[মার্কিন কবি, ছোট গল্পকার, সম্পাদক, সমালোচক এবং যুক্তরাষ্ট্রের রোম্যান্টিক আন্দোলনের অন্যতম নেতা এডগার অ্যালান পো (Edgar Allan Poe, ১৯ জানুয়ারি, ১৮০৯ – ৭ অক্টোবর, ১৮৪৯)’র পরিচয় সাহিত্যামোদীদের কাছে নতুন করে দেয়ার কিছু নেই। বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী এই প্রতিভাবান সাহিত্যিকের সারা জীবন কেটেছে নানা রকম যন্ত্রণা, আর্থিক দৈন্য ও মানসিক অস্থিরতার মধ্যে। বিশ বছর বয়স হবার আগেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন এবং তখনই তাঁর কিছু কিছু রচনা প্রকাশিত হয়। ১৮৪৯ সালে, মাত্র ৪০ বছর বয়সে, এক রহস্যজনক পরিস্থিতিতে পো’র মৃত্যু ঘটে।
জীবদ্দশায় একদিকে তিনি অসংযমী জীবনযাপন করেছেন, জুয়ো খেলেছেন, অসুস্থ হয়েছেন, মাদকসেবন করেছেন। মৃত্যুর এক বছর পূর্বে ঘুমের বড়ি খেয়ে একবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন। অন্য দিকে এতসবের মধ্যেও কয়েকটি গভীর আবেদনময় কবিতা ও ব্যতিক্রমধর্মী ছোটগল্প রচনা করে শুধু মার্কিন সাহিত্যভুবনে নয়, বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে নিজের জন্য একটি গৌরবমণ্ডিত স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলির মধ্যে রয়েছে ‘হেলেনকে’’, ‘স্বপ্ন’, ‘ইজাবেল’, ‘দাঁড়কাক’, ‘অ্যানাবেল লী’ প্রভৃতি। ‘দা রেভেন’ বা ‘দাঁড়কাক’ কবিতাটি রোম্যান্টিকতা, মোহন সুরেলা ছন্দোময়তা ও তার রহস্যময় পরিমণ্ডলের জন্য বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতারূপে স্বীকৃতি পায়।
পো তাঁর বেশ কয়েকটি ছোটগল্পে উল্লেখযোগ্য নৈপুণ্যের সঙ্গে রহস্যময়, ভুতুড়ে, মৃত্যুর গন্ধমাখা, খুনখারাবি ভরা, আতঙ্কতাড়িত পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। গোয়েন্দা-গল্পের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। উপরিউক্ত ধারার রচনার মধ্যে ‘আমন্তিলাডোর পিপা’, ‘কালো বিড়াল’, ‘রু মর্গের হত্যাকাণ্ড’ এবং ‘চুরি যাওয়া চিঠি’ তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উচ্চমানের রচনাশৈলী এবং প্রতীকবাদী দৃষ্টিভঙ্গির উচ্চ প্রশংসা করেছেন পরবর্তী কালের অনেক শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন আইরিশ কবি ডব্লিউ. বি. ইয়েট্স্, ফরাসি কথাসাহিত্যিক মপাসাঁ, কবি শার্ল বদ্ল্যের ও পল ভালেরি।
বাংলা সাহিত্যেও বিপুল প্রভাব এই বিশ্ববিশ্রুত লেখকের। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের কবি-সাহিত্যিকেরা অনেকেই প্রভাবিত হয়েছেন পো’র রচনা পড়ে। রবীন্দ্রনাথের ‘একই গাঁয়ে’ আর এডগার অ্যালেন পো’র ‘অ্যানাবেল লি’র মধ্যে মিল এতটাই বেশি যে, প্রথমটাকে দ্বিতীয়টার ভাষান্তর বা ভাবান্তর বলেই সাহিত্যবিদদের অনেকে মনে করেন। আবার অনেকের মতে, জীবনানন্দ দাশের অতি বিখ্যাত কবিতা ‘বনলতা সেন’-এর উৎস এডগার অ্যালান পো’র কবিতা ‘টু হেলেন’। এ দুটো কবিতার মধ্যেকার মৌলিক মিলগুলোও বিস্ময়কর।
আজও পো’র সাহিত্যকর্ম সাধারণ পাঠক ও বিদগ্ধ সমালোচক সবার কাছে সমাদৃত। নিচে পো’র দুটি বিখ্যাত কবিতা ‘Alone’ এবং ‘To Helen’ যথাক্রমে ‘একা’ ও ‘হেলেনকে’ নামে বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হলো। সঙ্গে রাখা হলো মূল কবিতা দুটিও।]
১.
একা
ছেলেবেলা থেকে আমি বাকিদের চেয়ে অন্যরকমের একা।
আর সকলের থেকে একদম অন্যরকম আমার দেখা।
ভিন্ন উৎস থেকে উৎসারিত আমার নিজস্ব আবেগ-উচ্ছ্বাস।
ওদের উৎস থেকে কখনো নিইনি আমি বেদনা নির্যাস।
আমার হৃদয় কখনো জেগে ওঠেনি একই আনন্দের সুরে।
যাদের বেসেছি ভালো, বেসেছি একান্তে শুধু নিজ অন্তঃপুরে।
তারপর একদিন আমার শৈশবে, ঝোড়ো এক জীবনের
ঊষাকালে, এসেছে বেরিয়ে জেনো প্রতিটি ভালো আর মন্দের
গভীর গহ্বর থেকে সে-এক রহস্য, যেটা আজো যায় ডেকে
আমাকে আটকে রাখে স্রোতস্বিনী থেকে, কিংবা ঝর্নাধারা থেকে,
পর্বতের রক্তিম শিখর থেকে, আমাকে ঘিরে ঘূর্ণায়মাণ
শরতের সোনায় রাঙানো সূর্যালোক থেকে, দ্রুত ধাবমান
আমার নিকট দিয়ে আকাশের উড়ন্ত বিজলি রেখা থেকে,
ঝড়-ঝঞ্ঝা বজ্রপাত থেকে, এবং যখন মেঘ অতিরেকে
আমার দৃষ্টিতে নেয় দানবের রূপ, যে-সময়ে অনাবিল
আকাশের বাকিটুকু থেকে যায় নিতান্তই নির্মল সুনীল।
মূল কবিতা:
ALONE
From childhood’s hour I have not been
As others were; I have not seen
As others saw; I could not bring
My passions from a common spring.
From the same source I have not taken
My sorrow; I could not awaken
My heart to joy at the same tone;
And all I loved, I loved alone.
Then- in my childhood, in the dawn
Of a most stormy life- was drawn
From every depth of good and ill
The mystery which binds me still:
From the torrent, or the fountain,
From the red cliff of the mountain,
From the sun that round me rolled
In its autumn tint of gold,
From the lightning in the sky
As it passed me flying by,
From the thunder and the storm,
And the cloud that took the form
(When the rest of Heaven was blue)
Of a demon in my view.
২.
হেলেনকে
হেলেন, আমার চোখে সৌন্দর্য তোমার
সেই কবেকার নিসীয়* বল্কলের মতো,
ক্লান্ত, পথশ্রান্ত পরিব্রাজক ধীরে ধীরে সুরভিত
সাগরের পথে নিয়ে আসে যারে স্বদেশে তাহার।
কতদিন আহা ঘুরছি উত্তাল সাগরে সাগরে
তোমার শ্যওলা চুল, তোমার ধ্রুপদী মুখ,
জলপরী রূপ ডেকে আনে গ্রিসের গৌরবে,
রোমের মহিমায় আমাকে নিজ ঘরে।
ওই তো দূরে আলোকোজ্জ্বল জানলার ধারে
মর্মরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছো তুমি
রত্নদীপ হাতে যেন দেবী কোনো স্বর্গভূমি
হতে নেমে এলে এই পৃথিবীর পারে।
*নিসিয়া: খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের রোমান সাম্রাজ্যের বিথিনিয়া রাজ্যের একটি শহর। আধুনিক তুরস্কের অন্তর্গত এ শহরের বর্তমান নাম ইজনিক।
মূল কবিতা:
TO HELEN
Helen, thy beauty is to me
Like those Nicéan barks of yore,
That gently, o’er a perfumed sea,
The weary, way-worn wanderer bore
To his own native shore.
On desperate seas long wont to roam,
Thy hyacinth hair, thy classic face,
Thy Naiad airs have brought me home
To the glory that was Greece,
And the grandeur that was Rome.
Lo! in yon brilliant window-niche
How statue-like I see thee stand,
The agate lamp within thy hand!
Ah, Psyche, from the regions which
Are Holy-Land!