HistoryMythologyইতিহাসপুরাকাহিনি

মগধেশ্বরী: চট্টগ্রামের পল্লীজননী

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২০
পড়ার সময়: 3 মিনিট
শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)

Text-to-Speech Voice Reader

বাংলা / EN

সাহিত্যকর্মটি অডিওতে শুনুন (Listen to this literary work)

বাংলায় ‘খোলা’ কথাটা বিশেষ্য, বিশেষণ ও ক্রিয়া– তিন পদাত্মক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। ক্রিয়ার্থে ‘খোলা’ মানে হলো ‘উন্মুক্ত করা’, যেমন– দরজা খোলা, মানে খুলে দেওয়া। বিশেষণার্থে ‘খোলা’ মানে ‘উন্মুক্ত’, যেমন– খোলা দরজা । আর বিশেষ্য হিসেবে ‘খোলা’ মানে হলো ‘উন্মুক্ত স্থান বা পরিসর’। এ অর্থে শব্দটা একা বা অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়। যেমন– খোলায় মুড়ি ভাজা, হাটখোলা, রথখোলা ইত্যাদি।
   চট্টগ্রামে অনুরূপ আরো একটা শব্দ প্রচলিত আছে– ‘সেবাখোলা’। এটা হলো একটা খালি জায়গা, যেখানে চট্টগ্রামের এক আঞ্চলিক গ্রামদেবীর ‘সেবা’ বা পুজো দেয়া হয়। চট্টগ্রামে এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে পাড়ায় পাড়ায় সেবাখোলা পাওয়া যাবে না। কোনো কোনো সেবাখোলায় ছোট ছোট মন্দিরও দেখা যায়। সাধারণত কোনো জনবিরল বিজন স্থানে, জঙ্গল মা মাঠের ধারে একটা চৌকোণা জায়গা পরিষ্কার করে সেবাখোলা বানানো হয়ে থাকে।
   সেবাখোলায় পূজিত দেবীর নাম মগধেশ্বরী বা মগদেশেশ্বরী। বেদে-পুরাণে কোথাও এ দেবীর নাম পাওয়া যাবে না। চট্টগ্রাম যে একদা মগ-অধ্যুষিত ছিলো, এ দেবীর নামের মধ্যে তার ছায়া রয়ে গেছে। শত শত বছর আগে বৃহত্তর রাঢ়-বঙ্গ থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মগভূমি চট্টগ্রামে এসে বসতি পত্তনের পর থেকেই সম্ভবত মগধেশ্বরীর পূজা শুরু করে।
   তবে এ দেবীর পূজার সঙ্গে অন্যান্য দেব-দেবীর পূজার মিল নেই বললেই চলে। পূজাবিধির ওপর লেখা ‘পুরোহিত দর্পণ’ বা অন্যকোনো
প্রামাণ্য গ্রন্থেও এ দেবীর পূজার নিয়মকানুন বা মন্ত্রের উল্লেখ মিলবে না। সুদীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত লোকবিধি অনুযায়ীই মগধেশ্বরীর পূজা হয়ে থাকে।
   এ দেবীর রূপবর্ণনাও কোনো পুরাণগ্রন্থে নেই। তবুও তাঁর মূর্তি কদাচিৎ কোনো কোনো মন্দিরে দেখা যায়, যদিও মন্দিরবিহীন বেশির ভাগ সেবাখোলায় কোনো মূর্তি বা ঘট ছাড়াই মগধেশ্বরীর ‘সেবা’ দেয়া হয়– অর্থাৎ তাঁকে ফুল-ফল, নৈবেদ্যাদি উৎসর্গ করা হয়। কোনো ব্রাহ্মণ পুরোহিত নয়, সকল জাতের হিন্দুরাই সরাসরি মগধেশ্বরীর সেবা-পূজার অধিকার রাখেন। চট্টগ্রামী হিন্দুরা প্রত্যক্ষ দর্শনের ভিত্তিতেই এ দেবীর রূপকল্প নির্মাণ করা হয়েছে বলে দাবি করে থাকেন। মগধেশ্বরী (চাটগেঁয়ে কথ্যভাষায় ‘মদ্দেশ্বরী’)-র দেখা পেয়েছে, চট্টগ্রামে এমন মানুষের দেখা এমনকি অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও কম নেই, আজকের এই অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগেও। সত্যি বলতে কি, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে চট্টগ্রামের সব মানুষই মগধেশ্বরীকে সমীহ, সম্ভ্রম, ভয় করে থাকে।
   আমি নিজে মগধেশ্বরীর দেখা না পেলেও তাঁর মূর্তি দেখেছি– এলোচুলের শ্যামবর্ণা দীর্ঘদেহী এক নারীমূর্তি। অন্য দেবীমূর্তির মতো মুকুট অলঙ্কার কিছুই তাঁর নেই। দেখে মনে হয় যেন বাংলার চিরকালের এক নিষাদ বা শবর রমণী।
   আরো একটা কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, অন্য দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে পুং জাতীয় পশু-পাখি বলি দেয়া হলেও, মগধেশ্বরীর উদ্দেশ্যে স্ত্রী-জাতীয় পশু-পাখি বলি দেয়া হয়। এজন্যে চট্টগ্রামে একটা লোকপ্রবাদ প্রচলিত আছে:
   “পাঁডারে কাডে, পাঁডিয়ে হাসে।
   পাঁডা কয়, ‘তোর লাই-অ মদ্দেশ্বরী আছে।’”
   (পাঁঠাকে কাটে, পাঁঠি হাসে।
   পাঁঠা বলে, ‘তোর জন্যেও মগধেশ্বরী আছে।’)
কারো দুঃখ-কষ্ট নিয়ে কেউ মজা করলে বা হাসাহাসি করলে এ প্রবাদটা বলা হয়ে থাকে।
   সত্যি বলতে কী, চট্টগ্রামের পল্লী অঞ্চলে মগধেশ্বরীর সেবা-পুজো না দিয়ে কোনো শুভকর্মই শুরু করা হয় না। নবজাতকের চূড়াকরণ, অন্নপ্রাশন, বিয়ে, নতুন বাড়ি নির্মাণ, গৃহপ্রবেশ প্রভৃতি সকল শুভকাজের আগে চাটগেঁয়ে হিন্দুরা সেবাখোলায় গিয়ে ‘মদ্দেশ্বরী’র পুজো দিতে ভোলে না। কারণ এ দেবী তাদের ঘরের দেবী, তাদেরই ধ্যান-কল্পনা-দর্শনের সৃষ্টি। মগধেশ্বরী হলেন চট্টগ্রামের গ্রামসমাজের রক্ষাকর্ত্রী অভিভাবিকা– প্রিয় পল্লীজননী।
[এ লেখার সঙ্গে দেয়া ছবি আমার নিজের গ্রামের একটি সেবাখোলার]
সকাল ১১:১৫
১০.০৯.২০২০
ঢাকা

জ্যোতির্ময় নন্দী সাহিত্য সংগ্রহশালা

দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ-এ দীর্ঘ ৪ দশক ধরে প্রকাশিত মূল রচনার অবিকল সংরক্ষণ

ওয়েবসাইটের মূল পাতায় যান →

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)