HistoryPoemঅনুবাদইতিহাসকবিতাসাহিত্য

উর্দুর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ-২

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক
১০ আগস্ট, ২০২০
পড়ার সময়: 10 মিনিট
শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)

Text-to-Speech Voice Reader

বাংলা / EN

সাহিত্যকর্মটি অডিওতে শুনুন (Listen to this literary work)

মির্জা আসাদুল্লাহ্ খান গালিব

মোগল রাজত্বের অবসান আর ব্রিটিশ শাসনের সূচনা জুড়ে ছিলো গালিবের জীবনকাল। তাঁর জন্ম ১৭৯৭-এর ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন আকবরাবাদ (বর্তমান আগ্রা’র) দরিয়াগঞ্জে। মৃত্যু ১৮৬৯-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লির চাঁদনি চৌক এলাকার বাল্লিমারানে কাসিম জান গলির একটা বাড়িতে। বর্তমানে বাড়িটি ‘গালিবের হাবেলি’ নামে পরিচিত।

ভারতবর্ষে দুটি পৃথক শক্তি (মোগল ও ব্রিটিশ)’র প্রতিষ্ঠিত দুটি সাম্রাজ্যের পতন ও উত্থানের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে গালিবের উর্দু কবিতায় গভীরভাবে ধ্বনিত হয়েছে নৈরাজ্য আর বিষাদের স্বর, যার কিছু নিদর্শন মিলবে নিচে উদ্ধৃত কবিতায়:

কোঈ উম্মীদ বর নহীঁ আতী
কোঈ সূরত নজর নহীঁ আতী।

মওত কা এক দিন মু’আইয়ান হ্যায়
নিন্দ ক্যোঁ রাত ভর নহীঁ আতী?

আগে আতী থী হাল-এ-দিল পে হাঁসী
অব কিসী বাত পর নহীঁ আতী।

জানতা হুঁ সওয়াব-এ-তা’আত-ও-জাহাদ
পর তবীয়ত ইধর নহীঁ আতী।

হ্যায় কুছ অ্যায়সি হী বাত জো চুপ হুঁ
ওয়র্না ক্যা বাত কর নহীঁ আতী?

ক্যোঁ ন চীখূন কি য়্যাদ করাতে হ্যাঁয়
মেরি আওয়াজ র্গ নহিঁ আতী।

দাঘ-এ-দিল গর নজর নহীঁ আতা
বূ ভী অ্যায় চারাগর নহীঁ আতী।

হম বঁহা হ্যাঁয় জহাঁ সে হমকো ভী
কুছ হমারী খবর নহীঁ আতী।

মরতে হ্যাঁয় আরজূ মে মরনে কি
মউত আতী হ্যায় পর নহীঁ আতী।

কা’বা কিস মুঁহ সে জাওগে ’গালিব’
শর্ম তুমকো মগর নহীঁ আতী?

বাদশাহ্‌ বাহাদুর শাহ্‌ জাফর আয়োজিত শেষ মুশায়রার দৃশ্য। শাহজাদা ফখরু’র সঞ্চালনায় সম্পন্ন এই কাব্যপাঠের অনুষ্ঠানে সম্রাট-কবি ও গালিবসহ তৎকালীন মুখ্য কবিরা সবাই যোগ দিয়েছিলেন।

বাংলায়:

কোনো আশাই আমার ঘরে আসে না,
কোনো চেহারাই আমার নজরে আসে না।

মৃত্যু তো একদিন নিশ্চয় আসবে,
তা হলে সারা রাত ঘুম কেন চোখ ভরে আসে না।

মনের এ অবস্থায় আগে হাসি পেতো,
এখন কেন কোনোকিছুতেই হাসি আর আসে না?

ধর্মাচরণের পুরস্কার কী আমি জানি,
কিন্তু আমার মন সেদিকে আর আসে না।

এজন্যেই আমি চুপ হয়ে গেছি,
তা না হলে, বলো, তোমার সঙ্গে আমার বলার কথা কি আসে না?

তোমার কথা আমার মনে পড়বে না কেন?
অথচ আমার আর্তস্বর তোমার কানে আসে না।

আমি এখন এমন এক অবস্থায় আছি
যখন আমার নিজের খবরই আমার কাছে আসে না।

মরার বাসনা নিয়ে মরছি,
মৃত্যু আসে, কিন্তু তারপর আর আসে না।

কাবায় কোন মুখে যাবে গালিব
তোমার কি তবে লজ্জাও আসে না?

দুঃখের সাগর পাড়ি দিয়ে অবশেষে গালিব বলেছেন:

বহু দুঃখ-কষ্ট, বেদনা-যন্ত্রণায় জীবন অতিবাহিত করার পর তাঁর অন্তিম উচ্চারণ:

হো চুকিঁ গালিব বালায়েঁ সব তামাম
এক মারাগ-এ-নঘানি অউর হ্যায়।

বাংলায়:
জীবনে সব বিপদ-আপদ দেখা হয়ে গেছে, গালিব,
এখন শুধু মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়াটাই বাকি আছে।

তবে বাহাদুর শাহ্ জাফর ও গালিবের পূর্বসুরী মির্জা রফি সওদা, মির তকি মির প্রমুখ শক্তিমান কবির ওপরেও কিছু আলোকপাত করা দরকার। এঁদের প্রত্যেকের কবিতায় ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে গভীর নির্বেদ ও নৈরাজ্যের সুর।

মির্জা রফি সওদা

ফার্সি ও উর্দু ভাষার স্বনামধন্য কবি মির্জা মুহাম্মদ রফি সওদা’র জন্ম ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দে, পুরোনো দিল্লির শাহজাহানাবাদে। তাঁকে মোগল দিল্লির সর্বপ্রথম ধ্রুপদী কবি হিসেবে গণ্য করা হয়। জানা যায়, তাঁর বয়স যখন ৬০ থেকে ৬৫ বছর, তখন তিনি নবাব বাঙ্গাশের সঙ্গে ফররুখাবাদে চলে যান, এবং ১৭৫৭ থেকে ১৭৭০ সাল পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করেন। ১৭৭১-৭২-এর দিকে তিনি চলে যান ফৈজাবাদে অযোধ্যার নবাবের দরবারে, এবং বাকি জীবন, অর্থাৎ ১৭৮১-তে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ওই দরবারেই ছিলেন সভাকবি হিসেবে। লাখনউকে যখন অযোধ্যা রাজ্যের রাজধানী বানানো হয়, তখন নবাব সুজাউদ্দৌল্লার সঙ্গে তিনি সেখানে যান।

কবি হিসেবে সওদা ছিলেন সমকালে গুরুস্থানীয়। স্বয়ং বাদশাহ্ শাহ আলম এবং নবাব সুজাউদ্দৌল্লা ছিলেন তাঁর শিষ্য। নবাব আসফউদ্দৌল্লা তাঁকে ‘মালকুশ-শুয়ারা’ (কাব্যের মালিক) উপাধি দিয়ে বার্ষিক ৬০ হাজার টাকা ভাতা বরাদ্দ করেন।

সওদা প্রথমে ফার্সি ভাষাতেই কবিতা লিখতেন। পরে তাঁর ওস্তাদ (গুরু) মির্জা-এ-আরজু’র পরামর্শে উর্দু ভাষায় লিখতে শুরু করেন। নিচে তাঁর একটা উর্দু কবিতা অনুবাদ করে দেয়া হলো।

দিল মৎ টপক নজর সে কি পায়া না যায়ে গা
জূ’ন আশক ফার জমীন সে উঠায়া না যায়ে গা।

কা’বা অগরছা টূটা তো ক্যা যায়ে গাম হ্যায় শেখ,
কুছ কসর-এ-দিল নহিঁ কা বনায়া না যায়েগা।

পুঁছে ন গয়ে ইস চমন মেঁ ন না হাম দাদাদ কো কভি,
জু’ন গুল ইয়াহ্ চাক-এ-জব সিলায়া না যায়ে গা।

আমামা কো উতারকে পঢ়িয়ো নমাজ শেখ,
সজদায়ে সে বর্না সর কো উঠায়া না যায়ে গা।

জালিম ম্যাঁয় নে কহ্ রহা হুঁ কি ইস খুন সে দর গুজার,
সওদা কা কাতিল হ্যায় ইয়াহ্ ছুপায়া না যায়ে গা।

মোগলআমলের আরেকটি মুশায়রার দৃশ্য

বাংলায়:
দৃষ্টি থেকে সরে যেয়ো না, হে হৃদয়, শেষে আর খুঁজে পাওয়াই যাবে না
অশ্রু চোখ থেকে ঝরে পড়ে গেলে, তা আর তো ওঠানো যাবে না।

কাবা যদি ভেঙে পড়ে শেখ, তাতে এমন কি ক্ষতি!
সে তো মেরামত করা যাবে, ভাঙা হৃদয় তো করা যাবে না।

জিজ্ঞেস কোরো না, এ ফুলবাগানে আমি কী চেয়েছি,
যে গোলাপ জ্বলে গেছে, তাকে তো মালায় গাঁথা যাবে না।

পাগড়ি খুলে নামাজ পড়ো, হে শেখ,
না হয় সেজদা থেকে মাথা আর ওঠানো যাবে না।

হে নিষ্ঠুর, বলছি আমাকে তুমি হত্যা কোরো না,
কারণ সওদাকে খুন করে তা কখনো লুকানো যাবে না।

মির তকি মির

মির্জা গালিব তাঁর নিকটতম পূর্বসুরী আরেক বড় কবি মির তকি মির সম্পর্কে একবার লিখেছিলেন, “রিখ্তা কে তুম হি উস্তাদ নহিঁ হো গালিব, কেহতেঁ হ্যায় অগলে জমানে মে কোঈ মির ভি থা।” অর্থাৎ– “ভাষার তুমি একমাত্র ওস্তাদ নও, গালিব। বলা হয়ে থাকে, আগের জমানায় মির বলে কেউ একজনও ছিলো।”

১৭২৩-এর ২০ সেপ্টেম্বর আগ্রায় জন্ম মির তকি মিরের। গালিবের মতো মিরও একটি বিশাল স্তম্ভ উর্দু কবিতার। এখানে মিরের কবিতার কয়েকটি বিখ্যাত পংক্তি, যেগুলো বলতে গেলে প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়ে প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হচ্ছে জীবনের নানা পরিবেশ-পরিস্থিতিতে, সেগুলোর অনুবাদ করে দেয়া হয়েছে। সবশেষে একটা গজল ‘আরজুয়েঁ হজার রখতে হ্যাঁয়’-এর ভাষান্তরও যোগ করা হলো। তবে কিনা মনে রাখতে হবে যে, এগুলো সর্বাংশে মির তকি মিরের সুবিশাল কবিতা জগতের যথোপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব করে না।

১.
ইবতিদা-এ-ইশ্ক্ হ্যায় রোতা হ্যায় ক্যা
আগে আগে দেখিয়ে হোতা হ্যায় ক্যা।

বাংলায়:
এই তো প্রেমের শুরু, এখনই এত কাঁদা!
আগে আরো কত কী তুমি দেখবে প্রেমের ধাঁধা।

২.
পত্তা পত্তা, বুটা বুটা হাল হমারা জানে হ্যায়,
জানে ন জানে গুল হি ন জানে, বাগ তো সারা জানে হ্যায়।

বাংলায়:
প্রতিটি পাতা, প্রতিটি কুঁড়ি আমার হাল কেমন জানে,
ফুল জানুক আর না-ই জানুক, সারা বাগান তো জানে।

৩.
বাদ মরনে কে মেরি কবর পে আয়া উও মির,
য়্যাদ আয়ি মেরে ইসা কো মাওয়া মেরে বাদ।

বাংলায়:
আমি মরার পর সে আমার কবরে এলো, মীর,
আমার মৃত্যুর পর মেওয়ার কথা মনে পড়লো আমার ইসা’র!

৪.
সুবহ্ হোতি হ্যায়, শাম হোতি হ্যায়,
উমরা য়্যুঁহি তমাম হোতি হ্যায়।

বাংলায়:
সকাল হয়, রাত হয়,
জীবন এভাবেই পাত হয়।

৫.
বেখুদি লে গই কহাঁ হমকো,
দের সে ইন্তেজার হ্যায় অপনা।

বাংলায়:
কোথায় নিয়ে গেছে আমাকে আত্মবিস্মরণ?
সেই কবে থেকে খুঁজে পাচ্ছি না নিজেকেই!

৬.
লগা ন দিল কো ক্যা সুনা নহি তুনে,
জো কুছ মীর কা আশিকি নে হাল কিয়া।

বাংলায়:
কেন, কেউ তোমাকে বলে নি– হৃদয় দিয়ো না?
বলে নি, প্রেমে পড়ে মিরের কী হাল হয়েছে?

৭.
য়্যারো মুঝে মাফ করো, ম্যায় নশে মেঁ হুঁ,
অব দো তু জাম খালি হি দো ম্যাঁয় নশে মে হুঁ।

বাংলায়:
বন্ধুরা, আমাকে মাফ করে দাও, আমি নেশার ঘোরে আছি।
এখন তুমি পানপাত্র শূন্য দিলেও, নেশায় মজেই আছি।

মোগল মুশায়রায় উপস্থিত কাব্যপিপাসুরা

৮.
ক্যা কহুঁ তুম সে ম্যাঁয় কে ক্যা হ্যায় ইশ্ক্,
জান কা রোগ হ্যায়, বালা হ্যায় ইশ্ক্।

বাংলায়:
কী আর তোমাকে বলি, কী জিনিস প্রেম?
পরানের রোগ, বালামুসিবত এ প্রেম।

৯.
মির কে দীন-ও-মজহব কা, পুঁছতে ক্যা হো
উননে তো কশ্কা খিঁচা দাইর মে বইঠা কব কা তর্ক ইসলাম কিয়া?

বাংলায়:
মিরের দীন-মাজহাব কী, প্রশ্ন করছো তাকে?
কপালে তিলক কেটে প্রেমের মন্দিরে বসে সে কবে ইসলাম ভুলে গেছে!

১০.
আশ্ক্ আঁখ মে কব নহিঁ আতা,
লহু আতা হ্যায় জব নহিঁ আতা।

বাংলায়:
অশ্রু চোখে কখন আসে না?
রক্ত আসে, যখন আসে না।

১১.
আরজুয়েঁ হজার রখতে হ্যাঁয়

আরজুয়েঁ হজার রখতে হ্যাঁয়
তো ভি হম দিল কো মা’র রখতে হ্যাঁয়

বক্র্ কম-হৌস্লা হ্যায় হম ভি তো
দিল কো বেকরার রখতে হ্যাঁয়

ঘয়ের হী মৌরিদ-এ-ইনায়ত হ্যায়
হম ভী তো তুম সে প্যার রখতে হ্যাঁয়

ন নিগাহ্ নে পয়াম নে ওয়াদা
নাম কো হম ভী য়্যার রখতে হ্যাঁয়

হম সে খুশ-জমানা কহাঁ য়্যূঁ তো
লব ও লহ্জা হজার রখতে হ্যাঁয়

ছোট্টে দিল কে হ্যাঁয় বুতাঁ মশ্হূর
বস য়্যহী এ’তিবার রখতে হ্যাঁয়

ফির ভী করতে হ্যাঁয় মির সাহব ইশ্ক্
হ্যাঁয় জওয়াঁ ইখতিয়ার রখতে হ্যাঁয়

বাংলায়:

বাসনা হাজারো রাখি

বাসনা হাজারো রাখি
তবে কিনা মনকেও সংযত রেখেছি

বজ্রের মতো আমারও ধৈর্য খুব কম
তারপরও অন্তরে ধৈর্য রেখেছি

মনে হচ্ছে অন্য কেউ জয় করছে তোমার হৃদয়
কিন্তু আমিও তোমার মধ্যেই ভালোবাসা রেখেছি

সে এখনো চিঠিতে বা কথায় কোনো শপথ করে নি
তাই আমি এখনো তোমার প্রেমিক বলার দাবি রেখেছি

আমার চেয়ে খুশির সময় কোথায় এখানে
তবুও আমি আমার কণ্ঠস্বর নমিত রেখেছি

ছোট্ট হৃদয়েই থাকে প্রসিদ্ধ প্রেম
এ বিশ্বাস এখনো ধরে রেখেছি

মির সাহেব তারপরও প্রেম করে–
বয়স কম হতে পারে, তবু অধিকারটুকু রেখেছি।

উল্লেখ্য, সওদারও আগে দিল্লির অগ্রণী কবি ছিলেন শেখ জহিরউদ্দিন (১৬৯৯-১৭৯২), যাঁর তখল্লুস বা কলমি নাম ছিলো হাতিম। হিন্দাওয়ি বা উর্দুতে কবিতা লেখার ধারাটির তিনিই ছিলেন প্রথম পৃষ্ঠপোষক। সওদা ও মির তকি মির ছাড়াও তাঁর প্রধান অনুসারী কবিদের মধ্যে ছিলেন মির দর্দ, জউক, মোমিন, মির্জা দাঘ দেহলবি প্রমুখ।

মোগল আমলের একেবারে শেষদিকে দিল্লির লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত একটি মুশায়রা,যাতে ফিরিঙ্গি সায়েবরাও যোগ দিয়েছে।

এই কবিরা সবাই উর্দুতে লিখলেও ভাষাটা তখনও উর্দু নাম পায় নি। এঁদের বদৌলতে আমির খসরুর হিন্দাওয়ি ভাষাই ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছিলো রাজধানী দিল্লির বাইরে– সেনাছাউনি, যুদ্ধক্ষেত্র, মাজার-মকবরা, হাটবাজার, সরাইখানা থেকে শ্রমজীবী মানুষের মুখে মুখে। ভাষাটা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো। এই কবিরা, যাঁরা দিন দিন ভাষাটাকে গরীয়সী করে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখছিলেন, আমির খসরুর কাছে তাঁদের যে বিশাল ঋণ ছিলো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তখনও এ ভাষায় ‘ঈশ্বর’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘রাম’ ও ‘খোদা’ দুটোই সমভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিলো কোনো সাম্প্রদায়িক ভাবনার লেশমাত্র না রেখে। পঞ্চদশ শতাব্দীর ধর্ম সমন্বয় ও ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ সন্ত কবির (১৪৪০-১৫১৮), শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক (১৪৬৯-১৫৩৯) প্রমুখেরাও এ ধারাতেই তাঁদের দোঁহা, ভজন প্রভৃতি লিখে যাচ্ছিলেন। গুজরাটের ষোড়শ শতকের ভক্তিবাদী সন্তকবি দাদু দয়াল এ ধারাতেই লিখেছেন, “যারা জালিম নয় এবং হারাম খায় না, তারা মোমিন এবং মৃত্যুর পর স্বর্গে যাবে।” আরবি-ফার্সি শব্দের বাহুল্য সত্ত্বেও এ ভাষা তখন সর্বজনবোধ্য ছিলো। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, খসরুর এই হিন্দাওয়ি ভাষার মধ্যে একটা বিভাজন রেখা একসময় স্পষ্ট হয়ে উঠলো। হিন্দাওয়ি বিভক্ত হয়ে গেলো হিন্দি ও উর্দু নামের দুটো আপাতপৃথক ভাষায়।

মোগলরা প্রথমে তাদের রাজধানী স্থাপন করেছিলো আগ্রায় এবং পরে তা স্থানান্তর করা হয় দিল্লিতে। দু জায়গাতেই দরবারি ভাষা বা রাজভাষা হিসেবে ফার্সিই ব্যবহৃত হতো। তবে তার আগে থেকে এ দুটো শহরে সমাজের সর্বস্তরে সবচেয়ে ব্যাপক ব্যবহৃত ভাষা ছিলো দেহাতি হিন্দির একটি বিশেষ রূপ ‘ব্রজভাষা’। কাব্য-সাহিত্যেও এ ভাষাই ব্যবহৃত হতো। ধর্মসমন্বয়বাদী ও ভক্তিবাদী সন্তকবি কবির, রাজ্জাক, রহিম প্রভৃতি এই ব্রজভাষাতেই লিখতেন। আজকের হিন্দি ও উর্দু দুই ভাষারই অন্যতম পূর্বসুরী বলা যেতে পারে এই ভাষাকে। এমনকি স্বয়ং আমির খসরুও তাঁর দ্বিভাষী কবিতাগুলোতে এবং হিন্দাওয়ি ভাষার প্রবর্তনে এই ব্রজভাষার অনুসরণ করেছেন। আগ্রা ও দিল্লিতে যখন উর্দু ভাষা ক্রমবিকশিত হচ্ছিলো, তখনও উত্তর ভারতের মফস্বলে, গ্রামাঞ্চলে সন্ত মরমিয়া সাধক কবিদের রচনায় এই ব্রজভাষা পূর্ণ মহিমা নিয়ে বিরাজ করছিলো। আগামী কিস্তিতে কবির, রাজ্জাক ও রহিমের রচনায় ব্যবহৃত ভাষার কিছু নমুনা তুলে ধরা হবে, যাতে পাঠকরা উর্দুর সঙ্গে এ ভাষার সম্পর্কটা আঁচ করতে পারেন।

জ্যোতির্ময় নন্দী সাহিত্য সংগ্রহশালা

দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ-এ দীর্ঘ ৪ দশক ধরে প্রকাশিত মূল রচনার অবিকল সংরক্ষণ

ওয়েবসাইটের মূল পাতায় যান →

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)