অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী
[লেখাটা ঠিক একবছর আগেকার। গত বছর (২০১৯) মে মাসের এই লেখাটুকু এ বছরের মে-তে এসে যেন আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, এমনটা মনে হওয়াতে এখানে আবার তুলে ধরলাম, অতীতের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতকে শুধরে নেয়ার আত্যন্তিক আকাঙ্ক্ষায়। এ লেখার শেষে একটা প্রশ্ন রেখেছি, যার উত্তর এখনও পাই নি।]
মানুষের কোন্ জ্ঞানটা সম্পূর্ণ? কোনোটাই না। মহাবিশ্ব থেকে পরমাণু পর্যন্ত কোনোটা সম্পর্কেই সে পুরোপুরি জানে না। তবুও জ্ঞানগরিমা নিয়ে তার অহঙ্কারের শেষ নেই। ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ কথাটার অর্থই হলো ‘জ্ঞানী মানুষ’। অথচ নামটা হওয়া উচিত ছিলো ‘অজ্ঞান মানুষ’ বা ‘জ্ঞানহীন মানুষ’। নিজের বাসভূমি পৃথিবী নামের এই গ্রহটা সম্পর্কেও তার পূর্ণ ধারণা নেই। ভূগর্ভের অন্তঃস্থল বা মহাসাগরের অতল সম্পর্কে তার জ্ঞান সম্পূর্ণ নয়। তবুও চাঁদে বা মঙ্গলে হানা দেয় সে কোটি কোটি ডলার খরচ করে, তার অসম্পূর্ণ জ্ঞানের পরিধি আরো একটু সম্প্রসারণের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। নিজের শরীরটার সব রহস্যও সে জানে না আজ অবধি। মৃত্যুকে কীভাবে ঠেকানো যায়, সেটাও সে আজ পর্যন্ত বের করতে পারে নি। তবুও জ্ঞান নিয়ে কেন তার এত অহঙ্কার?!!
মানুষকে অর্ধজ্ঞানী বা স্বল্পজ্ঞানী বলা চলে। এই অর্ধজ্ঞান-স্বল্পজ্ঞান নিয়েই সে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হওয়ার দাবিদার। কিন্তু ‘অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী’ বলে একটা কথা আছে। আজকের পৃথিবীতে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে পদে পদে। নিজের অল্পজ্ঞান বা খণ্ডিত জ্ঞান দিয়ে মানুষ পৃথিবীর সর্বনাশ করছে, ‘অজ্ঞান’ মানবেতর প্রাণীরা যেটা করছে না। মানুষের কারণে এসব প্রাণীর জীবনও বিপন্ন। অল্পবিদ্যার কারণে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী খণ্ডিত, অপরিণামদর্শী। তার দর্শন-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সকল খণ্ডজ্ঞান কীভাবে পরিবেশ-প্রকৃতিকে ঠেলে দিচ্ছে এক ভয়াবহ পরিণামের দিকে, তা আমরা নিয়ত দেখতে পাচ্ছি, যদিও পূর্ণজ্ঞানের অভাবে তা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছি কিনা সন্দেহ।
ইট-কাঠ, ইস্পাত কংক্রিটের আজকের যে ঝাঁ-চকচকে মানব সভ্যতা, সেটা ভালো, নাকি আদিম ‘অসভ্য’ (!) গুহামানবদের জীবন ভালো ছিলো, তা গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। মানুষের ধর্মচিন্তা, দর্শন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তাদেরকে যেন আলোর বদলে ক্রমঅন্ধকারের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। অর্ধজ্ঞানী মানুষ আজ প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশের, প্রতিবেশী প্রাণিকূলের, এমনকি তার নিজেরও পরম শত্রু। মানুষ আজ এমন এক অজগর, যে তার আশেপাশের সবকিছুকে গিলে খাচ্ছে, এমনকি গিলছে নিজেকেও নিজের লেজের দিক থেকে।
অজ্ঞানের চেয়ে জ্ঞান অবশ্যই ভালো। কিন্তু ভয়ঙ্কর অর্ধজ্ঞান-অল্পজ্ঞান থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় কী?