খাসিয়া কবি উ সোসো থাম ১৮৭৩ সালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁকে বলা হয়ে থাকে বৃষ্টি, মেঘমালা আর রামধনুর কবি।
সোসো থাম ছিলেন শিলংয়ের সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম খাসিয়া শিক্ষক। বেশ বেশি বয়সেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন, এবং অনূদিত কিছু কাজ বাদে নিজের কবিতার দুটো বই বের করেন। অতি নগণ্য এই প্রারম্ভ সত্তে¡ও কালক্রমে তিনি খাসিয়া কবিদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন, যাঁর কবিতা আজও খাসিয়া সমাজে গান হিসেবে গাওয়া হয়, এবং তাঁর বিভিন্ন উক্তি সেখানে এখনও সর্বত্র শোনা যায়। ১৯৪০ সারে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
কবি সোসো থামের তিনটি কবিতা তাঁর স্বজাতীয় অনুবাদক কাইন্ফাম সিং নংকাইনরিহ্’র করা ইংরেজি ভাষান্তর থেকে বাংলা করে এখানে তুলে ধরা হলো।
১.
শ্যামল তৃণ
বনের মধ্যে চুপচাপ
আগাছার ভেতরে ওটা গজিয়ে ওঠে;
এক অসামান্য ফুল, উ তিয়েও দোহমও*,
একটা উচ্চমার্গীয় ধ্যানধারণার জিনিস।
ছায়াময় ঝরনাগুলোর ধারে চুপচাপ
আনন্দদায়ী ফার্নগুলো সবুজ থেকে যায়
বারোটা পূর্ণিমা অব্দি
শুকিয়ে গিয়ে সুরভিত হবে বলে।
বলো আমাকে হে দেবপ্রিয় গোধূলীবেলা,
আর তোমরা হে পুঞ্জীভূত মেঘমালা
বলো আমাকে কোথায় সেই তারা
যেটা আকাশের কপালে প্রথম টিপ পরিয়েছিল।
চুপচাপ সে বেঁচে থাকে, মরে যায় চুপচাপ
বিজন বনের অন্তরালে;
চুপচাপ তাকে বিশ্রাম নিতে দাও
শ্যামল, সবুজ ঘাসের নিচের কবরে।
*উ তিয়েও দোহমও: একরকমের বুনো ফুল, গভীর জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
২.
চলে যাওয়া দিনগুলো
পাহাড়শ্রেণির ভেতরে যাওয়ার জন্যে আমি রি* সোহ্রায় যাবো,
উ তিয়েও সোহ্খাহ্ আর উ তিয়েও পওয়াং লুম**-এর ভূমিতে,
কা সিম পিয়েং-এর ভ‚মিতে, উ কাইতর***-এর ভূমিতে,
শৌর্য-বীর্যের ভূমিতে, সংস্কৃতির ভূমিতে।
শোনো, রি সোহ্রায় সেই ঈয়েওবাহ্**** এসে পৌঁছেছে
ধনুর্বিদ্যার জিতে যেতে পারে, এমত সম্ভাবনার উল্লাসের অনুরণন তোলে এটা!
গহ্বরে ডোবে ওটা, আকাশ থেকেও ওটা লতিয়ে নামে
একটা খাসিয়া, একটা প্নার, একটা ভই*****, বা একটা যুদ্ধের কাছে।
এর দুরারোহ পর্বত-কিনারাগুলো উপচে পড়ছে অন্তহীন
সেই জলস্রোত নিয়ে যেটা গর্জ্যমান, সেই হাওয়া নিয়ে যেটা স্নিগ্ধ কোমল,
আর সে হৃদয় নিয়ে যেটা চিরদিন বনে বনে গুনগুন যৌবনের গান গেয়ে যায়
যেভাবে গুড়গুড় শব্দ তোলে রি ওয়ারের গিরিখাত আর প্রতিধ্বনি ওঠে পাথরের চাঁইগুলোতে।
আত্মীয় স্বজন আর বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে চলে এসেছি অনেকদিন,
অন্যেরা যদিও চলে গেছে, অন্যেরা এখনো টিকে আছে;
এভাবেই সোহ্রা আর তার রজত সমুদ্রগুলোর সম্মান
আরেকবার, আরো একবার এলো চোখ ধাঁধিয়ে।
এভাবেই চলে যাওয়া দিনগুলো, ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের মতো উঠে আসে ,
আমি জানি না তোথায় তাদের শুরু বা কোথায় শেষ;
শুধু এটুকুই আমি জানি, যেটা প্রায়ই আমি চাই–
আরেকবার, আরেকটি বার আমি চাই শিশু হতে।
*রি: দেশ
**উ তিয়েও সোহ্খাহ্ আর উ তিয়েও পওয়াং লুম্: দুটি অর্কিডের নাম।
***কা সিম্ পিয়েং এবং উ কইতর: দুরকমের গায়ক পাখি।
****ইয়েওবাহ্: বড় বাজারের দিন।
*****প্নার, ভই এবং ওয়ার: তিনটা খাসিয়া উপগোষ্ঠীর তথা তাদের ভাষার ও ভৌগোলিক এলাকার নাম।
৩.
সহিষ্ণুতা
ঘাসে ঝরা শিশিরের ফোঁটা
সকালের রোদে তারা চমকায়
আমিও বেরিয়ে পড়বো বাড়ি থেকে
এই মুক্তো কুড়ানোর আশায়।
শ্যামল তৃণের বুক থেকে
খররোদে উবে যায় তারা;
তাদের মতোই উড়ে হবো
অজানা আসমানের তারা।
দূরের অজানা পথে কাঁটা
যদিওবা বিঁধে রক্ত ঝরে
বাড়ি থেকে চলে যাবো আমি
ফিরে আসবো বহুকাল পরে
হৃদয়ও ভারাক্রান্ত হবে
বাড়ি থেকে দূরে গেলে চলে;
অশ্রুবিন্দু যেগুলো ঝরবে
তারা কিন্তু মুক্তো আসলে।