অনুবাদ

মেয়েছেলের জাত: সাদাত হোসেন মান্টো’র গল্প

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক
২০ আগস্ট, ২০২৩
পড়ার সময়: 11 মিনিট
শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)

Text-to-Speech Voice Reader

বাংলা / EN

সাহিত্যকর্মটি অডিওতে শুনুন (Listen to this literary work)

রেসকোর্সে অশোকের দেখা হয়েছিলো মহারাজা গ-এর সঙ্গে। এর পর দুজনে অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেলো।

রেসের ঘোড়া পোষাটা মহারাজা গ-এর শুধু শখ ছিলো না, একটা বাতিকই ছিলো বলা যায়। ভালো ভালো জাতের অনেক ঘোড়া মজুদ ছিলো তাঁর আস্তাবলে আর তাঁর প্রাসাদটির গম্বুজ রেস কোর্স থেকে স্পষ্ট দেখা যেতো। অনেক আজব আজব জিনিস মজুদ ছিলো সেখানে।

অশোক যখন প্রথম বার এই প্রাসাদে গেলো, মহারাজা কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করে নিজের সংগ্রহের যাবতীয় আশ্চর্য জিনিস দেখালেন। এসব জিনিস যোগাড় করতে গিয়ে মহারাজাকে সারা দুনিয়ায় ছোটাছুটি করতে হয়েছে। পৃথিবীর সব জায়গার কোণায় কোণায় খোঁজ করতে হয়েছে। এসব দেখে অশোক খুব মুগ্ধ হলো। এজন্যে সে খুব তারিফ করলো নবযুবক মহারাজার এই নির্বাচিত সংগ্রহ সম্ভারের।

একদিন অশোক ঘোড়ার ব্যাপারে কিছু টিপস নেয়ার জন্যে মহারাজার কাছে গেলো। উনি তখন ডার্ক রুমে ফিল্ম দেখছিলেন। অশোককে তিনি সেখানেই ডেকে নিলেন। ওটা ছিলো স্কেটন মিলিমিটার ফিল্ম, মহারাজার নিজের ক্যামেরায় তোলা। প্রোজেক্টর চলার পর গতবারের রেসটাকে পর্দায় পুরোপুরি ছুটে যেতে দেখা গেলো। মহারাজার ঘোড়া এ রেসে নাম্বার ওয়ান হয়েছিলো।

এ ফিল্মের পর অশোকের ফরমায়েশে মহারাজা তাকে আরো কয়েকটি ফিল্ম দেখালেন। সুইজারল্যান্ড, প্যারিস, নিউইয়র্ক, হনলুলু, হাওয়াই, কাশ্মীর উপত্যকা… ফিল্মগুলো স্বাভাবিক রঙের হওয়াতে, এগুলো দেখে অশোক খুব আনন্দ পেলো।

স্কেটন মিলিমিটার ক্যামেরা আর প্রোজেক্টর অশোকের কাছেও ছিলো। কিন্তু ফিল্মের এত বড় ভাÐার তার কাছে ছিলো না। সত্যি বলতে কী, নিজের এই শখকে প্রাণ ভরে পূর্ণ করার মতো ফুরসতই তার ছিলো না।

কিছু ফিল্ম দেখিয়ে শেষ করার পর মহারাজা কামরার আলো জ¦ালালেন আর বড় দিলদরিয়াভাবে অশোকের উরুতে থাপ্পড় মেরে বললো, “এবার কিছু বলো, দোস্ত।”

অশোক একটা সিগারেট জ¦ালিয়ে বললো, “ফিল্ম দেখে খুব মজা পেয়েছি।”

“আরো দেখাবো?”

“না না।”

“না ভাই, একটা অবশ্যই দেখো… খুবই মজা পাবে,” এই বলে মহারাজা গ একটা ছোট সিন্দুক খুলে একটা রিল বের করে একটা প্রোজেক্টরে চড়িয়ে দিলেন, “এবার দেখো, আর ভাই কিছু মনো কোরো না।”

অশোক বললো, “মানে?”

মহারাজা কামরার লাইট আবার অফ করে দিলেন, “মানে, সবকিছু মন দিয়ে দেখবে,” এই বলে উনি প্রজেক্টরের সুইচ চেপে দিলেন।

পর্দায় কয়েক মুহূর্ত শুধু সাদা আলো কাঁপতে লাগলো, আর তারপর একদম ছবি শুরু হয়ে গেলো। নগ্ন এক নারীকে সোফায় শুয়ে থাকতে দেখা গেলো। আরেক নগ্ন নারী ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলো।

অশোক কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে দেখতে লাগলো… এর পর একদম তার গলার ভেতর থেকে অদ্ভুত এক আওয়াজ বেরিয়ে এলো। মহারাজা হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হলো তোমার?”

অশোকের গলা থেকে ফোঁস ফোঁস করে আওয়াজ বেরুচ্ছিলো, “বন্ধ করো, দোস্ত, বন্ধ করো!”

“কী বন্ধ করবো?”

অশোক উঠে দাঁড়াতে গেলো, কিন্তু মহারাজা গ তাকে চেপে ধরে বসিয়ে দিলেন, “এ ফিল্ম তোমাকে একেবারে পুরোটাই দেখতে হবে।”

ফিল্ম চলতে লাগলো। পর্দায় নগ্নতা নাচতে থাকলো পর্দা খুলে ফেলে। নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক সহজাত বেহায়াপনার সঙ্গে উথাল পাথাল করছিলো। অশোকের সারাটা সময় কাটলো অস্বস্তির মধ্যে। ফিল্ম যখন শেষ হলো আর পর্দায় রইলো শুধু সাদা আলো, কেবল তখনই অশোকের বোধগম্য হতে লাগলো এতক্ষণ সে কী সব দেখেছে। প্রোজেক্টরের কারণে তার চোখে ধাঁধা লেগে গিয়েছিলো।

মহারাজা কামরার লাইট অন করে অশোকের দিকে তাকালেন আর বিরাট এক অট্টহাসি দিলেন, “কী হয়ে গেলো তোমার?”

অশোক কেমন যেন সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছিলো। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে সে চোখ বুঁজে ফেলেছিলো। কপালে জমে উঠেছিলো বড় বড় ঘামের বিন্দু। মহারাজা গ তার উরুতে জোরসে একটা থাপ্পড় দিলেন, আর এমন বেদম হাসতে লাগলেন যে তাঁর চোখে জল চলে এলো। অশোক সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। রুমাল বের করে নিজের কপালের ঘাম মুছে বললো, “কিছু হয়নি, দোস্ত।”

“কিছু হয়নি মানে কী?… মজা পাওনি?”

অশোকের গলা শুকিয়ে গিয়েছিলো। ঢোঁক গিলে গলা ভিজিয়ে সে বললো, “এ ফিল্ম কোত্থেকে আনলে?”

মহারাজা সোফায় গা এলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “প্যারিস থেকে… পারী… পারী!”

অশোক মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, “কিছু বুঝতে পারলাম না।”

“কী?”

“এরা… মানে বলছিলাম কী, ক্যামেরার সামনে এরা কেমন করে…”

“এটাই তো আশ্চর্যের ব্যাপার… ঠিক কিনা?”

“ঠিক তো বটেই।” এটা বলে অশোক রুমাল দিয়ে নিজের চোখ পরিষ্কার করে নিলো, “সমস্ত ছবি যেন আমার চোখের মধ্যে ঢুকে গেছে।”

মহারাজা গ উঠে দাঁড়ালেন, “আমি একবার কয়েকজন ভদ্রমহিলাকে ফিল্মটা দেখিয়েছিলাম।”

অশোক চিৎকার করে বললো, “ভদ্রমহিলাদের?”

হ্যাঁ হ্যাঁ… বড় মজা করে ফিল্মটা দেখেছের ওনারা।”

“মিথ্যে কথা।”

মহারাজা খুব গম্ভীরভাবে বললেন, “সত্যি বলছি… একবার দেখে ওঁরা ফের দ্বিতীয় বার দেখেছেন। দেখতে দেখতে তাঁরা একে অন্যকে চেপে ধরছিলেন, চেঁচাচ্ছিলেন আর হাসছিলেন।”

অশোক আবার মাথা ঝাঁকালো, “সীমা ছাড়িয়ে গেছে… আমি তো ভেবেছিলাম তাঁরা… হয়তো বেহুঁশ হয়ে যাবেন।”

“আমিও সেটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু ওনারা খুব উপভোগ করেছেন।”

অশোক জিজ্ঞেস করলো, “ওঁরা কি ইউরোপীয় ছিলেন?”

মহারাজা বললেন, “না রে ভাই… আমাদের দেশের মহিলা।… আমার কাছ থেকে বেশ কয়েকবার ফিল্ম আর প্রোজেক্টর চেয়ে নিয়ে গেছেন… জানি না, তাঁদের আরো কত বান্ধবীকে দেখিয়ে ফেলেছেন।”

“বলছিলাম কি…” কিছু বলতে গিয়ে অশোক থেমে গেলো।

“কী?”

“ফিল্মটা দু-একদিনের জন্যে আমাকে দিতে পারবে?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, নিয়ে যাও না!” এই বলে অসোকের বুকে খোঁচা দিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে দেখাবে শালা?”

“বন্ধুদের।”

“দেখাও, যাকে তোমার মর্জি। এই বলে মহারাজা গ প্রোজেক্টর থেকে ফিল্মের স্পুল বের করে নিলেন। ওটাতে আরেকটা স্পুল চড়িয়ে দিয়ে বের করে নেয়া স্পুলটার কৌটো অশোকের হাতে তুলে দিলেন, “নে র্ধ… মজা করগে যা!”

কৌটোটা হাতে নিয়ে অশোকের চোখ-মুখ কেমন যেন কুঁচকে গেলো। ঘোড়ার টিপস নেয়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলো আর কয়েক মিনিট এটা-ওটা বলে চলে গেলো।

ঘর থেকে প্রোজেক্টর নিয়ে গিয়ে ফিল্মটা সে কয়েকজন বন্ধুকে দেখালো। মনুষ্য চরিত্রের এই উলঙ্গ বহিঃপ্রকাশ প্রায় সবার জন্যেই বিলকুল নতুন জিনিস ছিলো। অশোক এদের প্রত্যেকের প্রতিক্রিয়া খেয়াল করে দেখলো। কয়েকজন একটু ঘাবড়ে গেলেও ফিল্মটার প্রতিটি ইঞ্চি মনোযোগ দিয়ে দেখলো।

কেউ কেউ সামান্য দেখে চোখ বুঁজে ফেললো। কেউ কেউ চোখ খোলা রেখেও ফিল্মটার আগাগোড়া ভালোভাবে দেখতে পারলো না। একজন তো বরদাশত করতে না পেরে উঠে চলেই গেলো।

তিন-চারদিন পর ফিল্মটা ফেরত দেয়ার কথা অশোকের মনে পড়ে গেলে সে ভাবলো নিজের বউকে একবার ওটা দেখিয়ে নেবে। প্রোজেক্টরটাকে তাই সে তার ঘরে নিয়ে গেলো। রাতে সে তার বউকে ডাকলো। ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলো। প্রোজেক্টরের কানেকশন ইত্যাদি ঠিক করলো। ফিল্ম বের করে ওটা ফিট করলো। তারপর কামরার বাতি নিভিয়ে ফিল্মটা চালিয়ে দিলো।

পর্দায় কয়েক মুহূর্ত সাদা আলোর কাঁপাকাঁপি চলার পর ছবি শুরু হলো। সঙ্গে সঙ্গে অশোকের বউ জোরে চিৎকার করে উঠলো, ধড়ফড় বরে উঠলো, লাফিয়ে উঠলো। তার মুখ দিয়ে অদ্ভুত আর বিচিত্র সব শব্দ বেরুতে লাগলো। অশোক তাকে চেপে ধরে বসিয়ে রাখার চেষ্টা করলে সে চোখের ওপর হাত চাপা দিয়ে চেঁচাতে লাগলো, “বন্ধ করো… বন্ধ করো।”

অশোক হেসে বললো, “আরে ভাই দেখে নাও… লজ্জা পাচ্ছো কেন?”

“না না,” এই বলে তার বউ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে যেতে চাইলো।

অশোক তাকে জোর করে ধরে রাখলো। বউয়ের যে-হাতটা চোখের ওপর চেপে রাখা ছিলো, সেটাকে সে একদিকে টেনে সরিয়ে দিলো। এই টানাটানি শুরুর সাথে সাথেই অশোকের বউ কাঁদতে শুরু করলো। অশোক ব্রেক কষলো। সে তো নিছক একটু মজা করার জন্যে তার বউকে ফিল্মটা দেখাতে গিয়েছিলো।

কাঁদতে কাঁদতে আর বিড়বিড় করতে করতে তার বউ বেরিয়ে গেলো। অশোক অল্প কিছুক্ষণ একদম শূন্যমনে বসে নগ্ন ছবিগুলো দেখতে থাকলো, যেগুলো ছিলো নানা যৌনলীলায় মশগুল। তারপরই হঠাৎ করে সে ব্যাপারটার গুরুত্ব পুরোপুরি অনুভব করতে পারলো।

এ অনুভব তাকে লজ্জার সমুদ্রে ডুবিয়ে দিলো। সে ভাবলো, আমি একটা বিরাট ভুল কাজ করেছি, অথচ আশ্চর্যের কথা হলো আমি সেটা খেয়াল পর্যন্ত করিনি। বন্ধুদের দেখিয়েছি, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু ঘরে আর কেউ না, খোদ নিজের বউকে… নিজের বউকেই…। তার কপালে ঘাম দেখা দিলো।

ফিল্মটা তখনও চলছিলো। প্রকৃতিজাত নগ্নতা নানা বিচিত্র আসন অকলম্বন করে ছুটছিলো। অশোক উঠে সুইচ অফ করে দিলো… পর্দায় সবকিছু নিভে গেলো। তবে সে তার নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো।

তার মাথা আর মন দুটোই ডুবে ছিলো বিব্রত লজ্জায়। এ অনুভব তাকে কাঁটা ফোটাচ্ছিলো যে, সে খুবই বদখত… খুবই হাস্যকর একটা কাজ করেছে। এমনকি তার মাথায় এতদূর চিন্তাও এলো যে, এর পর সে তার বউয়ের চোখে চোখ রাখবে কী করে।

কামরাটা ডুবে ছিলো গভীর অন্ধকারে। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে সে তার অনুতাপের জ্বালা খানিকটা কমানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু সফল হলো না। কিছুক্ষণ সে তার মগজের এদিক ওদিক হাতড়ে দেখলো। চারদিক থেকেই তখন তার মাথায় ঘা পড়ছিলো, তখন মাথা বাঁচানোই তার দায় হলো। তার মনে তখন এমন অদ্ভুত এক ইচ্ছার জন্ম হলো যে, কামরাটা এখন যেমন আঁধার সেভাবে তার মাথার ভেতরটাও যেন আঁধারে ছেয়ে যায়।

এ চিন্তাটাই তাকে বার বার কষ্ট দিচ্ছিলো যে, “এমন অশ্লীল একটা কাজ, আর আমি সেটা খেয়ালই করলাম না!”

তারপর সে আবার ভাবলো, এ কথা যদি শ্বাশুড়ির কানে পৌঁছে যায়… শালিরা যদি জেনে যায়! আমার ব্যাপারে তারা তখন রায় দেবে যে, এক নষ্ট চরিত্রের মানুষ পাওয়া গেছে… এর মনমানসিকতা এমন খারাপ যে নিজের বউকেই…

মনোবেদনার চাপে অশোক আরেকটা সিগারেট জ্বালালো। ওই নগ্ন ছবিগুলো, যেগুলো সে কয়েকবার দেখে ফেলেছে, তার চোখের সামনে এসে নাচতে লাগলো… আর ওদের সাথে সাথে নিজের বউয়ের চেহারাও তার চোখে ভাসছিলো। জীবনে প্রথম বার এত বেশি দুর্গন্ধের সমাহার সামলাতে গিয়ে সে বড় হয়রান পেরেশান হয়ে পড়লো। মাথা ঝাঁকিয়ে সে উঠে দাঁড়ালো আর কামরার ভেতরে অস্থির পায়চারি শুরু করলো। কিন্তু তাতেও সে তার মনোকষ্ট দূর হলো না।

কিছুক্ষণ পর সে পা টিপে টিপে কামরা থেকে বেরিয়ে এলো। পাশের কামরাটায় উঁকি দিয়ে দেখলো। ওখানে তার বউ মাথা-মুখ ঢেকে শুয়ে ছিলো। অনেকক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ভাবতে লাগলো ভেতরে গিয়ে সঠিক-সমুচিত ভাষায় বউয়ের কাছে মাফ চাইবে, কিন্তু নিজের মধ্যে সে অতটা হিম্মত আনতে পারলো না। পা টিপে টিপে সে আবার আগের কামরাটায় গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়লো।

পরদিন খুব ভোর ভোর সে উঠে পড়লো। গতরাতের কাহিনি তার মনে নতুন করে জেগে উঠলো। উয়ের সঙ্গে দেখা করাটা অশোক সমীচিন হবে বলে মনে করলো না আর সকালের জলখাবার না খেয়েই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো।

অফিসে সে মন দিয়ে কোনো কাজ করতে পারলো না। এ অনুভবটা তার মনে আর মগজে আটকে থেকে গিয়েছিলো, “এমন অশ্লীল একটা কাজ, আর আমার সেটা খেয়ালই হলো না!”

বেশ কয়েকবার সে মনস্থ করলো বউকে টেলিফোন করবে, কিন্তু প্রত্যেকবার নম্বরের অর্ধেকটা ঘুরিয়েই সে রিসিভার রেখে দিলো। দুপুরে বাড়ি থেকে চাকর তার খাবার নিয়ে এলে তাকে জিজ্ঞেস করলো, “মেমসাহেব দুপুরের খানা খেয়ে ফেলেছেন?”

চাকর বললো, “জী না… উনি বাইরে কোথাও বেরিয়ে গেছেন।”

“কোথায়?”

“জানি না, সাহেব।”

“কখন গেছেন?”

“এগারোটার সময়।”

অশোকের বুক ধড়ফড় করতে লাগলো। ক্ষিদে পালিয়ে গেলো। দু-চার গরাস খেয়েই সে হাত উঠিয়ে নিলো। একটা তোলপাড় শুরু হয়ে গিয়েছিলো তার মাথার মধ্যে। নানারকমের দুশ্চিন্তার জন্ম হচ্ছিলো তার মনের মধ্যে… এগারোটার সময় গেছে… এখনো ফেরেনি… গেলো কোথায়… মায়ের কাছে? সবকিছু বলে দেবে নাকি? নিশ্চয় বলে দেবে। মায়ের কাছে মেয়ে সবকিছু বলতে পারে… নাকি বোনদের কাছে গেলো? ওরা যদি এসব শোনে তো কী বলবে? দুই শালিই আমাকে কত সম্মান করে! কে জানে, কথা কোথা থেকে কোথায় চলে যাবে… এমন অশ্লীল একটা কাজ, আর আমার সেটা খেয়ালই হলো না…

অশোক অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লো। মোটরে করে সে এদিক ওদিক এলোমেলো চক্কর দিতে লাগলো। যখন কিছুই তার মাথায় খোলসা হলো না, তকন সে মোটর ঘুরিয়ে বাড়ির পথ ধরলো, “যা হবে সে দেখা যাবেখন।”

বাড়ির কাছে পৌঁছার পর তার বুক জোরে জোরে ধড়ফড় করতে লাগলো। লিফ্ট্ যখন একধাক্কায় ওপরে উঠে এলো, তার কলজে লাফ দিয়ে যেন মুখের মধ্যে উঠে এলো।

লিফ্ট্ থামলো তৃতীয় তলায় পৌঁছে। কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে তারপর সে লিফটের দরজা খুললো। নিজের ফ্ল্যাটের কাছে পৌঁছে তার পা দুটো থেমে গেলো। ভাবলো ফিরে যাবে, কিন্তু ততক্ষণে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেলো আর চাকর বেরিয়ে এলো বিড়ি খাওয়ার জন্যে। অশোককে দেখে সে বিড়িটা হাতের মধ্যে লুকিয়ে ফেলে সালাম দিলো। বাধ্য হয়ে অশোককে ঢুকতেই হলো ফ্ল্যাটের ভেতরে।

চাকরটা কার পেছন পেছন আসছিলো। অশোক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো, “মেমসাহেব কোথায়?”

চাকর জবাব দিলো, “ভেতরের কামরায়।”

“ওখানে আর কে আছে?”

“ওনার বোনেরা, সাহেব… কোলাবে’র সেই সাহেবের মেমসাহেব আর ওই পার্টিতে যে মহিলারা আসেন, তাঁরা।”

এ কথা শুনে অশোক ভেতরের বড় কামরাটার দিকে এগিয়ে গেলো। কামরাটার দরজা বন্ধ ছিলো। সে ধাক্কা দিলো। ভেতর থেকে অশোকের বউয়ের সরু আর তীক্ষè গলার আওয়াজ এলো, “কে?”

চাকর বললো, “সাহেব।”

কামরাটার ভেতরে তখন এক ভীষণ তোলপাড় শুরু হয়ে গেলো। চিৎকার জোরালো হলো, দরজার ছিটকিনি থোলার আওয়াজ পাওয়া গেলো। খট খট, ফট ফট আওয়াজ শোনা গেলো। অশোক করিডোর দিয়ে গিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে কামরায় ঢুকে দেখলো, প্রোজেক্টর চলছে আর পর্দায় প্রকাশ্য দিনের আলোয় নর-নারীর ঝাপসা ঝাপসা অবয়ব ঘৃণ্য যান্ত্রিক ছন্দে পাশবিক কর্মে মশগুল।

অশোক বেদম অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।

জ্যোতির্ময় নন্দী সাহিত্য সংগ্রহশালা

দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ-এ দীর্ঘ ৪ দশক ধরে প্রকাশিত মূল রচনার অবিকল সংরক্ষণ

ওয়েবসাইটের মূল পাতায় যান →

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)