আজ ১৬ জুন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিনে এই অবিস্মরণীয় ক্ষণজন্মা শিল্পী আর আমার সদ্যপ্রয়াত বাবাকে একসঙ্গে মনে পড়ছে।
আমার কৈশোরে, তরুণ বয়সে আমার অসম্ভব হেমন্ত-প্রীতি দেখে বাবা কত যে ঠাট্টা করতেন! বলতেন, “তোদের ’হেমু’!” যেন হেমন্ত মুখুজ্যে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি গোছের কিছু!
বাবার তখনকার চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে নাকি বেশি ভালো লাগতো শচিন কর্তার আধুনিক গান, আর দেবব্রত বিশ্বাসের উদাত্ত ভরাট কণ্ঠের রবীন্দ্রসঙ্গীত। বলতেন, “তোদের ‘হেমুবাবু’ ওঁদের ধারেকাছে যেতে পারবেন না।”
অথচ আমরা জানতাম, হেমন্তের গান আসলে তাঁরও কত প্রিয়। তাঁর চেয়ে বয়সে প্রায় আট বছরের বড় হেমন্তের সেই ‘শাপমোচন’, ‘আনন্দমঠ’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, ‘নাগিন’, ‘বিস সাল বাদ’-এর গান শুনে শুনে, গেয়ে গেয়েই তো তাঁর ভরা যৌবনের দিনগুলো কেটেছে!
আমার ঠাকুর্দা ছিলেন চট্টগ্রামের সে-আমলের সর্ববৃহৎ প্রেক্ষাগৃহ সিনেমা প্যালেসের ম্যানেজার। পঞ্চাশের দশকে সেখানে তখন রমরম করে চলছে হেমন্ত সুরারোপিত ও গীত যুগান্তকারী ফিল্মগুলো। আর আমার বাবা-কাকা, আমার নববিবাহিতা মা দিন-রাত সেসব গান শুনছেন।
বাবা তাঁর চমৎকার ভরাট, দানাদার গলায় ‘সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা’, ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস’, বা ‘শোনো বন্ধু শোনো, প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা’ ইত্যাকার গানগুলো যে কী অসাধারণ গাইতেন, তা বলে বোঝানো যাবে না। আসলে তাঁর কণ্ঠে হেমন্তের গান শুনে-শুনেই আমরা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম।
এ ছাড়াও ছুটিছাটায় মামাবাড়ি গেলে হাতপাম্পে চালানো গ্রামোফোনে শুনতাম হেমন্তের ‘ঠিকানা’, ‘রানার’, ‘অলির কথা শুনে’, ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’, আরো কত যে গান! মধুনিষ্যন্দি রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলোর কথা তো বলাই বাহুল্য। তখন এমনকি গরু চরাতে চরাতে রাখাল ছোঁড়াও ভুল উচ্চারণে গাইছে– “মেরা মন ডোলে…”। আমাদের জগৎ তখন হেমন্তময়।
১৯৬৯-৭০-এ চট্টগ্রামের জে. এম. সেন স্কুলে আমার সহপাঠী ছিলো কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্’র ছেলে মাসুদ হোসাইন। পরবর্তী কালে সে নিয়মিত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা করে নিজেও সঙ্গীতশিল্পী হয়েছে। সেও ছিলো হেমন্তের অন্ধ ভক্ত। প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা হলেই পরস্পরকে আমাদের প্রথম প্রশ্নই হতো– “কাল রাতে বদ্দা’র গান শুনেছিস তো?” ‘বদ্দা’মানে চাটগেঁয়ে ভাষায় ‘বড়দা’, মানে হেমন্ত। হেমন্তকে আমাদের নিজেদের মধ্যে ‘বদ্দা’ বলেই উল্লেখ করতাম, যার বৃহত্তর মানে দাঁড়ায় অনেকটা ‘গুরু’র মতো।
টেলিভিশন, ভিসিআরহীন সে-যুগে কণ্ঠশিল্পীদেরকে চোখে দেখার বা তাদের ছবি দেখার সুযোগ ছিলো দুর্লভ শুধু নয়, অসম্ভবপ্রায়। আর তখনকার কাশ্মীর যুদ্ধোত্তর চরম ভারতবিরোধী পাকিস্তানে ভারতীয় শিল্পীদের কোনো মঞ্চানুষ্ঠান উপভোগের কল্পনা করাটাও ছিলো অপরাধতুল্য। তবুও মাসুদ পুরোনো উল্টোরথ ইত্যাদি থেকে হেমন্তের ছবি কেটে কেটে অ্যালবাম তৈরি করেছিলো। কৈশোরের মুগ্ধ চোখে আমরা সেসব ছবি দেখতাম, আর সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাতাম।
স্কুলে পরীক্ষা চলার সময় বাবা-মা রেডিও ট্রানজিস্টর আলমারিতে তুলে রাখতেন। সে-সময়ে গান শোনা, বিশেষ করে রাতের অনুরোধের আসর শোনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিলো। অথচ পরদিনের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি বসেও আমার মন পড়ে থাকতো সেই গানের দিকে।
তখনকার দিনে ‘আকাশবাণী কলকাতা-য় একটা সাধারণ রেয়াজ ছিলো, সমকালীন শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে বিবেচিত হেমন্তের গান দিয়ে অনুরোধের আসর শেষ করা। অন্য শিল্পীর গান না শুনলেও হয়তো চলবে, কিন্তু হেমন্তের গান না শুনে চলবে কী করে?
এমন অবস্থায় চট্টগ্রামে এক টিলার ওপরকার আমাদের বাসার বাইরের দিকে আমার পড়ার ঘর থেকে রাত সাড়ে দশটা বাজার মিনিট পাঁচেক আগে বেরিয়ে পড়ে, টিলা থেকে নেমে চলে গিয়েছিলাম আমাদের এক প্রতিবেশীর বাসায়। গেট বন্ধ ছিলো, তাই চুপচাপ সীমানাপ্রাচীর ডিঙিয়ে ওদের উঠোনে গিয়ে নামলাম।
ধুপ্ করে আমার নামার শব্দ শুনে ওঁরা চমকে গিয়ে দরজা খুলে দেখলেন, সামনে আমি শ্রীমান দাঁড়িয়ে। ব্যাপার কী, ব্যাপার কী– এমন উদ্বিগ্ন জিজ্ঞাসার জবাবে নতমুখে জানালাম– কাল পরীক্ষা, তাই বাসায় অনুরোধের আসর শুনতে দিচ্ছে না; এখন আমি শুধু আসরের শেষ গান, অর্থাৎ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানটা শুনেই চলে যাবো। তাঁরা যেন এ-ব্যাপারে বাবা-মাকে কিছু না বলেন।
শুনে ওরা শুধু বললেন, পাগল ছেলে! আয় ভেতরে আয়।
ততক্ষণে রেডিওতে আমাদের চেতনার সমগ্র ভুবন আলোড়িত করে শুরু হয়ে গেছে হেমন্তকণ্ঠে মধুবর্ষণ। সে-মধু সারা অন্তর ভরে আকণ্ঠ পান করে চুপচাপ আবার বাসায় ফিরে পড়ার টেবিলে বসলাম। বাবা-মা কিছু জানতেও পারলেন না।
হেমন্তকে নিয়ে এমনই ছিলো আমাদের পাগলামো।