Loading

সুপ্রভাত কবিতাগুচ্ছ

 

 

 

 

 

 

তবুও সকাল

কত যে সকাল এসেছে জীবনে, হিসাব কে রাখে তার!
কিন্তু সকল সকাল তো নয় আলোর বার্তাবহ।
কিছু সকালের উপহার হয় কত যে দুর্বিসহ!
কিছু কিছু সকাল রাতের চেয়েও অন্ধকার।

তবু প্রভাতের প্রত্যাশা রাখে সকল রাতের কুঁড়ি
কারণ সকালই দেয় ফুল হয়ে ফোটার প্রতিশ্রুতি।
সকল জীবন গায় করজোড়ে তাই পূষণের স্তুতি,
জীবনের রুটি সেঁকে নিতে চায় সূর্যের তন্দুরি।

যতই আসুক দুর্বহ দিন, দুঃস্বপ্নের রাত–
তবুও নতুন আশা, ভাষা দিয়ে আসুক সুপ্রভাত।

 

 

 

 

 

 

 

আনত হও, প্রণত হও

আনত হও, প্রণত হও প্রাকৃতজনের, প্রকৃতজনের চরণে।
কী কাজ এমন অপ্রাকৃত, প্রকৃতিবিরোধী উদ্ধত আচরণে?!!

শানবাঁধা পথে শকট চালাও, পায়ের নিচের ঘাস
চেঁছে-মুছে সাফ, ভেঙেচুরে বাদ আদিবাসী বসবাস।
আকাশ ঢেকেছো সৌধমালায়, কালো ধোঁয়া ওগড়ানো
চিমনিতে, জল দূষিত দ্রবণে! নিজেকে শোধরানো

খুব প্রয়োজন এখন– এখনই। নইলে তোমার মুখ
পুড়বে, পোড়াবে স্বর্ণলঙ্কা। তাক করা বন্দুক
ঘুরে যেতে পারে তোমার দিকেই, আরামভক্ত হনুমান!
চরম করুণ পরিণতি করো সময় থাকতে অনুমান।

অনুগত হও প্রকৃতি মায়ের, এড়িয়ে সকল সংঘাত
নীলাকাশতলে নিবিড় সবুজে জানাও সুপ্রভাত।

 

 

 

 

 

 

 

 

কোমল রেখাবে-ধৈবতে

একটি কোমল রেখাব ছুঁয়ে থাকে সকালের রোদ, হাওয়া।
সা থেকে রে ছুঁতে গিয়েই খানিকটা নেমে যায় সুর,
মিড় দিয়ে মোড় নেয় হৃদয়ের অনন্ত পৃথিবীর দিকে।
রোদ হয়ে যায় সুখস্পর্শ, প্রেমিকের প্রীতুল আঙুল,
হাওয়া হয়ে যায় নির্ভার, আত্মার আলতো শুশ্রূষা।

একটি কোমল ধৈবত ছুঁয়ে থাকে প্রভাতের পরম প্রকাশ।
মেজাজ পঞ্চমে চড়ে গিয়ে সপ্তমের দিকে ধেয়ে যেতে যেতেই
নেমে যায় সুর অন্তরের অন্তহীন গভীর গভীরে;
গতি থামে না, থেমে যায় গতির উদ্দামতা।
ভোরের ঝিরঝিরে হাওয়ায় ঈষদূর্মিপ্রবণ নদী
শান্ত ছন্দে এগিয়ে সাগরের সপ্তমে চূড়ান্ত বিস্তারের দিকে…

তার ছিঁড়ে গেলে বেসুরো বিক্ষিপ্ত স্বরে যন্ত্র আর্তনাদ করে ওঠে
যার কোনো নিজস্ব সপ্তক, তাল মান লয় নেই,
যা শুধু আত্মহারা আত্মার অন্ধ আর্তি
আলো যার আঁধার প্রাকার হয়ে গেছে।

তবুও প্রত্যহ ব্রাহ্মলগ্ন সুবেহ সাদেকে
একটি সকাল এসে আমাদের টেনে নেয়
কড়িময় জীবন থেকে অমল কোমলের দিকে,
সাধারণ সপ্তকের সীমা ডিঙিয়ে
হৃদয়ের অনন্ত পৃথিবীর,
অন্তরের অন্তহীন সাগরের
নিরন্তর বিস্তারের দিকে…

প্রাচীর, প্রাকার, প্রকোষ্ঠ–
সব প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে
তোমার চোখের জানলায় উঁকি দিয়ে
কোমল রেখাবে-ধৈবতে সে বলে–
সুপ্রভাত।

 

 

 

 

 

 

 

সকাল সকাল সকালবাবু

বড্ড সকাল সকাল এসে পড়েছো হে সকালবাবু,
আরেকটু দেরিতে এলেও পারতে।

হুট করে জানলার ফোকর দিয়ে উঁকি মেরে,
বোঁজা চোখে রোদসুঁইয়ের খোঁচা মেরে
আমার কাঁচা ঘুমটাকে যে পাকতে দিলে না–
তার কী হবে বলো দিকিনি?

আমাদের এখন ‘জাগরণে যায় বিভাবরী’।
রাত তো এখন আর ঘুমোনোর জন্যে নয়,
রাতারাতি পারাবার পারাপারই এখন রাত্রির তপস্যা…

কাজেই ব্ল্যাক আউট হতে হতেই আমাদের রাত শেষ
আর হতে না হতেই দরজায় তোমার করাঘাত–
আলোর আঙুল দাদরা বাজায় কাঠের কপাটে…

ধা ধিন ধা
না তিন তা
ধা ধিন ধা…

তালবাদ্যে মোহিত তবুও আমি
ঘুম জড়ানো গলায় বলি,
সুপ্রভাত!

তোমার কানে আদৌ কথাটা গেলো কিনা, সকালবাবু,
বুঝতে পারি না।

 

 

 

 

 

 

নাছোড়বান্দা

প্রতিকূল হাওয়া, বিরুদ্ধ পরিবেশ,
তবু হেসে যাই, বর্ণিল পরি বেশ।
তবুও ওড়াই রঙিন রুমাল বাতাসে,
হাসির মুখোস– আজ পরিচয়দাতা সে।

আলাপের ছলে কাটে দিন ঘোর তর্কে,
তর্কের ঝোঁকে ভুলি কে আপন, পর কে।
তর্ক থেকেই নেমে আসে শেষে খড়্গ,
বুঝি না কী করে গড়বো স্বদেশে স্বর্গ!

স্বাধীন এ দেশ আজ পিতাহীন, ত্রাতাহীন,
প্রকৃত মুক্তিসেনানী স্বীকৃতি ভাতাহীন।
চারপাশে যত নেপোয় মারছে দই–
কেউ নেই, যাকে দুঃখের কথা কই।

ভীতু বাঙালি, ভেতো বাঙালি বাঁচি খেয়ে ডালভাত
নতুন দিনকে তবুও জানাই উষ্ণ সুপ্রভাত।

 

 

 

 

 

 

প্রার্থনা

ওল্টানো জামার মতো নিজেকে তোমার কাছে করেছি প্রকাশ।
একটু ঝোলের দাগ, ছেঁড়া সুতো– কিছুই তো করি নি গোপন!
প্রকাশ করেছি খুব ভয়ে ভয়ে, জানি তুমি স্বভাবকোপন।
দহন কলঙ্ক নিয়ে নির্দ্বিধায় হতে পারে সূর্যের উদ্ভাস–

এটুকু ভরসা মনে আছে বলে দেখা দিই তোমার দুয়ারে
তবু এই কাকভোরে। খুলে দিয়ে অন্তর্গত পূর্বাশার দ্বার
আমাকেও ডেকে নাও, বিভাবতী, অসঙ্কোচে হৃদয়ে তোমার;
এবার উদিত হই পূর্ণতর মহিমার ঐশ্বর্য সম্ভারে।

অস্তগামিতার আগে শেষবার উঠিয়েছি প্রার্থনার হাত–
সর্বান্তঃকরণে তুমি, প্রভাময়ী, একবার বলো সুপ্রভাত।

 

 

 

 

 

 

বিনিময়ে

কতটিখানি ভালোবাসা আর জীবনপাত স্নেহ
গড়ে তুলেছে তোমার এই নধরকান্তি দেহ?
সহগজনের কতখানি আয়ুর বিনিময়ে
কেনা জীবন, হিসাবে তার আছে কি সন্দেহ?

তার বদলে তুমি কী দিয়েছো? সেখানে দেখছি ফাঁকি।
কিছু কিছু তুমি দিয়েছো, তবে অ-নে-ক দেয়াই বাকি।
বার বার ঘুঘু খেয়ে গেছে ধান অপরিণামে অবাধে–
পরান বধের পরিণাম ঘুঘু কিছুই জানে না নাকি!

বহু ঋণই বকেয়া, তবে এবার শোধবোধের
চিন্তাভাবনা করো। দেখো তাকিয়ে রোদের
রং পাল্টে গেছে, তাতে ভৈরবীর ছোঁয়া…
বেলা অবসান গা ঢেলে দেয়া প্রমোদের।

কালকে না-ও পোয়াতে পারে রাত।
কিছু দেয়ার কথা নিয়ে আজকে হোক– আজই হোক
চরম এবং পরম সুপ্রভাত।

 

 

 

 

 

 

বিকেলে ভোরের ফুল

সকাল কখনো বিকালকে ভালোবাসে না,
ভয় পায়, রেখে দিতে চায় বহু দূরে।
বিকালের যত গোপন কাহিনি তবুও
লুকিয়ে থাকে সকালের অঙ্কুরে।

সকাল আসলে গতকালকের অবসান
তবুও সবাই ভাবে আজকের সূচনা।
বিকালকে ভাবে আজকে দিনের শেষ,
অথচ আগামীকালের সম্ভাবনা।

সকাল যেদিন বুঝবে গূঢ় এ সত্য
সেদিন ভাঙবে সকল ধারণা ভুল।
সেদিন ফুটবে রঙিন সন্ধ্যামণি,
রজনীগন্ধা– বিকেলে ভোরের ফুল।

সকাল তখন বিকালকে ভাববে না
অস্তায়মান নিতান্ত এক অকাল।
সকালও বাসবে বিকালকে খুব ভালো,
হেসে হেসেই বলবে– শুভ সকাল।

 

 

 

 

 

বাঙ্ময়

অন্তরের গভীর গুহাকন্দরে
অন্ধকারে যেখানে ঢাকা সবই,
যেখানে উঁকি দিতে পারে না রবি
সেখানে যায় নীরব পায়ে কবি।

ভাবনা পায় তখন কিছু ভাষা,
কবিতা হয় তোমার ভালোবাসা,
হতাশা পায় কত যে আলো আশা,
পুষ্প হয়ে ফুৃটে ওঠে সকল অনুভবই।

মুখর হয়ে ওঠে তখন মূক,
স্ফীত হয়ে ওঠে তখন বুক,
বাচিত হয় বাক্য পরাঙ্মুখ,
বলে ওঠে ছিঁড়ে ফেলে বোবা আঁধার জাল–

বন্ধু, শুভ সকাল।

 

 

 

 

 

সহজে নাও

জীবনের যত ঘাত-প্রতিঘাত
সহজে নাও, বাদ-প্রতিবাদ
করে কী লাভ, তার চেয়ে
হেসে বলো, সুপ্রভাত!

অন্ধকার, আলো হাসি
পালাবদল বারোমাসই।
মেঘলা হোক, রৌদ্রময়–
সব দিনই ভালোবাসি ।

খুলে গেছে উৎসমুখ,
নেমে আসে জলপ্রপাত,
মেঘভাঙা রোদ বলে
সুপ্রভাত, সুপ্রভাত!

 

 

 

 

 

চলে যাওয়ার আগে

গুটিয়ে নিচ্ছি জগৎবেড় জাল
অনেক হলো ঘোলা জলে শিকার রোহিত মৎস্য।
ঝেঁটিয়ে দিচ্ছি সকল জঞ্জাল
বিলিয়ে দিচ্ছি গোলাভরা সকল সোনালি শস্য।

ফিরিয়ে নিচ্ছি মুগ্ধ এই চোখ
তোমার মুখের ললিত লোভন মোহন মায়া থেকে।
ভুলে যাচ্ছি সকল দুঃখ শোক
সরে যাচ্ছি আপন গৃহের শোভন ছায়া থেকে।

গোড়ার মাটি রাখছি করে ঢিলে
উপড়োলেও লাগবে না আর তেমন জোর টান।
হাততালি দাও তোমরা সবাই মিলে
হোক না সেটা টিটকিরি বা বিদায়ী সম্মান!

নামার আগে অন্তবিহীন রাত
জানিয়ে যাচ্ছি আবারো সুপ্রভাত।

You must be logged in to post a comment.