চর্যাপদ: আধুনিক বাংলায় (চতুর্থ কিস্তি)
চর্যা-২৩
ভুসুকুপাদ
জই তুহ্মে ভুসূকু অহেই জাইবেঁ মারিহসি পঞ্চজণা ।
নলণীবন পইসন্তে হোহিসি একুমণা ।।
জীবন্তে ভেলা বিহণি মএল ণঅণি ।
হণবিণু মাঁসে পদ্মাবণ পইসহিণি ।।
মাআজাল পসরি উরে বাধেলি মাআ হরিণী ।
সদ্গুরু বোহেঁ বুঝিরে কাসু কদিনি ।।………
[বি.দ্র.- নেপালের রাজবাড়ির গ্রন্থাগার থেকে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উদ্ধার করা চর্যাপদের পুঁথিটিতে ২৩ সংখ্যক পদটির শেষাংশ এবং ২৪ ও ২৫ সংখ্যক পদগুলো পুরো পাওয়া যায় নি। অপ্রয়োজনীয় বোধে ২৩ নং পদটির প্রাপ্ত অর্ধাংশের রূপান্তর করলাম না।]
চর্যা-২৬
শান্তিপাদ
তুলা ধুণি ধুণি আঁসুরে আঁসূ।
আঁসু ধুণি ধূণি ণিরবর সেসু ।।
তউ ষে হেরুঅ ণ পাবিঅই ।
সান্তি ভণই কিণ স ভাবিঅই ।।
তুলা ধুণি ধূণি সুনে অহারিউ ।
শুন লইআঁ অপণা চটারিউ ।।
বহল বাট দুই আর দিশঅ ।
শান্তি ভণই বালাগ ন পইসঅ ।।
কাজ ন কারণ জএহু জঅতি ।
সঁএঁ সঁবেঅণ বোলথি সান্তি ।।
আধুনিক বাংলায়:
তুলো ধুনে ধুনে আঁশ রে আঁশ
আঁশ ধুনে ধুনে নিরবয়ব শাঁস।
তবু সে হেরুক* পাওয়া তো যায় না
শান্তি বলছে, যতই তা ভাবো না।
শূন্যে জড়ো করি তুলো ধুনে ধুনে
নিজেকে লীন করি নিয়ে গিয়ে শূন্যে।
কর্দমাক্ত পথ, দুদিক দেখি না,
শান্তি বলছে, কেশাগ্রও ঢুকবে না।
কাজ না, কারণ না—এটাই যুক্তি,
সেটাই সংবেদন, বলছে শান্তি।
*হে্রুক বীণা, যেটি কার্য-কারণ হেতুর প্রতীক হিসেবে ধরা হয়
রূপকার্থ:
শান্তিপাদ বলছেন, আপন চিত্তকে তুলোর মতো ধুনে ধুনে তিনি বিকারশূন্য, নিরবয়ব করেছেন, শূন্যে বিলীন করে দিয়েছেন। এভাবে চিত্তের অস্তিত্ব লোপ পাওয়ায় তার পুনরুৎপত্তির হেতু খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন সংসারের সমস্ত মলিনতা আর দ্বৈতভাব মুছে যায়। এই অনুত্তর জ্ঞানের কণামাত্রও মূর্খজনের অন্তরে ঢুকতে পারে না। কার্য-কারণজাত সংসারের অলীকতা যিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তিনিই এই সংবেদনের অধিকারী।
চর্যা-২৭
ভুসুকুপাদ
অধরাতি ভয় কমল বিকসউ ।
বতিস জোইণি তসু অঙ্গ উহ্লসিউ ।।
চালিউঅ সসহর মাগে অবধুই ।
রঅণহু ষহজে কহেই (সোই) ।।
চালিঅ সসহর গউ ণিবাণে ।
কমলিনি কমল বহই পণালেঁ ।।
বিরমানন্দ বিলক্ষণ সুসুধ
জো এথু বুঝই সো এথু বুধ ।।।
ভুসুকু ভণই মই বুঝিঅ মেলেঁ ।
সহজানন্দ মহাসু্হ লোলেঁ ।।।
আধুনিক বাংলায়:
অর্ধরাত্রি হলে কমল বিকশিল
বত্রিশ যোগিনীর অঙ্গ উল্লসিল।
শশধর* মার্গে অবধূত চালিল
রত্নের প্রভাবে সহজে বলিল।
চালিত শশধর নির্বাণে গেলে
কমলিনী কমল বহিল মৃণালে।
বিরমানন্দ বিলক্ষণ শুদ্ধ
যে এটা বোঝে, সে-ই তো বুদ্ধ।
ভুসুকু বলে, আমি মিলনে বুঝেছি
সহজানন্দ মহাসুখ লীলায় মজেছি।
*চন্দ্র
রূপকার্থ:
প্রজ্ঞাজ্ঞানের অভিষেক যে-সময়ে করা হচ্ছে, সেটাই হলো অর্ধরাত্রি। তখন সাধকের সহস্রার পদ্ম বিকশিত হলো, অর্থাৎ তাঁর সত্যজ্ঞান লাভ হলো। দেহের বত্রিশটি নাড়ি তখন উল্লসিত, পরিশুদ্ধ চিত্ত তখন মহাসুখানন্দে বিভোর। রত্ন হেতু বা গুরুর উপদেশেই এই মহাসুখ পাওয়া গেছে। চিত্তরূপ চন্দ্র তখন এভাবে নির্বাণে আরোপিত, দেহকে অবলম্বন করেই সেই বোধিচিত্ত-কমল স্থির। এই যে আনন্দ, তা লক্ষণহীন, আর যিনি তা অনুভব করতে পেরেছেন তিনিই প্রকৃষ্ট বুদ্ধ। ভুসুকুপাদ বলছেন, তিনি গুরুর কৃপায় পুরুষ-প্রকৃতির মিলনসঞ্জাত সেই মহাসুখ অনুভব করতে পেরেছেন।
চর্যা-২৮
শবরপাদ
উঁচা উঁচা পাবত তঁহিঁ বসই সবরী বালী ।
মোরঙ্গি পীচ্ছ পরহিণ সবরী গিবত গুঞ্জরী মালী ।।
উমত সবরো পাগল সবরো মা কর গুলী গুহাডা তোহৌরি।
তোহৌরি ণিঅ ঘরিণী ণামে সহজ সুন্দারী ।।
ণাণা তরুবর মৌলিল রে গঅনত লাগেলী ডালী ।
একেলী সবরী এ বণ হিন্ডই কর্ণ কুন্ডল বজ্রধারী ।।
তিঅ ধাউ খাট পড়িলা সবরো মহাসুখে সেজি ছাইলী ।
সবরো ভুজঙ্গ ণইরামণি দারী পেহ্ম রাতি পোহাইলী ।।
হিঅ তাঁবোলা মহাসুহে কাপুর খাই।
সুন নিরামণি কন্ঠে লইআ মহাসুহে রাতি পোহাই ।।
গুরুবাক্ পুঞ্চআ বিন্ধ ণিঅ মনে বাণেঁ ।
একে শর সন্ধানে বিন্দহ পরম ণিবাণেঁ ।।
উমত সবরো গরুআ রোষে ।
গিরিবর সিহর সন্ধি পইসন্তে সবরো লোড়িব কইসে ।।
আধুনিক বাংলায়:
উঁচু উঁচু পর্বত, সেখানে থাকে শবরী বালা
ময়ূরপুচ্ছ পরনে শবরীর, গ্রীবায় গুঞ্জার মালা।
উন্মত্ত শবর, পাগল শবর, দোহাই তোমার গোল কোরো না
তোমারই নিজ ঘরণী নামে সহজসুন্দরী ললনা।
নানা তরুবর মুকুলিত হলো রে, গগনে শাখা বিস্তারি
একেলা শবরী এ বনে প্রবেশে কর্ণকুণ্ডল বজ্রধারী।
তিন ধাতু খাট বিছিয়ে শবর মহাসুখে শয্যা বিছালো
শবর ভুজঙ্গ নৈরামণি নিয়ে প্রেমরাতি পোহালো।
হৃদয়-তাম্বুলে মহাসুখে কর্পূর খাই
শূন্য নৈরামণি কণ্ঠে নিয়ে মহাসুখে রাত পোহাই।
গুরুবাক্য ধনু করে নিজ মন বিদ্ধ কর বাণে
এক শর সন্ধানে বিদ্ধ কর পরম নির্বাণে।
উন্মত্ত শবর গুরুতর রোষে
গিরিবর শিখর সন্ধিতে প্রবিষ্ট শবরকে পাবো কিসে?
রূপকার্থ:
দেহরূপ পর্বতের উচ্চ শিখরে মহাসুখচক্র, যেখানে শবরীরূপিণী নৈরাত্মামণির বাস। তিনি নানারকম ভাববিকল্পের অলংকারে ভূষিতা। কিন্তু তিনি যেন সহজপথের সাধককে বলছেন—উন্মত্ত সাধক, আর সবাই যে যেভাবে আমাকে ব্যাখ্যা করুক-না কেন, এ কথা জেনো যে, আমিই তোমারই প্রার্থিত সহজানন্দ। নানা অবিদ্যায় দেহ সজ্জিত, পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের শাখা-প্রশাখার জটিল জালে নির্বাণের আকাশ অবরুদ্ধ—তবু আমি দেহের মধ্যেই একাকি। অবিদ্যার কলুষ থেকে নিছক ইন্দ্রিয় সম্ভোগের উন্মত্ততা থেকে যে-সাধক মুক্ত, তিনিই আমাকে সহজানন্দরূপে পাবেন। সেই সহজান্দকে পেতে হলে সাধককে কঠোর সাসধনা করতে হবে। নর-নারীর মিলনের নানা উপকরণ খাট, শয্যা, তাম্বুলাদি বাহুল্যমাত্র, আসল হলো মিলন। তেমনি সহজানন্দকে পেতে হলে চিত্তের বিভিন্ন বিকারকে অবহেলা করতে হবে, একমন হয়ে নৈরাত্মাকেই করতে হবে প্রধান লক্ষ্য। চিত্তের বিকার নাশ করার প্রধান অস্ত্র গুরুর উপদেশ। এ উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যিনি সহজানন্দের স্বাদ পেয়েছেন, তিনি মহাসুখে বিলীন—তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আগের কিস্তিগুলোর লিঙ্ক: