ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আমির খসরু যখন হিন্দাওয়ি ভাষা সৃষ্টি করছিলেন, তখন প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষে হিন্দি বলে কোনো ভাষা ছিলো না, উর্দুর তো প্রশ্নই ওঠে না। উত্তর ভারতে যেটাকে বর্তমানে ‘হিন্দি বলয়’ পরিচয়ে চিনি, সেখানে তখন ব্রজভাষা, অবধি বা অওধি, ভোজপুরী, মৈথিলী ইত্যাদি কিছু ভাষা প্রচলিত ছিলো। খসরুর শহর দিল্লিতে প্রচলিত ছিলো ব্রজবুলি বা ব্রজভাষা। হিন্দাওয়ি সৃষ্টিতে খসরু এই ব্রজভাষার কাঠামোয় ফার্সি ও আরবীর মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এই হিন্দাওয়ি ভাষাই হিন্দি ও উর্দু এই দুই ভাষায় বিভক্ত হয়ে যায়। হিন্দিতে ফার্সি ও আরবীর জায়গায় দরাজ হাতে তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হতে থাকে।
কাজেই উর্দুর চলন বুঝতে হলে ব্রজভাষার বিশিষ্ট কবিদের লেখা সম্পর্কেও একটা ধারণা থাকা উচিত। এ ভাষা মূলত তৎকালীন মরমিয়া সাধক সন্তকবিরাই বেশি ব্যবহার করেছেন, যাঁদের উদ্ভব মূলত পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাদশাহ্ আকবর (১৫৪২ – ১৬০৫)-এর রাজত্বকাল থেকে। এই কবিদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সদস্যই ছিলেন। মনে রাখতে হবে, আকবরই প্রথম মোগল সম্রাট, যিনি রাজপুত হিন্দুদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের প্রচলন করেন। তাঁর প্রবর্তিত এই ধারা তাঁর উত্তরপুরুষ সম্রাটদের আমলেও প্রচলিত ছিলো। এই রাজপুত কন্যাদের মোগল সম্রাটদের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হতো এই শর্তে যে, তাঁরাই সম্রাটের প্রধান বেগম হবেন এবং তাঁদের গর্ভজাত সন্তানরাই পরবর্তী সম্রাট হবেন। সে-হিসেবে জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, শাহ্ আলম প্রমুখ মোগল সম্রাটদের ধমনীতে মোগল-রাজপুত বা হিন্দু-মুসলিম রক্ত সমভাবে প্রবাহিত ছিলো। এ ক্ষেত্রে একমাত্র আওরঙ্গজেব আলমগীরই ছিলেন ব্যতিক্রম। কারণ তাঁর মা মমতাজমহল ছিলেন পারসিক রমণী। তবে গোঁড়া মুসলিম হিসেবে পরিচিত আলমগিরের প্রধানা মহিষী যোধাবাঈও ছিলেন রাজপুত রাজকন্যা। মোগল অন্তঃপুরে এঁরা পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা উপভোগ করতেন বলে জানা যায়।
শুধু আন্তঃসাম্প্রদায়িক বিয়েই নয়, হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে পূর্ণ ধর্মীয় সমন্বয়ের উদ্যোগও নেন আকবর, দীন-এ-এলাহি মতবাদ প্রবর্তনের মাধ্যমে, যদিও তাঁর এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয় নি গোঁড়া কট্টরবাদীদের কারণে। এর কাছাকাছি সময়েই সমন্বয়বাদী সন্তকবিদেরও উদ্ভব হয়, যাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য হিসেবে কবিরের নামোল্লেখ করা চলে।
সন্ত কবির
পঞ্চদশ শতাব্দীর সন্ত ও মরমিয়া কবি কবির ওরফে কবিরদাস উত্তর ভারতের বারাণসী বা কাশীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম ও জীবনকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন তাঁর জীবনকাল ১৩৯৮ থেকে ১৪৪৮, আবার কারো কারো মতে ১৪৪০ থেকে ১৫১৮। জানা যায়, বাংলার লালন সাঁইয়ের মতো তিনিও হিন্দুর ঘরে জন্ম নেন, কিন্তু পালিত হন এক মুসলমান জোলা বা তাঁতির ঘরে। হিন্দুদের ভক্তিবাদ আর ভারতীয় মুসলিমদের সুফিবাদ, দুটোতেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী তথা রচনা গভীর প্রভাব ফেলে। তবে কবির নিজে তাঁর সময়ে প্রচলিত হিন্দু ও মুসলিম ধর্ম দুটোরই কঠোর সমালোচনা করেছেন তাঁর লেখায়। নিজের জীবৎকালে বার বার হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কট্টরবাদীদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন তিনি। তবে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই তাঁর শিষ্য-অনুসারীর সংখ্যা ছিলো সুপ্রচুর। লালন সাঁইয়ের যেমন, তেমনি কবির মারা যাওয়ার পর তাঁর মৃতদেহের সৎকার নিয়েও দু সম্প্রদায়ের শিষ্যদের মধ্যে বিস্তর টানাহেঁচড়া হয়েছিলো বলে জানা যায়। কবিরের ধর্মমত ‘কবিরপন্থ’ (কবিরের পথ) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলো। এ মতের অনুসারীদের বলা হতো ‘কবিরপন্থী’।
কবিরের লেখা থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া হলো, যা থেকে তাঁর দর্শনের আঁচ পাওয়া যাবে।
১.
সাধো, দেখো জগ বৌরানা।
সাঁচী কহী তো মারত ধাওয়ে, ঝূঠে জগ পতিয়ানা।
হিন্দু কহত রাম হমারা, মুসলমান রহমানা।
আপস মেঁ দৌঊ লড়ৈ মরত হ্যায়, মরম কোঈ নহিঁ জানা।
বহুত মিলে মোহি নেমি ধর্মী, প্রাত করে আস্নানা।
আতম ছাঁড়ি পষাণৈ পূজৈ, তিনকো থোথা জ্ঞানা।
আসন মারি ডিম্ভ ধরি বৈঠে, মন মেঁ বহুত গুমানা।
পীপর-পাথর পূজনে লাগে, তীর্থ-বরত ভুলানা।
মালা পহিরে, টোপী পহিরে, ছাপ-তিলক অনুমানা।
সাখী সব্দৈ গাওয়ত ভূলে, আতম খবর ন জানা।
ঘর ঘর মন্ত্র জো দেন ফেরত হ্যায়, মায়া কে অভিমানা।
গুরুয়া সহিত সিষ্য সব বুঢ়ে, অন্তকাল পছিতানা।
বহুতক দেখে পীর-অওলিয়া পঢ়ৈ কিতাব কুরানা,
করৈ মুরীদ, কবর বতলাওয়েঁ, উনহূঁ খুদা ন জানা।
হিন্দু কী দয়া, মেহর তুরকন কী, দোনো ঘর সে ভাগী,
ওয়হ করৈ জিবহ, উয়ো ঝটকা মারে, আগ দোঊ ঘর লাগী।
য়্যা বিধি হঁসত চলত হ্যায়, হমকো আপ কহাওয়ে স্যানা,
কহৈ কবীর সুনো বাই সাধো, ইনমে কৌন দিওয়ানা।
বাংলায়:
সাধু দেখো, জগৎ খারাপ হয়ে গেছে।
সত্য বললে মারতে আসে, মিথ্যে নিয়েই আছে বেঁচে।
হিন্দু বলে রাম আমার, মুসলিম বলে রহমানা।
শুধু শুধু দুই দল লড়াই করে মরে, মর্ম কিছু নেই জানা।
অনেক দেখেছি পবিত্র ধার্মিক, প্রাতঃকালে করে স্নান।
পরমাত্মাকে ছেড়ে পাষাণকে যে পূজে, শূন্যগর্ভ তার জ্ঞান।
আসন নিয়ে ভাব ধরে বসে, মনে তার গুমোরের পোকা,
গাছ-পাথরের পূজা করে তারা, তীর্থে-ব্রতে দেয় ধোঁকা।
মালা ঘোরায়, টুপি পড়ে, ছাপ-তিলকে অনুমান,
ভুল করে গায় খোলসের গান, নেই কোনো আত্মজ্ঞান।
ঘরে ঘরে মন্ত্র বিলিয়ে ফেরে মায়াময় অহংকারে,
গুরুর সঙ্গে শিষ্যও বুড়ো হয়, অন্তিমে অনুতাপ করে।
অনেক দেখেছি পীর-আউলিয়া, পড়ে তারা কেতাব-কোরান;
মুরিদ বানায়, আজাব বাতলায়, খোদার বিষয়ে অজ্ঞান।
হিন্দুর দয়া, মুসলিমের মেহের, দুটোই ভেগেছে ঘর ছেড়ে।
এ করে ঘৃণা, ও মারে ঝটকা, দু ঘরেই আগুন দিয়ে ফেরে।
এ নিয়মে যদি হেসে হেসে চলে যাও, সবাই বলবে সেয়ানা।
কবির বলছে, শোনো ভাই সাধু, এতে কেন হলে দেওয়ানা!
২.
পানি বীচ মীন পিয়াসী।
মোহি সুনি সুনি আওয়ত হাঁসি ।।
আতম গ্যান বিনা সব সূনা,
ক্যা মথুরা ক্যা কাসী।
ঘর মেঁ বসত ধরীঁ নহিঁ সূঝে,
বাহর খোজন জাসী।।
মৃগ কী নাভি মাঁহি কস্তূরী,
বন-বন ফিরত উদাসী।
কহত কবীর, সুনৌ ভাই সাধো,
সহজ মিলে অবিনাসী।।
সহজে মেলে অবিনাশী
বাংলায়:
পানিতে থেকেও মীন পিয়াসী,
শুনে শুনে আমার আসে হাসি।
আত্মজ্ঞান বিনা সব শূন্য,
কিসের মথুরা আর কাশী!
ঘরের মধ্যে বসতি হলো না,
বাইরে কী খুঁজতে আসি।
মৃগের নাভিতে লুকোনো কস্তুরী,
বনে বনে ফেরে উদাসী,
কবির বলছে, শোনো ভাই সাধু,
সহজেই মেলে অবিনাশী।
৩.
বুরা জো দেখন ম্যাঁয় চলা, বুরা ন মিলিয়া কোয়।
জো দিল খোজা আপনা, মুঝসে বুরা না কোয় ॥
বাংলায়:
খারাপ দেখতে গিয়েছিলাম, খারাপ তো মিললো না কেউ।
নিজের মনখানা খুঁজে দেখি, তার চেয়ে খারাপ না কেউ ॥
৪.
পোথী পঢ়ি পঢ়ি জগ মুআ, পণ্ডিত ভয়া না কোয়।
ঢাই আখর প্রেম কা, পঢ়ে সো পণ্ডিত হোয় ॥
বাংলায়:
পুঁথি পড়ে পড়ে জগৎ মূর্খ, পণ্ডিত হয় নি কেউ
আড়াই অক্ষর প্রেমের, পড়ে পণ্ডিত হয় কেউ।
৫.
জিন খোজা তিন পাইয়া, গহরে পানি পইঠ,
ম্যাঁয় বপুরা বুড়ন ডরা, রহা কিনারে বইঠ।
বাংলায়:
যিনি খুঁজবেন তিনিই পাবেন, গভীর পানিতে পশে,
আমি বাপু বুড়ো ভয় পাই, কিনারায় থাকি বসে।
৬.
তিনকা কবহুঁ না নিন্দিয়ে, জো পাঁবন তর হোয়,
কবহুঁ উড়ী আঁখিন পড়ে, তো পীর ঘনেরী হোয়।
বাংলায়:
পোকাটারও নিন্দা কোরো না, যাকে কিনা পা দিয়ে মাড়ায়,
উড়ে এসে চোখে পড়লে, সেও জেনো ব্যথায় কাঁদায়।
৭.
ধীরে ধীরে রে মনা, ধীরে সব কুছ হোয়,
মালী সীঁচে সও ঘড়া, ঋতু আএ ফল হোয়।
বাংলায়:
ধীরে ধীরে ওরে মন, ধীরে ধীরে সবকিছু হয়,
মালী সেঁচে শতঘড়া জল, ঋতু এলে তবে ফল হয়।
৮.
মালা ফেরত জুগ ভয়া, ফিরা ন মনকা ফের,
কর কা মনকা ডার দে, মন কা মনকা ফের।
বাংলায়:
মালা ফিরিয়ে যুগ যুগ গেলো, ঘুরলো না মনের ফের,
হাতের মাণিককে ফেলে দে, মনমাণিকের দিকে ফের।
রহিমজি
মোগল শাসনামলে ধর্মসমন্বয়ের প্রবক্তা ভক্তিবাদী, সুফিবাদী যেসব কবি, সাধক, পণ্ডিতের আবির্ভাব ঘটেছিলো খানজাদা মির্জা খান আবদুল রহিম খান-এ-খানা (১৭ ডিসেম্বর, ১৫৫৬ – ১৬২৭) ওরফে রহিমজি ওরফে রহিমদাসজি তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
আবদুল রহিম ছিলেন মহান মোগল সম্রাট আকবরের প্রখ্যাত নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন, এবং সম্রাটের শৈশবের পিতৃতুল্য অভিভাবক বৈরাম খানের পুত্র। রহিমের নামাঙ্কিত খানখানা গ্রাম ভারতের পাঞ্জাবের নওয়াঁশহর জেলায় অবস্থিত।
আবদুল রহিম বর্তমান পাকিস্তানের লাহোরে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা ছিলেন বর্তমান ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের ভূম্যাধিপতি জামাল খানের কন্যা। জামাল খান ছিলেন রাজপুত হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত সুফিবাদী মুসলমান।
রহিমের পিতা বৈরাম খান গুজরাটের পাটানে গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী ও শিশুপুত্র রহিমকে নিরাপদে দিল্লি নিয়ে এসে সম্রাট আকবরের হাতে তুলে দেয়া হয়। আকবর রহিমকে‘মির্জা খান’ উপাধি দেন এবং স্বনামধন্য মোগল আমির আতাগা গানের পুত্র মির্জা আজিজ কোকা’র কন্যা মাহ্ বানু (চাঁদ বিবি)’র সঙ্গে বিয়ে দেন।
একটি ঘটনা রহিমের জীবনে একটা বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। আকবরের তীব্র বিরোধী রাজস্থানের মেওয়ারের রাজা রানা প্রতাপ রহিমের পরিবারের মহিলাদের নিরাপদে তাঁর কাছে ফিরিয়ে দিলে, এ ঘটনার প্রভাবে জন্মসূত্রে মুসলমান হয়েও তিনি কৃষ্ণভক্ত হয়ে পড়েন, এবং ‘রহিমদাস’ ভনিতায় কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে কবিতা রচনা করেন।
আবদুর রহিম তাঁর দানধ্যানের জন্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তিনি কাউকে দান করতেন বড় অদ্ভুতভাবে– যাকে তিনি দান করছেন কখনও তার মুখের দিকে তাকাতেন না। বরং সেইসময় অত্যন্ত দীনভাবে মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তৎকালীন ভক্ত মহাকবি, হিন্দি রামায়ণ ‘রামচরিতমানস’-এর রচয়িতা তুলসীদাসজি রহিমের এভাবে দান করার কথা শুনে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে দু পংক্তির একটা দোহা লিখে পাঠান। দোহাটি হলো:
“এ্যায়সি দেনী দেঁন জ্যুঁ, কিৎ সীখে হো সৈন।
জ্যোঁ জ্যোঁ কর উঁচ্যো করো, ত্যোঁ ত্যোঁ নিচে নৈন ॥”
অর্থাৎ–
“এমন দান দেন আপনি, কোত্থেকে শিখলেন এ রীতি?
যা করছেন তা উচ্চ কাজ, অথচ নিচে কেন চোখ!”
কেন যে তিনি এভাবে দান করেন সেটা তুলসীদাসজি ভালোই জানেন, অথচ তবুও তিনি চাইছেন রহিমজি নিজে এ ব্যাপারে কিছু বলুন– এটা বুঝতে পেরে রহিমজি উত্তরে আরেকটা দোহা লিখে তুলসীদাসজীর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি লিখলেন:
“দেনদার কোঈ অউর হ্যায়, ভেজত জো দিন রৈন।
লোগ ভরম হম পর করে, তাসো নিচে নৈন ॥”
অর্থাৎ–
দান তো করেন অন্য কেউ, যিনি দেন দিন-রাত।
লোকে ভ্রম করে ভাবে আমি দান করি, তাই নিচু করে রাখি চোখ।”
আবদুর রহিম ছিলেন পারস্য সংস্কৃতির একজন বিশেষজ্ঞ। পাশাপাশি ভারতীয় শাস্ত্র-সাহিত্যেও তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত। হিন্দি ভাষায় অসংখ্য দোহা রচনা ছাড়াও, সম্রাট বাবরের পিতৃভাষা চাগতাই তুর্কিতে লেখা তাঁর আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’ রহিমজি ফার্সিতে অনুবাদ করেন। সংস্কৃত ভাষাও তিনি খুব ভালো জানতেন। জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর সংস্কৃত ভাষায় তিনি দুটি গ্রন্থ ‘খেটকৌতুকম’ ও ‘দ্বাত্রিংশদ্যোগাবলী’ রচনা করেন।
আবদুল রহিম ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন এবং দিল্লিতে সম্রাট হুমায়ুনের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তারঁ রচিত কয়েকটি দোহার বঙ্গানুবাদ এখানে দেয়া হলো।
১.
জো বড়েন কো লঘু কহেঁ, নহিঁ রহিম ঘটি জাহিঁ।
গিরধর মুরলীধর কহেঁ, কছু দুঃখ মানত নাহিঁ ॥
বাংলায়:
বড়কে ছোট বললে তাতে রহিম তার কিবা আসে যায়?
গিরিধারীকে যদি মুরলীধরই বলো, সে কিছুই দুঃখ না পায়।
২.
জো রহিম উত্তম প্রকৃতি, কা করী সকত কুসঙ্গ।
চন্দন বিষ ব্যাপে নহিঁ, লিপটে রহত ভুজঙ্গ ॥
উত্তম প্রকৃতি যে, হে রহিম, কী ক্ষতি করবে তার কুসঙ্গ?
চন্দন বৃক্ষ বিষাক্ত হবে না, জড়িয়ে থাকলেও ভুজঙ্গ*।
*সাপ
৩.
রহিমন ধাগা প্রেম কা, মত টোরো চটকায়।
টুটে পে ফির না জুরে, জুরে গাঁঠ পরী যায় ॥
বাংলায়:
রহিম তো সুতো প্রেমের, ছেঁড়ো না টান মেরে তায়;
ছিঁড়ে গেলে জোড়া দিয়ো না, জোড়া দিলে গিঁঠ পড়ে যায়।
৪.
দোনো রহিমন এক সে, জোঁ লোঁ বোলত নাহিঁ।
জান পরত হ্যায় কাক পিক, রিতু বসন্ত কে নাহিঁ ॥
বাংলায়:
দুটোকেই রহিম এক মনে হয়, যতক্ষণ দিচ্ছে না ডাক।
বসন্ত ঋতু এলে বোঝা যায়, কে কোকিল আর কে-বা কাক।
৫.
রহিমন ওছে নরন সো, বৈর ভলী ন প্রীত।
কাটে চাটে স্বান কে, দোউ ভাঁতি বিপরীত ॥
বাংলায়:
রহিম, অধঃপতিতের সাথে নয় ভালো বৈরিতা, নয় প্রীতি।
কুকুর সে কামড়াক বা চাটুক, দুই-ই যে ঠেকে বিপরীত-ই ॥
৬.
রহিমন দেখি বড়েন কো, লঘু ন দীজিএ ডারী।
জহাঁ কাম আওয়ে সুঈ, কহা করে তরবারী ॥
বাংলায়:
বড় পেয়ে রহিমন ছোটটাকে দিয়ো না কো ফেলে।
যে-কাজে সুঁচের প্রয়োজন, কী করবে তরবারি পেলে!
৭.
সময় পায় ফল হোতা হ্যাঁয়, সময় পায় ঝরী জাত।
সদা রহে নহীঁ এক সী, কা রহীম পছিতাত ॥
বাংলায়:
সময় এলে ফল হয়, সময় এলে ঝরে যায়।
সব সময় তো এক থাকে না, কেন রহীম পস্তায়!
৮.
বিগরী বাত বনে নহীঁ, লাখ করো কীঁ কোয়।
রহিমন ফাটে দুধ কো, মথে ন মাখন হোয় ॥
বাংলায়:
কটু কথা একবার বললে, ফেরানো যায় না লাখো চেষ্টায়।
একবার দুধ ফেটে গেলে রহিম, তাতে কি মাখন তোলা যায়!
৯.
রূঠে সুজন মনাইয়ে, জো রূঠে সও বার।
রহিমন ফিরি ফিরি পোইয়ে, টূটে মুক্তা হার ॥
বাংলায়:
রুষ্ট সুজনকে শান্ত করো, রুষ্ট হলেও শতবার।
রহিম বার বার গেঁথে নাও, ছিঁড়ে যাওয়া মুক্তাহার।
সন্ত রজ্জব
সন্ত রজ্জব, যাঁর পিতৃদত্ত নাম রজ্জব আলি খান এবং যাঁকে রজ্জবদাস নামেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে, তিনি ছিলেন ভারতের মধ্যযুগের ভক্তি আন্দোলনের একজন সাধক কবি, এবং সে-যুগের প্রখ্যাত সন্তকবি দাদু বা দাদুদয়ালের প্রধান শিষ্য। সপ্তদশ শতকে রাজস্থানে জন্ম নেয়া রজ্জব ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্ম সম্প্রদায়গুলোর মিলনের, রাম-রহিম আর কৃষ্ণ-করিমের একত্বের প্রবক্তা একজন নিরাকারবাদী সন্ত।
রজ্জবের জীবনে সবচেয়ে বড় কীর্তি তাঁর সমকালীন ও পূর্বজ মহাপুরুষদের বাণী সংগ্রহ, সম্পাদনা ও সঙ্কলন। বহু শ্রম ও সময় ব্যয় করে তিনি যে মহাসঙ্কলন তৈরি করেন, তাতে তাঁর গুরু সন্ত দাদু ও তাঁর নিজের রচনা ছাড়াও বষণা, গরীবদাস, ক্ষেমদাস, পীপা প্রভৃতি রাজস্থানী সন্ত, নানক, অঙ্গদ, অমরদাস প্রভৃতি পাঞ্জাবি সন্ত, জ্ঞানদেব, নামদেব প্রমুখ মারাঠি সন্ত ছাড়াও অওধী ও ব্রজভাষার বহু পদকর্তার রচনা স্থান পেয়েছে। এ ছাড়াও এতে রয়েছে সংস্কৃত ভাষার ব্যাসদেব, শঙ্করাচার্য, ভর্তৃহরি প্রমুখের রচনাও। সব মিলে রজ্জব মোট ১৩৭ জন সাধক, কবি, মহাজনের রচনা তাঁর সঙ্কলনে গ্রন্থিত করেছেন।
রজ্জবের নিজের রচনা থেকে কিছু পংক্তি এখানে অনুবাদ করে দেয়া হলো তাঁর দর্শনের স্বরূপ বোঝার জন্যে।
প্রীত অকেলী ব্যর্থ মহা, সিন্ধ বিরহী দিল হোয়।
বুন্দ পুকারে বুন্দ কো, গদি মিলে সংযোয় ॥
বুন্দ বুন্দ সাধন মিল হরিসাগর জাহিঁ।
প্রাণ গঙ্গা না পহুঁচা, মুর্দ সঙ্গ সমাহিঁ ॥
রজ্জব বসুধা বেদ সব, কুল আলম কুরাণ।
পণ্ডিত কাজি ব্যর্থ রৈ, দপ্তর দুনিয়া যান।
সৃষ্টি শাস্তর হ্যায় সহি, বেত্তার করৈ বখান ॥
বাংলা:
প্রেম একলা মহা ব্যর্থ, সাগর বিরহী মন,
বিন্দু ডাকে বিন্দুকে, কোল মেলে হলে মিলন।
বিন্দু বিন্দু সাধনা মিলে হরিসাগরে যায়,
প্রাণ যদি গঙ্গা না পায়, লাশ হয়ে কবরে সমায়।
রজ্জব, এই বসুধাই বেদ, সারা জগত কোরান;
পণ্ডিত, কাজি সব ব্যর্থ, দুনিয়াই শিক্ষাস্থান।
সৃষ্টিই সঠিক শাস্ত্র, এখানেই সব ব্যাখ্যান।
…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..
এ লেখার পূর্ববর্তী কিস্তিগুলোর লিঙ্ক:
https://banglapro.xyz/%e0%a6%89%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%ad%e0%a6%ac-%e0%a6%93-%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ae%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6/
https://banglapro.xyz/%e0%a6%89%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%ad%e0%a6%ac-%e0%a6%93-%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ae%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6-2/