Poemঅনুবাদকবিতা

কবিতা কাদম্বরীর কবিতা

শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)
Bengali Voice Audioএইচডি কণ্ঠ (HD Voice)

সম্পূর্ণ সাহিত্যকর্মটি স্পষ্ট বাংলায় শুনুন

[নাম ‘কবিতা’ হলেই সবাই কবিতা লেখেন না, কিন্তু কবিতা কাদম্বরী লিখেছেন এবং লিখেই যাচ্ছেন। ভারতের নবীন প্রজন্মের কবিদের মধ্যে তিনি বহুলপঠিত ও পাঠকনন্দিত একজন।

কবিতা কাদম্বরীর জন্ম ১৯৮৪-তে, উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে। তিনি লেখেন হিন্দি ভাষায়। তাঁর রচনায় সাগরের ঢেউয়ের মতো ফুঁসে ওঠা আবেগমথিত ক্রোধ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁর একেকটি কবিতা বহুযুগলালিত অনেক অচল মূল্যবোধের গালে একেকটি চপেটাঘাত।

কবি কবিতা কাদম্বরীর পাঁচটি কবিতার অনুবাদ এখানে পত্রস্থ করা হল।]

১.
দেবতার বদলে মানুষকে ভালোবাসা

বাজারে বহু দেবতার চেহারায় বয়ে বেড়ানো নকল শাশ্বত হাসি
যখন কিনা মানুষদের চেহারা শুকিয়ে যাচ্ছে
অগণিত চরণ থেকে চুঁইয়ে পড়া শীতলতা দেখে

আমি তো ছুঁয়েছি দেবতাদের মর্মরের মতো খোদাই করা কঠোর বাহু
অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত কিন্তু নিশ্চল জড়
যখন কিনা মানুষ নিজের নিরস্ত্র হাত হাওয়ায় দোলাচ্ছে
অত্যাচারী তোপের সামনে

আমি তো দেবতাদের চিরযুবা চেহারা বেশ কাছ থেকে দেখেছি
ভুল না করার গর্বে ভরপুর–
পুরো ব্রহ্মাণ্ডের সব আলো
নিজেদের জ্যোতির্বলয়ে নিয়ে ঘুরছে
যখন কিনা মানুষদের চেহারাগুলো
নানা ভুলের রেখায় ভরে গিয়ে
বুড়িয়ে যাচ্ছে
আর অপরাধবোধ ও প্রায়শ্চিত্তে হয়ে যাচ্ছে কান্তিহীন

আমি তো দেবতাদের দেখেছি পূজা আর ভোগরাগ পেয়ে আহ্লাদে গদগদ
যখন কিনা মানুষ ক্ষুধায় গুমরিয়েও
মাগনাখেকো পরগাছায় ভরা গুদাম একধাক্কায় ধসিয়ে দেয়

আমি তো দেবতাদের দেখেছি অমর
কিন্তু অন্যায়ের বেলায় চোখ বুঁজে থাকা
আরামশয্যায় নিস্পৃহ শুয়ে
যখন কিনা মানুষ মৃত্যুর সম্ভাবনা সত্ত্বেও লাফিয়ে পড়ে লড়াইয়ের ময়দানে

আমি তো দেবতাদের দেখেছি অভগ্ন কিন্তু প্রেম থেকে দূরে
স্তূতিতে প্রসন্ন হলে কৃপা করে থাকে
যখন কিনা ভেঙে যাওয়াটাই মানুষের নিয়তি
আর বিনষ্টির আশঙ্কা দেখেও
ভালোবেসে যায় ঝরে পড়ার আগপর্যন্ত

আজকের সময়ে যখন কিনা মানুষ হওয়াটা এক পুরাকাহিনি
অনেক দেবতা দিয়ে ঘেরা
তাদেরকে অনুনয় করছি মানুষ হতে
তাদেরকে উপেক্ষা করে
ভালোবাসছি একজন মানুষকে
আর তার দেবতা হয়ে যাওয়ার কল্পনা করলেও
আঁতকে উঠছি

ভীষণ আঁতকে উঠছি

২.
ওপরওয়ালা

ওদের লালসা বেড়ে গেলে ওরা গড়েছে পাথুরে কেল্লা
ওপরওয়ালার জয়কারের

নিজেই লিখেছে আর বলেছে
ওপরওয়ালাই লিখেছে

নিজেই বলেছে আর জানিয়েছে
মহান ওপরওয়ালাই বলেছে

আমাদের নারীদের হাতিয়ে নিয়েছে আর বলেছে
ওপরওয়ালার সেবার জন্যে

আমাদের জমি কব্জা করে নিয়েছে আর বলেছে
এটা ওপরওয়ালার ন্যায়বিচার

ক্ষুধার শেষ রুটিটাও চেয়ে নিয়েছে আর বলেছে
ওপরওয়ালার জন্যে দাও

জন্ম নেয়ার পর দুনিয়ায় আসার কর বসিয়েছে আর বলেছে
ওপরওয়ালাই রাস্তা দেয়

মরে যাওয়ার পর কাফনের ওপর তোলাবাজি করেছে আর বলেছে
ওপরওয়ালা মোক্ষ দেবে

ওরা জাদুকরের মতো
প্রারব্ধের কাহিনি শুনিয়ে
হাতসাফাই করে
আমার হকের রুটি তাদের নিজেদের থালায় সরাতে থাকে
আর আমরা এই অলৌকিক কাণ্ড দেখে হাততালি দিই

তারা আনাজপাতি নিজেদের গুদামে ভরেছে আর দুধেল গাই
আর তার লাথিকে স্বর্গের চাবি বলে জানিয়ে
আমাদের চৌকাঠে বেঁধে দিয়েছে

চেহারা দেখেই যদি ঠক চেনা যায় তো সে কেমনতরো ঠক
আমরা বিষক্রিয়ার শিকারের মতো
ফ্যাকাশে চেহারায় ওপরওয়ালাকে খুঁজতে থাকি

যে কিনা ওদের আফিম ক্ষেতে খাড়া করানো কাকতাড়ুয়ার মতো
যে কিনা তাদের লৌহবর্ম
যার ওপরে ন্যায়ের সব তলোয়ার ভেঙে যায়

আর সবশেষে
যে কিনা তাদের জুতো
ছিঁড়ে গেলে পেরেক ঠুকে দেয়া হয়
পায়ে চেপে বসলে মাখানো হয় তেল
আর বদলে ফেলা হয় কাজে না এলে

আমাদের ঘাড়, তার ওপর ওদের জুতো আর ওই জুতোর ভেতরে ওদের পায়ের ধাঁধায়
ওপরওয়ালা কে সেটা বোঝা তো এত কঠিন ছিল না

৩.
তোমার সাহচর্যের ফুল

তোমার সাহচর্য
আমার হাতের তালুতে রুয়ে দেয়
বিদ্রোহের লাল জ্বলজ্বলে ফুল
যার পরাগ বিদ্রোহী প্রজাপতিরা দারুণ দক্ষতায় ছড়িয়ে দেয়
ঝড়ের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে
আর যার মধুভরা মৌচাকে ঝুলে থাকে মৌমাছিরা
ক্ষুধার্ত ও দুঃখী বাচ্চাদের বস্তিতে

৪.
মাছের ডানা

আমি বাজপাখি নই
মাছ হয়ে জন্ম নিয়েছি
সাঁতারের অসামান্য দক্ষতা নিয়ে

বিদ্বিষ্ট চোখগুলো বললো
আমি উড়তে পারি না
আমি আকাশ দেখি না

আমার উন্নতির জন্যে
ওরা আমার পাখনায় বেঁধে দিল
পাথরের বড় আর
নকশাদার ডানা

আকাশ দেখতে গিয়ে আমি
জলেই ডুবে গেলাম
আরো সহজেই

৫.
ছ্যাতলা ও উত্তাপ

আমার হাড়ে অস্থিতে জমে থাকা সংস্কার আঁকড়ে ধরেছে আমার ঘাড়
যেটা একটা সীমার পর আর ঘুরতে পারে না
যাতে দেখতে পায় নিজেরই পিঠ
আমার হাতও আমার পিঠের সকল অংশে পৌঁছতে পারে না

আমি আঁচ তো করতে পারি, কিন্তু
খুঁচিয়ে ফেলে দিতে পারি না
নিজের কশেরুকায় জমে ওঠা ছ্যাতলা
যেটা সবার বৃষ্টি আর নদীগুলোকে
নিজেরই উঠোনে বেঁধে ফেলার লোভী জেদেরই ফল

কতবারই তো আমার হৃদয় থেকে জেগে ওঠা বিদ্রোহ
আমার নিজেরই পাঁজর থেকে পিছলে পাতালে গিয়ে পড়েছে
কতবারই তো বদলে গিয়েছে রাস্তা
কতবারই তো স্থগিত করে দিয়েছি জরুরি সংঘাত
অনির্দিষ্ট কালের জন্যে

আমার পিঠে সঞ্চরমাণ সব হাত ছ্যাতলায় ভর্তি
কিন্তু
যখন তোমার দুটো গরিলা চোখ
সূর্যতাপের মতো পোড়ায় আমার পিঠ
তখনই আমার মুক্তি ঘটে ইতিহাসের চটচটে কলঙ্ক থেকে

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)@jtmnandy

চার দশকের পেশাদার সাংবাদিক (দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ), কবি এবং সা’দত হাসান মান্টো ও পাওলো কোয়েলহোর মূল অনুবাদক।

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)