Uncategorizedঅনুবাদ

১৯১৯ সালের একটি কাহিনি: সাদাত হাসান মান্টো’র গল্প

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক
১৫ আগস্ট, ২০২৩
পড়ার সময়: 13 মিনিট
শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)

Text-to-Speech Voice Reader

বাংলা / EN

সাহিত্যকর্মটি অডিওতে শুনুন (Listen to this literary work)

এটা ১৯১৯ সালের কথা ভাইজান, যখন রাউলাট অ্যাক্টের বিরুদ্ধে সারা পাঞ্জাবে এজিটেশন হচ্ছিল। আমি অমৃতসরের কথা বলছি। স্যার মাইকেল ওডায়ার ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া রুলসের আওতায় গান্ধীর পাঞ্জাবে ঢোকা বন্ধ করে দিয়েছিল। উনি এদিকে আসার সময় পালওয়ালে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে গ্রেফতার করে বোম্বাইয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। যদ্দূর আমি বুঝতে পারছি ভাইজান, ইংরেজ যদি এ ভুল না করত তো তাদের শাসনামলের কালিমালিপ্ত ইতিহাসে জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যাকাণ্ডের মতো রক্ষক্ষয়ী ঘটনার এমন বাড়বাড়ন্ত হতো না।

কি হিন্দু, কি মুসলমান, কি শিখ, সবার হৃদয়ে গান্ধীজীর খুবই সম্মানের একটা জায়গা ছিল। তাঁর গ্রেফতারের খবর যখন লাহোরে পৌঁছল, সমস্ত কাজকর্ম একদম বন্ধ হয়ে গেল। এ থেকে অমৃতসরওয়ালারাও পাঠ নিল আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেখানেও পুরোদস্তুর হরতাল হয়ে গেল।

বলা হয় যে, ৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় ডাক্তার সত্যপাল আর ডাক্তার কিচলুর বহিষ্কারাদেশ ডেপুটি কমিশনার পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা পালনের জন্যে সে তৈরি ছিল না। এজন্যে যে, তার মতে অমৃতসরে বিপজ্জনক কিছুর আশঙ্কা ছিল না।

লোকজন শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ ইত্যাদি করছিল, যেগুলো থেকে কোনোরকমের সহিংসতা সৃষ্টির প্রশ্নই ওঠার কথা ছিল না। আমি নিজের চোখে দেখা অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছি। নয় তারিখ রামনবমী ছিল। জলুস বেরিয়েছিল, কিন্তু আদেশের বিরুদ্ধে একটা কদম ওঠানোর দুঃসাহস কেউ করেনি। কিন্তু ভাইজান, স্যার মাইকেল এক আজব অন্ধ মগজের মানুষ ছিল।

সে ডেপুটি কমিশনারের একটা কথাও শুনলো না। তার মাথায় স্রেফ এই ভয়টা সোয়ার হয়ে গিয়েছিল যে, এরা সবাই লিডার মহাত্মা গান্ধীর ইশারায় ব্রিটিশ রাজের তক্ত্ ওল্টানোর ধান্ধায় আছে, আর যেসব হরতাল হচ্ছে, সভা-সমাবেশের আয়োজন হচ্ছে, সেখানে পর্দার আড়ালে এ ষড়যন্ত্রই হচ্ছে।

ডা. কিচলু আর সত্যপালের বহিষ্কারােেদশ তৎক্ষণাৎ সারা শহরে ছড়িয়ে পড়লো আগুনের মতো। প্রতিটি মানুষের মন উচাটন হয়ে পড়েছিল। সবার বুক সারাক্ষণই ধড়ফড় করছিল একটা অঘটন ঘটতে যাচ্ছে ভেবে। কিন্তু ভাইজান, জোশ ছিল খুব বেশি। কাজকারবার সব বন্ধ ছিল। সারা শহর কবরস্থান হয়ে পড়েছিল, কিন্তু এই কবরস্থানের নীরবতার মধ্যেও একটা শোরগোল ছিল।

যখন ডা. কিচলু আর সত্যপালের গ্রেফতারের খবর এল, তৎক্ষণাৎ হাজার হাজার মানুষ একত্র হয়ে বা মিলিত হয়ে ডেপুটি কমিশনার বাহাদুরের কাছে গেল এবং নিজেদের প্রিয় লিডারদের বহিষ্কারের আদেশ বাতিল করানোর জন্যে দরখাস্ত দিলো। কিন্তু ওটা ভাই দরখাস্তে কর্ণপাত করার সময় ছিলো না। স্যার মাইকেলের মতো ফেরাউন তখন পাঞ্জাবে ছোটলাট। সে দরখাস্ত শুনে স্থানীয় জনগণের এই সমাবেশ বেআইনি বলেই স্থির করলো।

অমৃতসর… সেই অমৃতসর, যেটা কখনো স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ছিলো আর যার বুকে ছিলো জালিয়ানওয়ালাবাগের মতো একটা অহঙ্কারযোগ্য ক্ষত। এখন সেটা কোন্ অবস্থায়? তবে এসব কথা ছাড়–ন। মনে বড় দুঃখ হয়। লোকে বলে, আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এই পবিত্র শহরে যা ঘটেছিলো, তার জন্যেও দায়ী এই ইংরেজরাই। সেটাই হবে হয়তো ভাইজান! তবে সত্যটা যদি জানতে চান তো বলি, ওখানে যে রক্তস্রোত বয়েছিলো, তার দাগ আমাদের হাতেই লেগে আছে দেখতে পাচ্ছি। কী আর বলি!

ডেপুটি কমিশনার সাহেবের বাংলো ছিলো অমৃতসরের সিভিল লাইনে। সব বড় অফিসার আর তাদের চামচারা থাকতো শহরের এই আলাদা করা অংশে। আপনি অমৃতসরে এসে থাকলে হয়তো জানেন, মূল শহর আর সিভিল লাইনের মধ্যে যোগাযোগের জন্যে একটা পুল আছে, যেটা পেরিয়ে লোকে ঠান্ডা সড়কে পৌঁছে যায়, যেখানে অফিসাররা নিজেদের জন্যে ভ‚স্বর্গ বানিয়ে নিয়েছে।

জনতা যখন ওই প্রবেশপথের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছলো তখন জানা গেলো, পুলের ওপর ঘোড়সোয়ার গোরা পুলিশ মোতায়েন আছে। জনতার মিছিল কিন্তু না থেমে এগিয়েই চললো। ভাইজান, আমিও ওই মিছিলে ছিলাম। সবার মধ্যে কত যে জোশ ছিলো, আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারবো না। কিন্তু সকলেই ছিলো নিরস্ত্র। কারো হাতে একটা মামুলি লাঠি পর্যন্ত ছিলো না।

আসলে ওরা তো শুধু এ উদ্দেশ্যে পথে বেরিয়েছিলো যে, নিজেদের আওয়াজ যাতে সসম্মানে শহরের হাকিমের কাছে পৌঁছে দেয়া যায় এবং ডা. কিচলু আর ডা. সত্যপালকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার আবেদন জানানো যায়। জনতার মিছিল পুলটার দিকে এগিয়ে চললো। কিন্তু ওটার কাছাকাছি পৌঁছার সাথে সাথেই গোরা সেপাইরা গুলি ছোঁড়া শুরু করে দিলো। এতে চারপাশে একটা ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেলো। সেপাইরা সংখ্যায় ছিলো বিশ-পঁচিশজন আর মিছিলে শামিল হয়েছিলো শয়ে শয়ে মানুষ। কিন্তু ভাই, গোলাগুলি বড় আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এমন হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো, সে আর বলার নয়। কেউ কেউ গুলিতে ঘায়েল হলো, আর কেউ কেউ ছোটাছুটিতে জখম হলো।

ডানপাশে ছিলো নোংরা নালা। ধাক্কা খেয়ে আমি সেটাতে পড়ে গিয়েছিলাম। গুলি চলা বন্ধ হলে আমি সেখান থেকে উঠে চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিলো। আহতরা রাস্তার ওপর পড়ে ছিলো আর গোরারা পুলের ওপর দাঁড়িয়ে হাসছিলো। ভাইজান, ওই সময়ে আমার মনের অবস্থা কেমন ছিলো একদম মনে নেই।

আমার খেয়াল আছে যে, আমার হুঁশ-জ্ঞান তখন ঠিকঠাক ছিলো না। নোংরা নালায় পড়ার সময় তো আমার একদম হুঁশ ছিলো না। ঘটে যাওয়া ঘটনাটার স্বরূপ আমার মাথায় আস্তে আস্তে ঢুকতে লাগলো নালা থেকে উঠে আসার পর।

দূর থেকে শোরগোল শোনা যাচ্ছিলো, যেন অনেক লোক রাগে চেল্লাচিল্লি করছে। আমি নোংরা পানির নালাটা থেকে উঠে জাহিরা পিরের তাকিয়া হয়ে হলের ফটকের কাছে পৌঁছে দেখি, তিরিশ-চল্লিশ জন নওজোয়ান জোশে ভরপুর হয়ে পাথর তুলে তুলে ফটকের বড় ঘড়িটায় ছুঁড়ে মারছে। ওটার কাঁচ ভেঙে রাস্তায় ছড়িযে পড়ার পর ছেলেদের একজন বাকিদের বললো, “চলো… মহারানির মূর্তিটা ভাঙি!”

আরেকজন বললো, “না দোস্ত… কোতোয়ালিতে আগুন লাগাইগে চলো!”

তৃতীয় একজন বললো, “আর সব ব্যাংকগুলোতেও আগুন দেবো!”

চতুর্থ একজন ওদেরকে থামালো, “দাঁড়াও… এসব করে কী ফায়দা হবে?… তার চেয়ে চলো, পুলের ওপরে ওই লোকগুলোকে মারি।”

আমি ওকে চিনতে পারলাম। এ হলো থলে কঞ্জর (কঞ্জর হলো গুর্জর সম্প্রদায়ের এক যাযাবর গোষ্ঠী, যাদেরকে উত্তর ভারতের প্রায় সব জায়গার গ্রামে আর শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। সংস্কৃত ‘কাননচর’ শব্দ, যার অর্থ ‘বনচর’, এ থেকেই ‘কঞ্জর’ শব্দটির উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়: অনুবাদক)। ওর আসল নাম মোহম্মদ তোফায়েল, তবে থলে কঞ্জর নামেই ওকে সবাই চেনে। কারণ সে ছিলো এক বাইজি পরিবারের সন্তান। বড় ভবঘুরে ধরনের ছেলে ছিলো সে। অল্পবয়সেই সে জুয়াখেলা আর মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েছিলো।

ওর দুবোন শমসাদ আর আলমাস তাদের নিজেদের সময়ের সেরা সুন্দরী বাইজি হিসেবে পরিচিত ছিলো। শমসাদের গলা ছিলো খুব ভালো। তার গানের মুজরো শোনার জন্যে রইস লোকেরা অনেক দূর-দূরান্ত থেকে চলে আসতো। ভাইয়ের নানা অপকর্মে তারা খুব কষ্ট পেতো। শহরে সবাই জানতো যে, বোনেরা তাদের ভাইটির সাথে সম্পর্ক একরকম ছিন্ন করে ফেলেছে।

তারপরও সে নিজের নানা প্রয়োজনে কোনো না কোনোভাবে ওদের কাছ থেকে কিছু না কিছু আদায় করে নিতো। এমনিতে তো সে খুব ভালো পোশাক আশাক পরতো। ভালো খানাপিনা করতো। নিজে খুব সাফসুতরো থাকতো আর চারপাশের সবকিছুকেও সাফসুতরো দেখতে চাইতো। নানা রসালো চুটকি বলা আর ঠাট্টামস্করার মেজাজে সারাক্ষণ ভরপুর থাকতো সে। ‘মীরাসী’ (প্রধানত পাঞ্জাবে বসবাসকারী একটি মুসলিম গোষ্ঠী, যাদের পুরুষরা ভাঁড়ের এবং মেয়েরা বাইজির পেশা নিয়ে থাকে: অনুবাদক) আর ভাঁড়দের বেহায়াপনা থেকে অনেক তফাতে থাকে সে। চওড়া কাঁধ, সুগঠিত হাত-পা, কসরত করা মজবুত শরীর। চেহারাটাও ছিলো খাসা।

জোশে ভরপুর ছেলেগুলো তার কথা না শুনে মহারানির মূর্তির দিকে এগিয়ে চললো। সে আবারও তাদেরকে বললো, “আমি বলছি, নিজেদের এই জোশটাকে নষ্ট কোরো না। আমার সঙ্গে এদিকে এসো… চলো ওদেরকে মারি যারা আমাদের বেকসুর মানুষগুলোকে খুন করেছে আর জখম করেছে।… খোদার কসম, আমরা সবাই মিলে ওদের ঘাড় মুচড়ে দিতে পারবো… চলো!”

কেউ কেউ ইতোমধ্যেই মহারানির মূর্তি ভাঙার জন্যে রওনা হয়ে গিয়েছিলো, বাকিরা থেমে গেলো। থলে কঞ্জর পুলের দিকে এগিয়ে গেলে ওরাও তার পেছনে পেছনে যেতে লাগলো। আমি ভাবলাম, এই মায়ের পুতটা বেকার মওতের মুখে যাচ্ছে। ফোয়ারাটার কাছে লুকিয়ে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওখান থেকে আমি থলেকে চেঁচিয়ে বললাম, “যেয়ো না দোস্ত… কেন নিজের আর ওদের জানের পেছনে লেগেছো?”

এ কথা শুনে থলে উচ্চস্বরে অদ্ভুত এক অট্টহাসি দিয়ে আমাকে বললো, “থলে শুধু এ কথাটা জানাতে যাচ্ছে যে, সে ওসব গুলিগোলাকে ভয় পায় না।” তারপর আবার সে মুখোমুখি হলো তার সাথীদের, “তোমরা ভয় পেলে ফিরে যেতে পারো।”

এমন অবস্থায় বাড়ানো পা আবার উল্টোদিকে কী করে ফেরানো যেতে পারে, তাও আবার যখন লিডার নিজের প্রাণ হাতে নিয়ে এগিয়ে চলেছে। থলে চলার গতি বাড়িয়ে দেয়ায় তার সাথীদেরও সেটাই করতে হলো।

হলের ফটক থেকে পুলের দূরত্ব তেমন বেশি না… ষাট-সত্তর গজের মতো। থলে ছিলো সবার আগে আগে। যেখান থেকে পুলটার একই রকম দেখতে দুটো রেলিঙের শুরু, সেখান থেকে পনেরো-বিশ পা দূরে দুই ঘোড়সওয়ার গোরা খাড়া ছিলো। নারা দিতে দিতে থলে যখন বাঙলোর সম্মুখভাগের কাছাকাছি পৌঁছলো, সাথে সাথেই ফায়ার হলো। আমি ভেবেছিলাম, সে পড়ে গেছে… কিন্তু দেখলাম যে, সে জ্যন্ত অবস্থায় ওদিকেই এগিয়ে চলেছে। তার বাকি সঙ্গীরা সবাই ভয়ে পালাচ্ছে। সে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে দেখে চেঁচিয়ে উঠলো, “পালিয়ো না… চলে এসো।”

তার মুখ আমার দিকে ফেরানো অবস্থায় থাকতে থাকতেই আবারো ফায়ার হলো। মুখ ঘুরিয়ে সে আবার গোরাদের দিকে তাকালো আর নিজের পিঠে হাত বোলালো।… ভাইজান, আমার চোখে তো কিছু না পড়লেই ভালো ছিলো, কিন্তু আমি দেখলাম যে, তার সাদা রেশমি পাঞ্জাবিতে লাল লাল ছোপ ফুটে উঠেছে।

সে আরো দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেলো, যেন এক আহত বাঘ… আরো একটা ফায়ার হলো। সে টলে উঠলো, কিন্তু বুকে দম টেনে পা শক্ত করে সে লাফিয়ে পড়লো ঘোড়সোয়ার গোরাদের একজনের ওপর। তারপর চোখের পলকে কী যে হয়ে গেলো… ঘোড়াটার পিঠে দেখলাম কেউ নেই, গোরাটা মাটিতে পড়ে আছে আর থলে তার ওপরে। দ্বিতীয় যে গোরাটা কাছে ছিলো, সে প্রথমে চমকে গিয়েছিলো। তারপর সামলে উঠে রাশ টেনে ঘোড়াটাকে থামিয়ে দমাদম ফায়ার শুরু করে দিলো।… এর পর যা কিছু হয়েছে, সেসব আমি জানি না। আমি ওখানে ফোয়ারার পাশে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম।

ভাইজান, যখন আমার হুঁশ ফিরে এলো তখন আমি নিজের ঘরে। জানাশোনা লোকজন আমাকে ওখান থেকে উঠিয়ে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলো। তাদের মুখে জানতে পেরেছিলাম, গুলি খেয়ে জনতা ক্রুদ্ধ আর উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলো। এ উত্তেজনার ফলাফল এটাই হলো যে, মহারানির মূর্তি ভাঙার চেষ্টা করা হলো, হল আর তিনটি ব্যাংকে আগুন দেয়া হলো, এবং পাঁচ-ছজন ইউরোপীয়কে হত্যা করা হলো। খুব লুটপাট চালানো হলো।

লুট-ফুট নিয়ে ইংরেজ অফিসারদের অতটা মাথাব্যথা ছিলো না। কিন্তু পাঁচ-ছজন ইউরোপীয়কে মেরে ফেলা হয়েছে, তার বদলা নেয়ার জন্যেই জালিয়ানওয়ালাবাগের খুনি পরিকল্পনা তৈরি করা হলো।

ডেপুটি কমিশনার বাহাদুর শহরের রাশ ধরার ভার জেনারেল ডায়ারের হাতে তুলে দিলেন। এর পর জেনারেল সাহেব বারোই এপ্রিল সৈনিকদের সঙ্গে শহরের প্রধান প্রধান বাজার এলাকাগুলোতে মার্চ করলেন এবং ডজন ডজন নির্দোষ মানুষকে গ্রেফতার করলেন। তেরো তারিখ জালিয়ানওয়ালাবাগে সমাবেশ হলো। সেদিন প্রায় পঁচিশ হাজার মানুষ জমায়েত হয়েছিলো সেখানে।

সন্ধ্যে নাগাদ জেনারেল ডায়ার সশস্ত্র গোরা আর শিখদের সাথে নিয়ে সেখানে পৌঁছেন এবং নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলিবৃষ্টি শুরু করে দেন।

সে-সময়ে তো কজন মারা পড়লো সে-ব্যাপারে কারো সঠিক আন্দাজ ছিলো না। পরে তদন্তে জানা গেলো, প্রায় এক হাজারের মতো নিহত আর তিন বা চার হাজারের মতো আহত হয়েছে।… কিন্তু আমি তো থলের কথা বলছিলাম… ভাইজান, নিজের চোখে দেখে আপনাকে বলে ফেলেছি। নিষ্পাপ মানুষ খোদারই হয়ে থাকে।

মৃতে চারটি দোষ শরীয়ত সম্মত। একটি হলো পেশা। বাইজি পরিবারের সন্তান ছিলো সে, কিন্তু একজন জ্যন্ত মানুষ ছিলো বটে। এখন আমি জোর দিয়ে বলতে পারি যে, ওই বিধর্মী গোরার প্রথম গুলিও তার গায়ে লেগেছিলো। গুলির শব্দ শুনে সে যখন ঘাড় ফিরিয়ে নিজের সাথীদের দিতে তাকিয়েছিলো আর তাদের হুঁশ ফেরানোর চেষ্টা করছিলো।

জোশের ঠেলায় তার মালুমই হয়নি যে তার বুকের ছাতিতে গরম গরম সিসা ঢুকে গেছে। দ্বিতীয় গুলি তার পিঠে লেগেছিলো। তৃতীয়টি আবার তার সিনায়… আমি দেখিনি, তবে শুনেছি, গোরাটা থেকে যখন তাকে আলাদা করা হয়েছিলো, তখন তার দুই হাত গোরাটার গলায় এমন খারাপভাবে চেপে বসেছিলো যে ওগুলোকে কিছুতেই ছাড়ানো যাচ্ছিলো না… গোরাটা ততক্ষণে জাহান্নামে পৌঁছে গিয়েছিলো।

পরদিন থলের লাশ যখন দাফন-কাফনের জন্যে তার পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হলো, তখন তার সারা শরীর ছিলো গুলিতে ঝাঁঝরা। দ্বিতীয় গোরাটা তো তার পিস্তলের সমস্ত গুলি ভরে দিয়েছিলো তার শরীরে।

আমার মনে হয়, সে-সময়ে তার রূহ্ দেহের খাঁচা থেকে উড়াল দিয়েছিলো। নিজের পরিবার-পরিজনদের মধ্যে সে অতটা গ্রহণযোগ্য ছিলো না, কিন্তু গুলিতে শতচ্ছিদ্র হয়ে যাওয়া তার লাশ দেখার পর সবাই বুক চাপড়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। তার দুবোন শমসাদ আর আলমাস তো বেহুঁশ হয়ে গেলো। দাফনের জন্যে লাশ যখন ওঠানো হলো, তখন ভাইয়ের নাম ধরে দুবোন এমন করুণ বিলাপ শুরু করলো যে, যারা শুনছিলো তাদের যেন রক্তই অশ্রæ হয়ে ঝরে পড়ছিলো।

ভাইজান, আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম যে, ফরাসি বিপ্লবে প্রথম গুলিটা লেগেছিলো এক বেশ্যার গায়ে। মরহুম মুহম্মদ তোফায়েলও ছিলো এক বাইজির ছেলে। থলের গায়ে লাগা প্রথম গুলিটা বিপ্লবের এই অবিরাম দ্ব›দ্ব-সংঘাতের মধ্যে দশম নাকি পঞ্চাশতম ছিলো, সেটা কেউ তদন্ত করে দেখেনি। হয়তো এজন্যে যে, সোসাইটিতে এসব গরিবের কোনো মর্যাদা নেই।

আমার তো মনে হয় পাঞ্জাবে যারা এই রক্তস্নান করেছে তাদের তালিকায় থলে কঞ্জরের নামনিশানাও নেই, আর এটাও কিছু জানা নেই যে, এরকম কোনো তালিকা আদৌ তৈরি করা হয়েছিলো কিনা।

মারাত্মক দাঙ্গাহাঙ্গামার সময় ছিলো ওটা। ফৌজি শাসন বলবৎ হয়েছিলো। মার্শাল ল নামের সেই দানবটি শহরের গলিতে গলিতে, আনাচে কানাচে দাপিয়ে ফিরছিলো। ভীষণ গোলমেলে ওই সময়ে ওই গরিবকে এমনভাবে দাফন করা হলো যেন তার মৃত্যু তার শোকার্ত স্বজনদের জন্যে এক সঙিন জুলুমের মতো ছিলো, যার নামনিশানা তারা মুছে ফেলতে চাইছিলো।

ব্যাস্, ভাইজান, থলে এভাবেই মরে গেলো। থলেকে দাফন করে ফেলা হলো, আর… আর এটা বলে আমার সফরসঙ্গী এই প্রথম বারের মতো কিছু বলতে বলতে থেমে গিয়ে চুপ হয়ে গেলো।

ট্রেন ঝমঝম করে এগিয়ে চলেছিলো। রেললাইনের খটাখট আওয়াজ যেন বলে চলেছিলো: থলে মরে গেছে… থলের দাফন হয়ে গেছে… থলে মরে গেছে… থলের দাফন হয়ে গেছে। এই মৃত্যু আর শেষকৃত্যের মধ্যে কোনো ব্যবধান ছিলো না, যেন সে এখানে মরেছে আর ওখানেই তার দাফন হয়েছে।

আর এই খটাখট শব্দের সঙ্গে এই কথাগুলোর সাদৃশ্য এতোটা আবেগের সৃষ্টি করছিলো যে, নিজের মাথার মধ্যে থেকে ওগুলোকে আমার বের করে দিতে হলো। তারপর আমি আমার সফরসঙ্গীকে বললাম, “আপনি আরো কিছু যেন বলতে চেয়েছিলেন?”

চমকে গিয়ে সে আমার দিকে তাকালো, “জী হ্যাঁ… এ কাহিনির এক দুঃখজনক অংশ বাকি রয়ে গেছে।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “সেটা কী?”

সে বলতে শুরু করে দিলো: “আমি আপনাকে জানিয়েছি যে, থলের দুটো বোন ছিলো, শমসাদ আর আলমাস। দুজনই ছিলো খুব সুন্দরী। শমসাদ ছিলো দীর্ঘাঙ্গী। হালকা পাতলা শরীর, বড় বড় চোখ। ঠুমরি খুব ভালো গাইতো। শুনেছি খাঁ সাহেব ফতেহ্ আলি খান থেকে তালিম নিতো।

“দ্বিতীয় জন ছিলো আলমাস। তার কণ্ঠে সুর ছিলো না বটে, তবে ভাবপ্রকাশক নাচে তার জুড়ি ছিলো না। যখন সে মুজরো করতো, মনে হতো তার প্রতিটি অঙ্গ যেন কথা বলছে। প্রতিটি ভাবে একেকটা মুদ্রা ছিলো… চোখে ছিলো জাদু যা প্রত্যেকের মাথার ভেতরে ঢুকে গিয়ে কথা বলতো।” আমার সফরসঙ্গী থলের দুবোনের তারিফ আর গুণকীর্তনে প্রয়োজনের চেয়ে কিছু বেশি সময় নিচ্ছিলো। কিন্তু আমি তাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করাটা সমীচিন মনে করলাম না।

কিছুক্ষণ পরে সে নিজেই এই লম্বা চক্কর থেকে বেরিয়ে এলো এবং কাহিনির দুঃখজনক অংশটায় এলো, “ঘটনা এই যে ভাইজান, এই বিপর্যয়ের ভাগীদার দুবোনের রূপগুণের বর্ণনা এক চামচা গিয়ে ফৌজি অফিসারদের কানে তুলে দিলো… বিদ্রোহের সময় এক মেমসাহেব… কী যেন নাম ছিলো ডাইনিটার? মিস… মিস শেরউড মারা পড়েছিলো… সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে ওদেরকে ডেকে আনা হবে আর… আর… প্রাণ ভরে বদলা নেয়া হবে। আপনি বুঝে গেছেন না, ভাইজান?”

আমি বললাম, “জী হ্যাঁ!”

আমার সফরসঙ্গীর কণ্ঠে এক হাহাকার জেগে উঠলো, “এসব স্পর্শকাতর সময়ে বাইজি আর বেশ্যারাও আমাদের মা-বোন হয়ে থাকে… কিন্তু ভাইজান, এদেশের মানুষ নিজেদের মানমর্যাদা কী জিনিস, আমার বিবেচনায় সেটা বোঝেই না।”

জ্যোতির্ময় নন্দী সাহিত্য সংগ্রহশালা

দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ-এ দীর্ঘ ৪ দশক ধরে প্রকাশিত মূল রচনার অবিকল সংরক্ষণ

ওয়েবসাইটের মূল পাতায় যান →

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)