‘তবু মনে রেখো’: বাইশে শ্রাবণে রবিপ্রণাম
আমার মনে হয়, ৮০ বছরের দীর্ঘ জীবন জুড়ে রবীন্দ্রনাথ এত যে লিখেছেন — এত কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ইত্যাদি, এর মূলে তাঁর একটা ইচ্ছেই কাজ করেছে, আর সেটা হলো জনমনে চিরস্থায়ী আসন লাভ। তাঁকে যেন আমরা মনে রাখি — এ বাসনা বার বার ধ্বনিত হয়েছে তাঁর বহু লেখায়, যার মধ্যে এ মুহূর্তে মনে পড়ছে তাঁর বহুলপঠিত, গীত ও শ্রুত কবিতা আর গান ‘১৪০০ সাল’, ‘এই কথাটি মনে রেখো’, ‘তবু মনে রেখো’ প্রভৃতির কথা। এর মধ্যে প্রথমোক্ত কবিতাটি এবং শেষোক্ত গানটি মৃত্যুর প্রাক্কালে তাঁর স্বকণ্ঠে ধরে রাখা হয়েছে গ্রামোফোন রেকর্ডে (নিচে লিংক দেয়া হলো)।
বাংলা কবিতায় আধুনিকতার অগ্রদূত মধুসূদনও লিখে গিয়েছেন ‘রেখো মা দাসেরে মনে’। প্রাচীন কালে পুঁথিপত্রে বা গানে রচয়িতারা নিজ নামের ভনিতা যোগ করে দিতেন এই স্মরণীয় হওয়ার কাঙ্ক্ষা নিয়েই।
শুধু রবীন্দ্রনাথ বা মধুসূদন বা অন্যান্য কবি-লেখকরা নন, মানুষমাত্রই মানবচিত্তে অমরতা পেতে চায়। সন্তানসন্ততি ও নানা কর্মকৃত্যের মধ্যে দিয়ে তাদের সে-কামনারই প্রতিফলন ঘটে। যে-মানুষ মরে গেছে, তারও চিতায় বা কবরে তার নাম-ধাম উৎকীর্ণ করে রাখা হয়, যাতে মৃত্যুর পরও জীবিতরা তাঁকে মনে রাখে।
অন্যদের কথা বাদ দিয়ে বলি, মনে থাকার বাসনাটা রবীন্দ্রনাথের সফল হয়েছে ষোল আনার ওপর আঠারো আনা। আমরা শুধু তাঁকে মনেই রাখি নি, মন থেকে চিত্তে, চিত্ত থেকে আত্মায় ঠাঁই করে দিয়েছি। মৃত্যুর প্রায় আট দশক পরও তিনি আমাদের আত্মার পরমাত্মীয় হয়ে আছেন। এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ, তবুও বাঙালি প্রাণপণে রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে।
রবীন্দ্র-সম্পদে গরীয়ান বাঙালি বিশ্বের অন্যান্য জাতিকে অন্তত একটা কারণে করুণা করতে পারে যে, তাদের কোনো রবীন্দ্রনাথ নেই।