সমসাময়িক

করোনার গোদের ওপর আম্ফানের বিষফোঁড়া

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক
২৩ মে, ২০২০
পড়ার সময়: 3 মিনিট
শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)

Text-to-Speech Voice Reader

বাংলা / EN

সাহিত্যকর্মটি অডিওতে শুনুন (Listen to this literary work)

আগের রাতেও পশ্চিম বঙ্গের এক বন্ধু নিশ্চিন্তে বলছিলেন, “কী, আম্ফান তো আপনার দেশের দিকে চললো !! যা-ই বলুন, ঝড়-তুফানরা কিন্তু বাংলাদেশকে খুব ভালোবাসে।”

আবহাওয়াবার্তা থেকে মানুষ ততক্ষণে জেনে গেছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ঠ আম্ফান বা আম্পান বা উম্পুন আবার দিকবদল করেছে। পশ্চিম দিকে ভারতের উড়িষ্যার দিকে যাওয়া স্থগিত রেখে সে রওনা হয়েছে উত্তরে বাংলাদেশকে তাক করে। আসার পথে অবশ্য ভারতের বাংলা বা পশ্চিম বঙ্গকেও একটু ছুঁয়ে আসার কথা ছিলো।

কিন্তু শেষমুহূর্তে আবারও একটু দিকবদল করে মহাঝড়টা ঝাঁপিয়ে পড়লো পুরোপুরি পশ্চিম বঙ্গের ওপরেই। রাজ্যটির রাজধানী কলকাতাসহ সুন্দরবন সংলগ্ন কয়েকটা জেলা। বাংলাদেশের সুন্দরবনের লাগোয়া জেলাগুলোতেও হিংস্র নখর বুলিয়েছে আম্ফান।

মানুষের, গবাদিপশুর, বন্য জন্তুজানোয়ারের মৃত্যু, বিপুল শস্য-সম্পদহানি– এগুলো নিয়ে আমার নতুন করে কিছু বলার নেই। সংবাদ  মাধ্যমগুলো অবিরাম এসবের ধারাবর্ণনা দিচ্ছে। এসব দেখে আমার নিজের কিন্তু মনে পড়ে যাচ্ছে, চট্টগ্রামবাসী হিসেবে আমার জীবৎকালেই অতীতে দেখা আরো বহু ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের কথা। ছোট-বড় অনেক ঝড়ের কথা বাদ দিলেও ১৯৬০, ১৯৬৪, ১৯৭০, ১৯৯১-এর

কলকাতার শহরতলীতে আম্ফানের ছোবল

 

প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াল স্মৃতি তো জীবনে মোছার নয়।

আজকের কলকাতা আর তার আশেপাশের জেলাগুলোর অবস্থা দেখে অতীতের মহাঝড়ের পর বাংলাদেশের চট্টগ্রামসহ উপকূলীয় জেলাগুলোর বিধ্বস্ত চেহারা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে অসংখ্য প্রাণ অজস্র সম্পদহানির কথা।

আমার ভারতীয় বাঙালি বন্ধু ঠিকই বলেছিলেন– ঝড়-তুফানেরা বাংলাদেশকে বড্ড ভালোবাসে। কিন্তু এবার কাহিনিটা অন্যরকম হয়ে গেলো। ঝড়ের ভালোবাসা এবার উথলে পড়লো বন্ধুটির দেশের ওপরেই।
তাঁর এবং তাঁদের দেশের অধিকাংশেরই তুফানের এধরনের তাণ্ডবের সঙ্গে পরিচয় এই প্রথম। কারণ কলকাতায় অতীতের কিছু বড় বড় ঝড়ের বিবরণ পুরোনো পত্রিকার পাতায়, সরকারি নথিপত্রে পাওয়া গেলেও, স্মরণকালের মধ্যে এমন ঝড় কলকাতাবাসী দেখে নি।

১৯৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত চট্টগ্রাম

অতীতের অনুরূপ অভিজ্ঞতা না থাকায়, কলকাতার মানুষজন ক্ষয়ক্ষতি যতটা না হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্যানিকড হয়ে গেছে। আমার মনে পড়ছে, ১৯৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ের পর চট্টগ্রামে অনেক এলাকায় মাসাধিককাল বিদ্যুৎ ও লাইনের জল ছিলো না। অমানুষিক কষ্টে আমরা দিনের পর দিন কাটিয়েছি। কিন্তু আমরা তখন অতটা ভীতিগ্রস্ত হই নি। কারণ এ ধরনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের, বিশেষ করে এখানকার উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের ছেলে-বুড়ো সবার কম-বেশি আছে। সমস্ত মৃত্যু ও ধ্বংস কাটিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো ভস্মস্তূপ থেকে পুনরুত্থানের কলাকৌশল বাংলাদেশের মানুষের মজ্জাগত।

এবার চট্টগ্রামে না হলেও বাংলাদেশের অন্য কয়েকটি জেলায় অবশ্য জোরালো থাবা বসিয়েছে আম্ফান। তাতে মৃত্যু আর ক্ষয়ক্ষতিও কম নয়, যদিও ১৯৭১ বা ‘৯১-এর তুলনায় তা নগণ্যই বলতে হবে।

করোনা ভাইরাস আর আম্ফানের যুগপৎ আক্রমণে এ অঞ্চলের মানুষের নাভিঃশ্বাস উঠেছে। এ দুই আক্রমণকারীর মধ্যে আবার অনেক

করোনা আতঙ্ক আর আম্ফানের আক্রমণে পর্যুদস্ত পশ্চিম বঙ্গের এক মা আর তাঁর শিশুসন্তান

মিলও আছে। করোনা বীজাণুর ঘন ঘন জিনগত গঠন পাল্টানোর মতোই ঘন ঘন দিক পাল্টিয়েছে আম্ফান। আবার এই বীজাণু আর ঘূর্ণিঝড় দুটোই প্রথমে আক্রমণ করেছে যেখানে করার নয়, সেখানেই। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলো বাদ দিয়ে কোভিড-১৯ প্রথমে আক্রমণ করেছে ধনে-মানে, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে উন্নত প্রথম বিশ্বকে। অন্যদিকে, আম্ফান তার পুরোনো প্রিয়তমা বাংলাদেশকে একপাশে সরিয়ে রেখে নতুন প্রিয়তমা করে নিয়েছে পশ্চিম বঙ্গকে।

মাওলার খেলা কে বুঝিতে পারে…!!!

জ্যোতির্ময় নন্দী সাহিত্য সংগ্রহশালা

দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ-এ দীর্ঘ ৪ দশক ধরে প্রকাশিত মূল রচনার অবিকল সংরক্ষণ

ওয়েবসাইটের মূল পাতায় যান →

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)