short storyঅনুবাদছোটগল্প

সেই মেয়েটি: সাদাত হাসান মান্টো’র গল্প

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩
পড়ার সময়: 8 মিনিট
শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)

Text-to-Speech Voice Reader

বাংলা / EN

সাহিত্যকর্মটি অডিওতে শুনুন (Listen to this literary work)

বিকেল সোয়া চারটে বেজে গিয়েছিলো, কিন্তু রোদে তখনও সেই তেজ যেমনটা দুপুর বারোটায় দেখা যায়। সে ব্যালকনিতে এসে বাইরে তাকালে একটা মেয়ে তার চোখে পড়লো। রোদ থেকে বাঁচার জন্যে মেয়েটা একটা গাছের ছায়ায় পা মুড়ে বসে ছিলো।

তার গায়ের রঙ ছিলো গভীর কালো। এতটাই কালো যে, তাকে গাছটার ছায়ারই একটা অংশ বলে মনে হচ্ছিলো। ওকে দেখে সুরেন্দ্রের মনে হলো, সে মেয়েটাকে কাছে পেতে চায়, যদিও এমন একটা আবহাওয়ায় কোনো নারীসান্নিধ্য পাওয়ার কথা তার ভাবারও কথা নয়।

আবহাওয়াটা খুব বাজে ধরনের ছিলো। সোয়া চারটে বেজে গিয়েছিলো। সূর্য তৈরি হচ্ছিলো ডোবার জন্যে, কিন্তু আবহাওয়াটা ছিলো একেবারেই জঘন্য রকমের। ঘামের স্রোত বয়ে যাচ্ছিলো। ভগবান জানে রোমকূপগুলো দিয়ে এত পানি কোত্থেকে বেরুচ্ছিলো।

সুরেন্দ্র কয়েকবার খেয়াল করে দেখেছে যে, গত চার ঘন্টায় খুব বেশি হলে সে মাত্র এক গেলাস জল খেয়েছে, কিন্তু ঘাম বেরিয়েছে খুব কম করে বললেও চার গেলাস। কথা হলো, এত জল এলো কোত্থেকে!

মেয়েটাকে গাছের ছায়ায় পা মুড়ে বসে থাকতে দেখে সে ভাবলো, এভাবে রোদ বা আবহাওয়া কিছুরই পরোয়া না করাটাই বোধহয় পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখের ব্যাপার।

সুরেন্দ্র ঘামে ভিজে একদম চুপচুপে হয়ে গিয়েছিলো। তার গেঞ্জি খুব খারাপভাবে তার গায়ের সঙ্গে লেপটে গিয়েছিলো। ওর মনে হচ্ছিলো যেন তার শরীরে কেউ মোবিল মাখিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তারপরও গাছের ছায়ায় বসা মেয়েটাকে দেখে তার দেহে বাসনা জাগলো ওর ঘামের সাথে তার নিজের ঘাম মিশিয়ে দেয়, ঢুকিয়ে দেয় ওর রোমকূপের ভেতর।

আকাশের রঙ ছিলো ধূসর রঙের। নিশ্চিতভাবে কারো বলা সম্ভব ছিলো না মেঘ জমেছে, নাকি হাওয়ায় ভাসছে ধূলিকণা। সে যা-ই হোক, এই ধুলো বা মেঘ সত্ত্বেও রোদের ছটা যথেষ্ট ছিলো, আর মেয়েটা বড় সন্তোষের সঙ্গে অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় বসে আরাম করছিলো।

সুরেন্দ্র আরো মনোযোগ দিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালো। ওর রঙ কুচকুচে কালো হলেও শরীরের গঠন এমন ধারালো, যা বার বার যেন সুরেন্দ্রের চোখে বিঁধে যাচ্ছিলো।

মেয়েটা মজুরের কাজ করে বলেই মনে হচ্ছিলো। ভিখারি হওয়াও অসম্ভব নয়, তবে সুরেন্দ্র এ ব্যাপারে কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলো না। আসলে সে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসতে চাইছিলো যে, মেয়েটাকে সে ইশারা করবে কি করবে না।

ঘরে সে তখন একদম একা। তার বোন ছিলো মারি-তে। মাও বোনের সাথেই ছিলো। বাবা বেঁচে নেই। এক ভাই– তার ছোট– সে থাকতো স্কুল বোর্ডিংয়ে। সুরেন্দ্রের বয়স ছিলো সাতাশ-আঠাশের কাছাকাছি। এর আগে সে তার দুজন মাঝবয়েসী চাকরানির সঙ্গে দু-তিন বার করে মিলিত হয়েছে।

কেন কে জানে, আবহাওয়া খারাপ হওয়া সত্তে¡ও কিন্তু সুরেন্দ্রের মনে এ বাসনা হচ্ছিলো যে, সে নিচে অশ্বত্থের ছায়ায় বসে থাকা মেয়েটার কাছে যাবে অথবা ওকে ইশারায় ডাকবে যাতে সে ওপরে চলে আসে, আর তারপর তারা একে অন্যের ঘামের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে অজানা কোনো দ্বীপে পৌঁছে যাবে।

ব্যালকনির রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সে জোরে গলা খাঁকারি দিলো, কিন্তু মেয়েটা তা খেয়াল করলো না। কয়েকবার এরকম করার পরও যখন কোনো ফল পাওয়া গেলো না, তখন সে আওয়াজ দিলো, “আরে ভাই… একটু এদিকে দেখো!”

কিন্তু তারপরও মেয়েটা তার দিকে তাকালো না। সে তার পায়ের গুল চুলকিয়ে যেতেই লাগলো।

সুরেন্দ্র খুব চিন্তায় পড়ে গেলো। মেয়েটার জায়গায় যদি কোনো কুকুর হতো তো ওটা তার আওয়াজ শুনে নিশ্চয় তার দিকে তাকাতো। তার আওয়াজ পছন্দ না হলে ওটা হয়তো ঘেউ ঘেউও করতো। কিন্তু মেয়েটা যেন তার আওয়াজ শুনতেই পেলো না। শুনলেও সে ওটা না-শোনা করে দিলো।

সুরেন্দ্র ভেতরে ভেতরে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাচ্ছিলো সে এবার জোরগলায় মেয়েটাকে ডাকলো, “এই মেয়ে!”

মেয়েটা তবুও তার দিকে তাকালো না। বিরক্ত হয়ে সে নিজের মলমলের কোর্তাটা পরে নিচে নামলো। মেয়েটার কাছে যখন সে গিয়ে পৌঁছলো, তখনও সে তার পায়ের অনাবৃত গুল চুলকে যাচ্ছে।

সুরেন্দ্র তার পাশে দাঁড়িয়ে গেলো। মেয়েটা তাকে একনজর দেখে নিজের শালওয়ারের পায়া নিচে নামিয়ে পায়ের গুল ঢাকা দিয়ে দিলো।

সুরেন্দ্র তাকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি এখানে কী করছো?”

মেয়েটা বললো, “বসে আছি।”

“কেন বসে আছো?”

মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়ে গেলো, “নাও, এখন দাঁড়িয়ে গেছি!”

সুরেন্দ্র হকচকিয়ে গেলো, “এত কী হলো? জিজ্ঞেস করছিলাম যে, তুমি এতক্ষণ ধরে এখানে বসে বসে কী করছো?”

কালো মেয়েটার চেহারা আরো কালো হয়ে গেলো, “তুমি কী চাও বলো তো?”

সুরেন্দ্র কিছুক্ষণ নিজের মনের ভেতরটা খুঁজে দেখলো, “আমি কী চাই?… আমি কিচ্ছু চাই না… ঘরে আমি একা। এখন তুমি একটু আমার সঙ্গে গেলে বড় মেহেরবানি হবে।”

মেয়েটার গাঢ় কালো ঠোঁটে এক অদ্ভুত ধরনের হাসি ফুটে উঠলো, “মেহেরবানি!… কিসের মেহেরবানি?… চলো!”

তারপর দুজনে একসাথে চললো ওপরে সুরেন্দ্রের ঘরের দিকে।

ঘরে পৌঁছার পর মেয়েটা সোফায় না বসে মেঝেয় পাতা ফরাশে বসে পড়লো আর নিজের পায়ের গুল চুলকোতে থাকলো। সুরেন্দ্র তার কাছে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো এখন ওর কী করা উচিত।

মেয়েটাকে সে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। ও সুন্দরী ছিলো না, তবে একজন যুবতীর শরীরে যা যা সম্পদ থাকা দরকার সব তার কাছে পুরো মাত্রায় বর্তমান ছিলো। তার কাপড় ছিলো ময়লা, কিন্তু তা সত্ত্বেও তার সুগঠিত দেহ তার পোশাকের বাইরে উঁকি দিচ্ছিলো।

সুরেন্দ্র তাকে বললো, “ওখানে বসলে কেন?… এখানে সোফায় এসে বসো!”

মেয়েটা জবাবে শুধু বললো, “না!”

সুরেন্দ্র তখন ফরাসে তার পাশে বসে পড়লো, “তোমার মর্জি… নাও, এখন বলো তুমি কে আর এতক্ষণ ধরে গাছতলায় বসে কী করছিলে?”

“আমি কে আর গাছতলায় কেন বসেছিলাম– এসব জেনে তো তোমার কোনো লাভ নেই।” এই বলে মেয়েটা তার শালওয়ারের পায়া নিচে নামিয়ে দিলো আর পায়ের গুল চুলকানো বন্ধ করে দিলো।

সুরেন্দ্র ওই সময়ে মেয়েটার দুরন্ত যৌবনের ব্যাপারে ভাবছিলো। সে এই মেয়েটার তুলনা করছিলো যে-দুটো মাঝবয়েসি চাকরানির সঙ্গে সে ইতোমধ্যে দৈহিকভাবে মিলিত হয়েছে, তাদের সঙ্গে। সে ভাবছিলো, এ মেয়েটার তুলনায় ওরা অনেক ঢিলেঢালা ছিলো, অনেক বছর ধরে ব্যবহার হতে থাকা সাইকেলের মতো। কিন্তু এর সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজ নিজ জায়গায় দৃঢ়ভাবে বসানো ছিলো।

সুরেন্দ্র ওই দুই মাঝবয়েসি চাকরানির বেলায় নিজের থেকে কোনো চেষ্টা করেনি। ওরা নিজেরাই তাকে টেনে নিজেদের কুঠুরিতে নিয়ে যেতো। কিন্তু সুরেন্দ্র এখন বুঝতে পারলো যে, এ উদ্যোগ এখন তাকে নিজেকেই নিতে হবে, যদিও এর টেকনিকটা তার পরিষ্কার জানা ছিলো না। যাই হোক, সে তার একটা হাতকে প্রস্তুত করে মেয়েটার কোমরে রাখলো।

মেয়েটা জোর একটা ঝটকা দিয়ে বললো, “এটা তুমি কী করছো?”

সুরেন্দ্র আরেকবার হতভম্ব হয়ে পড়লো, “আমি… আমি… কিছু করছি না তো!”

মেয়েটার গাঢ় কালো ঠোঁটে আবার এক অদ্ভুত ধরনের হাসি দেখা দিলো, “চুপচাপ বসে থাকো!”

সুরেন্দ্র চুপচাপ বসে রইলো, কিন্তু তার বুকের মধ্যে আলোড়ন আরো বেড়ে গেলো। তাই সে এবার সাহস সঞ্চয় করে মেয়েটাকে জাপটে ধরে বুকের মধ্যে টেনে নিলো।

অনেক হাত-পা ছুঁড়লো মেয়েটা, কিন্তু সুরেন্দ্র তাকে ধরে রাখলো শক্ত করে। ফরাশের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে গেলো মেয়েটা, আর তখন সুরেন্দ্র ছিলো তার ওপরে। সে সাথে সাথেই মেয়েটার গাঢ় কালো ঠোঁটে চুমু খেতে শুরু করলো।

মেয়েটা অসহায় হয়ে পড়েছিলো। সুরেন্দ্রের বোঝা এত ভারী ছিলো যে, তাকে সে তার গায়ের ওপর থেকে ফেলে দিতে পারলো না। তাই বাধ্য হয়েই তাকে সুরেন্দ্রের ভেজা ভেজা চুমুগুলো সহ্য করতে হচ্ছিলো।

সুরেন্দ্র ভাবলো মেয়েটা বশ মেনে গেছে, আর তাই সে আরো বেশি করে জোরজবরদস্তি শুরু করলো। তার কামিজের মধ্যে হাত গলিয়ে দিলো সে। মেয়েটা চুপ করে রইলো। হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি বন্ধ করে দিয়েছিলো সে। মনে হচ্ছিলো, প্রতিবাদ করাটা সে এখন নিরর্থক মনে করছে।

ময়দান এখন তার হাতে চলে এসেছে, এ ব্যাপারে সুরেন্দ্র যখন নিশ্চিত হয়ে গেলো, তখন সে জবরদস্তি করা বাদ দিয়ে মেয়েটাকে বললো, “চলো, পালঙ্কের ওপর গিয়ে শুই।”

মেয়েটা উঠে তার সঙ্গে গেলো। দুজনে খাটের ওপর শুয়ে পড়লো। খাটের পাশে একটা তেপায়ায় কয়েকটা মাল্টা আর একটা ধারালো ছুরি পড়ে ছিলো। মেয়েটা একটা মাল্টা হাতে নিয়ে বললো, “আমি এটা খেয়ে ফেলবো?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, একটা কেন, সবকটা খেয়ে নাও।”

তেপায়া থেকে ছুরিটা উঠিয়ে সুরেন্দ্র একটা মাল্টার খোসা ছাড়াতে শুরু করলো। কিন্তু মেয়েটা তার হাত থেকে দুটোই নিয়ে ফেলে বললো, “আমি নিজেই খোসা ছাড়িয়ে নেবো!”

খুব যতœ করে সে মাল্টাটার খোসা ছাড়ালো। কোয়াগুলোর ওপর যে সাদা সাদা আঁশগুলো থাকে, সেগুলোও পরিষ্কার করে ফেললো। তারপর মাল্টাটাকে দুভাগ করে এক ভাগ করে সুরেন্দ্রকে দিলো, আর অন্য ভাগটা মুখে পুরে দিয়ে মজা করে খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো, “তোমার কাছে পিস্তল আছে?”

সুরেন্দ্র জবাব দিলো, “হ্যাঁ আছে… কিন্তু তুমি তার খোঁজ নিচ্ছো কেন?”

মেয়েটার গাঢ় কালো ঠোঁটে আরো একবার সেই অদ্ভুত ধরনের হাসি ফুটে উঠলো, “এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। তুমি তো নিশ্চয় জানো, আজকাল হিন্দু আর মুসলিমদের মধ্যে অনেক ঝামেলা হচ্ছে।”

সুরেন্দ্র পিরিচ থেকে অরেকটা মাল্টা তুলে নিলো, “আজ থেকে হচ্ছে!… অনেকদিন থেকেই হচ্ছে।… আমার পিস্তলটা দিয়ে চার-চারটে মুসলমান মেরেছি… ভীষণ খুনি ধরনের!”

“সত্যি?” এটা বলে মেয়েটা উঠে দাঁড়ালো, “আমাকে পিস্তলটা একটু দেখাও না!” সুরেন্দ্র উঠে পাশের কামরায় গেলো। তারপর তার টেবিলের ড্রয়ার খুলে পিস্তলটা নিয়ে আবার এ ঘরে এলো, “এই নাও… তবে একটু দঁিড়াও!” এই বলে সে পিস্তলের সেফটি ক্যাচটা ঠিক করে দিলো, কারণ ওটা ছিলো গুলিভর্তি।

হাতে পিস্তলটা নিয়ে মেয়েটা সুরেন্দ্রকে বললো, “আমিও আজকে একটা মুসলমান মারবো।” এটা বলেই সে পিস্তলের সেফটি ক্যাচটা একপাশে করে দিয়ে সুরেন্দ্রের ওপর গুলি চালিয়ে দিলো।

ফরাশের ওপর পড়ে গিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় গোঙাতে গোঙাতে সুরেন্দ্র বললো, “এ তুমি কী করলে?”

মেয়েটা তার গাঢ় কালো ঠোঁটে আবারো হাসি ফুটিয়ে বললো, “যে চারজন মুসলমানকে তুমি খুন করেছো, তাদের মধ্যে আমার বাপও ছিলো।”

জ্যোতির্ময় নন্দী সাহিত্য সংগ্রহশালা

দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ-এ দীর্ঘ ৪ দশক ধরে প্রকাশিত মূল রচনার অবিকল সংরক্ষণ

ওয়েবসাইটের মূল পাতায় যান →

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)