্ষ্ন ব্যাঙ্গের ছাপ
সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে তাঁদের ঠোঁটের রেখায়।
তবে তাঁদের ওপর টেক্কা মারতে মুখিয়ে আছেন
আরো কয়েকজন—যাঁরা নাকি উত্তরোত্তর আধুনিক।

কয়েকজন কবির চেহারা আবার এমন দরকচা মেরে গেছে
দেখে তাঁদের বয়স ঠিক বোঝা গেলো না।
মনে হলো, পনের থেকে পঞ্চাশের মধ্যে
যেকোনো সীমায় তাঁদের অবস্থান হতে পারে।
প্রমিত ও স্থানীয় কথ্যভাষার মিশেলে তৈরি
এক খিচুড়ি ভাষায় তাঁরা কাব্যচর্চা করে থাকেন।
তাঁদেরকে ঘিরে লাফালাফি করছে কয়েকটা উচ্চিংড়ে।

আমিও শালা কবিযশোলোভী ছুপকে ছুপকে
চলে এসেছি কবিতা বাজারে। ঘোরাফেরা করছি
আশেপাশে অনেকক্ষণ, কিন্তু সাহস করে
বাজারের ভেতরে ঢুকতে পারছি না।
বুঝতে পারছি না, পেঁয়াজ নাকি পয়জার–
কী অপেক্ষা করছে আমার জন্যে কবিতা বাজারে।

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)@jtmnandy

চার দশকের পেশাদার সাংবাদিক (দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ), কবি এবং সা’দত হাসান মান্টো ও পাওলো কোয়েলহোর মূল অনুবাদক।

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)