কবি, ভ্রমণকাহিনি রচয়িতা, ক্রীড়া কলামিস্ট শরৎচাঁদ থিয়ামের জন্ম ১৯৬১-তে, ভারতের মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে। উনি নেশায় কবি হলেও, পেশায় একজন প্রকৌশলী। কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন খুব অল্পবয়সেই। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে এবং পরে কবিতার আরো দুটি বই ‘ছো ছাবুন’ আর ‘আফ্রিকা’ প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৯৮৯ এবং ১৯৯৩-এ। ১৯৯৪-এ প্রকাশিত তাঁর চতুর্থ বই ‘হাজিল্লাকপা এইশিং গি মানাক্তা’ একটি ভ্রমণকাহিনী, যেটি আসলে কেরালায় দক্ষিণ ভারতীয়দের সঙ্গে তাঁর কাব্যিক মিথস্ক্রিয়ার একটি ফসল। এ বইটির জন্যে ২০০৬ সালে তিনি ভারতের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
কবিতা রচনায় তাঁর নৈপুণ্য, শৈলী, ভাষা এবং বক্তব্য বিচারে থিয়ামকে যথোপযুক্তভাবেই উত্তরাধুনিকতাবাদী কবিদের দলে ফেলা হয়ে থাকে।
মানব সমাজের সমকালীনতার শ্বাসপ্রশ^াসতুল্য থিয়ামের কবিতায় মানবজাতির বেদনা আর যন্ত্রণার প্রতিফলন দেখা যায়। কাব্যে প্রায়শই তিনি নৈতিকতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকেন। মানবতাবাদ তার কবিতার এক অনিবার্য অঙ্গ। সেদিক থেকে কেউ কেউ থিয়ামকে ‘বিশ^প্রেমিক কবি’ বলে উল্লেখ করে থাকেন।
কবির নিজের মাতৃভাষায় লেখা কিছু কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করে ‘দা ওয়েভস’ নামে একটি গ্রন্থে সঙ্কলিত করেছেন বি. এস. রাজন। বইটা বেরিয়েছে ১৯৯৫-এ, ইম্ফলের পোকনাফাম পাবলিকেশনস থেকে। বইটি থেকে কয়েকটা কবিতা এখানে বাংলা অনুবাদ করে দেয়া হল, যেগুলো এই মনিপুরী কবির কবিতার মেজাজ বুঝতে বাংলাভাষী পাঠকদের সহায়ক হবে বলে মনে হয়।
১.
ঢেউ
প্রতিটি তলই চিরআলোড়নে,
ঢেউয়ের পরে ঢেউ
নিঃশব্দে ধেয়ে আসে
সাগর আর মহাসাগরগুলো চিরগতিশীল,
তরঙ্গ শিখরগুলো আঘাত করে, চাপ দেয়
আর আলিঙ্গন করে শুষ্ক কঠিন ভূমির
ঊষর চেহারাকে।
সৈকতগুলো আশ্রয় খোঁজে
কংক্রিট প্রাচীরে হেলান দিয়ে।
আমি দেখি প্রাচীরগুলো টপকে যাওয়া
দুঃসাহসী ঢেউগুলোকে
আর আমার পিতামহীর মধ্যেকার পরিবর্তনগুলোকে
— তার চেহারা ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে
উঁচুনীচু অসমান ঢেউগুলোর।
সময়টা এমন
রোববার সোমবার
কিছুই আর গোনা হচ্ছে না।
বিশাল বিশাল ঢেউয়ের চূড়াগুলো গিলে নিয়েছে
অনেক বুদ্ধ পূর্ণিমা
তারা লুকিয়ে ফেলেছিল আইডিগুলো,
আর অকথিত শুভ বড়দিনগুলো
আর ঢেকে ফেলেছে কৃষ্ণ জন্মগুলোকে
আর নিয়ে চলে গিয়েছে বহু চেইরাওবাকে*
তাদের ডানার নিচে।
একসময় সে গুনতো
রোববার সোমবার মঙ্গলবার
আর জানুয়ারি ফেব্রæয়ারি মার্চ–
তার যে আঙুলগুলো এভাবে গুনতো
সেগুলো এখন
হাঁটাচলা করার ছড়ির দখলে।
ঢেউগুলো
নিঃশব্দ হোক বা উদ্দাম
কখনো সংযোগ হারায় না
ভেজা হোক বা শুকনো ভূমির সঙ্গে।
ঢেউগুলো
এক অন্তহীন ভ্রমণ
যেখানে আর কোনো ফিরে আসা নেই।
………………………….
*চেইরাওবা: মণিপুরের মেইতেই সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব। চান্দ্র সববর্ষ উপলক্ষে এ উৎসব পালন করা হয় সাধারণত এপ্রিল মাসে। –(অনুবাদক)
২.
আমার বোন
জোর বৃষ্টি পড়ছে তবুও আমার বোন
অত তাড়াহুড়ো করে বাইরে যেয়ো না।
অন্ধকার মিশে যাচ্ছে সবকিছুর সঙ্গে
এটা দিন শুধু নামেই
যে মুহূর্তে সে তার বাবার বাড়ি
পেছনে ফেলে চলে গেছে
তার স্ত্রী রাতের বাড়িতে
তার সঙ্গে থাকার জন্যে
আমাদের দিন আর
তার পুরোনো ভালো সত্তায় নেই।
নিরর্থক, নিরর্থক এটা ভাবা, বোন আমার
তুমি পারতে নিজেকে বাঁচাতে
একটা ছাতা দিয়ে আর শুকনো থাকতে
এই ভারী আর তীব্র মুষলধার বৃষ্টি থেকে।
যে শব্দটা শুনছোু সেটা জোরালো
কিন্তু ওটা শুধু বাচ্চাদের খেলাধূলার আওয়াজ
যা প্রতিটি কক্ষ ভরে তুলেছে
তাদের কলরব আর রিনরিনে চিৎকারে।
বৃষ্টির অবস্থা এখন আরো খারাপ হচ্ছে,
বোন তুমি যেয়ো না, যেয়ো না, যেয়ো না গো
দেখো বোন প্রতিটি উঠোন
মঙ্গরক কানবি* হয়ে গেছে।
তোমার শোনা শব্দটা সুস্পষ্ট
এখন এটা সৈন্যদের বুটের শব্দ
যা সর্বত্র ধ্বনিত হচ্ছে
বোন, এখন বাইরে যেয়ো না।
তোমার যাওয়া উচিত হবে না এটা নিশ্চিত
লুকিয়ে পড়ো বোন, দয়া করে,
তোমাকে অবশ্যই লুকিয়ে পড়তে হবে
নিরাপদ ও নিশ্ছিদ্র কোথাও।
…………………………….
*মঙ্গরক কানবি: এটা মণিপুরের একটি গিরিখাতের নাম, যেটাকে একসময়ে নিষিদ্ধ স্থান হিসেবে মনে করা হতো। মেইতেই সম্প্রদায়ের কারো অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে তাকে এই গিরিখাতে ফেলে বা রেখে দেয়া হতো, প্রাকৃতিক নিয়মে পচে-গলে যাওয়ার জন্যে। –(অনুঃ)
৩.
ইম্ফল
(১)
এখানে শোকবিলাপ করে
ওরা– সোনার কানের দুল পড়া শিশুরা
(২)
ইম্ফল ডিমাপুর রোড
ইম্ফল জিরিবাম রোড
স্নায়ু আর ধমনীগুলো
(৩)
হালকা জলখাবার
এসব ফুলের টব
বনসাই করা গাছগুলোর ওপর
ছোট মেয়েটার ছেটানো জলের ফোঁটাগুলো
চোখের জলের ফোঁটাগুলো
(এসব বড় বড় মাছ ঘর সাজানোর জিনিস
আর তাদের ক্ষণস্থায়ী হাসি)
(৪)
মাতাল ফুটপাত
এখন খারাপ ব্যবহার করছে
পথচারীদের সাথে
(৫)
বাসগুলো
সবদিক থেকে
একের পর এক
এখানে পৌঁছে যায়
পিঠে ধুলোর বোঝা নিয়ে
সাফসুতরো পোশাক পরা লোকেরা আর
ময়লা পোশাক পরা লোকেরা
প্রতিদিন মেশামেশি ঠাসাঠাসি হয়
খোয়াইরাম কেইথেলের হাতে
নিজেদের কাপড় যোগাতে অক্ষম
গরিব কুঁড়েঘরগুলো
এত লজ্জা পায় যে
তারা নিজেদেরকে ঢাকে
খবরের কাগজের পাতা দিয়ে
(৬)
ফুলের ঝুড়িটা সুন্দর
আর বিক্রির জন্যে রাখা
ফুলে ফুলে ভরা
ভক্তেরা আসে পুজোর জন্যে
কিন্তু তারা তিনবার হাততালি দেয় না
ফুলগুলোর ব্যাপারে একটা লেনদেন হয়
আর ওরা কোথায় যেন নিয়ে যায় সেগুলোকে
(৭)
আগুন
জল
হাওয়া
অবিচ্ছেদ্য এরা
(৮)
একজন বিদেশি পর্যটক
চুমু খেলো চা ভর্তি একটা গ্লাসের
ভাঙা কানায়
রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকানে
(৯)
চাল
ডাল
ভোজ্য তেল
নুন
ব্যবসা মুনাফা দালান
(১০)
ইম্ফল
ইয়াম্ফালের বিকৃতি
৪.
তুষারাবৃত প্রান্তর
অন্ধকার দেশের কালো হয়ে যাওয়া লোকগুলো
বেরিয়ে এলো তুষারাবৃত প্রান্তরে
খেলতে আর গড়াগড়ি খেতে।
আঁধার ভূমির এই কালো হয়ে যাওয়া লোকগুলো
এখন লেগে পড়েছে এমন এক ভূমির খোঁজে
যেখানে আলো চিরায়ত
যেহেতু তারা জেনে এসেছে যে
কখনো কখনো
যে আলোর বিচ্ছুরণ
অন্ধকার গিরিখাতকে আলোকিত করে তোলে
সেটা বিজলি ছাড়া আর কিছু নয়।
এক বিরাট বিস্ফোরণ, ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত
জেলিগ্নাইট ধোঁয়া অবরুদ্ধ করে দেয় সবকিছুকে
আর আকাশ জোরেশোরে মুছতে থাকে
তার দু চোখ। ওগুলো আরক্তিম হয়ে ওঠে।
আকাশের নিচে
ধোঁয়ার ভেতরে
কামানের শব্দ গড়াতে থাকে
গড়াতেই থাকে।
একটা ছেলে পড়ে থাকে মহাসড়কে
একটা সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা,
তার সঙ্গী শুধু তার শরীরের ওপর
ক্রীড়ারত একঝাঁক মাছি।
একটা কোমল মেয়ে তার ঢাকাটা সরায়
তার অশ্রুর ভারী ফোঁটাগুলো ঝরে পড়ে এ প্রশ্নটি হয়ে
— তোমার স্বপ্নগুলো কি এই সাদা চাদরের ছিলো?
এই আঁধার ভূমির কালো হয়ে যাওয়া লোকগুলো
হাওয়ায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
তারা এলোমেলো আকীর্ণ এখানে ওখানে
সাদা চাদরগুলো তাদেরকে ঢেকে রাখে
এই বাতাসে ঝাঁট দেয়া মেঝেতে।
এই লোকগুলো, কালো
একটা ভূমির, অন্ধকার
এখনো পেছনে রেখে যায় অন্ধকার গিরিখাত
একটা তুষারাবৃত প্রান্তরের জন্যে
সাদা চাদরের বিস্তার পেরিয়ে।
৫.
সৈনিকসুলভতা: আমার ধরন
কোনো পথ দেখছি না
এই অবরুদ্ধ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরুনোর।
এখনো সেখানে একটা দরজা হাট করে খোলা–
মত্যু আমাকে ডাকে তার মধ্যে দিয়ে,
যেটা আমার বেরুনোর পথ না
তাই আমি নিশ্চিত ফিরে আসি
তাই আমি নিশ্চিত পালিয়ে যাই
যাতে আমার চোখ তার ওপর আর কখনো না পড়ে
যাতে তাকে আমার কখনো মনে না পড়ে
আর যাতে আমি নিজেকে দুর্বল করে না ফেলি।
আমি পালিয়ে যাবো
শত্রুদের ভেদ করে একটা পথ করে নিয়ে।
আমার যে নিজস্ব ধরনের সাহস আছে
এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
কিন্তু আমি বুঝতে পারি না
কেন আমার বুড়ো মা
তার জরতী হাতে লন্ঠন ধরে
আজও পথ চেয়ে থাকে
কখন আমি বাড়ি ফিরবো।
সরু আর অন্ধকার ওই গলিতে
যদি আলো না থাকতো
আমরা সবাই একই রকম হয়ে যেতাম।
এখন আমাদের হাতগুলো
পিছমোড়া শক্ত করে বাঁধা
আর আমরা লড়ে যাচ্ছি কুকুরের মতো
যাতে যুদ্ধটা ছড়িয়ে পড়ে।
আমার মাথায় বটপাতার মুকুট,
পাক খাওয়া ঝড় সেটাকে
ছুঁড়ে ফেলে দেয় মাটিতে।
তা হলে কেন সে সেটাকে তার পায়ের তলায়
গুঁড়ো গুঁড়ো করে পিষে ফেললো,
যেন শুধু ছুঁড়ে দিয়েই সন্তুষ্ট নয়?
এমনকি যখন আমি তাড়াহুড়ো করি
উঁচু ভবনগুলোকে ধসিয়ে ফেলতে,
ধ্বংসের জন্যে বাধ্য সেই সময়ে
কেন আমি কাঁদি,
ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটার দীর্ঘ চুল দেখে
যেটা তার মাসি কেটে ছোট করে দিয়েছে,
আর একা একা হাঁটতে অভ্যস্ত আমার পা
কেন পরাভ‚ত করে
তাদের স্বেচ্ছাপ্রত্যাবর্তনকে?
সৈনিকসুলভতা, লড়াই, আমার ধরন–
এটাই আমি জেনে এসেছি,
এই যুদ্ধক্ষেত্রেই আমার মৃত্যু ঘটানো হবে।