পুরাকাহিনি

রামের ভগ্নিপতি ঋষ্যশৃঙ্গ ওরফে একশৃঙ্গ

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক
৩০ ডিসেম্বর, ২০২২
পড়ার সময়: 4 মিনিট
শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)

Text-to-Speech Voice Reader

বাংলা / EN

সাহিত্যকর্মটি অডিওতে শুনুন (Listen to this literary work)

রামের এক দিদি ছিল, সেটা অনেকেই হয়তো জানেন না।

অযোধ্যাপতি দশরথের প্রধানমহিষী কৌশল্যা তখন প্রথম বারের মতো সন্তান সম্ভবা। নতুন যুবরাজ আসতে চলেছেন দশরথের ঘরে। তাই চারিদিকে উত্সবের আমেজ। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে, কৌশল্যা এক কন্যাসন্তান প্রসব করলেন। পুত্রসন্তানের পরিবর্তে প্রথমেই কন্যাসন্তানের জন্ম হওয়ায় রাজা-রাণী দুজনেই অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। কৌশল্যার বোন ভার্ষিণী ও ভগ্নিপতি রোমপাদ ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁরা এই সদ্যোজাত শিশুকন্যাকে দত্তক নিলেন। নাম রাখলেন শান্তা। পরম আদরে অঙ্গরাজ্যে (বর্তমান বিহারে) শান্তা বড় হতে থাকলেন। পরবর্তীতে ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির সাথে তাঁর বিয়ে হয়। এর পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর কাহিনী।

কথিত আছে, কাশ্যপ বিভাণ্ডক মুনি একবার কঠোর তপস্যা শুরু করেন। তাঁর তপস্যা ভঙ্গ করতে দেবরাজ ইন্দ্র উর্বশীকে পাঠালে। উর্বশীর মায়ায় মুনির তপস্যা ভঙ্গ হয়। বিভাণ্ডক মুনির ঔরসে উর্বশীর গর্ভে ঋষ্যশৃঙ্গের জন্ম হয়। জন্মের পরই দেবরাজ ইন্দ্রের নির্দেশে সদ্যোজাত পুত্রকে ফেলে উর্বশী স্বর্গে ফিরে গেলেন। মুনির কোনো অনুরোধই উর্বশীর মন গলাতে পারল না। এতে বিভাণ্ডকের মনে নারী জাতির প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মায়। তিনি সঙ্কল্প করেন, নিজের পুত্রকে চিরদিনের জন্য নারীদের সংশ্রব থেকে দূরে রাখবেন। সেই জন্য তিনি সদ্যোজাত পুত্রকে নিয়ে এক নির্জন ও গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেন। সেই থেকে ঋষ্যশৃঙ্গ একা পিতৃস্নেহে বড় হতে থাকেন প্রকৃতির কোলে।

এদিকে রোমপাদ একবার এক ব্রাহ্মণকে অসাবধানতা বশত অপমান করায় সে তাঁকে অভিশাপ দেয় যে অঙ্গরাজ্যে খরা নেমে আসবে। তখন শান্তা অনেক অনুনয় করলে ব্রাহ্মণ বলেন, যে পুরুষ জন্মের পরমূহুর্ত থেকে কোন নারীকে দর্শন করেনি, সে যদি অঙ্গরাজ্যে এসে শান্তাকে বিবাহ করে তবেই দেশে বৃষ্টি নামবে। ফলে অনেক তপস্যা ও কষ্ট স্বীকার করে শান্তা ঋষ্যশৃঙ্গকে পতিরূপে লাভ করেন ও অবশেষে ব্রাহ্মণের অভিশাপ থেকে পালক পিতার রাজ্যকে রক্ষা করেন। এই ঋষ্যশৃঙ্গই শান্তার অনুরোধে অযোধ্যায় গিয়ে রাজা দশরথের জন্য পুত্রকামেষ্টি যজ্ঞ করেন। তারপরই দশরথের ঘরে রাম, লক্ষণ, ভরত ও শত্রুঘ্নের জন্ম হয়।

রামায়ণের ঋষ্যশৃঙ্গের কাহিনি নিয়ে ভারতে ও ভারতের বাইরে একাধিক নাটক রচিত হয়েছে। জাপানে রচিত অনুরূপ একটি নাটক ‘ইক্কাকু সেন্নিন’-এর বঙ্গানুবাদ করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু ‘তপস্বী ও তরঙ্গিণী’ নামে। ”ইক্কাকু সেন্নিন’ নামটা এসেছে ঋষ্যশৃঙ্গের আরেক নাম ‘একশৃঙ্গ’ থেকে। আরেকটা বাংলা কাব্যনাট্য দেখেছি তিব্বতজয়ী শরচ্চন্দ্র দাশের ভাই রায়গুণাকর নবীনচন্দ্র দাশের লেখা, যাঁর নামে চট্টগ্রামের আসকারদিঘির পাড়ের রায়গুণাকর লেন।

অনুরূপ কোনো সংস্কৃত নাটকের (যার নাম আমার জানা নেই, কেউ জানালে বাধিত হব) দুটো সংলাপ আমাকে পাঠিয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলার অধ্যাপক, অনুজপ্রতিম ড  কুন্তল বড়ুয়া।

উদ্ধৃত সংলাপে জীবনে কখনো নারীমুখ না দেখা ঋষ্যশৃঙ্গের প্রথম নারীদর্শনের বিস্ময় ও মুগ্ধতা এবং এর বিপরীতে নারী সম্পর্কে তাঁর পিতার পিতৃতান্ত্রিক সতর্কবাণী দেখা যায়। সংলাপ দুটো পড়ে খুব মজা পাওয়ায় অনুবাদ করে আপনাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করলাম। মূল সংস্কৃত সংলাপদ্বয়ও দেয়া হল আগ্রহীদের জন্যে।

একশৃঙ্গ:

তোমার এ স্নিগ্ধ জটাজাল
ফুলে আর লতায় জড়িত
নবমেঘ সঞ্চারে ছড়ানো
পেখম যেন-বা ময়ূরের।
হোমাগ্নিলগ্নে ফোটা স্ফুলিঙ্গ,
নবপল্লবের কোলে কুঁড়ি
নতুন লতার মতো তন্বী
এ তোমার, নাকি আর কার
তনু– জানতে কুতুহল হয়।
প্রসন্ন হয়ে বল, তপোবনে
কেন তব পায়ের বিন্যাস
বিকশিত হয়? এই প্রভা
কেন এত বিভাময় সদা
সঞ্চারিণী স্থলপদ্ম যেন?

কাশ্যপ

না, পুত্র, এ সাধু বা মহর্ষী
নয়। এ হল স্ত্রীলোক, মনে
জন্মভূমি ভূজঙ্গের, যার
প্রতি অনুরাগক্ষত হয়
ক্রমতীব্রতর, বিষব্যথা
করে ফেলে সম্পূর্ণ বিমূঢ়।
কোনো তরুণীর কালকূট
কাজল মাখানো নয়নের
সুতীক্ষ্ণ কটাক্ষে বিদ্ধ হয়ে
লোকে নারীভুজপাশবদ্ধ
হয়ে সংসারকারাসদনে
ফেরে নানা দোষে দোষী হয়ে।
নারী আসে কুটুম্বিনীবেশে
অথবা উন্মাদ মূর্চ্ছাকর
বিষলতা হয়ে, কিংবা হয়ে
মহামোহময় পিশাচিকা,
যার সংস্পর্শে কুশলীজন
কখনো যাবে না।

মূল সংস্কৃতে:

একশৃঙ্গ

অয়ং তব স্নিগ্ধজটাকলাপঃ
কৃতোপকারঃ কুসুমৈঃ লতাভিঃ
নবাভ্রসম্ভারবিজৃম্ভমাণ
ময়ূরবর্হ প্রতিমাং বিভর্তি।
হোমাগ্নিলগ্নস্ফূটবিস্ফুলিঙ্গাং
মৌঞ্জীং দধানা নবপল্লবাঙ্কাং
কুতুহলং বাললতেব তন্বী
তনুস্তবেয়ং ন তনোতি কস্য।
ব্রূহি প্রসন্নং ক্ক তপোবনং তে
তৎপাদবিন্যাসবিকশিনীভিঃ
যত্র প্রভাতিঃ সততং বিভাতি
সঞ্চারিণী পঙ্কজিনী স্থলীষু।

কাশ্যপ

ন পুত্র সাধু, ন মহর্ষীসুনুঃ
সা স্ত্রী মনোজন্ম ভুজঙ্গভূমিঃ
তত্র ক্ষতস্তীব্রতরানুরাগ
বিষব্যথামেব বিভর্তি মূঢ়ঃ।
জনাঃ প্রসক্তাঞ্জনকালকূটৈঃ
বিদ্ধা সুতীক্ষ্ণৈ তরুণীকটাক্ষৈঃ
শোচন্তি যোষিদ্ভুজপাশবদ্ধাঃ
সংসারকারাসদনে সদোষাঃ।
এতাভিরুৎসেককুটুম্বিনীভিঃ
উন্মাদমূর্ছাবিষবল্লরীভিঃ
স্ত্রীভির্মহামোহপিশাচিকাভিঃ
সংস্পৃশ্যমানঃ কুশলী ন লোকঃ।

জ্যোতির্ময় নন্দী সাহিত্য সংগ্রহশালা

দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ-এ দীর্ঘ ৪ দশক ধরে প্রকাশিত মূল রচনার অবিকল সংরক্ষণ

ওয়েবসাইটের মূল পাতায় যান →

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)