short storyছোটগল্পসমসাময়িকসাহিত্য

শুভঙ্করের ফাঁকি

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক
২৩ মে, ২০২০
পড়ার সময়: 3 মিনিট
শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)

Text-to-Speech Voice Reader

বাংলা / EN

সাহিত্যকর্মটি অডিওতে শুনুন (Listen to this literary work)

তিন-চার মাস গৃহবন্দী থেকেই মানুষ কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে– শুভঙ্কর লক্ষ্য করে। এ অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তাদের উৎকেন্দ্রিক আচার-আচরণে, গণ ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত তাদের নানা বক্তব্যে, লেখালেখিতে। স্কুল-কলেজে, অফিস-আদালতে, ক্ষেতেখামারে, কলকারখানায়, হাটে-বাজারে, হোটেল-রেস্তোরাঁয়, রাস্তাঘাটে নিত্যদিনের চিরঅভ্যস্ত থিকথিকে জনাকীর্ণ সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষ কেমন যেন অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

এটা অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ সর্বোপরি মানুষ যূথবদ্ধ সামাজিক জীব। যতোই আন্তর্জাল সংযোগ থাক, সার্বক্ষণিক ভাইরাল উপস্থিতি থাক, মানুষের সরাসরি সংস্পর্শে যেতে না পারলে, মানুষের দেহের উত্তাপ না পেলে মানুষের মন ভরে না। কিন্তু এমন এক মারণরোগের বীজাণু প্রকৃতিতে এখন এমন অবাধ বিচরণ করছে, যার প্রতিরোধক বা প্রতিষেধক কোনো ওষুধই নেই, সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই যাকে ঠেকানোর একমাত্র উপায়।

অথচ শুভঙ্কর নিজে আজ কতদিন ধরে গৃহবন্দী! কতদিন? ঠিক মনেও পড়ে না। দু বছর? নাকি চার? কে জানে!

কিন্তু এতটা সময় ধরে গৃহবন্দী থেকেও তো শুভঙ্কর অমন, অসুস্থ হয়ে পড়ে নি! দিনে দিনে সে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এই ঘরবন্দী জীবনযাত্রার সঙ্গে। তা হলে কি সে সামাজিক জীব নয়? সে কি মনুষ্য সমাজের বাইরে?

আসলে বহুদিন তুমুল সামাজিক জীবনযাপনের পর কারো নির্দেশে নয়, স্বেচ্ছায় এই নির্বাসন বেছে নিয়েছিলো শুভঙ্কর। কারণ অনেক আগেই সে বুঝতে পেরেছিলো, ‘সমাজ’ নামের প্রতিষ্ঠানটি প্রাণঘাতী নানা জীবাণু-বীজাণুতে ভরে গেছে। সংক্রমণ ঠেকানোর একমাত্র উপায় সমাজবিচ্ছিন্নতা। যদি সে আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে চায়, ইতিবাচক সৃজনশীল কিছু করতে চায়, তা হলে তাকে স্বগৃহে স্বেচ্ছানির্বাসনে যেতেই হবে।

এ নির্বাসনের আগেই অবশ্য সে বার বার আক্রান্ত হয়েছে মারাত্মক সব জীবাণু-বীজাণুতে। দু-একবার তো তার অবস্থা প্রায় মরো মরো হয়ে দাঁড়িয়েছিলো– এখন যায় তখন যায় অবস্থা। নিতান্তই ভাগ্য আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জোরে কোনোমতে টিকে গেছে সে। কিন্তু তার কাছের মানুষদের মধ্যে অনেকেই মারা গেছে এসব ভাইরাস ব্যাকটিরিয়ার আক্রমণে। অনেকেই চলে গেছে তার মতো চিরনির্বাসনে।

সমাজে ক্ষতিকর অণুজীবদের উপস্থিতি শুভঙ্কর এবং তার কাছের বা তার মতো আরো কয়েকজন অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলো। অনেক পরে পুরো সমাজ এখন তা বুঝতে পারছে। সমাজ এখন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে ব্যক্তি বা পরিবারের সংকুচিত আয়তনে।

মুখে মধু অন্তরে বিষ নিয়ে মানুষ সামাজিকতার নামে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিচ্ছিন্নতার অনুশীলন করে আসছে চিরকাল না হোক– বহুকাল ধরে। পুঁজিবাদী জীবনচর্চায় সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু যার যা ভাব, তার তা-ই লাভ। অবচেতনে দীর্ঘলালিত সেই স্বার্থপর বিচ্ছিন্নতাবোধ নিরাকার থেকে এখন সাকার হয়ে উঠছে, সাম্প্রতিকতম অতিথি এক রোগবীজাণুর হাত ধরে।

এটাই শেষ কথা নয়। এমন আরো অনেক বীজাণু-জীবাণু ক্রমশ আসতেই থাকবে। তাদের সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে পরস্পর বিচ্ছিন্নতাই হবে সামনের মানুষের মূলমন্ত্র। সমাজকাঠামোর মধ্যেকার অদৃশ্য কোনো কুঠুরিতে বসে কুর কুর করে কালের জাল কাটবে মানুষ নামের ঘূণপোকা। আভাস পাওয়া যাবে, কিন্তু চোখে দেখা যাবে না।

পৃথিবীর প্রান্তরে উজ্জ্বল সূর্যালোকে চরে বেড়াবে শুধু নানা অণুজীব আর মানবেতর প্রাণীরা। মানবঘাতী অণুজীবদের থেকে মানবেতরদের কোনো ভয় নেই।

শুভঙ্কর ভাবে, গোড়াতেই বিরাট একটা ভুল হয়ে গেছে। সুস্থ, সুন্দর একটা বন্য প্রাণী হয়ে জন্মানো উচিত ছিলো তার। তথাকথিত সভ্য জীব হতে গিয়ে সে মাতৃক্রোড়ের অধিকার হারিয়েছে। প্রকৃতি জননী হয়তো এটাও ভাবছেন, মানুষ নামের সর্বকনিষ্ঠ সন্তানটিকে কেন তিনি অনেক আগেই আঁতুড়ে মুখে নুন দিয়ে মেরে ফেলেন নি।

জীবনে এটা একটা বিরাট ফাঁক বা ফাঁকি রয়ে গেলো শুভঙ্করের, যা সারানোর সুযোগ বা সময় প্রকৃতি হয়তো তাকে আর দেবে না।

শুভঙ্কর ভাবে….

অপরাহ্ণ ১:১২
২৩.০৫.২০২০
ঢাকা

জ্যোতির্ময় নন্দী সাহিত্য সংগ্রহশালা

দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ-এ দীর্ঘ ৪ দশক ধরে প্রকাশিত মূল রচনার অবিকল সংরক্ষণ

ওয়েবসাইটের মূল পাতায় যান →

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)