Loading

শঙ্করাচার্যের মোহমুদ্গর

‘ব্রহ্ম সত্যং জগন্মিথ্যা  জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ’ — অর্থাৎ শুধু আদিঅন্তহীন মহাশক্তি নিরাকার নিরঞ্জন ব্রহ্ম-ই একমাত্র সত্য, জগৎ মায়া বা ভ্রান্তিমাত্র, জীবকূলও ব্রহ্মের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। ‘একমেব অদ্বিতীয়ম ব্রহ্ম’ — ব্রহ্মই একমাত্র, তাঁর কোনো দ্বিতীয় নেই — অনেকটা যেন ইসলামের তৌহিদবাদের প্রতিধ্বনি এ তত্ত্বের নাম ভারতীয় দর্শনে অদ্বৈতবাদ। এ তত্ত্বের উদ্গাতা অষ্টম শতকের ধর্মগুরু, দার্শনিক, ঋষি শঙ্করাচার্য — একই নামের সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের স্রষ্টা তথা গুরু হিসেবে যাঁকে সাধারণত জগদ্গুরু আদি শঙ্করাচার্যও বলা হয়ে থাকে।

ভারতের ইতিহাসবিদ ও দার্শনিকদের প্রায় সবাই মনে করেন আচার্য শঙ্কর বা শঙ্করাচার্য ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক। তাঁর জন্মকাল নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য আছে। যেমন ভেঙ্কটেশ্বর মনে করেন, শঙ্করের জন্ম ও মৃত্যু যথাক্রমে ৮০৫ এবং ৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ তিনি ৯২ বছর বেঁচে ছিলেন। তবে যাঁরা মনে করেন যে, শঙ্করের জন্ম ও মৃত্যু যথাক্রমে ৭৮৮ ও ৮২০ খ্রিস্টাব্দে তাদের সমর্থক শুধু অধিকাংশই নয়, বলা যেতে পারে, প্রায় সবাই। এঁদের মধ্যে আশুতোষ ভট্টাচার্য, আর. জি. ভাণ্ডারকর, ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

শঙ্করাচার্য ভারতের কেরালা রাজ্যে এক ব্রাহ্মণ পরিবারের জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শিবগুরু এবং মাতার নাম বিশিষ্টা। অতি অল্প বয়সেই ধর্ম সম্পর্কিত বিভিন্ন বিদ্যায় তিনি পারদর্শী হন। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি আচার্য গোবিন্দপাদের নিকট সন্যাস গ্রহণ করেন এবং তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ১২ বছর পর্যন্ত বেদ-উপনিষদ ও ভারতীয় দর্শনশাস্ত্র  অধ্যয়ন করেন।

শঙ্করাচার্যের মতে একমাত্র ব্রহ্মই সত্য এবং এ জগৎ মিথ্যা ও মায়াময়। শঙ্করের দর্শন অনেক নামে পরিচিত। এ নামগুলো: বিশুদ্ধ অদ্বৈতবাদ, কেবল অদ্বৈতবাদ, বিবর্তনবাদ, মায়াবাদ, অনির্বাচ্যবাদ এবং নির্বিশেষবাদ। তাঁর বক্তব্য প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সাংখ্য বিবর্তনবাদ, বৌদ্ধ ক্ষণিকত্ববাদ, জৈন স্যাৎবাদ, বৈশেষিক পরমাণুবাদ ইত্যাদি মতবাদ খণ্ডন করেন। অদ্বৈত বেদান্তের সিদ্ধান্তকে পূর্ণরূপ দেওয়ার জন্য তিনি ব্রহ্মসূত্র-ভাষ্যের ঈশ, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, ঐতরেয়, তৈত্তিরীয়, ছান্দোগ্য ও বৃহদারণ্যক এই দশটি উপনিষদের ভাষ্য এবং গীতা-ভাষ্য, বিষ্ণু সহস্রনাম-ভাষ্য প্রভৃতি ভাষ্যগ্রন্থ রচনা করেন। ভাষ্যগ্রন্থ ছাড়াও তিনি আত্মবোধ, বিবেকচূড়ামণি, উপদেশসাহস্রী প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। শঙ্করাচার্য মাত্র ৩২ বছর বেঁচে ছিলেন। এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি কীভাবে এতগুলো ভাষ্য এবং গ্রন্থ রচনা করেন এ কথা ভেবে অনেকে বিস্মিত হন। সে কারণে কেউ কেউ (যেমন ভেঙ্কটেশ্বর) মনে করেন যে তিনি ৯২ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু ভেঙ্কটেশ্বরের বক্তব্য কোনো মহলেরই সমর্থন পায়নি।

ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, দার্শনিক– সবদিক থেকেই শঙ্করাচার্যের প্রভাব ভারতীয় সমাজে এখনও এত ব্যাপক ও গভীর যে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। তবে এটুকু বলতে হবে যে, এই নির্মায়িক নির্মোহ ব্রহ্মবাদী সন্ন্যাসী তাঁর সব মায়া-মোহকে ব্রহ্মপদে সমর্পণ করেছিলেন ভক্তিকুসুম হিসেবে। বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে জ্ঞানীদের অন্যতম, ধার্মিক হিন্দুরা যাঁকে স্বয়ং শিব বা শঙ্করের অবতার বলে মনে করে, তিনি বলেছেন, বুদ্ধি পরিপক্ক হয়ে যখন মনে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়, তখন তা জ্ঞানে পরিণত হয়; আর সেই জ্ঞান জীবনে নিহিত বা প্রোথিত হয়ে কর্ম হিসেবে প্রকাশিত হলে তা পরিণত হয় ভক্তিতে। তাই ভক্তি হলো জ্ঞানের পূর্ণতম রূপ। ইসলামের মারফতি চিন্তাধারায় এর কিছুটা প্রতিধ্বনি আছে। আবার আজকের কোয়ান্টাম তত্ত্ব বা থিওরি অব এভরিথিংয়েও শঙ্করাচার্য পেছন থেকে উঁকি দেন।

নিচে শঙ্করাচার্যের সবচেয়ে বিখ্যাত রচনাগুলোর একটা ‘মোহমুদ্গর’ বা ‘চর্পটপঞ্জরিকাস্তোত্রম্’ বা ‘ভজ গোবিন্দং’ এখানে অনুবাদ করে দিলাম, যেখানে তিনি সাধারণ মানুষের বোধগম্যতা বিবেচনায় ‘একমেব অদ্বিতীয়ম্’ পরম ব্রহ্মকে ‘গোবিন্দ’ নামে ডেকে, বাকি সবকিছু বাদ দিয়ে কেবল সেই মহাশক্তিরই শরণাপন্ন হওয়ার, কেবল তাঁরই ভজনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এ শ্লোকগুচ্ছের সহজ সরল চলন ও শব্দচয়ন দেখে অবশ্য শঙ্করাচার্যের পাণ্ডিত্য বা শব্দকুশলতার সম্যক পরিচয় পাওয়া যাবে না। সাধারণ মানুষের বোধগম্য ও সহজে মুখস্তযোগ্য এ ধরনের বহু কবিতা বা স্তোত্র বা শ্লোকমালা তিনি রেখে গেছেন ভাবীকালের জন্যে। তাঁর এ উদ্দেশ্য অবশ্যই সফল হয়েছে। সহস্রাধিক বছর ধরে ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের মানুষ শঙ্করাচার্যের এসব কবিতা থেকে জীবনের চরম ও পরম পাঠ নিচ্ছে।

‘মোহমুদ্গর’ শব্দটির অর্থ হলো, ‘মোহের ওপর মুগুরাঘাত’। নিমপাতার সুক্তোর মতো এ কবিতার রস এমনিতে হয়তো তেতো ঠেকবে, কিন্তু বর্তমান সময়ের তীব্র ভবব্যাধি থেকে মানব সভ্যতাকে মুক্তি দিতে বারোশ বছরের পুুরোনো এই কবিতা হয়তো আখেরে ভালো কাজ দেবে, এ ভরসায় তার তর্জমা করে এখানে তুলে ধরলাম।

মোহমুদ্গর বা ভজ গোবিন্দম্ বা বা চর্পটপঞ্জরিকাস্তোত্রম্-এ মোট তেত্রিশটা শ্লোক রয়েছে, যেগুলো এখানে বাংলায় অনুবাদ করে দিয়েছি, দেবনাগরী ও বাংলা হরফে মূল সংস্কৃত পাঠসহ।

উল্রেখ্য, সবশেষের — অর্থাৎ ৩২ ও ৩৩ নং শ্লোক দুটি — প্রক্ষিপ্ত বলে বিবেচনা করা হয়। শ্লোকদ্বয়ের ছন্দ-অন্ত্যমিল ইত্যাদিতে ত্রুটি, বক্তব্যে পূর্বানুবৃত্তি ও পারম্পর্যহীনতা দেখে আমাদেরও সেরকমটাই মনে হয়। তবুও এ দুটো এখানে রাখা হলো, অনুবাদে সম্পূর্ণতার খাতিরে।

মোহমুদ্গর
( বা ‘ভজ গোবিন্দং’ বা ‘চর্পটপঞ্জরিকাস্তোত্রম্’)

১.
भज गोविन्दं भज गोविन्दं गोविन्दं भज मूढमते ।
सम्प्राप्ते सन्निहिते काले नहि नहि रक्षति डुकृङ्करणे ॥

ভজ গোবিন্দং, ভজ গোবিন্দং, গোবিন্দং ভজ মূঢ়মতে।
সম্প্রাপ্তে সন্নিহিতে কালে নহি নহি রক্ষতি ডুকৃংকরণে ॥

বাংলায়:
ভজ গোবিন্দ, ভজ গোবিন্দ, গোবিন্দ ভজ মূঢ়মনা।
কাল ঘনালে অং-বং করে কেউই রেহাই পাবে না ॥

২.
मूढ जहीहि धनागमतृष्णां
कुरु सद्बुद्धिं मनसि वितृष्णाम् ।
वितृष्णाम् यल्लभसे निजकर्मोपात्तं
वित्तं तेन विनोदय चित्तम् ॥

মূঢ় জহীহি ধনাগমতৃষ্ণাং
কুরু সদ্বুদ্ধিং মনসি বিতৃষ্ণাং।
বিতৃষ্ণাম্ যল্লভসে নিজকর্ম উপাত্তং
বিত্তং তেন বিনোদয় চিত্তম্ ॥

বাংলায়:
মূঢ় সে, আছে যার ধনাগম তৃষ্ণা,
সদ্বুদ্ধিতে মনে আনো বিতৃষ্ণা।
বিতৃষ্ণা এসে গেলে কর্মের বৃত্তে
বিত্ত তখন দেবে আনন্দ চিত্তে ॥

৩.
नारीस्तनभरनाभीदेशं
दृष्ट्वा मा गा मोहावेशम् ।
एतन्मांसवसादिविकारं
मनसि विचिन्तय वारं वारम् ॥

নারীস্তনভরনাভীদেশং
দৃষ্ট্বা মা গা মোহাবেশম্।
এতৎ মাংস বসাদি বিকারং
মনসি বিচিন্তয় বারং বারম্ ॥

বাংলায়:
নারীদের স্তনভার আর নাভীদেশ
দেখে মনে যেন নাহি আসে মোহাবেশ।
এগুলো তো মাংস ও মেদের বিকার
এ কথা তোমার মনে ভাবো বার বার ॥

৪.
नलिनीदलगतजलमतितरलं
तद्वज्जीवितमतिशयचपलम् ।
विद्धि व्याध्यभिमानग्रस्तं
लोकं शोकहतं च समस्तम् ॥

নলিনীদলগত জলম্ অতি তরলং
তদ্বৎ জীবন অতিশয় চপলম্।
বিদ্ধি ব্যাধ্য অভিমানগ্রস্তং
লোকং শোকহতং চ সমস্তম্ ॥

বাংলায়:
পদ্মের পাঁপড়িতে জল অতি তরল
তেমনি এ জীবনও তো বড়ই চপল।
রোগব্যাধি, শোকতাপ আর অহংকার
এসবে ডুবেছে জেনো সমস্ত সংসার ॥

৫.
यावद्वित्तोपार्जनसक्त
स्तावन्निजपरिवारो रक्तः ।
पश्चाज्जीवति जर्जरदेहे
वार्तां कोऽपि न पृच्छति गेहे ॥

যাবৎ বিত্ত উপার্জনসক্ত
স্তাবৎ নিজ পরিবারো রক্তঃ।
পশ্চাৎ জীবতি জর্জর দেহে
বার্তা কোহপি ন পৃচ্ছতি গেহে ॥

বাংলায়:
যতদিন বিত্ত উপার্জনসক্ত
ততদিনই নিজ পরিবার অনুরক্ত।
তারপর বেঁচে থাকে জরাজীর্ণ দেহে
বার্তা তো তার কেউ পুছে না গেহে ॥

৬.
यावत्पवनो निवसति देहे
तावत्पृच्छति कुशलं गेहे ।
गतवति वायौ देहापाये
भार्या बिभ्यति तस्मिन्काये ॥

যাবৎ পবনো নিবসতি দেহে
তাবৎ পৃচ্ছতি কুশলং গেহে।
গতবতি বায়ৌ দেহাপায়ে
ভার্যা বিভ্যতি তস্মিন্ কায়ে ॥

বাংলায়:
যতক্ষণ প্রাণবায়ু থাকে এই দেহে
ততক্ষণ কুশল জিজ্ঞাসা করে গেহে।
দেহ থেকে প্রাণবায়ু যেই বেরিয়ে যায়
তখন সে কায়া দেখে স্ত্রীও ভয় পায় ॥

৭.
बालस्तावत्क्रीडासक्तः
तरुणस्तावत्तरुणीसक्तः ।
वृद्धस्तावच्चिन्तासक्तः
परमे ब्रह्मणि कोऽपि न सक्तः ॥

বালস্তাবৎ ক্রীড়াসক্তঃ
তরুণঃ তাবৎ তরুণীরক্তঃ।
বৃদ্ধঃ তাবৎ চিন্তামগ্নঃ
পরমে ব্রহ্মণি কোহপি ন লগ্নঃ ॥

বালকেরা সবে দেখো ক্রীড়াসক্ত,
তরুণেরা সবাই তরুণী অনুরক্ত।
বৃদ্ধেরা সকলেই চিন্তামগ্ন,
পরম ব্রহ্মে কেউই নয় লগ্ন ॥

৮.
का ते कान्ता कस्ते पुत्रः
संसारोऽयमतीव विचित्रः ।
कस्य त्वं कः कुत आयात-
स्तत्त्वं चिन्तय तदिह भ्रातः ॥

কা তে কান্তা কঃ তে পুত্রঃ
সংসারোঃ অয়ম্ অতীব বিচিত্রঃ।
কস্য ত্বং কঃ কুত আয়াতঃ
তৎ ত্বং চিন্তয় তদিহ ভ্রাতঃ ॥

বাংলায়:
কে তোমার পত্নী, কে তোমার পুত্র?
এই সংসার জেনো খুবই বিচিত্র।
তুমি কে বলো তো? কোত্থেকে এলে?
ভেবে দেখো সেটা ভাই অন্তর মেলে ॥

৯.
सत्सङ्गत्वे निस्सङ्गत्वं
निस्सङ्गत्वे निर्मोहत्वम् ।
निर्मोहत्वे निश्चलतत्त्वं
निश्चलतत्त्वे जीवन्मुक्तिः ॥

সৎসঙ্গত্বে নিঃসঙ্গত্বং
নিঃসঙ্গত্বে নির্মোহত্বম্।
নির্মোহত্বে নিশ্চলতত্ত¡ং
নিশ্চলতত্তে¡ জীবন্মুক্তম্ ॥

বাংলায়:
সৎসঙ্গে নিঃসঙ্গত্ব
নিঃসঙ্গত্বে নির্মোহত্ব।
নির্মোহত্বে নিশ্চলতত্ত¡
নিশ্চলতত্ত্বে জীবন্মুক্ত ॥

১০.
वयसि गते कः कामविकारः
शुष्के नीरे कः कासारः ।
क्षीणे वित्ते कः परिवारः
ज्ञाते तत्त्वे कः संसारः ॥

বয়সি গতে কঃ কামবিকারঃ
শুষ্কে নীরে কঃ কাসারঃ।
ক্ষীণে বিত্তে কঃ পরিবারঃ
জ্ঞাতে তত্ত্ব কঃ সংসারঃ ॥

বাংলায়:
বুড়ো হলে কোথা আর কামের কামড়?
জল না থাকলে সে কেমন সরোবর?
বিত্ত না থাকলে কোথায় পরিবার?
তত্ত্ব জেনে গেলে আর কিসের সংসার?

১১.
मा कुरु धनजनयौवनगर्वं
हरति निमेषात्कालः सर्वम् ।
मायामयमिदमखिलं हित्वा
ब्रह्मपदं त्वं प्रविश विदित्वा ॥

মা কুরু ধনজনযৌবন গর্বং
হরতি নিমেষাৎ কালঃ সর্বম্।
মায়াময়ম্ ইদং অখিলং হিত্বা
ব্রহ্মপদং ত্বং প্রবিশ বিদিত্বা ॥

বাংলায়:
ধন-জন-যৌবনের কোরো না গর্ব
কাল তো নিমেষেই কেড়ে নেবে সর্ব।
মায়াময় এ অখিল জগৎ সংসার —
এই জেনে ব্রহ্মপদে মাগো হে নিস্তার ॥

১২.
दिनयामिन्यौ सायं प्रातः
शिशिरवसन्तौ पुनरायातः।
कालः क्रीडति गच्छत्यायु-
स्तदपि न मुञ्चत्याशावायुः॥

দিনযামিন্যৌ সায়ং প্রাতঃ
শিশির বসন্তৌ পুনরায়াতঃ।
কালঃ ক্রীড়তি গচ্ছতায়ু-
স্তদপি ন মুঞ্চতি আশাবায়ুঃ ॥

বাংলায়:
দিন ও রাত, সন্ধ্যা-সকাল আর
শীত-বসন্ত ফিরে আসে বার বার।
কাল খেলা করে, ফুরিয়ে আসছে আয়ু
তবুও মোছে না আশার ঝঞ্ঝাবায়ু ॥

১৩.
का ते कान्ता धनगतचिन्ता
वातुल किं तव नास्ति नियन्ता।
त्रिजगति सज्जनसङ्गतिरेका
भवति भवार्णवतरणे नौका॥

কা তা কান্তা ধনগত চিন্তা
বাতুল কিং তব নাস্তি নিয়ন্তা।
ত্রিজগতি সজ্জন সঙ্গতিঃ একা
ভবতি ভবার্ণব তরণে নৌকা ॥

বাংলায়:
কে তোমার কান্তা*, ধনগত চিন্তা?
বাতুল, কেউ কি নেই তোমার নিয়ন্তা?
ত্রিজগতে সজ্জন সঙ্গতি সে একা,
এ ভবসাগর পারে সে-ই হবে নৌকা ॥

………….
*স্ত্রী

১৪.
जटिलो मुण्डी लुञ्छितकेशः
काषायाम्बरबहुकृतवेषः।
पश्यन्नपि च न पश्यति मूढो
ह्युदरनिमित्तं बहुकृतवेषः॥

জটিলো মুণ্ডী লুঞ্ছিতকেশঃ
কাষায় অম্বর বহুকৃতবেশঃ।
পশ্যন্নপি চ ন পশ্যতি মূঢ়োহি
উদর নিমিত্তং বহুকৃতবেশ ॥

বাংলায়:
কারো শিরে জটাজাল, কেউ শূন্যকেশ
কাপড় গেরুয়া কারো, কেউ সাদা বেশ।
সত্য প্রকাশিত, তবু দেখে না মূঢ়েরা
উদরের জন্যে শুধু নানা বেশে ফেরা।

১৫.
अङ्गं गलितं पलितं मुण्डं
दशनविहीनं जातं तुण्डम् ।
वृद्धो याति गृहीत्वा दण्डं
तदपि न मुञ्चत्याशापिण्डम्॥

অঙ্গং গলিতং পলিতং মুণ্ডং
দশনবিহীনং জাতং তুণ্ডম্।
বৃদ্ধো যাতি গৃহিত্বা দণ্ডং
তদপি ন মুঞ্চতি আশাপিণ্ডম্ ॥

বাংলায়:
অঙ্গ গলিত*, পলিত** মুণ্ড,
দন্তবিহীন হয়েছে তুণ্ড**।
বৃদ্ধেরা যায় হাতে ধরে লাঠি
তবু আশামূল ছাড়ে না তো মাটি!

……………….
*জরাগ্রস্ত, **চুলশূন্য, ***মাড়ি

১৬.
अग्रे वह्निः पृष्ठे भानुः
रात्रौ चुबुकसमर्पितजानुः।
करतलभिक्षस्तरुतलवास
स्तदपि न मुञ्चत्याशापाशः॥

অগ্রে বহ্নিঃ পৃষ্ঠে ভানুঃ
রাত্রৌ চুবুক সমর্পিত জানুঃ।
করতল ভিক্ষঃ তরুতলবাসঃ
তদপি ন মুঞ্চতি আশাপাশ ॥

বাংলায়:
সামনে আগুন আর পেছনে রোদ্দুর
রাত্রে চিবুকে হাঁটু গুঁজে নিদ্রাতুর।
হাত পেতে ভিক্ষা আর তরুতলে বাস
তবুও ঘোচে না এই তীব্র আশাপাশ*।

………………….
*আশার বন্ধন

১৭.
कुरुते गङ्गासागरगमनं
व्रतपरिपालनमथवा दानम्।
दानम् ज्ञानविहीनः सर्वमतेन
मुक्तिं न भजति जन्मशतेन॥

কুরুতে গঙ্গাসাগর গমনং
ব্রত পরিপালনম্ অথবা দানম্।
জ্ঞানবিহীনঃ সর্বমতেন
ভজতি ন মুক্তিং জন্মশতেন ॥

বাংলায়:
হাজার তীর্থে গিয়ে, করে ব্রত দান
কিছুই হবে না যদি নাহি থাকে জ্ঞান।
শূন্য হবে কর্মফল অসংখ্য পুণ্যকর্মেও,
জ্ঞান ছাড়া মুক্তি নেই এমনকি শতজন্মেও।

১৮.
सुरमंदिरतरुमूलनिवासः
शय्या भूतलमजिनं वासः।
सर्वपरिग्रहभोगत्यागः
कस्य सुखं न करोति विरागः॥

সুরমন্দির তরুমূল নিবাসঃ
শয্যা ভূতলম্ অজিনং বাসঃ।
সর্বপরিগ্রহ ভোগ ত্যাগঃ
কস্য সুখং ন করোতি বিরাগঃ ॥

বাংলায়:
তরুমূলে কোনো দেবমন্দিরে নিবাস,
শয়ন ভূমিতে, পরিধানে চর্মবাস,
সব পরিগ্রহ ভোগে হয়ে গেছে ত্যাগ —
এমন সুখেতে কার আসবে বিরাগ?

১৯.
योगरतो वा भोगरतो वा
सङ्गरतो वा सङ्गविहीनः।
यस्य ब्रह्मणि रमते चित्तं
नन्दति नन्दति नन्दत्येव ॥

যোগরতো বা ভোগরতো বা
সঙ্গরতো বা সঙ্গবিহীন।
যস্য ব্রহ্মপি রমতে চিন্তং
নন্দতি নন্দতি নন্দতি এব ॥

বাংলায়:
যোগে রত হও কিংবা ভোগে হও রত,
সঙ্গরত হও বা হও সঙ্গবিরত,
ব্রহ্মে যার চিন্তা সদা করিছে রমণ
আনন্দে আনন্দে আনন্দে সে সর্বক্ষণ ॥

২০.
भगवद्गीता किञ्चिदधीता
गङ्गाजललवकणिका पीता।
सकृदपि येन मुरारिसमर्चा
क्रियते तस्य यमेन न चर्चा॥

ভগবদ্গীতা কিঞ্চিৎ অধীতা
গঙ্গাজল লবকণিকা পীতা।
সকৃদপি যেন মুরারিসমর্চা
ক্রিয়তে তস্য যমেন ন চর্চা ॥

বাংলায়:
যে করেছে কিছুমাত্র গীতা অধ্যয়ন,
বিন্দুমাত্র গঙ্গাজলও যে করেছে পান,
যার সুকৃতিতে আছে মুরারি* অর্চনা
যমও কখনো তার কেশাগ্র ছোঁবে না।

……………………………………………………………………………………..
*ভক্তিবাদের প্রায়োগিকতার প্রয়োজনে শঙ্করাচার্য নিরাকার ব্রহ্মকে সাকার গোবিন্দ, মুরারি প্রভৃতি নামে সম্বোধন করেছেন।

২১.
पुनरपि जननं पुनरपि मरणं
पुनरपि जननीजठरे शयनम्।
इह संसारे बहुदुस्तारे
कृपयाऽपारे पाहि मुरारे॥

পুনরপি জননং পুনরপি মরণং
পুনরপি জননীজঠরে শয়নম্।
ইহ সংসারে বহুদুস্তারে
কৃপয়া-পারে পাহি মুরারে ॥

বাংলায়:
আবারও জন্ম, আবার মরণ
আবার জননীজঠরে* শয়ন।
বড় দুস্তর এই সংসার —
হে মুরারী, করো কৃপা করে পার।

……………………
*মায়ের গর্ভে

২২.
रथ्याचर्पटविरचितकन्थः
पुण्यापुण्यविवर्जितपन्थः।
योगी योगनियोजितचित्तो
रमते बालोन्मत्तवदेव॥

রথ্যা চর্পট বিরচিত কন্থঃ
পুণ্য অপুণ্য বিবর্জিত পন্থঃ।
যোগী যোগ নিয়োজিত চিন্তো
রমতে বালোন্মত্ত বদেব ॥

বাংলায়:
পথে যতদিন আছে চটে তৈরি কাঁথা,
পুণ্যাপুণ্য বিবর্জিত রাস্তা আছে পাতা,
যোগী থাকে সদা যোগচিন্তা নিমগন
উন্মত্ত বালকসম তার বিচরণ।

২৩.
कस्त्वं कोऽहं कुत आयातः
का मे जननी को मे तातः ।
इति परिभावय सर्वमसारम्
विश्वं त्यक्त्वा स्वप्नविचारम् ॥

কস্ত্বং কোহহং কুত আয়াতঃ
কা মে জননী কো মে তাতঃ।
ইতি পরিভাবয় সর্বমসারম্
বিশ্বং ত্যক্ত্বা স্বপ্নবিচারম্ ॥

বাংলায়:
কে তুমি, কে আমি, কোথা থেকে আসি?
কে মাতা, কে পিতা, কোথা যাই ভাসি?
এ পরিভাবনাই জেনো সবকিছুর সার
বিশ্ব ত্যাগ করে করো স্বপ্নের বিচার।

২৪.

त्वयि मयि चान्यत्रैको विष्णु
र्व्यर्थं कुप्यसि मय्यसहिष्णुः ।
भव समचित्तः सर्वत्र त्वं
वाञ्छस्यचिराद्यदि विष्णुत्वम् ॥

ত্বয়ি ময়ি চান্যত্রৈকো বিষ্ণুঃ
ব্যর্থং কৃপ্যসি ময্যসহিষ্ণুঃ।
ভব সমচিন্তঃ সর্বত্র ত্বং
বাঞ্ছস্য চিরাদ্ যদি বিষ্ণুত্বম্ ॥

বাংলায়:
তুমি-আমি সবেতেই একমাত্র বিষ্ণু
ব্যর্থ হবে কৃপা তাঁর হলে অসহিষ্ণু।
সর্বত্রই সমচিন্ত হয়ে তুমি যাও
যদি চিরতরে তুমি বিষ্ণুত্বই চাও।

২৫.
शत्रौ मित्रे पुत्रे बन्धौ
मा कुरु यत्नं विग्रहसन्धौ ।
सर्वस्मिन्नपि पश्यात्मानं
सर्वत्रोत्सृज भेदाज्ञानम् ॥

শত্রৌ মিত্রে পুত্রে বন্ধৌ
মা কুরু যত্নং বিগ্রহসন্ধৌ।
সর্বস্মিন্নপি পশ্যাত্মানং
সর্বত্রোৎ সৃজ ভেদাজ্ঞানম্ ॥

বাংলায়:
শত্রু মিত্র পুত্র আর আত্মীয়ের সনে
কালক্ষেপ কোরো না কো সন্ধিতে বা রণে।
সকলেরই মধ্যে দেখো নিজের আত্মাকে,
ত্যাজো ভেদজ্ঞান যদি লেশমাত্র থাকে।

২৬.
कामं क्रोधं लोभं मोहं
त्यक्त्वाऽऽत्मानं भावय कोऽहम् ।
आत्मज्ञानविहीना मूढा
स्ते पच्यन्ते नरकनिगूढाः॥

কামং ক্রোধং লোভং মোহং
ত্যাক্তাত্মানং পশ্যতি সোহম্।
আত্মজ্ঞানবিহীনা মূঢ়া
স্তে পচ্যন্তে নরকনিগূঢ়াঃ ॥

বাংলায়:
কাম ক্রোধ লোভ মোহ পিছে রেখে
তবেই আত্মা পরমাত্মাকে দেখে।
আত্মজ্ঞানবিহীন যেজন মূূঢ়
পচবে সেজন জেনো নরকে নিগূঢ়।

২৭.
गेयं गीतानामसहस्रं
ध्येयं श्रीपतिरूपमजस्रम् ।
नेयं सज्जनसङ्गे चित्तं
देयं दीनजनाय च वित्तम् ॥

গেয়ং গীতানামসহস্রং
ধ্যেয়ং শ্রীপতিরূপমজস্রম্।
নেয়ং সজ্জনসঙ্গে চিত্তং
দেয়ং দীনজনায় চ বিত্তম্ ॥

বাংলায়:
গান করো গীতানাম সহস্র
ধ্যান করো শ্রীপতিরূপ অজস্র।
সজ্জনসঙ্গে নাও চিত্ত
দীনজনকে দাও বিত্ত।

২৮.
सुखतः क्रियते रामाभोगः
पश्चाद्धन्त शरीरे रोगः ।
यद्यपि लोके मरणं शरणं
तदपि न मुञ्चति पापाचरणम् ॥

সুখতঃ ক্রিয়তে রামাভোগঃ
পশ্চাদ্ধান্ত শরীরে রোগঃ।
যদ্যপি লোকে মরণং শরণং
তদপি ন মুঞ্চতি পাপাচরণম্ ॥

বাংলায়:
সুখের খেলায় করে মনোরম ভোগ
ফলে পরে দেহে বাসা বাঁধে কত রোগ।
যদিও সবার হবে নিশ্চিত মরণ
তবুও না ছাড়ে কেউ পাপ আচরণ ।

২৯.
अर्थमनर्थं भावय नित्यं
नास्तिततः सुखलेशः सत्यम् ।
पुत्रादपि धनभाजां भीतिः
सर्वत्रैषा विहिता रीतिः ॥

অর্থমনর্থং ভাবয় নিত্যং
নাস্তি ততঃ সুখলেশঃ সত্যম্।
পুত্রাদপি ধনভাজাং ভীতিঃ
সর্বত্রৈষা বিহিতা রীতিঃ ॥

বাংলায়:
অর্থ অনর্থ — এই ভাবো নিত্য।
জেনো তাতে নেই কোনো সুখলেশ সত্য।
ধনবান মনে পোষে পুত্রেও ভীতি —
সর্বত্র এই হলো প্রচলিত রীতি।

৩০.
प्राणायामं प्रत्याहारं
नित्यानित्य विवेकविचारम् ।
जाप्यसमेतसमाधिविधानं
कुर्ववधानं महदवधानम् ॥

প্রাণায়ামং প্রত্যাহারং
নিত্যানিত্য বিবেকবিচারম্।
জাপ্যসমেতসমাধিবিধানং
কুর্ববধানং মহদবধানম্ ॥

বাংলায়:
প্রাণায়াম, চিত্ত প্রত্যাহার
নিত্য-অনিত্য নিয়ে বিবেক বিচার,
জাপ্যের সাথে মহাসমাধি বিধান
করো অবধান, মহৎ অবধান।

৩১.
गुरुचरणाम्बुजनिर्भरभक्तः
संसारादचिराद्भव मुक्तः ।
सेन्द्रियमानसनियमादेवं
द्रक्ष्यसि निजहृदयस्थं देवम् ॥

গুরুচরণাম্বুজনির্ভরভক্তঃ
সংসারাদচিরাদ্ভব মুক্তঃ।
সেন্দ্রিয়সানসনিয়মাদেবং
দ্রক্ষ্যসি নিজহৃদয়স্থং দেবম্ ॥

বাংলায়:
গুরুর চরণে নির্ভর করে ভক্ত
সংসার থেকে অচিরেই হয় মুক্ত।
সংযত করে ইন্দ্রিয় আর মন
নিজ দেহে পায় দেবতার দর্শন।

৩২.
मूढः कश्चन वैयाकरणो
डुःकृङ्करणाध्ययनधुरीणः ।
श्रीमच्छङ्करभगवच्छिष्यै-
र्बोधित आसीच्छोधितकरणः ॥

মূঢ়ঃ কশ্চন বৈয়াকরণো
ডুঃক্রিঙ্করণাধ্যয়নধুরীণঃ।
শ্রীমৎ শঙ্কর ভগবৎ শিষ্যে-
র্বোধিত আসীৎ শোধিতকরণং ॥

বাংলায়:
মূঢ় সে এক বৈয়াকরণ
অং-বং-চং করে অধ্যয়ন।
হয়ে শঙ্করাচার্যের শিষ্য
বোধে এসে হলো শোধিতকরণ।

৩৩.
भज गोविन्दं भज गोविन्दं
गोविन्दं भज मूढमते ।
नामस्मरणादन्यमुपायं
नहि पश्यामो भवाब्धितरणे ॥

ভজ গোবিন্দং ভজ গোবিন্দং
গোবিন্দং ভজ মূঢ়মতে।
নামস্মরণাদন্যমুপায়ং
নহি পশ্যামি ভবাব্ধিতরণে ॥

বাংলায়:
ভজ গোবিন্দ, ভজ গোবিন্দ,
গোবিন্দ ভজ মূঢ়মতি।
ভবনদী পার হতে নাম স্মরণ ছাড়া
দেখছি না কোনো আর গতি।

You must be logged in to post a comment.