[নামে কিবা আসে যায়– এ কথাটা আমরা বার বার বলি। প্রসঙ্গক্রমে আমরা টেনে আনি শেক্সপিয়রের ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ নাটকের সেই বিখ্যাত উক্তি: “What’s in a name? That which we call a rose” (নামে কিবা আসে যায়? গোলাপকে যে নামেই ডাকো…)। এ কথাটা দার্শনিক যুক্তির মাধ্যমে বলা হয়েছে মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘মদালসা উপাখ্যান’ বা ‘মদালসা উপদেশ’-এ।
এটা আসলে একটা গান– একটা ঘুমপাড়ানি গান। ক্রন্দনরত একটি শিশুকে ঘুম পাড়াতে এক সুশিক্ষিতা, পরম জ্ঞানী, দিব্যদর্শী মা এ গান গেয়েছেন, আর এই গানের মধ্যে দিয়ে তিনি কিছু কথা বলে গেছেন শিশুটির উদ্দেশ্যে। কথাগুলো শিশুটি বুঝবে আরো বড় হলে, যদিও আপাতত এ গানের মায়াবী সুর শুনতে শুনতে সে ঘুমিয়ে পড়বে। রোজ ঘুমিয়ে পড়ার আগে শুনে শুনে গানের দুর্বোধ্য কথাগুলো তার মুখস্ত হয়ে যাবে, যেমনটা শিশুদের হয়ে থাকে। তারপর বড় হতে হতে কথাগুলো ক্রমে বোধ্য, সুবোধ্য হয়ে উঠবে তার কাছে। আর তখনই ফলবে সুফল– মায়ের বাক্য সত্যিই হয়তো বাঙ্ময় হয়ে উঠবে তার জীবনে।
বিদূষী মনস্বিনী এই জননীর নাম মদালসা, যা আপনারা নিশ্চয় আগেই আঁচ করেছেন। ঘুমপাড়ানি গানের ছলে তাঁর নামাঙ্কিত উপদেশগুলো তিনি দিয়েছিলেন তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র অলর্ককে।
মদালসা ছিলেন রাজা কুবলয়াশ্ব ওরফে ঋতধ্বজের রানি। তিনি ছিলেন বিদূষী, অন্তর্দর্শী, আত্মজ্ঞানী একজন মহিলা। রাজা ঋতধ্বজ ও রানি মদালসা’র চারটি পুত্র ছিলো। এদের মধ্যে প্রথম তিনজনের নাম রাজা নিজে রেখেছিলেন, যথাক্রমে বিক্রান্ত, সুবাহু ও শত্রুমর্দন। তিনটি নামের অর্থই বেশ ভালো, যথাক্রমে– ‘বিক্রমসম্পন্ন’, ‘সুন্দর সুদৃঢ় বাহুধারী’, এবং ‘শত্রু দমনকারী’।
কিন্তু প্রতিবার রাজা যখন এক-একটা ছেলের নাম রাখতেন, রানি মদালসা মুখ টিপে হাসতেন। কেন হাসছেন জিজ্ঞেস করলে কিছু বলতেন না। এতে রাজা খুব বিরক্ত আর ক্ষুব্ধ হতেন। তাই শেষে যখন তাঁদের চতুর্থ ছেলের জন্ম হলো, তখন রাজা রানিকে বললেন, “এবার আমি না, তুমিই ছেলের নাম রাখো।” মদালসা তখন তাঁর এই ছেলেটির নাম রাখেন অলর্ক, যার মানে হলো ‘পাগলা কুকুর’।
অলর্ক যখন একটু বড় হলো, তখন সে গুরুগৃহে পড়তে গেলে বা বন্ধু সহপাঠীদের সঙ্গে খেলতে গেলে তারা তার নামের অর্থ নিয়ে তাকে নানা ব্যঙ্গবিদ্রূপ করতো, আর সে ঘরে এসে কাঁদতো। তার কান্না থামানোর জন্যে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে ঘুম পাড়ানোর জন্যে মদালসা গানটা গাইতেন বলে কথিত আছে।
রানি মদালসার এই গানে বিদ্ধৃত আছে ভারতীয় দর্শনের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বেদান্তের নির্যাস, তার সবচেয়ে বিশুদ্ধ চেহারায়। এত জ্ঞানী দার্শনিক একজন নারীর রচনা, অথচ তারপরও প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য মেনে মদালসার সংস্কৃতকে প্রাকৃতগন্ধী করে দেয়া হয়েছে। তবুও দার্শনিক গুরুত্ব বিচারে আঠারো পুরাণের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কণ্ডেয় পুরাণে ঠাঁই দেয়া হয়েছে ‘মদালসা উপদেশ’-কে। প্রাচীন ভারতের বিদূষী গার্গী, মৈত্রেয়ী প্রমুখের পাশে মদালসাকেও বসানো যায় কিনা ভেবে দেখা যায়।
নিচে ‘মদালসা উপাখ্যান’ বা ‘মদালসা উপদেশ’-এর বাংলা অনুবাদের একটা চেষ্টার নিদর্শন দেয়া গেলো।]
১.
शुद्धोसि बुद्धोसि निरँजनोऽसि
सँसारमाया परिवर्जितोऽसि
सँसारस्वप्नँ त्यज मोहनिद्राँ
मँदालसोल्लपमुवाच पुत्रम्।
শুদ্ধোসি বুদ্ধোসি নিরঞ্জনোসি
সংসারমায়া পরিবর্জিতোসি।
সংসারস্বপ্নং ত্যজ মোহনিদ্রাং
মন্দালসোল্লপমুবাচ পুত্রম্॥
বাংলায়:
তুই শুদ্ধ, বুদ্ধ, নিরঞ্জন,
কর্ তুই যত সংসারমায়া বর্জন।
ছাড়্ সংসারস্বপ্ন, ছাড়্ মোহনিদ্রা,
জড় আলস্য ঝেড়ে ফেল্ তুই, পুত্র।
২.
शुद्धोऽसि रे तात न तेऽस्ति नाम
कृतँ हि तत्कल्पनयाधुनैव।
पच्चात्मकँ देहँ इदँ न तेऽस्ति
नैवास्य त्वँ रोदिषि कस्य हेतो॥
শুদ্ধোসি রে তাত ন তেস্তি নাম
কৃতং হি তৎকল্পনয়াধুনৈব।
পচ্চাত্মকং দেহং ইদং ন তেস্তি
নৈবাস্য ত্বং রোদিষি কস্য হেতো॥
বাংলায়:
শুদ্ধ রে তুই, বাবা, তোর নাম শুধু
কল্পিত আরোপ ছাড়া আর কিছু নয়!
পঞ্চ উপাদানের এ দেহ, এও তোর নয়!
তবুও তুই কাঁদছিস কী কারণে।
৩.
न वै भवान् रोदिति विक्ष्वजन्मा
शब्दोयमायाध्य महीश सूनूम्।
विकल्पयमानो विविधैर्गुणैस्ते
गुणाश्च भौताः सकलेन्दियेषु॥
ন বৈ ভবান্ রোদিতি বিক্ষ্বজন্মা
শব্দোয়মায়াধ্য মহীশ সূনূম্।
বিকল্পয়মানো বিবিধৈর্গুণৈস্তে
গুণাশ্চ ভৌতাঃ সকলেন্দিয়েষু॥
বাংলায়:
বিশ্বের সার বাস্তবতায় কাঁদে না,
এগুলো, কুমার, শুধু শব্দের মায়া।
যেসব গুণকে তোমার ভাবছো তুমি
উপাদানেরাই আসল মালিক তাদের।
৪.
भूतनि भूतैः परिदुर्बलानि
वृद्धिँ समायाति यथेह पुँसः।
अन्नाम्बुपानादिभिरेव तस्मात्
न तेस्ति वृद्धिर् न च तेस्ति हानिः॥
ভূতনি ভূতৈঃ পরদুর্বলানি
বৃদ্ধিং সমায়াতি যথেহ পুংসঃ।
অন্নাম্বুপানাভিরেব তস্মাৎ
ন তেস্তি বৃর্দ্ধি ন চ ন তেস্তি হানিঃ॥
বাংলায়:
উপাদান কমে গেলে হোস দুর্বল
বাড়লে হোস আরো বেশি বলবান।
মনে হয়, এটা অন্ন-জলের প্রভাব,
অথচ আসলে তোর ক্ষয়-বাড় নেই!
৫.
त्वम् कँचुके शीर्यमाणे निजोस्मिन्
तस्मिन् देहे मूढताँ मा व्रजेथाः।
शुभाशुभौः कर्मभिर्देहमेतत्
मृदादिभिः कँचुकस्ते पिनद्धः॥
ত্বম্ কঞ্চুকে শীর্যমাণে নিজোস্মিন্
তস্মিন্ দেহ মূঢ়তাং মা ব্রজেথাঃ।
শুভাশুভৌঃ কর্মভির্দেহমেতৎ
মৃদাদিভিঃ কঞ্চুকস্তে পিনদ্ধ॥
বাংলায়:
দেহ যেন ক্রমশ পুরোনো এক জামা
মূর্খের মতো যার মধ্যে বন্দী তুই।
জামাটা তোকে পরানো হয়েছে
শুধুমাত্র শুভাশুভ কর্মফল পেতে।
৬.
तातेति किँचित् तनयेति किँचित्
अँबेति किँचिद्धयितेति किँचित्।
ममेति किँचित् न ममेति किँचित्
त्वम् भूतसँघँ बहु म नयेथाः॥
তাতেতি কিঞ্চিৎ তনয়েতি কিঞ্চিৎ
অংবেতি কিঞ্চিদ্ধয়িতেতি কিঞ্চিৎ।
মমেতি কিঞ্চিৎ ন মমেতি কিঞ্চিৎ
ত্বম্ ভূতসঙ্ঘং বহু মে নয়েথাঃ॥
বাংলায়:
কেউ ডাকবে বাবা, কেউ বলবে ছেলে,
কেউ পরিচয় দেবে মা, কেউ-বা স্ত্রী বলে।
কেউ বলবে, ‘তুমি আমার’, কেউ বলবে, ‘কিছু নও’!
আসলে তো তুমি উপাদান সমষ্টি ছাড়া কিছু নও।
৭.
सुखानि दुःखोपशमाय भोगान्
सुखाय जानाति विमूढचेताः।
तान्येव दुःखानि पुनः सुखानि
जानाति विद्धनविमूढचेताः॥
সুখানি দুঃখোপশমায় ভোগান্
সুখায় জানাতি বিমূঢ়চেতাঃ।
তান্যেব দুঃখানি পুনঃ সুখানি
জানাতি বিদ্ধনবিমূঢ়চেতাঃ॥
বাংলায়:
ভ্রান্ত চোখে মনে হয়, কিছু বস্তু যেন
দুঃখ দূর করে এনে দেয় কত সুখ!
জ্ঞানী জানে, আজকে যেটাতে সুখভোগ
কালকেই হবে সেটা দুঃখের আকর।
৮.
यानँ चित्तौ तत्र गतश्च देहो
देहोपि चान्यः पुरुषो निविष्ठः।
ममत्वमुरोया न यथ तथास्मिन्
देहेति मात्रँ बत मूढरौष।
যানং চিত্রৌ তত্র গতশ্চ দেহো
দেহোপি চান্যঃ পুরুষো নিবিষ্টঃ।
মমত্বমুরোয়া ন যথ তথাস্মিৎ
দেহেতি মাত্রং বত মূঢ়রৌষ॥
বাংলায়:
গাড়ির আরোহী কিন্তু ভিন্ন গাড়ি থেকে
যেমন ভিন্ন দেহ থেকে দেহের ভেতরে সত্ত্বাটাও।
দেহ আর দেহের মালিক কিন্তু এক নয়,
নিজেকে এ দেহ ভাবা কেবলই মূঢ়তা!
রাত ১০:১৪
১১.০৪.২০২০
ঢাকা
…………………………………………………………………………..
সঙ্গে দেয়া ছবিটির শিল্পী রাজা রবিবর্মা