ত্রিপুষ্প কবিচরণে: বাইশে শ্রাবণে রবিপ্রণাম
১.
এখনো তোমার ছায়াতলে
দাবদাহে দগ্ধ এ জীবনে বসি এখনো তোমার ছায়াতলে–
হে প্রাচীন বনস্পতি। চারপাশে টুঁটি চেপে ধরে অন্ধকার,
দশন-নখর মেলে ছুটে আসে শ্বাপদেরা যত দলে-বলে,
যা বলিতে চাই, বলা হয় নাকো এই ক্রুর নগর জঙ্গলে।
আকাশ বাতাস রুদ্ধ, অন্ধতার প্রাচীর ঘিরেছে জনপদ–
এ কালবেলায় তুমি অনাথের নাথ, নিরাশ্রয়ের আশ্রয়।
তোমার সুরের ধারা পাষাণ গলিয়ে দেয়, হে ভূমাস্পদ,
কেবল তোমার সৃষ্টি আমাদের একমাত্র বিষয়-আশয়।
জীবন যখন এক নিয়ত মৃত্যুর নামান্তর, এ স্বদেশ
যখন শুধুই পরবাস, প্রতিবেশ দিন দিন যখন অচেনা,
ধবংসকামী প্রবণতাময় যদি মানব চেতনা অবশেষ,
মানুষ যখন আর অমানুষ হওয়া ছাড়া কিছুই চাইছে না–
তখন তোমাকে ছাড়া বলো আর কাকে কাছে ডাকি, হে ঠাকুর,
কার সুরে দুষ্কালের দিবানিশি হবে সান্ত্বনায় ভরপুর?
২.
তোমার শ্বেতশুভ্র শ্মশ্রুতে
তোমার শ্বেতশুভ্র শ্মশ্রুতে খুঁজে পাই আমার আশ্বাস।
পদ্মার মতো প্রলম্বিত তরঙ্গিত ওই রোমরাজি
যেন বহমান আমার জীবননদী, যার তীরে বসে
আমাদের দিগন্ত দর্শন, স্পর্শ করা অনন্তের কূল।
চারপাশে ক্রমাগত জমে ওঠে রুক্ষ খরখরে
আদিম অরণ্যের মতো হিংস্র বর্বর দাড়ির জঞ্জাল।
থুতনিতে ছাগলদাড়ি নিয়ে ইবলিশ ইজারা নেয় ঈশ্বরের,
অনাবিল প্রকৃতিকে মুছে দেয়, ঢেকে দেয় আঁধার পর্দায়।
বদলে যাচ্ছে আমার মাতৃভূমি, তোমার সোনার বাংলা,
তোমার ভালোবাসা — দাড়িদার অজদের
অজাচার, অনাচার, অত্যাচারে।
শুধু বাংলা নয়, সারা বিশ্ব বিপন্ন আজ…
এ ঘোর সংকটে সান্ত্বনা, শক্তি ও আশ্বাস
খুঁজে পাই, পিতামহ কবি,
তোমার চন্দনগন্ধ শ্মশ্রুর নিবিড় গভীর আশ্রয়ে —
আর্ত আত্মার নির্ভয় আশ্রমে — শান্তিনিকেতনে।
৩.
তোমার সুরের সুরা
তুমি আমার স্ফটিকস্বচ্ছ পাত্রভরা সুরা
তুমি আমার প্রাণের গানে মন্দ্রিত তানপুরা।
তুমি আমার ভুবন জুড়ে গুঞ্জরিত সুর
তোমার সুরের সুরায় শুধু রয়েছি ভরপুর।
কিন্নরলোক জাগায় তোমার অমৃত সঙ্গীত
তোমার সুরের সুরা ফেরায় আত্মার সম্বিত।
আর কিছু তো প্রার্থনা নেই– যাবে যখন প্রাণ
কানে যেন বাজে তোমার অমর্ত্য ওই গান।