Loading

অরুণদা

অরুণদা, মানে অরুণ দাশগুপ্তকে নিয়ে লিখতে বসার আগে আন্তর্জালে অনুসন্ধান চালিয়ে তাঁকে নিয়ে লেখা কিছু লেখা পড়ে নিলাম, নতুন কোনো তথ্য-তত্ত্ব পাওয়ার আশায়। দেখলাম, সব লেখাই তাঁর মৃত্যুর পরে লেখা, এবং সেকারণেই কিনা কে জানে, লেখাগুলোতে তাঁকে মহামানব বানানোর একটা জোরালো প্রয়াস চালানো হয়েছে। লেখাগুলোতে মিথ্যে কিছু লেখা হয়েছে তা আমি বলছি না, কিন্তু সবই ‘সুগার কোটেড ট্রুথ’। অথবা আমি এও বলতে চাইছি না যে, অরুণ দাশগুপ্ত আদৌ কোনো মহামানব বা মহান মানুষ ছিলেন না। কিন্তু লেখাগুলোতে আমি সেই মানুষটার খোঁজ পাইনি, যাঁকে আমি দীর্ঘকাল ধরে খুব কাছ থেকে দেখেছি; যাঁকে দেখে রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতা পংক্তি দুটি অনায়াসে বলা যেতো:

তোমারে পাছে সহজে বুঝি
তাই কি এত লীলার ছল?
বাহিরে যার হাসির ছটা
ভিতরে তার চোখের জল।


অরুণ দাশগুপ্তের একটা জনপ্রিয় পরিচিতি ছিল ‘দাদামণি’ হিসাবে। যদিও আমার সঙ্গে তার বয়সের পার্থক্য বিচারে তাঁকে হয়তো আমি ‘কাকা’ বলতে পারতাম, কিন্তু আমি তাঁকে ‘অরুণদা’ই বলতাম। সেটা আবার সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের প্রচলিত রীতিতে যেকোনো বয়সের মানুষকে যে ‘দাদা’ বা ‘ভাই’ সম্বোধন করা যায়, সেদিক থেকেও নয়। আমি তাঁকে ‘অরুণদা’ বলতাম অন্য সুবাদে। তাঁর মামা প্রয়াত পরিমল সেন (সেনগুপ্ত) ছিলেন আমার পিতা প্রয়াত নীরদ বরণ নন্দী’র অগ্রজতুল্য সুহৃদ, এবং তাঁর উদ্যানচর্চা ও পায়রা পালনের পথপ্রদর্শক ও পরামর্শদাতা। পরিমল জ্যাঠা ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের আগপর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরের কাজেম আলি রোডে টিলার ওপরে আমাদের বাগান ও পশু-পক্ষীরালয় শোভিত বাংলো ধরনের বাসাটায় প্রায় নিত্যদিন এসে দেখে যেতেন বাবার পোষ্য প্রাণী ও উদ্ভিদদের অবস্থা ও ব্যবস্থা। কোনো ভুলত্রæটি দেখলে সংশ্লিষ্ট পরিচারককে, এমনকি খোদ বাবাকে আর মাকেও বকাবকি করতে ছাড়তেন না। ঘটনাচক্রে আমার গরম মেজাজের ঠাকুমাও দু-একবার পরিমল জ্যাঠার বকুনি খাওয়ার পর থেকে ওনার উপর চটা ছিলেন। এদিকে আবার ঠাকুমার নামও ছিল পরিমল, মানে পরিমল সুধা, তাঁর কবি বাবার রাখা কাব্যিক নাম। পরিমল জ্যাঠা এলে আমরা ঠাকুমাকে খ্যাপাতাম– ‘ঠাকুমা, ঠাকুমা, দেখবে চলো, তোমার মিতা এসেছেন।’ ঠাকুমা তখন আরো চটে যেতেন।

পরিমল জ্যাঠা রাউজানের সুলতানপুর নন্দীপাড়ায় আমাদের গাঁয়ের বাড়িতেও একাধিকবার বেড়াতে এসেছেন। আমার ১২-১৩ বছর বয়সের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। একবার উনি এসেই বাবাকে জানিয়ে দিলেন, ‘নীরদ, এবার মাংসটা আমিই রাঁধব। গতবার তোমার রাঁধুনির রান্না তেমন যূতের হয়নি।”

অসাধারণ জুলজিক্যাল আর বোটানিক্যাল গার্ডেনিং-এর পাশাপাশি রান্নাটাও চমৎকার করতেন পরিমল জ্যাঠা। সেবারের খাসির মাংসটায় যদিও কড়াইয়ের তলার দিকে একটু পোড়া লেগে গিয়েছিল, তবুও খুব সুস্বাদু হয়েছিল। আসলে রান্নাটা হয়েছিল ঠিক যেন পরিমল জ্যাঠার মেজাজের মতোই– একটু মেজাজে পোড়া ঘ্রাণ থাকলেও সুস্বাদু।

যেহেতু পরিমল জ্যাঠাকে বাবা ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন, তাই অরুণদা আমার বাবাকেও ‘মামা’ আর মাকে ‘মামি’ বলে ডাকতেন। আর সেই সম্পর্কের সুতো ধরেই আমি তাঁকে ‘অরুণদা’ বলতাম। আমার মা প্রয়াতা স্মৃতিকণা নন্দী আর অরুণদা ছিলেন সমবয়সী। ১৯৩৬-এ মায়ের জন্ম কলকাতায় তাঁর বাবার বাসায়, আর অরুণদার জন্ম চট্টগ্রামের পটিয়ায় সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী ধলঘাট গ্রামে নিজের পৈতৃক বাড়িতে। অরুণদা আমাদের গ্রামের বাড়িতে আসার সুযোগ কখনো পাননি নানা কারণে, তবে ১৯৭১-এর পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম শহরের পাথরঘাটার ব্রিক ফিল্ড রোডে আমাদের নতুন বাসায় অনেকবার এসেছেন।


অরুণ দাশগুপ্তকে নিয়ে লিখতে বসে তাঁর মামা পরিমল সেন বা সেনগুপ্তকে নিয়ে এত কথা যে বলছি, তার কারণ আছে। আমার দিক থেকে অরুণদার দিকে তাকাতে গেলে পরিমল জ্যাঠার কথা অবধারিতভাবে মনে আসবেই। মামা-ভাগ্নে দুজনের জীবনে আর মৃত্যুতে এত মিল যে, তা রীতিমতো অবাক করে দেয়। ভাগ্নে অরুণের মতো মামা পরিমলবাবুও ছিলেন অকৃতদার। চিরকাল আত্মীয়-স্বজনের আশ্রয়েই তাঁদের জীবন কেটেছে। তাঁদের দুজনের চেহারা, শরীরের গঠন আর বর্ণেও ছিল প্রচুর সাদৃশ্য। দুজনের শেষ পরিণতিও প্রায় একই রকমের। সারা জীবন চট্টগ্রামে ফুল-পাখি আর বন্ধু-সুহৃদদের নিয়ে কাটিয়ে শেষজীবনে রুগ্নাবস্থায় কলকাতার উপকণ্ঠে কোন্ এক জায়গায় এক আত্মীয়ের বাসায় নিঃসঙ্গ একাকিত্বে কাটাতে বাধ্য হলেন এবং সেখানেই শেষনিঃশ্াস ত্যাগ করলেন। প্রায় একইভাবে অরুণদাও শেষজীবনে চলে যেতে বাধ্য হলেন তাঁর কর্মক্ষেত্র, যৌবনের লীলাভূমি চট্টগ্রাম শহরকে ছেড়ে স্বগ্রামের বাস্তুভিটায়, এবং সেখানে প্রায় জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন। এক্ষেত্রে ‘নরানাং মাতুলক্রম’ কথাটির সত্যতা প্রমাণিত করতেই যেন মামার ভাগ্য বা দুর্ভাগ্য ভাগ্নেতেও বর্তিয়েছে।

চট্টগ্রাম শহরে পরিমল জ্যাঠা থাকতেন পাথরঘাটায় তাঁর কাকা যোগেশ চন্দ্র সেনের সুরম্য বাসভবনে। এই বাড়িটিতে পরিমল জ্যাঠা এক অসম্ভব সুন্দর বাগান গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে দেশি-বিদেশি নানা ফুলের পাশাপাশি জলভরা বিশাল বিশাল গামলার মতো টবে লাল আর শাদা পদ্মফুল ফুটে থাকতে দেখতাম। বাগানটা এত সুন্দর ছিল, দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যেত। এ উদ্যানের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল সূক্ষ্ম, সুন্দর এক রুচির বহিঃপ্রকাশ। জ্যাঠার পায়রার সংগ্রহটাও ছিল দারুণ বৈচিত্র্যময়। দেশি, ময়ূরপঙ্খি, নোটন, সেরাজু, গলাফুলা, গেরোবাজ, পেশোয়ারি– কত জাতের, কত চেহারার পায়রা ছিল ওখানে তার ইয়ত্তা ছিল না। তার স্নেহের অনুজ আর অনুগামী নীরদের, মানে আমার বাবার, সংগ্রহেও যাতে সেসব পায়রা পৌঁছে যায়, সেদিকেও তাঁর ছিল তীক্ষ্ণদৃষ্টি।

পরিমল জ্যাঠার কাকা যোগেশ সেনের সুন্দরী বিদূষী কন্যার নাম ছিল প্রণতি সেন। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম প্রধান মেয়েদের স্কুল অপর্ণাচরণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, লোকমুখে যার প্রচলিত নাম ছিল নন্দনকানন স্কুল, তার প্রধান শিক্ষিকা। তিনি প্রেমে পড়েছিলেন চট্টগ্রাম শহরের সরকারি চট্টগ্রাম কলেজের বাইরের তৎকালীন একমাত্র মহাবিদ্যালয় বোয়ালখালির কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজের তরুণ সুপুরুষ অধ্যাপক শান্তিময় খাস্তগীরের।

জাতপাত, শিক্ষাদীক্ষা সবকিছুর পুরোপুরি মিল সত্তে¡ও শান্তিময়-প্রণতির প্রেম কিন্তু পরিণয়ে পরিণতি পেল না, কন্যাপক্ষের অভিভাবকদের অসম্মতির কারণে। দুঃখে. অভিমানে প্রণতি দেবী পিতৃগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে উঠলেন তাঁর সহশিক্ষয়িত্রী ও স্বজাতের ঘনিষ্ট বান্ধবী কল্যাণী গুপ্তের বাড়িতে। ওটা ছিল মূলত কল্যাণী দেবীর প্রয়াত পিতা, চট্টগ্রামের একসময়কার সিভিল সার্জন ডা. কেশব চন্দ্র গুপ্তের বাসা। কেশব বাবুরা ছিলেন টাঙ্গাইলের লোক, এবং কর্মসূত্রে তিনি চট্টগ্রামে থিতু হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর চিরকুমারী কন্যা কল্যাণী এ বাড়ির মালিকানা পান। কল্যাণীর মতো প্রণতিও আজীবন কুমারী থেকে এ বাড়িতেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

শান্তিময় খাস্তগীরও চিরকুমার থেকে যান। কানুনগোপাড়া কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালে ১৯৭১-এ হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে তিনি কলেজ ক্যাম্পাসেই শহিদ হন।

চট্টগ্রামের নন্দনকানন বৌদ্ধমন্দিরের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ডা. কেশব গুপ্তের প্রাচীন বাড়িটিতে প্রণতি সেনের সূত্রে আশ্রয় পান তাঁর কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন, যাঁদের একজন হলেন তাঁর জ্যাঠতুতো দিদির ছেলে অরুণ দাশগুপ্ত।

চিরকুমারী প্রণতি ও কল্যাণীর মৃত্যুর পর ওই আত্মীয়দের মধ্যেই কেউ বাড়িটির মালিকানা পেলেও, অরুণদার ভাগ্যে কিছুই জোটেনি। অবশ্য তিনি যে তার খুব পরোয়াও করেছেন তাও নয়। ওসব সাংসারিক ব্যাপার স্যাপার নিয়ে তিনি আদৌ ভাবতেন বলে মনে হয় না। তবে বাড়িটির মালিকানা যিনি পান, তিনি পরে বাড়িটি ডেভেলপারদের দিয়ে বহুতল ভবন করানোর উদ্যোগ নিয়ে অরুণদাকে আশ্রয়চ্যুত করেন। শোনা যায়, ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হলে সেখান থেকে অরুণদাকে একটা ফ্ল্যাট দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত যেকোনো কারণে সেটা তাঁকে দেওয়া হয়নি।


বলতে গেলে, বৌদ্ধমন্দিরের পাশের বাড়িটা থেকে উৎখাত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় অরুণদার উদ্বাস্তু জীবনের পালা। কিছুদিনের জন্য তিনি আশ্রয় নেন চট্টগ্রাম শহরের রহমতগঞ্জ এলাকার আরেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের বাড়িতে, কিন্তু একপর্যায়ে সেটাও ডেভেলপারের হাতে দিয়ে দেওয়ায় তাঁর ঠাঁই হয় পাশেই আরেক প্রখ্যাতজনের বাড়ি ভেঙে নবনির্মিত ভবনের একটি ফ্ল্যাটে। শেষপর্যন্ত সেখানেও থাকা সম্ভব না হওয়ায় তাঁকে চলে যেতে হয় ধলঘাটে গ্রামের বাড়িতে। এই হল আমাদের প্রখ্যাত কবি, প্রবন্ধকার, দার্শনিক, সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্তের জীবনের শেষদিককার কয়েকটি বছরের যাযাবর জীবনের চিত্র।

এটা ঠিক যে, চিরকুমার কবি অরুণ দাশগুপ্তকে পথেঘাটে বা কোনো দাতব্য চিকিৎসালয়ে নিরাশ্রয়ের মতো মরতে হয়নি, নিজ ভিটেবাড়িতেই দেহত্যাগ করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, প্রায় আজীবনই নগরবাসী, নাগরিক হাওয়ায় লালিত, নাগরিক জীবনযাত্রায় চিরাভ্যস্ত মানুষটাকে জীবনের শেষলগ্নে পল্লীগ্রামে নির্বাসিত হতে হল কেন? এত ভক্ত অনুরাগী শুভানুধ্যায়ীতে পরিপূর্ণ এই শহরের এককোণে এই চিরকুমার পরিবার-পরিজনহীন মানুষটার একটা ছোট্ট ঠাঁই হতে পারত না? কেন তাঁকে এভাবে বঞ্চিত করা হল? আর অরুণদাও এতটাই ভদ্রলোক, এতটাই সুশীল তাঁর আচরণ যে, তিনি কখনো মুখ ফুটে কারো কাছে কিছু চাননি, শুধু দিয়েই গেছেন। কোনো নেপোয় দই মেরে দিয়ে গেছে, আর অরুণদা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছেন আর মুচকি মুচকি হেসেছেন।

আর যে-পত্রিকায় তিনি আজীবন নিজেকে নিংড়ে দিয়ে গেলেন, সেটার কর্তৃপক্ষ তাঁকে মৃত্যুর কয়েকমাস আগে পর্যন্ত কাজ করার সুযোগ দিয়ে বিরাট একটা মহানুভবতা দেখিয়েছে বটে, কিন্তু তাঁকে কখনো ন্যায্য স্কেলে বেতন-ভাতা দিয়েছে কি? তাঁর প্রাপ্য প্রভিডেন্ড ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ইত্যাদির টাকা কি ঠিকমতো শোধ করা হয়েছে? অরুণ দাশগুপ্ত, সিদ্দিক আহমেদ প্রভৃতি মানুষদের মেধা ভাঙিয়ে শত শত কোটি টাকা উপার্জনকারী চট্টগ্রামের পত্রিকাগুলোর রেকর্ড এ বাবদে এত খারাপ যে, সন্দেহ রাখার যথেষ্ট অবকাশ আছে। তা না হলে অরুণ দাশগুপ্তের মতো একজন শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিককে কেন মৃত্যুর জন্যে নিজের ফেলে আসা জীর্ণ বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়?


১৯৭১-এর আগে আমি অরুণদার মামা পরিমল সেনকে খুব চিনতাম, কিন্তু অরুণদাকে চেনা দূরে থাক চোখের দেখাও কখনো দেখিনি। দেখবো কী করে? তখন তো তিনি কলকাতায়। কলকাতা আর বিশ্বভারতীতে শিক্ষাজীবন শেষ করে পার্টির নির্দেশে লক্ষ্মীকান্তপুরে না কোথায় কোন্ হাই স্কুলে মাস্টারি করছেন। কলকাতা থেকে লোকাল ট্রেনে যাওয়া আসা করেন। কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য। পুরো বোহিমিয়ান জীবন।

কলকাতাতেই তাঁর দীক্ষা হয় বামপন্থী রাজনীতিতে। তাঁর কাকা দীনেশ দাশগুপ্ত কংগ্রেসি রাজনীতি করার সুবাদে ঘরে রাজনীতির আবহাওয়া আগে থেকেই ছিল। কিন্তু অরুণ দাশগুপ্ত সেই চলতি হাওয়ার পন্থী না হয়ে যুক্ত হয়েছিলেন ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনে।

একাত্তরের ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে এলেন, কিসের টানে জানি না। এসে কিছুদিন মফস্বলের দুটো স্কুলে অল্পদিন শিক্ষকতা করার পর সম্ভবত ১৯৭৩ নাকি ’৭৪-এর দিকে আজাদীতে যোগ দিলেন। আমি তখন ১৭-১৮ বছরের তরুণ। সেই সময়েই তাঁকে আমি প্রথম দেখি কলকাতা-ফেরত সাংস্কৃতিক মুক্তিযোদ্ধা কিছু তরুণ-তরুণীর একটি সংগঠন ‘বঙ্গশ্রী শিল্পী সংসদ’-এর একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। শুনলাম, তিনি সাংবাদিক– আজাদী পত্রিকার সাহিত্য পাতার সম্পাদক। দেখলাম, ৩৫-৩৬ বছরের একজন ছিপছিপে শ্যামলকান্তি যুবক, যিনি সবার উপরোধে নিজের হাতে হারমোনিয়াম বাজিয়ে ঈষদ আনুনাসিক সুরে, খানিকটা যেন মেয়েলি ঢঙে, কিন্তু সুর-তালের পুরো শুদ্ধতা রক্ষা করে গোটা দুই রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলেন। আমার তেমন ভালো লাগল না। আমি তখন পঙ্কজ কুমার, হেমন্ত, দেবব্রত প্রমুখের পুরুষালি কণ্ঠের রবীন্দ্রগানের অন্ধ ভক্ত। অরুণদার গান আমার পছন্দ হয়নি। পরে জেনেছি, অরুণদা কলকাতায় রবীন্দ্রসঙ্গীতে তালিম নিয়েছেন সঙ্গীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদার আর শুভ গুহঠাকুরতার কাছে। আরো পরিণত বয়সে বুঝতে পেরেছি, রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার এই আদি ধারা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, দীনেন্দ্রনাথ, শান্তিদেব ঘোষ, শৈলজারঞ্জন, সুবিনয় রায় প্রমুখের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে, এবং অরুণদা ছিলেন এ ধারারই অনুসারী। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সঙ্গীত নিয়ে অরুণ দাশগুপ্তের বহুদিনের চর্যা, অনুশীলন, পঠন পাঠন, চিন্তনের কিঞ্চিন্মাত্র প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের ছয় ঋতুর গান ও অন্যান্য’ গ্রন্থে। বাকি কিছু লুকিয়ে আছে কোনো অপ্রকাশিত লেখায়, অথবা মহাশূন্যে হারিয়ে গেছে চিরতরে।

তখনও কিন্তু আমি জানতাম না, তিনি পরিমল জ্যাঠার ভাগ্নে। পরে দিনে দিনে, ধীরে ধীরে তাঁকে জানার পরিধি বিস্তৃততর হল। আমি তাঁর অসংখ্য স্নেহধন্য তরুণদের একজন হয়ে উঠলাম। তাঁর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার মাধ্যমটি ছিল কবিতা। সম্ভবত ১৯৭৯ কি ’৮০’র দিকে আমি তাঁকে আমার একটা কবিতা দিই, আজাদীর সাহিত্য পাতায় ছাপানোর জন্যে। মোটেই দুরু দুরু বক্ষে দিইনি– কারণ ততদিনে আমার কবিতা সিনিয়রদের কাছ থেকে বিস্তর প্রশংসাসূচক পিঠ চাপড়ানি পেয়েছি, এবং আমার কবিতা বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন, লিফলেট ইত্যাদিতে ছাপা হওয়া শুরু হয়েছিল। কাজেই কবিতাটা অরুণদার হাতে দেওয়ার সময় আমার মনের ভাবটা ছিল ‘এটা বাপু খুবই ভালো একটা কবিতা, না ছাপালে তোমাকে দেখে নেব’ গোছের। অরুণদা কিন্তু সুগন্ধি জর্দা দেয়া মিঠাপান চিবোতে চিবোতে একটু হেসে, ঠেঁটের কোণা থেকে পানের রস মুছে আলগোছে কবিতাটা নিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে রাখলেন, আর তারপর আমাকে যথারীতি পাশের লাকি হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট থেকে গরম চা শিঙাড়া জিলাপি খাইয়ে বিদায় করলেন।

অরুণদার কাছে যে-ই যাক, তাকে চা সন্দেশ, সিঙাড়া, জিলাপি ইত্যাদি খাইয়ে আপ্যায়িত করা ছিল তাঁর অবধারিত রীতি। লাকি হোটেলের সঙ্গে ছিল তাঁর মাসকাবারি ব্যবস্থা। কথা ছিল, ওরা যাবতীয় বিল খাতায় টুকে রাখবে, আর অরুণদা মাসশেষে তা একবারে শোধ করবেন। ওরা পাঁচকে সাত আর সাতকে সতেরো করে বাড়িয়ে টুকে রাখত, আর অরুণদা চোখ বুঁজে তা শোধ করে দিতেন। এভাবে লাকি হোটেল তাঁর কত টাকা খেযেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ডা. কেশব গুপ্তের বাসায় অরুণদার সেই আস্তানা আর লাকি হোটেল– দুই-ই আজ চাপা পড়ে গেছে নবনির্মিত বহুতল ভবনের তলায়। কালপ্রবাহে হারিয়ে গেছে আমাদের তারুণ্য-যৌবনের উজ্জ্বল এক স্মৃতি।

যা-ই হোক, অরুণদা সে-সপ্তাহেই আজাদীর সাহিত্য পাতায় আমার কবিতাটি ছাপিয়েছিলেন, এবং বড় পত্রিকায় সেটাই ছিল আমার প্রথম মুদ্রিত কবিতা। এভাবে অরুণ দাশগুপ্ত কত নবীন কবির প্রথম কবিতাকে প্রকাশনার আলোর মুখ দেখিয়েছেন, তা গবেষণার বিষয় বটে। শুধু কবিতা প্রকাশ নয়, তাদের কাব্য-কবিতার লিখিত আলোচনা-সমালোচনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ছাপানোতে তাঁর কোনো কার্পণ্য ছিল না। মনে আছে, আশির দশকের গোড়ার দিকে যখন আমি, বর্তমানে প্রয়াত কবি শাহিদ আনোয়ার, কবি ওমর কায়সার, কবি বিশ্বজিৎ চৌধুরী আর কবি ইব্রাহিম আজাদ– এই পাঁচজনের প্রত্যেকের দশটা করে মোট পঞ্চাশটা কবিতা নিয়ে ‘দ্রৌপদীর প্রেমিকেরা’ নামের কবিতা সঙ্কলনটি বেরুল, তখন চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের কাব্য জগতে বেশ একটা আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল, আর অরুণদা এই তরুণ পঞ্চকবিকে স্বাগত জানিয়ে আজাদীর পুরো একটা পৃষ্ঠা জুড়ে বইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রকাশ করেছিলেন।

অরুণদা নিজে গান গাইতেন, কবিতা লিখতেন, কিন্তু কখনও নিজেকে কবি বা ষাটের দশকের, সত্তর দশকের কবি এরকম কিছু বলতেন না। নতুন কবিতা লিখলে হাতের কাছে কাউকে পেলে পড়ে শোনাতেন; আমিও শুনেছি তাঁর কিছু কবিতা। কিন্তু তাঁর গান শুনে যেমন, কবিতা শুনে বা পড়েও তেমন মুগ্ধ হতে পারিনি। আসলে তাঁর সঙ্গীত ও কাব্যের অন্তর্গত সুর বোঝার পক্ষে আমার বয়সটা আর মনোভাবটা ছিল বড় অন্তরায়। উদীয়মান কবির মূঢ় অহমিকায় ‘কী হনু রে’ গোছের ভাব, দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না, ধরাকে সরা জ্ঞান করছি। এদিকে নাট্যমঞ্চে গায়ক অভিনেতা হিসেবেও তখন একটু নাম ছড়িয়েছে। অরুণদার কবিতা বা গান তখন প্যানপ্যানানির মতো মনে হত। পরে ক্রমশ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অন্তর্দৃষ্টিতে ক্রমপরিস্ফ‚ট হয়ে উঠেছে অরুণ দাশগুপ্তের কবিতার তন্ময় অনুভব আর মন্ময় সৌন্দর্য।

তাঁর কবিতার বই বের করার কথা বললেই হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলতেন– ‘আমিও আবার কবি– পিঁপড়েও আবার পাখি!’ শেষপর্যন্ত তাঁর জীবৎকালে তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ বেরুলোই না, যদিও জীবনের একেবারে শেষের দিকে ‘খাÐবদাহন’ নামে একটি কবিতার বইয়ের পাÐুলিপি চ‚ড়ান্ত করেছিলেন শুনেছি। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অরুণ দাশগুপ্তের বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ আর কবিতা গ্রন্থাকারে প্রকাশের দায়িত্ব কে নেবে? তাঁর রক্তের কোনো উত্তরাধিকারী তো নেই! এ শহরে বা দেশে তাঁর চেতনার উত্তরাধিকারীও কি কেউ আছে?


অরুণদার চরিত্রে যে ভাবটা প্রধান ছিল, রামকৃষ্ণ ঠাকুরের ভাষায় তার নাম ‘প্রকৃতি ভাব’; অর্থাৎ কপিলের সাংখ্য দর্শনের পুরুষ-প্রকৃতির বৃত্তান্ত। অরুণদার স্বভাবে কিঞ্চিত নারীসুলভ কমনীয়তা ছিল, যা পরম আদরে জড়িয়ে রাখত তাঁর সংস্পর্শে যারাই গেছে, সবাইকে। গোঁফ ফোলানো দৃঢ় পৌরুষের বহিঃপ্রকাশ তাঁর মধ্যে কখনো দেখিনি।

চট্টগ্রামী আঞ্চলিক ভাষায় স্বভাবতই একটা রুঢ় পৌরুষের প্রকাশ আছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, বহু প্রজন্মের চট্টগ্রামী হওয়া সত্তে¡ও চাটগেঁয়ে ভাষায় কথা বলতে তাঁকে কখনও শুনিনি। এমনকি বাড়ির ‘পুরাতন ভৃত্য’ রাইমোহনের সঙ্গেও তিনি প্রমিত বাংলায় কথা বলতেন। চট্টগ্রামে জন্ম ও শৈশবসহ জীবনের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সময় বাস করা সত্তে¡ও, কলকাতায় তাঁর যৌবনের শিক্ষা ও প্রাথমিক কর্মজীবনে আয়ত্ত করা বিশুদ্ধ কলকাত্তাই টানের প্রমিত বাংলায় কথা বলার অভ্যাসটা কখনও ছাড়েননি। তাঁ কথার ঢঙে কলকাতার সারস্বত জীবনের আভাস পাওয়া যেতো, যদিও তা তাঁর বাচনভঙ্গীতে একটু বাড়তি কমনীয়তা যোগ করেছিল। চট্টগ্রামের কোনো এক ছড়াকার তাঁর বাচনভঙ্গী নিয়ে একটু রসিকতার ছলে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী অনুজ কবি-ছড়াকার-প্রাবন্ধিক অজয় দাশগুপ্ত লিখেছিল: ‘গরম গরম জিলিপি ভেজেছিস খুব তো! / বললেন অরুণ দাশগুপ্ত।’ এখানে অরুণদার কথা বলার ধরনটা অবিকল ফুটে উঠেছে।

অরুণ দাশগুপ্ত মারা যাওয়ার পর তাঁর বয়ঃকনিষ্ঠ ভক্ত অনুরাগী সহকর্মী কবি-লেখকরা, যাঁদের লেখা তিনি দিনের পর দিন তাঁর পাতায় ছাপিয়ে গেছেন, তাঁর বহু সন্দেশ-শিঙাড়া-জিলাপি-চা যাদের পেটে গেছে, তাঁদের কেউ কেউ অনন্ত মহিমারোপ করে তাঁকে বৃক্ষের মগডালে তুলছে, যেহেতু বিদেহী তাঁর এখন আছড়ে পড়ে হাড়গোড় ভাঙার আশঙ্কা নেই। তাঁকে বলা হচ্ছে একাধারে কবি, দার্শনিক, গবেষক, বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবী, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ, আরো বহু কিছু। এতই যদি গুণী মানুষ হন, তাহলে অরুণ দাশগুপ্ত, বা সেইসঙ্গে সিদ্দিক আহমদ, সুচরিত চৌধুরী, ওয়াহিদুল আলমেরা বেঁচে থাকতে কেন আমাদের সরকার, বাংলা একাডেমির চোখেই পড়লেন না? বহু সুউচ্চ পাহাড়-পর্বত চোখে না পড়লেও, অনেক উইয়ের ঢিবি দেখি ঠিকই তাদের প্রসন্ন নয়নে পড়ে গিয়ে বকশিস টঙ্কা, বকশিস ফুর্তি দুটোই পেয়ে যায়। এ এক গভীর রহস্য বটে!

যেটা বলছিলাম– হয়তো স্বভাবে প্রকৃতি ভাবটা বেশি হওয়ার কারণেই, কিংবা একধরনের উদাসীনতার ফলে, অরুণ দাশগুপ্ত জীবনে পাওয়ার অনেককিছুই পাননি, আর জন্মসূত্রে পাওয়া অনেককিছুই হারিয়েছেন। জমিদার পরিবারের সন্তান হওয়ার সূত্রে চট্টগ্রাম শহরে আর গ্রামাঞ্চলে তাঁদের বিস্তর জমিজিরেত ছিল, দেখভালের অভাবে যার সিংহভাগই হস্তচ্যুত হয়েছে। অরুণদা সেগুলোর দিকে কখনো ফিরেও তাকাননি। পরের বাড়ি, পরের ঘরকে নিজের করে নিয়ে একধরনের নিঃস্পৃহ নির্ঝঞ্ঝাট শান্তিপ্রিয় জীবন কাটিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর নিজের পরিবার ছিল না, কিন্তু তিনি নিঃসঙ্গ কখনোই ছিলেন না। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা মানুষ ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। তাঁর ঘরের দুয়ার আক্ষরিক অর্থেই সর্বক্ষণ সবার জন্যে উন্মুক্ত থাকত।

অরুণদা কেন বিয়েশাদি করলেন না, সেও এক অদ্ভুত ব্যাপার। একজন এলিজিবর ব্যাচেলরের সব গুণ তাঁর মধ্যে ছিল। নারী ভক্ত অনুরাগিণীর সংখ্যাও কম ছিল না। চাইলেই তাঁদের কাউকেও জীবনসঙ্গিনী করতে পারতেন। মাসী প্রণতি সেনের মতো তাঁর জীবনেও কোনো ব্যর্থ প্রেমের কাহিনী আছে– এমনটাও শুনিনি। তবুও তিনি বিয়ে করলেন না। করছি করবো করেই জীবনটা কাটিয়ে দিলেন গদাই লস্করি চালে, হেলাফেলায়।


অরুণদার রাজনীতিক কাকা দীনেশ দাশগুপ্ত বুদ্ধিজীবী এবং সুসাহিত্যিক হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। কলকাতায় গিয়ে যে বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, সেই কালাধন ইনস্টিটিউশানের প্রধান শিক্ষক যিনি ছিলেন, সত্যপ্রিয় রায়, যিনি একসময় চট্টগ্রামের নোয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ফলে চট্টগ্রাম তথা চট্টগ্রামীদের সাথে তাঁর একটা পূর্বপরিচয় ছিল। শিক্ষক হিসাবে সত্যপ্রিয় বাবুর নামডাক আর চট্টগ্রামের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সূত্র ধরেই তাঁর বিদ্যালয়ে বালক অরুণকে ভর্তি করা হয়েছিল। এই সত্যপ্রিয় রায় পরে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হন। পরে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ ও বিশ^ভারতীতে অধ্যয়নকালে তিনি আচার্য সুকুমার সেন, কথাশিল্পী প্রমথনাথ বিশী এবং আরো বহু মনস্বী শিক্ষক ও বিদগ্ধজনদের সংস্পর্শে আসেন। সব মিলে বিগত বিংশ শতকের ষাটের ও সত্তরের দশকের কলকাতায় শিল্প সাহিত্য সঙ্গীত রাজনীতির এক পরাবলয়ে অরুণ দাশগুপ্তের যে মানসলোক ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তা তিনি আমৃত্যু সযত্নে বয়ে বেড়িয়েছেন– বসনে-ভূষণে, চলনে বলনে সর্বক্ষেত্রেই। তবে সেইসঙ্গে তিনি মিশিয়ে দিয়েছিলেন জন্মসূত্রে পাওয়া কিছু চট্টগ্রামী সৌজন্য ও সংস্কৃতি। কবিভাস্কর শশাঙ্কমোহন সেন, অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাস্টারদা সূর্য সেনের কিশোর সহযোদ্ধা, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ সুলেখক পূর্ণেন্দু দস্তিদার প্রমুখের স্মৃতিধন্য ধলঘাট গ্রামের সন্তান অরুণ দাশগুপ্ত চট্টগ্রামের একসময়কার প্রচলিত ভদ্রজনোচিত সংস্কৃতি-সৌজন্যের পরাকাষ্ঠার বলতে গেলে শেষ প্রতিভূ হিসেবেই জীবন কাটিয়ে গেছেন।

অরুণ দাশগুপ্তকে আমি যতটুকু দেখেছি, জেনেছি, তাতে তাঁকে আমার একজন কবি, দার্শনিক ইত্যাদির চেয়ে বরং প্রবলভাবে মানবঘনিষ্ঠ, মানবিক গুণাবলীতে ভরপুর একজন পরিপূর্ণ মানুষ বলেই মনে হয়েছে। অর্থসম্পদ, নারী-বাড়ি-গাড়ি, নাম-যশ কিছুই অরুণ দাশগুপ্তের কাম্য ছিল বলে মনে হয় না। তাঁকে শুধু আমার মানুষের অক্লান্ত সঙ্গপিপাসুই মনে হয়েছে। এমন অহোরাত্র মানবসঙ্গ করতে আমি আর কাউকে দেখিনি। গৃহাগতদের আপ্যায়নে তিনি ছিলেন সদাপ্রস্তুত। কিছু পানাহার না করে তাঁর ওখান থেকে কারো আসার কোনো কোনো উপায় ছিল না।

চট্টগ্রামে সবার জন্যে গৃহের ও হৃদয়ের এমন অবারিত আর কোনো দ্বার কখনো পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। অরুণ দাশগুপ্তের মৃত্যুর, কিংবা তারও আগে এ শহর থেকে চিরবিদায় নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। বিংশ শতকের শেষ তিন দশক আর একবিংশ শতকের প্রথম দুদশক– এই অর্ধশতাব্দীকালে চট্টগ্রাম শহরে অরুণ দাশগুপ্ত-কেন্দ্রিক এক স্বীকৃতিহীন, পুরস্কারহীন আর সম্পূর্ণ অপ্রাতিষ্ঠানিক অধ্যায়ে চিরযবনিকা নেমে এসেছে আমাদের অনেকের অজান্তেই, যার বিকল্প গড়ে তোলার কোনো নায়ককে এ শহর হয়তো আর খুঁজে পাবে না।

#####

You must be logged in to post a comment.