চর্যাপদ: আধুনিক বাংলায় (সপ্তম কিস্তি)
চর্যা-৩৭
তাড়কপাদ

মহাসিদ্ধের প্রতীকী মূর্তি
অপণে নাহি সো কাহেরি শঙ্কা।
তা মহামুদেরী টুটি গেলী কংখা ।।
অনুভব সহজ মা ভোল রে জোই।
চৌকোট্টি বিমুকা জইসো তইসো হোই ।।
জইসনে অছিলেস তইছন অচ্ছ ।
সহজ পিথক জোই ভান্তি মাহো বাস ।।
বান্ড কুরুণ্ড সন্তারে জাণী ।
বাক্পখাতীত কাঁহি বখাণী ।।
ভণই তাড়ক এথু নাহিঁ অবকাশ॥
জো বুঝই তা গলেঁ গলপাস ।।
আধুনিক বাংলায়:
আমিই নেই তো কাকে শঙ্কা
তাই মহামুদ্রার টুটে গেলো কাঙ্ক্ষা।
অনুভব সহজ ভোলো না রে যোগী তবে
চতুষ্কোটি বিমুক্ত যেমন তেমনই হবে।
যেমন ছিলে তেমনভাবেই থাকো
সহজকে যোগী পৃথক ভেবো নাকো।
বটুয়া-কেঁড়েকে* সাঁতার কেটে জানি
বাকপথের অতীতকে কীভাবে বাখানি।
তারক বলছে এখানে নেই অবকাশ
যে বোঝে তারও গলায় গলপাশ**।
*বাণ্ড-কুরুণ্ড বা বটুয়া-কেঁড়ে—প্রতীকী অর্থে লিঙ্গ-অণ্ডকোষ; **গলায় দড়ি
রূপকার্থ:
সবকিছুই যখন অনিত্য, যখন আমার অস্তিত্বই নেই, তখন আমার আর কাকে ভয়! সংসারের অনিত্যতা আমি বুঝেছি, তাই মহামুদ্রার জন্যে আমার আর আকাঙ্ক্ষা নেই। কারণ যেইমাত্র আমি বুঝতে পেরেছি সংসার অনিত্য, তখনই আমার চিত্ত নির্বাণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সহজানন্দ বাক্যে প্রকাশযোগ্য নয়, তা অনুভূতিলভ্য। আমি সেই অনুভূতির সাহায্যে বুঝতে পেরেছি, চার রকম বিকল্প (সৎ, অসৎ, সদসৎ, ন সৎ ন অসৎ) থেকে মুক্ত আমি পূর্বে যা ছিলাম, এখনো তাই আছি। জন্মের সময় যে-আনন্দ নিয়ে এসেছিলাম, পরে এই পৃথিবীতে নানা মোহজালে আবদ্ধ হয়ে আমার সে-আনন্দ মুছে গিয়েছিলো, অনেক দুঃখও ভোগ করেছি। এখন সমস্ত সঙ্গ বর্জিত হওয়ায় আমার আগেকার সেই আনন্দ আবার ফিরে এসেছে। তাই আমি পূর্বে যেমন ছিলাম, এখনো তা-ই আছি। নদী পার হওয়ার সময় পাটনী যাত্রীর কাপড়-বটুয়া খুঁজে দেখে, খেয়াপারের মাশুল দেয়ার কড়ি তার আছে কিনা। কিন্তু সহজপন্থীদের ভবপারাবার পার হওয়ার সামর্থ্য আছে কিনা, তা এভাবে বাহ্যলক্ষণ দিয়ে বোঝা যায় না, কারণ তা বাক্পথাতীত। যাঁরা সহজানন্দের সাধক নন, তাঁদের এ ধর্মে প্রবেশ করার অবকাশ নেই। আবার যাঁরা এ আনন্দ বোঝেন, তাঁদেরও গলায় দড়ি—অর্থাৎ তাঁরাও এ অনুভূতি ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারেন না।
চর্যা-৩৮
সরহপাদ

আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের এক পটচিত্রে সরহপাদ। ছবিটি সংরক্ষিত আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে
কাঅ ণাবড়ি খান্টি মণ কেড়ুআল ।
সদগরুবঅণে ধর পতবাল ।।
চীঅ থির করি ধহু রে নাহী ।
অন উপায়ে পার ণ জাই ।।
নৌবাহী নৌকা টাগুঅ গুণে ।
মেলি মেল সহজেঁ জাউ ণ আণেঁ ।।
বাটত ভঅ খান্ট বি বলআ ।
ভব-উলোলেঁ ষঅ বি বোলিআ ।।
কুল লই খরে সোন্তে উজঅ ।
সরহ ভণই গণেঁ সমাএঁ ।।
আধুনিক বাংলায়:
কায়া নৌকাখানি, মন কেড়ুয়াল*
সদ্গুরু বচনে ধরো পতোয়াল**।
চিত্ত স্থির করে ধরো রে নাও
অন্য উপায়ে পারে না যাও।
নৌবাহী নৌকা টানো হে গুণে
মিলে মেলো সহজে, যেয়ো না অন্যে।
পথেতে ভয়, দস্যুও বলিষ্ঠ
ভব-উল্লাসে সবই বিনষ্ট।
কুলের ধার দিয়ে খরস্রোতে উজাও
সরহ বলছে, গগনে ঢুকে যাও।
*বৈঠা; **হাল
রূপকার্থ:
দেহকে নৌকা আর মনকে বৈঠা করে, সদ্গুরুর উপসদেশকে হাল হিসেবে গ্রহণ করে সাধককে ভবসমুদ্র পার হতে হবে। এটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। নৌবাহী নৌকা গুণে টানে, কিন্তু দেহনৌকা সেভাবে চলে না। তার জন্যে প্রধান অবলম্বন হিসেবে চাই গুরুর উপদেশ। সহজপথ ছাড়া অন্য কোনো সাধনপথ নেই। কিন্তু এ পথে ভয়ও আছে—বিষয়াসক্তির ভয়। এই বিষয়াসক্তি জলদস্যুর মতো ভয়ঙ্কর। এর ফলে দেহসমুদ্র উদ্বেলিত হয়, এবং বিষয়তরঙ্গে নৈরাত্ম্য নষ্ট হয়ে যায়। ঠিক পথ ধরে সহজানন্দের দিকে যদি যাওয়া যায়, তবেই নৌকা বা এই দেহ গগনসমুদ্রে বা নির্বাণে লীন হতে পারে।
চর্যা-৩৯
সরহপাদ

সরহপাদ
সুইণা হ অবিদারঅরে নিঅ মনে তোহোরেঁ দোসে ।
গুরুবঅণবিহারেঁ রে থাকিব তই ঘুন্ড কইসে ।।
অক্ট হুঁ ভবই গঅণা ।
বঙ্গে জায়া নিলেসি পরে ভাগেল তোহার বিণাণা ।।
অদঅভুঅ ভব মোহারো দিসই পর অপাণা ।
এ জগ জল বিম্বাকারে সহজেঁ সুণ অপণা ।।
অমিয়া আচ্ছান্তেঁ বিস গিলেসি রে চিঅ পরবস অপা।
ঘরেঁ পরেঁ বুঝ্ঝিলে মরে খাইব মই দুঠ কুন্ডবাঁ ।।
সরহ ভণন্তি বর সুণ গোহালী কি মো দুঠ্য বলন্দেঁ ।
একেলে জগ নাশিঅ রে বিহরঈঁচ্ছন্দেঁ ।।
আধুনিক বাংলায়:
স্বপ্নেও অবিদ্যারত নিজ মনে তোমারি দোষে
গুরুবচন-বিহারে থাকবে তো তুমি ঘুরে বেড়াচ্ছো কী হুঁশে।
একটা হুঙ্কারে সৃষ্টি হলো এ গগন
বঙ্গে জায়া নিলে পরে ভাংলো তোর বিজ্ঞান।
অদ্ভুত এই ভবের মোহ, দেখা যায় পর-আপন
এ জগৎ জলবিম্বাকার, সহজে শূন্য আত্মন।
অমৃত আছে, তবু বিষ গিলছো রে চিত্ত, পরবশ করো নিজেকে
ঘরে পরে বুঝলে আমি খাবো আমার দুষ্ট কুটুম্বকে।
সরহ বলছে, বরং শূন্য গোয়াল ভালো দুষ্ট বলদের চেয়ে
একলা জগৎ নাশ করে আমি বিহার করি ছন্দ পেয়ে।
রূপকার্থ:
মন অবিদ্যার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারছে না বলেই মোহস্বপ্নও দূর হচ্ছে না। বিষয়বাসনায় মন মত্ত। সেই মনকে সংযত করতে হবে, গুরুর নির্দেশের বাইরে গিয়ে অহেতুক বিভ্রান্তিতে পড়লে চলবে না। পৃথিবীর মোহ বিচিত্র, এ মোহই আত্মপর ভেদ সৃষ্টি করে, তবে সহজানন্দে চিত্ত প্রবিষ্ট হলে জলে প্রতিবিম্বিত চাঁদের মতো জগৎকে অসার বলে মনে হয়। সহজানন্দ অমৃত পান করলে বিষয়বিষ নাশ করা যাবে। নিজের দেহেই নৈরাত্মা আছে, এ কথা বুঝতে পারলে দুষ্ট আত্মীয়-স্বজন, অর্থাৎ দেহজ রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদিকে ধ্বংস করা যাবে। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো, কারণ একটি দুষ্ট গরুই সব নষ্ট করে দিতে পারে। অনুরূপভাবে, দুষ্ট বিষয়বলের একটিই জগৎ নষ্ট করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। এই বিষয়বলকে জয় করতে পারলে স্বচ্ছন্দে সহজানন্দে বিহার করা যাবে।
চর্যা-৪০
কাহ্নপাদ

অষ্ট মহাসিদ্ধাচার্য
জো মণগোএর আলাজালা।
আগম পোথী ইষ্টামালা॥
ভণ কইসেঁ সহজ বোলবা জায়।
কাঅবাক্ চিঅ জসু ণ সমায়॥
আলে গুরু উএসই সীস।
বাক্ পথাতীত কাহিব কীস॥
জেতই বোলী তেতবি টাল।
গুরু বোব সে সীসা কাল॥
ভণই কাহ্নু জিণরঅণ বিকসই সা।
কালে বোব সংবোহিঅ জইসা॥
আধুনিক বাংলায়:
যে মনগোচর বিকল্পজাল*
আগম-পুঁথী, ইষ্টমাল**।
বলো, কেমন করে সহজ বলা যায়
কায়-বাক-চিত্ত যেখানে না সমায়***?
বৃথাই গুরু উপদেশে**** শিষ্যেরে
বাক্পথাতীতকে বলবে কী করে?
যতই বলি, ততই ভুল বলা
গুরু বোবা তো শিষ্য কালা।
কাহ্নু বলছে, জিনরত্ন কেমন?
কালা বোবাকে বোঝায় যেমন।
*ইন্দ্রজালের সাহায্যে দেখা বাইরের জগৎ; **ইষ্টমালা; ***ঢোকে; ****উপদেশ দেয়
রূপকার্থ:
যা কিছু মনের সাহায্যে গ্রহণীয়, সবই বিকল্পাত্মক; তাই যা-কিছু আমরা মনের সাহায্যে জানি তার সবই ইন্দ্রজালের মতো মায়াময়। আগম-পুঁথী, শাস্ত্রজ্ঞান—সবই তো আমরা মনের সাহায্যে পাই। তা হলে সহজানন্দকেও কি আমরা মনলব্ধ জ্ঞান দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারবো! কীভাবে সেই সহজানন্দকে ভাষায় প্রকাশ করবো, কারণ এটা তো মন দিয়ে নয়, অনুভবে লভ্য, আর তাই ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। বাক্য দিয়ে যতই বোঝানোর চেষ্টা করা হবে, ততই শুধু ভুল হবে। এই সহজানন্দকে বোঝানো যায় না বলেই গুরু বোবা, আর শিষ্য কালা। কারণ, গুরু বোঝানোর ভাষা পান না বলেই তিনি বোবা, এবং শিষ্য ভাষার সাহায্যে গুরুর দেয়া ব্যাখ্যা কিছুই বুঝতে পারেন না বলে তিনি কালা। এই বাক্যাতীত জিনরত্নকে কীভাবে বোঝানো যাবে, তাই নিয়ে কাহ্নু সমস্যায় পড়ে গেছেন। তিনি মনে করছেন যে, সহজানন্দকে বোঝানো যাবে শুধুমাত্র আভাসে-ইঙ্গিতে, যেমন বোবায় বোঝায় কালাকে।
……………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………