[এ কাহিনির সব চরিত্র সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কারো সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত বা কাকতালীয় বলেই মনে করতে হবে।]
কী জানি কেন, মনোরমা মাসির জীবনের নানা পর্যায়ে খান বংশীয়রা বার বার অনিবার্য নিয়তির চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে।
মাসি ছিলেন সে-আমলের এম. এ.। তখনও এ শহরে বিশ্ববিদ্যালয় হয় নি। অনার্স বা এম. এ. পড়তে হলে রাজধানীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিলো না। মনোরমা মাসি হোস্টেলে নাকি কোন্ আত্মীয়ের বাসায় থেকে রাজধানীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম. এ. পাস করেছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই তিনি প্রেমে পড়েন বাংলা বিভাগের এম. এ. শেষবর্ষের ছাত্র আ ক ম (আবু কায়সার মোহাম্মদ) আসাফুদ্দৌল্লাহ্ খানের সঙ্গে। খান বংশীয় এই সুদর্শন মেধাবী যুবাও মাসির একই জেলা থেকে এসেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কবি হিসেবে তখন তাঁর এক-আধটু নামডাকও হয়েছে, এবং তিনি ক্যাম্পাস থেকে একটা মানসম্পন্ন লিটল ম্যাগও সম্পাদনা করতেন।
মেয়েদের, বিশেষ করে মনোরমা মাসিদের মতো সেসময়কার উঠতি যৌবনা, আপাদমস্তক রোম্যান্টিক, সাহিত্যপ্রেমী মেয়েদের প্রেমে পড়ার মতো সব মালমসল্লা মজুদ ছিলো আ ক ম আসাদুল্লাহ্ খানের মধ্যে। মাসি পড়লেন, এবং রীতিমতো গোঁত্তা খেয়ে। দ্বিতীয় বিভাগে প্রথম হয়ে এম. এ. পাসের পরপরই খানপুত্র চাকরি পেয়ে গেলেন তাঁর হোম টাউনের সবচেয়ে পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে, এবং মনোরমা মাসির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়ে গেলো।
সব ঠিকঠাক চলছিলো। এই আন্তঃসম্প্রদায় বিয়ে নিয়ে গোড়ার দিকে কেউ কেউ এক-আধটু ফুসফুস গুজগুজ করলেও সেগুলো ধোপে টিকলো না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো অধ্যাপক খান আর মনোরমা মাসির বিয়েটাও টিকলো না। অধ্যাপক সাহেব বুঝি একটু বেশি রাশ পরাতে গিয়েছিলেন মনোরমা নামের তেজী অশ্বিনীটাকে! এসব আপাতপ্রগতিবাদী মানুষ আবার ভেতরে ভেতরে রক্ষণশীলতার চূড়ান্ত হতে পারেন তো! কিন্তু মনোরমা মাসী তো কোনো অযাচিত বাঁধন মেনে নেয়ার পাত্রী নন! সব ছেড়েছুঁড়ে তিন বেরিয়ে এলেন অধ্যাপক সাহেবের কোয়ার্টার থেকে। তখন তাঁর পেটে খান সাহেবের সাতমাসের বাচ্চা।
আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেলো। মাসি কোনো খোরপোশ দাবি করলেন না। খান সাহেবও স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কিছু দিলেন না।
খালি হাতেই শুরু হলো মনোরমা মাসির জীবনসংগ্রামের একটা কঠিন পর্ব। বাপের বাড়িতে ছেলের জন্ম দিয়েই তাকে নিয়ে তিনি আবার চলে গেলেন রাজধানীতে। সেখানে একটা পরিবারে ছেলেসহ থেকে তাদের বাচ্চাদের দু বেলা পড়ানোর পাশাপাশি ছেলের পরিচর্যাও করতে করতে এম. এ. পড়ার পাটটা শেষ করেন। তারপর আবার ফিরে যান তাঁদের গ্রামের বাড়িতে, বিধবা মায়ের কাছে।
গ্রামে ফিরে মাসি যোগ দেন সেখানকার হাই স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে। তাঁর সব কথা জেনে, ভালোবাসায় যতটা নয় তার চেয়ে বেশি অনুকম্পা, করুণায় গলে গিয়ে তাঁকে বিয়ে করেন তাঁর সহকর্মী শিক্ষক বিনয় সেন। খান সাহেবের পুত্রটির পিতার সব দায়িত্ব পালনেও তিনি সম্মত হন।
এর পর মোটামুটি সুখেই চলছিলো মনোরমা মাসির সংসার। মাসির দ্বিতীয় বিয়ের বছর চারেক পর মারা গেলেন তাঁর মা। বয়স যতটা নয়, নানা অসুখ বিসুখ তাঁকে কাহিল করে ফেলেছিলো। ইত্যবসরে মাসির আরো একটা ছেলে হয়েছে। বড় ছেলেটাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। মাসি আর বিনয়বাবু দুজনেই মাস্টারি করছেন। ছেলেদের দেখাশোনার জন্যে একজন ঝি রাখা হয়েছে।
এমন সময় দেশে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। নিয়তির অমোঘ নির্দেশে মাসির জীবনে দ্বিতীয় বারের জন্যে আবির্ভাব ঘটলো খান পদবীধারীর। তবে এবার একজনের নয়, একদলের, এবং এরা স্বদেশি নয়, বিদেশি। মুক্তিযুদ্ধকে নির্মূল করার অভিযানে আসা এসব খান পুঙ্গবেরা প্রথমে বিনয়বাবুকে গুলি করে মারলো। তারপর ছেলেদের চোখের সামনেই পালাক্রমে ধর্ষণ করলো মনোরমা মাসীকে। তারপর ঘরে আগুন দিয়ে মাসীর কোলের ছেলেটাকে বেয়োনেটে গেঁথে আগুনে ছুঁড়ে দিলো। বড়টা পালিয়ে যাওয়ায় কোনোমতে বেঁচে যায়। এসব ঘটার সময় অবশ্য মাসি অজ্ঞান ছিলেন, উপর্যুপরি ধর্ষণের ধকলে।
আশ্চর্য মাসির প্রাণশক্তি! সব কিছু সামলে ফের উঠে দাঁড়ালেন। দেশ স্বাধীন হলো। মাসি আবার যোগ দিলেন শিক্ষিকার কাজে। কিন্তু জীবিত ছেলেটা আর আগের মতো স্বাভাবিক হলো না। যুদ্ধের সময়ে দেখা তীব্র বিভীষিকা তার মাথার মধ্যে ওলটপালট করে দিয়েছিলো। সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে গিয়েছিলো সে। পড়াশোনা করতো না, স্কুলে যেত না। সারাদিন এখানে ওখানে, বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতো। একদিন মাসি যখন স্কুলে ক্লাস নিচ্ছেন, খবর এলো, তাঁর ছেলের লাশ ভেসে উঠেছে প্রতিবেশী ভটচাজদের এক পরিত্যক্ত ডোবায়।
জীবনে মাসির আর কেউ রইলো না, কিন্তু জীবনটা রয়ে গেলো। স্কুলের চাকরিটা দিয়ে কোনোমতে চলছিলেন, কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বছর না ঘুরতেই সেটাও গেলো। কারণ মাসি খানসেনাদের ধর্ষিতা বলে স্কুলে নানারকম কথা উঠছিলো। অভিভাবকরা মনে করছিলো, এমন শিক্ষিকার কাছে পড়লে তাদের সন্তানদের নৈতিক অধঃপতন হতে বাধ্য।
এর পর শুরু হলো মনোরমা মাসীর চরম দুর্দশার ভাসমান জীবন। তাঁর জীবনের এ পর্বটতেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি তখন শহরের উদীয়মান জনপ্রিয় পত্রিকা ‘উদয়দিগন্ত’-এর সহকারী সম্পাদক। মাসি একদিন গুটি গুটি পায়ে আমার সেই পত্রিকা অফিসে এসে হাজির হলেন। রোদ আর জীবনের আগুনে পোড়ানো শীর্ণ চেহারা, ধূলিধূসরিত খালি পা। হাতে ঝোলানো রশি দিয়ে বাঁধা স্কুলছাত্রদের কয়েকটি এক্সারসাইজ খাতা।
এ দেশের মাটিতে তাঁর সন্তানদের দেহাবশেষ মিশে আছে, আর তাই তিনি জুতো পায়ে এই পবিত্র মাটি মাড়াতে পারবেন না বলে মনোরমা মাসি ঘরে-বাইরে সর্বত্র সবসময় খালি পায়ে থাকতেন। তীব্র ঠান্ডা বা গরমের সময়েও।
আমার মামাবাড়ির গ্রামের মেয়ে হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি বললেন, “আঁ’র দিদি তোঁয়ার মা’র ক্লাসমেট আছিল্। আঁই তানে-অ দিদি ডাইকতাম। তইলে আঁই হইলাম যে তোঁয়ার মাসি (আমার দিদি তোমার মায়ের ক্লাসমেট ছিলো। আমি তাঁকেও দিদি ডাকতাম। তাই আমি হলাম গিয়ে তোমার মাসি।”
এই বলে তিনি আমার হাতে খাতাগুলো তুলে দিয়ে বললেন, “তুঁই ত লেখক মানুষ। আঁর লেখাউন এক্কানা পড়ি চ। ভালা লাইলে ছাবাইয়। (তুমি তো লেখক মানুষ। আমার লেখাগুলো একটু পড়ে দেখো। ভালো লাগলে ছাপিয়ো)।”
খাতা খুলে দেখলাম, খুদে খুদে লেখায় ভর্তি। বললাম, “খাতাউন রা’ই য’ন, মাসি। আঁই চা’ই রাইখ্যম। (খাতাগুলো রেখে যান, মাসি। আমি দেখে রাখবো)।”
মাসিকে রঙ-চা আর বিস্কুট খাইয়ে বিদায় করে খাতাগুলো নিয়ে বসলাম। দেখলাম, লেখাগুলোর সাহিত্যমূল্য যা’ই হোক, ঐতিহাসিক এবং মানবিক মূল্য বিরাট। সিদ্ধান্ত নিলাম ছাপানোর।
উদয়দিগন্তে ধারাবাহিক লেখা ছাপানোর সুবাদে শহরে মাসির একটু নাম-পরিচয় হলো। শহরের অন্যান্য পত্রিকায়, এমনকি রাজধানীর দু-একটা পত্রিকাও মাসির লেখা ছাপানো শুরু করলো। পত্রপত্রিকায় লেখাসূত্রে মাসির কিছু আয়রোজগারও হতে থাকলো।
উদয়দিগন্তে মনোরমা মাসির যে-লেখাটা ধারাবাহিক ছাপা হয়েছিলো, সেটা আসলে তাঁর ঠিক আত্মজীবনী না হলেও আত্মজৈবনিক লেখা বটে। এ অঞ্চলের তথা দেশের একটা সময়কালের, এবং সেইসঙ্গে দেশের জনজীবনে মুক্তিযুদ্ধের ভয়ঙ্কর প্রভাবের একটা প্রামাণ্য দলিলের মতো ছিলো লেখাটি।
পত্রিকায় বেরুনো শেষ হওয়ার পর একদিন তিনি খাতাগুলো নিয়ে হাজির হলেন শহরের এক উঠতি প্রকাশকের দপ্তরে। বললেন, “অ বাজি, আঁর বইউয়া বাইর করি দ্য। ধর, আঁই তোঁয়ারে কিছু ট্যাঁ দি যাইর। বাকি ট্যাঁ আঁই বই বেচি শোধ করি দিয়ম। চিন্তা ন কইরগ্য, দরকার হইলে আঁই দুয়ারত দুয়ারত হাঁডি বেয়াক বই বেচনর ব্যবস্থা কইরগম্ (ও বাবাজি, আমার বইটা বের করে দাও। ধরো, আমি তোমাকে কিছু টাকা দিয়ে যাচ্ছি। বাকি টাকা আমি বই বেচে শোধ করবো। চিন্তা কোরো না, দরকার হলে আমি দুয়ারে দুয়ারে হেঁটে সব বই বেচার ব্যবস্থা করবো)।”
হংসদূত প্রকাশনার মালিক কামালউদ্দিন আবার মনোরমা মাসির লেখা পড়ে তাঁর কিছুটা ভক্ত হয়ে পড়েছিলো। বইটা ছাপাতে সে রাজি হয়ে গেলো।
বই ছাপা হলো তিনশ কপি। রমা মাসির ইচ্ছে ছিলো পাঁচশ কপি ছাপানোর। কামালউদ্দিন অতটা ঝুঁকি নিতে রাজি হয় নি। যা-ই হোক, এর পর থেকে মনোরমা মাসিকে দেখা যেতো কাঁধে ঝোলানো থলেতে করে বই নিয়ে চিরাচরিত খালি পায়ে সারা শহর টহল দিতে। পরিচিত, অর্ধপরিচিত, অপরিচিত সবার বাড়িতে, দোকানে, অফিসে তিনি গিয়ে হাজির হতেন তাঁর বই নিয়ে। বৈশাখের খর রোদে যখন রাস্তার পিচ গলছে, তার মধ্যে দিয়ে খালি পায়ে মাথা নুইয়ে মনোরমা মাসির হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য এখনও আমার চোখে ভাসে।
এমনই একদিন হেঁটে যাওয়ার সময় এসে তাঁর হাত ধরলো তাঁর জীবনে আবির্ভূত খান বংশজাতদের শেষজন। তার নাম সালাহউদ্দিন খান বাচ্চু। খান পদবীটা অবশ্য সে ব্যবহার করতো না। দেশের মুক্তিযুদ্ধ তার জন্মের অনেক আগের ঘটনা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আচ্ছন্ন তার মনে ‘খান’ পদবীটার ওপর এমন গভীর বিতৃষ্ণা জমেছিলো যে, নাম থেকে সে ওটা পুরোপুরি ছেঁটে ফেলেছিলো। সবাই তাকে চিনতো সালাহউদ্দিন বাচ্চু নামে। সে ছিলো এ শহরের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এম. এ. শেষ বর্ষের ছাত্র। মনোরমা মাসির জীবনে তাঁর জীবননাট্যের পুরোনো একটি দৃশ্যই যেন পুনরাভিনীত হচ্ছিলো। কিন্তু এবারের খানপুত্র এলো তাঁর জীবনে প্রেমিকের নয়, পুত্রের অধিকারের দাবি নিয়ে।
একদিন তীব্র রোদের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে তেষ্টায়, ক্লান্তিতে মাসির মাথায় চক্কর লেগে যাওয়ায় তিনি একটা ল্যাম্পপোস্টের ছায়ায় একটু দাঁড়িয়েছিলেন। বাচ্চু যে অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর ওপর চোখ রাখছে, সেটা তিনি জানতেন না। তাঁকে টাল খেয়ে পড়ো পড়ো হতে দেখে বাচ্চু এগিয়ে এসে বললো, “মা, শরীর খারাপ লাগের না (মা, শরীর খারাপ লাগছে নাকি)?”
বহুবছর পর অবার মা ডাক শুনে মাসির কান ভিজে গিয়েছিলো, গলা না ভিজলেও। চোখ তুলে তিনি ছেলেটার দিকে চাইলেন। বিশ-বাইশ বছরের একটি তরুণ। বেঁচে থাকলে তাঁর ছোট ছেলেটাও বয়সে এর চেয়ে অনেক বড় হতো। বললেন, “হ অ বা’জি, মাথাউয়া এক্কানা চক্কর দি উট্ঠিল্ (হ্যাঁ বাবা, মাথাটা একটু চক্কর দিয়ে উঠেছিলো)।
বাচ্চু তাঁকে ধরে ধরে পাশের এক চায়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসিয়ে পাখার স্পিডটা পুরো করে দিলো। তারপর তাঁকে প্রথমে ঠান্ডা জল, আর তারপর গরম চা-সিঙাড়া খাইয়ে চাঙা করে তুললো। মনোরমা মাসিকে সে আগেই নামে চিনতো, তাঁর লেখাও কিছু কিছু পড়েছিলো।
পাশের জেলার ছেলে সালাহউদ্দিন বাচ্চু এখানে একটা মেসে থাকে। এ শহরে তার স্বজন বলতে কেউ নেই। আসলে সে মাতৃহারা হয়েছে সুদূর শৈশবেই। এ কষ্ট তাকে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। আজ পথে পথে ঘুরতে থাকা এক অনাথিনী মাকে দেখে সে তাকে আর ছাড়তে চাইলো না।
মনোরমা মাসিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো, শহরে তাঁর থাকার কোনো জায়গা নেই। ভোরের ট্রেন ধরে রোজ শহরে আসেন। সারা দিন ঘুরে ঘুরে বই বেচে সন্ধ্যার ট্রেনে বাড়ি ফিরে যান। প্রায়শই টিকেট করতে পারেন না। টিকেট চেকার কোনোদিন তাকে ধরলেও কিছু বলে না। গ্রামের বাড়িটিও ভেঙে ভেঙে পড়ছে। সারাই করার ক্ষমতা তাঁর নেই। যেকোনো সময়ে ওটা বাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে যাবে।
সালাহউদ্দিন বাচ্চু তারপর চেষ্টাচরিত্র করে মাসির জন্যে, এবং সেইসঙ্গে তার জন্যেও এক কামরার একটা বাসস্থলের ব্যবস্থা করলো, তার কিছু সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবী আর ব্যবসায়ী বন্ধুর বদৌলতে। শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে, পত্রিকা, প্রকাশনা আর বই বিপণী পাড়ার মাঝখানে এই বাসাটার নামমাত্র ভাড়াটা মাসির লেখা আর বই বিক্রি থেকে পাওয়া টাকা আর বাচ্চুর টিউশনি থেকে পাওয়া টাকা মিলিয়ে শোধ করা হতো।
মনোরমা মাসি তাঁর বইপত্র, বাক্স-প্যাঁটরা, বাসনকোসন, আর গুটি পাঁচেক বেড়াল নিয়ে ওই বাসায় অধিষ্ঠিতা হলেন। মা ষষ্ঠীর দান ছেলেদের হারিয়ে ফেললেও ষষ্ঠীর বাহন বেড়ালের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কোনোদিনও হারায় নি। আর তার ফলও মা ষষ্ঠী তাঁকে দিয়েছেন, শেষবয়সে তাঁর কোলে না হোক বুকে আরেকটা ছেলে দিয়ে।
বেড়ালগুলোর মধ্যে গোটা তিনেক তিনি নিয়ে এসেছিলেন গাঁয়ের বাড়ি থেকেই। আরো দুটো শহরে এ বাসাতেই এসে জুটেছিলো। মাসি তাঁর বাসার একটিমাত্র কামরায় একটা চওড়া চৌকিতে পঞ্চ মার্জার পরিবৃতা অবস্থায় বসে, নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে, ক্লিপবোর্ডে কাগজ এঁটে লিখছেন, দরজার পাশে আরেকটা ছোট চৌকিতে বাচ্চুও কিছু লিখছে বা পড়ছে, এমনটা আমরা আকছার দেখতাম মাসির সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে।
তখন থেকে মাসির বই বিক্রি অভিযানে অনিবার্য সঙ্গী হিসেবে দেখা যেতো বাচ্চুকে। বইয়ের ঝোলা সে নিজ কাঁধে নিয়েছে, আর জরা-বার্ধক্যে ক্রমশ নুয়ে আসতে থাকা মনোরমা মাসির হাত ধরে এগিয়ে চলেছে ধীর পায়ে, শহরের বড়রাস্তা, ফুটপাত, গলিঘুঁজি দিয়ে– এটা শহরে এক নিত্য চেনা দৃশ্য হয়ে দাঁড়ালো। বাচ্চুই তাঁকে নিয়ে যেতো বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে, বইয়ের দোকানে, নানা অনুষ্ঠানে।
মাসির প্রথম এবং মধ্যযৌবনে খানপুত্রেরা দু-দুবার ভেঙে দিয়েছে তাঁর সাধের, সুখের ঘর। শেষজীবনে আরেক খানপুত্র কোথা থেকে যেচে এসে তাঁকে দেয় এতটুকু শান্তি, স্বস্তি, নির্ভরতার এক পরম আশ্রয়।
এভাবেই বোধ হয় ঈশ্বর মানুষের সব পাওনা তার জীবৎকালেই শোধ করে দেন।
মাসির মৃত্যুকালে তাঁর মুখে শেষবারের মতো জল বাচ্চুই দিয়েছে। তাঁর শেষকৃত্যে করণীয় সবকিছুও করেছে বাচ্চু। মনোরমা মাসির কাছে অতীতের খানপুত্রদের যে-বিশাল দেনা জমা হয়ে গিয়েছিলো, নতুন প্রজন্মের এক খানপুত্র এসে সে-দেনা যথাসাধ্য শোধ করে দিয়েছে।