শেষ স্যাল্যুট


এই কাশ্মীর যুদ্ধটাও ছিলো অদ্ভুত ধরনের। সুবাদার রব নওয়াজের মেজাজ এমন একটা বন্দুকের মতো হয়ে গিয়েছিলো, যেটার ঘোড়া (ট্রিগার) খারাপ হয়ে গেছে।
বিগত মহাযুদ্ধে সে কয়েকটি রণক্ষেত্রে লড়াই করেছে। তখন সে মারতে আর মরতে জানতো। ছোট-বড় সব অফিসারের দৃষ্টিতে তার প্রতি বড় সম্মান ছিলো, কারণ সে ছিলো বড় বাহাদুর, নির্ভীক আর সমঝদার সেপাই। প্লাটুন কম্যান্ডার সব কঠিন কাজ সবসময় তারই হাতে তুলে দিতো আর তাদের দেয়া দায়িত্ব সে সুচারুভাবে সম্পন্ন করতো।
কিন্তু এই কাশ্মীর যুদ্ধের ধরনটাই কেমন আলাদা! শুরুতে মনে বড় উৎসাহ, বড় জোশ ছিলো। ক্ষুধা-তৃষ্ণার পরোয়া না করে লক্ষ্য ছিলো কেবল একটাই– দুশমনদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। কিন্তু ওদের মুখোমুখি হলেই চেনাজানা চেহারা চোখে পড়তো। কিছু বন্ধুকে দেখতে পেতো, বড় অন্তরঙ্গ রকমের বন্ধু, যারা গত মহাযুদ্ধে তার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, ঐক্যবদ্ধভাবে দুশমনদের সঙ্গে লড়েছে, অথচ এখন তার জান নেয়ার জন্যে তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠেছে।
সুবাদার রব নওয়াজ ভাবছিলো, এগুলো সব স্বপ্ন না তো! বিগত মহাযুদ্ধের সেই ঘোষণা। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়া, উচ্চতা আর ছাতির মাপ নেয়া, পি টি, চাঁদমারি, আর তারপর যুদ্ধক্ষেত্র। ওখান থেকে এখানে, এখান থেকে ওখানে, অবশেষে যুদ্ধের সমাপ্তি। তারপর একেবারে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা আর কাশ্মীর যুদ্ধ। একের পর এক কত ঘটনা! রব নওয়াজ ভাবতো, যারা এসব করেছে বুঝেশুনেই করেছে, যাতে অন্যেরা বিভ্রান্ত হয়ে গিয়ে কিছু বুঝতে না পারে। না হয় এটা কি একটা কথা হলো যে, এত চটজলদি এত বড় একটা পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলা হলো!
এতটুকু তো রব নওয়াজ বুঝতে পারতো যে, সে লড়ছে কাশ্মীর জয়ের জন্যে। কাশ্মীর কেন জয় করতে হবে, সেটাও সে ভালোই বুঝতো। করতে হবে এ জন্যে যে, পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্যে কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্তিটা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বন্দুকের নিশানা ঠিক করতে গিয়ে যখন কোনো চেনাজানা চেহারা চোখে পড়ে যেতো, তখন সে কিছুক্ষণের জন্যে ভুলে যেতো কোন্ প্রয়োজনে লড়াই করছে, কী উদ্দেশ্যেই-বা বন্দুক উঠিয়েছে। সম্ভবত সে এজন্যেই ভুলতো যে, ও যে এখন শুধু বেতন, ভূমি আর পদকের জন্যে নয়, বরং নিজের দেশের জন্যে লড়ছে, এটা তাকে নিজেকেই বার বার মনে করিয়ে দিতে হতো।
এ দেশ আগে থেকেই তার দেশ ছিলো। সে এ এলাকারই বাসিন্দা, যেটা এখন পাকিস্তানের একটা অংশে পরিণত হয়েছে। এখন তাকে নিজের সেই স্বদেশীয়দের বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছিলো, যারা একদিন তার ছায়াসহচর ছিলো, যাদের খানদানের সঙ্গে তার খানদানের অব্যাহত সম্পর্ক ছিলো পুরুষানুক্রমিক।
এখন যেটা ওদের দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানকার জল পর্যন্ত তারা আগে কখনও খায়নি। অথচ এখন এরই জন্যে তাদের কাঁধে একদম বন্দুক চাপিয়ে দিয়ে হুকুম দেয়া হয়েছে, যাও, এই যে জায়গাটা যেখানে তুমি তোমার ঘরের জন্যে এখনও পর্যন্ত দুটো ইটও বেছে নাও নি, যার জল আর হাওয়ার স্বাদ এখনও তোমার মুখে ঠিকমতো বসে নি, এটাই তোমার দেশ… যাও, এর জন্যে পাকিস্তানের সঙ্গে লড়ো… সেই পাকিস্তানের সঙ্গে, যার সুপ্রশস্ত হৃদয়ে তুমি নিজের জীবনের এতগুলো বছর কাটিয়েছো।
রব নওয়াজ মনে করতো, এই একই অনুভব ওই মুসলমান সৈনিকদের মধ্যেও আছে, যারা হিন্দুস্তানে নিজেদের ঘর-বার সব ছেড়ে এখানে এসেছে। ওখানে তাদের সবকিছু কেড়ে নেয়া হয়েছিলো, এখানে এসে তাদের আর কিছু তো মেলে নি। অবশ্য বন্দুক মিলেছে। ওই একই ওজনের, একই চেহারার, একই মার্কা আর ছাপের।
আগে সবাই মিলে এমন এক শত্রুর সঙ্গে লড়তো, যাদেরকে তারা পেট আর পুরস্কার-অনুগ্রহের খাতিরে নিজেদের শত্রু বলে গণ্য করে নিয়েছিলো। এখন তো নিজে নিজেই তারা দু ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আগে সবাইকে হিন্দুস্তানী সৈন্য বলা হতো। এখন এক দল পাকিস্তানী আর আরেক দল হিন্দুস্তানী। ওধারে হিন্দুস্তানে মুসলমান হিন্দুস্তানী সৈনিকেরাও ছিলো।
রব নওয়াজ যখন ওদের ব্যাপারে ভাবতো, তার মাথার ভেতরে এক অদ্ভুত ধরনের গোলমালের মতো সৃষ্টি হতো। আর যখন সে কাশ্মীরের ব্যাপারে ভাবতো তো তার মাথা পুরো জবাব দিয়ে দিতো…
পাকিস্তানী সৈন্যেরা কাশ্মীরের জন্যে লড়ছে, নাকি কাশ্মীরের মুসলমানদের জন্যে? যদি তাদেরকে কাশ্মীরের মুসলমানদের জন্যেই লড়াই করানো হয়ে থাকে, হায়দরাবাদ আর জুনাগড়ের মুসলমানদের জন্যে তো করানো হচ্ছে না! আর এ যুদ্ধ যদি খাঁটি ইসলামী যুদ্ধ হয়ে থাকে তবে দুনিয়ার অন্যান্য ইসলামী দেশগুলো এতে যোগ দিচ্ছে না কেন?
অনেক ভাবনা-চিন্তার পর রব নওয়াজ এখন এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, এসব সূক্ষ্ম-জটিল চিন্তাভাবনা সৈনিকদের না করাই উচিত। ওদের জ্ঞান-বুদ্ধি মোটা ধরনের হওয়া উচিত, কারণ মোটা বুদ্ধির মানুষেরাই ভালো সৈনিক হতে পারে। কিন্তু তারপরও স্বভাববশে কখনো কখনো চোরা মনে ওসব কথা ভাবতো আর পরে নিজের এই আচরণের জন্যে খুব হাসতো।
কিশনগঙ্গা নদীর পাড় দিয়ে মুজাফফরাবাদ থেকে করণ পর্যন্ত চলে যাওয়া সড়কটির জন্যে কিছুদিন ধরে লড়াই চলছিলো… অদ্ভুত ধরনের লড়াই। রাতে আশেপাশের পাহাড়গুলো কয়েক দফা প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠতো ফায়ারিং নয়, বরং খারাপ খারাপ গালিগালাজের আওয়াজে।
সুবাদার রব নওয়াজ একবার রাতের বেলা শত্রু শিবিরে চোরাগোপ্তা হামলা চালানোর জন্যে তৈরি হচ্ছিলো। এমন সময় দূরে নিচের খাদ থেকে গালাগালির একটা শোরগোল উঠলো। প্রথমে তো সে ঘাবড়েই গেলো। মনে হচ্ছিলো, যেন অনেক ভ‚ত-প্রেত মিলে নাচছে আর জোরে জোরে অট্টহাসি হাসছে। সে বিড়বিড় করে বললো, “শালার শুয়োরের লেজ… এসব কী হচ্ছে!”
একজন জওয়ান প্রতিধ্বনিত হতে থাকা আওয়াজগুলোর দিকে মুখ ফিরিয়ে খুব কষে গালাগাল দিলো। তারপর রব নওয়াজকে বললো, “সুবাদার সাহেব, গালাগাল দিচ্ছে। আমার মায়ের নাং।”
রব নওয়াজ গালাগালগুলো শুনছিলো, যেগুলো ছিলো মাথা ভীষণ গরম করে দেয়ার মতো। তার ইচ্ছে হলো, সেও তোড়ে গালাগাল শুরু করে দেয়, কিন্তু সেটা করা ভুল কাজ হবে ভেবে চুপ করেই রইলো। ওই জওয়ানটাও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, কিন্তু জল মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেলে পর সেও গলা ফাটিয়ে গালি ছুঁড়ে দেয়া শুরু করে দিলো। এ ধরনের লড়াই রব নওয়াজের জন্যে ছিলো একেবারেই নতুন জিনিস।
জওয়ানদের সে দু-তিনবার বললো চুপ করতে, কিন্তু নিচে থেকে আসা গালিগুলো এমন ধরনের ছিলো, যেগুলোর জবাব না দিয়ে থাকা যায় না।
শত্রুসৈন্যদের চোখে দেখা যাচ্ছিলো না। রাতের আঁধারে তো বটেই, দিনের বেলাতেও ওদেরকে দেখা যেতো না। শুধু ওদের গালাগালগুলো নিচে পাহাড়গুলোর পায়ের কাছ থেকে উঠতো আর পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে বাতাসে মিশে যেতো।
রব নওয়াজের প্লাটুনের জওয়ান যখন ওই গালিগুলোর জবাব দিতো, তার মনে হতো ওগুলো নিচে যাচ্ছে না, ওপরে উড়ে যাচ্ছে। এতে তার খুব দুঃখ হতো। তাই তিতিবিরক্ত হয়ে সে আক্রমণ করার হুকুম দিয়ে দিলো।
ওখানকার পাহাড়গুলোকে এক অদ্ভুত ব্যাপার রব নওয়াজের চোখে পড়ছিলো। কিছু পাহাড়ে চড়াইয়ের দিকে বৃক্ষ আর ঝোপঝাড়ে ভর্তি থাকে আর উৎরাইয়ের সময় সম্পূর্ণ গাছপালাহীন, কাশ্মীরী বন্ধুদের টাকমাথার মতো। আবার কোনো পাহাড়ে চড়াইয়ের দিকটা বৃক্ষহীন আর উৎরাইয়ের দিকে শুধু বৃক্ষ আর বৃক্ষ। লম্বা আর মোটা মোটা চীড় (পাইন) গাছগুলোর বিলি করা সুতোর মতো দেখতে পাতাগুলোর ওপর দিয়ে হাঁটার সময় ফৌজি বুট পিছলে যেতো।
যে-পাহাড়টার ওপর সুবাদার রব নওয়াজের প্লাটুন ছিলো, ওটার উৎরাইয়ে গাছপালা আর ঝোপঝাড় ছিলো অচিন্তনীয় রকমের। স্পষ্টতই, হামলা চালানোটা খুবই বিপজ্জনক হবে, কিন্তু সব জওয়ান খুশিমনে প্রস্তুত ছিলো এ হামলার জন্যে। গালাগালির বদলা নিতে তারা একেবারে অধৈর্য হয়ে পড়েছিলো।
হামলা চালানো হলো এবং এতে তারা সফলও হলো। প্লাটুনের দুজন জওয়ান মারা গেলো, চারজন জখম হলো। শত্রæপক্ষের তিনজনের মৃতদেহ মাটিতে পড়ে রইলো, বাকিরা পালালো রসদের কিছু জিনিসপত্র ফেলে রেখে।
সুবাদার রব নওয়াজ আর তার প্লাটুনের জওয়ানদের বড় একটা দুঃখ রয়ে গেলো যে, শ পক্ষের কোনো জ্যন্ত সেপাই তাদের হাতে এলো না, যাতে ওদেরকে খাতিরদারি করে গালি দেয়ার মজাটা চাখানো যায়। তবে এ মোকাবেলাটায় জয়ী হওয়ার পর একটা গুরুত্বপূর্ণ পাহাড় তাদের দখলে চলে এলো।
নিজেদের এই হামলার ফলাফল সুবাদার রব নওয়াজ তৎক্ষণাৎ ওয়্যারলেসে প্লাটুন কমান্ডার মেজর আসলামকে জানিয়ে দিয়ে সাবাশী আদায় করে নিলো।
ধরতে গেলে প্রায় প্রতিটি পাহাড়ের চ‚ড়ায় জলের একটা পুকুরের মতো হয়ে থাকে। এ পাহাড়েও একটা পুকুর ছিলো, কিন্তু সেটা অন্যান্য পাহাড়ের পুকুরের তুলনায় অনেক বড়। এটার জল খুবই পরিষ্কার আর স্বচ্ছ ছিলো। আবহাওয়াটা তখন খুবই ঠান্ডা ছিলো, কিন্তু তারপরও সবাই স্নান করে নিলো। ঠকঠক করে সবার দাঁতে তাঁতে ঠোকাঠুকি হচ্ছিলো, কিন্তু কেউ তার পরোয়া করলো না। ওরা যখন স্নানানন্দে মশগুল, তখনই ফায়ারের শব্দ শোনা গেলো। উলঙ্গ অবস্থাতেই সবাই মাটিতে শুয়ে পড়লো।
কিছুক্ষণ পর সুবাদার রব নওয়াজ খাঁ চোখে দুরবিন লাগিয়ে নিচে পাহাড়ের ঢালুর দিকে চোখ বোলাতে থাকলো, কিন্তু শত্রুদের লুকিয়ে থাকার জায়গাটা সে দেখতে পেলো না।
ও এভাবে দেখতে দেখতেই আরেকটা ফায়ার হলো। তার পরপরই সে দেখতে পেলো, দূরের উৎরাইয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট একটা পাহাড়ের ঢাল থেকে ধোঁয়া উঠছে। সাথে সাথেই সে তার জওয়ানদের ফায়ার শুরুর হুকুম দিলো। ওধার থেকে দমাদম ফায়ার হতে লাগলো। তার জবাবে এধার থেকেও গুলির পর গুলি চলতে লাগলো।… সুবাদার রব নওয়াজ দুরবিন দিয়ে দুশমনদের পজিশন খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলো।
ওরা সম্ভবত বড় বড় পাথরের একটা প্রাকারের পেছনে সুরক্ষিত ছিলো। কিন্তু এই সুরক্ষা দানকারী প্রাকারটা ছিলো খুবই ছোট। বেশিক্ষণ ওরা ওখানে টিকে থাকতে পারতো না। ওদের মধ্যে থেকে যারাই এধার ওধার যাওয়ার চেষ্টা করবে, তাদেরই সুবাদার রব নওয়াজের নিশানায় আসা নিশ্চিত ছিলো।
কিছুক্ষণ পর্যন্ত ফায়ার হতে লাগলো। এর পর রব নওয়াজ তার জওয়ানদের বেকার গুলি খরচ করতে বারণ করে বললো শুধু তাক করে থাকতে। যখনই শত্রæপক্ষের কোনো সৈনিক পাথরের প্রাকারের পেছন থেকে বেরিয়ে এধারে বা ওধারে যাওয়ার চেষ্টা করবে, তাদের যেন উড়িয়ে দেয়া হয়।
এ হুকুম দিয়ে সে নিজের খাড়া উলঙ্গ দেহটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো, “ শালার শুয়োরের লেজ… কাপড়চোপড় ছাড়া মানুষকে দেখতে জানোয়ারের মতো লাগে।”
লম্বা লম্বা বিরতির পর পর শত্রুপক্ষের দিক থেকে একটা দুটো করে ফায়ার হতে লাগলো। এদিক থেকেও কখনো কখনো জবাব দেয়া হতে লাগলো। এই খেলা চালু রইলো পুরো দুদিন ধরে।… হঠাৎ আবহাওয়া খুবই ঠান্ডা হয়ে গেলো। এমনতরো ঠান্ডার দিনে রক্তও জমে গিয়ে বরফ হয়ে যায়, তাই সুবাদার রব নওয়াজ চায়ের ব্যবস্থা করানো শুরু করে দিলো।
সারাক্ষণ আগুনের ওপর চায়ের কেতলি বসানোই থাকতো। ঠান্ডা যখনই বেশি কষ্ট দিতো, এক দফা এই গরম গরম পানীয়ের ব্যবস্থা হয়ে যেতো। ওদিকে দুশমনদের ওপর বরাবর চোখ রাখা হচ্ছিলো। একজন সরলে, তার জায়গায় দুরবিন হাতে বসে যাচ্ছিলো আরেকজন।
হাড় পর্যন্ত সেঁধিয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাস বইছিলো। যে জওয়ানটা পাহারায় ছিলো সে যখন বললো যে, পাথরের ঘেরাটার পেছনে কোনো গড়বড় হচ্ছে, সুবাদার রব নওয়াজ তার কাছ থেকে দুরবিন নিয়ে ভালোভাবে ঠাহর করে দেখলো।
কোনো গোলমেলে ব্যাপার তার নজরে পড়লো না, কিন্তু ঠিক তখনই এক জোর চিৎকার শোসা গেলো আর তার প্রতিধ্বনি আশেপাশের পাহাড়গুলোতে। এর অর্থ কী, রব নওয়াজ বুঝতে পারলো না, তবে ারে জবাবে সে নিজের বন্দুক দেগে দিলো।
গুলির আওয়াজের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে আসার পর ওধার থেকে আবারও জোর চিৎকার শোনা গেলো, যেটা স্পষ্টত তার উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছিলো। রব নওযাজও চেঁচিযে বললো, “শুয়োরের লেজ কোথাকার। বল্, তুই কী বলতে চাস!”
দু পক্ষের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি ছিলো না। রব নওয়াজের কথা শত্রæপক্ষের কাছে পৌঁছে গেলো, কারণ ওধার থেকে কে যেন বললো, “গালি দিস না ভাই।”
রব নওয়াজ নিজের দলের জওয়ানদের দিকে তাকালো, আর বড় বিভ্রান্ত আর তাজ্জব হয়ে হয়ে বললো, “ভাই…?” তারপর সে নিজের মুখের সামনে দুই হাত জড়ো করে চোঙা বানিয়ে চিৎকার করে বললো, “ভাই না, তোর মায়ের লোক… এখানে সব তোর মায়ের নাং!”
একেবারে ওপাশ থেকে একটা মনে আঘাত পাওয়া আওয়াজ শোনা গেলো, “রব নওয়াজ!”
রব নওয়াজ কেঁপে উঠলো।… এ আওয়াজ আশেপাশের পাহাড়গুলোর গায়ে টক্কর খেতে খেতে বিভিন্নভাবে পুনরাবৃত্ত হতে হতে অবশেষে কোথায় জআন উড়ে গেলো রক্তকে জমিয়ে দেয়া ঠান্ডা হাওয়ার সাথে।
রব নওয়াজ অনেকক্ষণ পর চমকে উঠে ভাবলো, “কে ছিলো এটা?” তারপর সে আস্তে আস্তে বিড়বিড় করে বললো, “শুয়োরের লেজ কোথাকার!”
তার এতটুকু জানা ছিলো যে, টেটওয়ালের যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রপক্ষের সেপাইরা সবাই ৬/৯ রেজিমেন্টের। ও নিজেও একসময় ওই রেজিমেন্টেই ছিলো। কিন্তু এই আওয়াজটা কার ছিলো?
ও এমন অগুনতি লোককে চিনতো, যারা একসময় তার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলো। এমনও কেউ কেউও ছিলো, যাদের সাথে ছিলো তার শত্রæতা। কিন্তু এটা কে ছিলো, যে তার গালাগালকে মন্দ মনে করে চেঁচিয়ে তাকে ডাক দিয়েছে?
রব নওয়াজ দুরবিন তাক করে দেখলো, কিন্তু পাহাড়ের দুলতে থাকা ঝোপঝাড়ের মধ্যে কাউকে চোখে পড়লো না। দু হাতের চোঙা বানিয়ে সে তার আওয়াজ জোরে ওধারে ছুঁড়ে দিলো, “কে কথা বলছিলে…? আমি রব নওয়াজ বলছি… রব নওয়াজ… রব নওয়াজ।”
এই রব নওয়াজও কিচুক্ষণ ধরে পাহাড়গুলোতে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো। রব নওয়াজ বিড়বিড় করে বললো, “ শালা শুয়োরের লেজ!”
সাথে সাথেই ওধার থেকেও জোর আওয়াজ এলো, “আমি বলছি… আমি রাম সিংহ!”
এটা শুনে রব নওয়াজ এমনভাবে লাফিয়ে উঠলো, যেন উড়াল দিয়ে ওধারে চলে যেতে চায়। প্রথমে সে নিজেকে নিজে বললো, “রাম সিংহ?” তারপর গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, “রাম সিংহ…? ওরে রাম সিন্ধা… ওরে বেটা শুয়োরের লেজ!”
শুয়োরের লেজ পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেতে খেতে পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই ফাটা ফাটা গলায় রাম সিংহের জোর চিৎকার শোনা গেলো, “ওরে কুমোরের চাক!”
রব নওয়াজ নাক দিয়ে ঘোঁত ঘোঁত আওয়াজ করতে লাগলো। ঘাড় বেঁকিয়ে বড় বড় চোখ করে জওয়ানদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো, “বকছে… বেটা শুয়োরের লেজ!” তারপর সে রাম সিংহকে জবাব দিলো, “ওরে বাবা পেরেশানির কড়াই প্রসাদ… ওরে শুয়োরের গুঁতো!”
রাম সিংহ বেদম অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। রব নওয়াজও জোরে জোরে হাসতে লাগলো। এই আওয়াজগুলো পাহাড়ে পাহাড়ে যেন এক খেলার মতোই একে অপরের দিকে লাফিয়ে পড়ছিলো… সুবাদার রব নওয়াজের জওয়ানরা তখন চুপ করে ছিলো।
হাসাহাসির পালা যখন শেষ হলো, ওধার থেকে রাম সিংহের আওয়াজ জোরালো হলো, “দেখো দোস্ত, আমাদেরকে চা খেতে হবে।”
রব নওয়াজ বললো, “খাও… আয়েশ করো।”
রাম সিংহ চেঁচালো, “আরে আয়েশ করবো কী করে… আমাদের জিনিসপত্র সব তো ওপাশে পড়ে আছে!”
রব নওয়াজ জিজ্ঞেস করলো, “কোন্ পাশে?”
রাম সিংহের আওয়াজ এলো, “ওপাশে… যেপাশে তোমাদের ফায়ার আমাদের উড়িয়ে দিতে পারে।”
রব নওয়াজ হাসলো, “তো কী চাও তুমি… বেটা শুয়োরের লেজ!”
রাম সিংহ বললো, “আমাদের জিনিসগুলো নিয়ে আসতে দে।”
“যা নিয়ে আয়!” এই বলে রব নওয়াজ তার জওয়ানদের দিকে তাকালো।
রাম সিংহের শঙ্কাভরা আওয়াজ শোনা গেলো, “তুই গুলি করে উড়িয়ে দিবি, বেটা কুমোরের চাক্কি!”
রব নওয়াজ চটে গিয়ে বললো, “বাজে বকিস না, বেটা সন্তোষ দিঘির কাছিম!”
রাম সিংহ হাসলো, “কসম খেয়ে বল্, মারবি না!”
রব নওয়াজ জিজ্ঞেস করলো, “কার নামে কসম খাবো?”
রাম সিংহ বললো, “যার নামেই হোক খেয়ে নে!”
রব নওয়াজ হাসলো, “আ বে যা… নিজেদের জিনিসপত্তর নিয়ে আয় গে যা।”
কয়েক মুহূর্ত সব চুপচাপ। দুরবিনটা ছিলো একজন জওয়ানের হাতে। সে অনুমতি চাওয়ার চোখে রব নওয়াজের দিকে তাকালো। বন্দুক সে চালিয়েই দিতো, কিন্তু রব নওয়াজ তাকে বারণ করে দিলো, “না… না!”
তারপর রব নওয়াজ দুরবিন নিয়ে নিজেই দেখলো। একজন লোক হাতের থাবার সাহায্যে পাথরগুলোর পেছন থেকে বেরিয়ে এসে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো। কিছুদূর এভাবে গিয়ে সে উঠে দাঁড়ালো আর তারপর টেনে দৌঁড় দিয়ে কিছু দূরের ঝোপগুলোর মধ্যে গায়েব হয়ে গেলো। দু মিনিট বাদে সে ফিরে এলে দেখা গেলো, তার হাতে কিছু জিনিসপত্র রয়েছে।
এক পলকের জন্যে থামলো সে। ফের জোর ছুট লাগালে রব নওয়াজ বন্দুক চালিয়ে দিলো। গুড়–ম আওয়াজের সাথেই জোরদার হলো রব নওয়াজের অট্টহাসি। শব্দ দুটো মিলে কিছুক্ষণ পর্যন্ত ঝনঝন করতে লাগলো। তারপর এলো রাম সিংহের আওয়াজ, “থ্যাঙ্ক ইউ।”
“নো মেনশন।” এই বলে রব নওয়াজ জওয়ানদের দিকে তাকালো, “এক রাউন্ড হয়ে যাক।”
হাসি-তামাসার মধ্যেই দুদিক থেকে গুলি চলতে লাগলো। আবার চুপচাপ হয়ে গেলো সব। রব নওয়াজ দুরবিন দিয়ে দেখলো, পাহাড়ের দুলতে থাকা ঝোপঝাড়ের মধ্যে থেকে ধোঁয়া উঠছে। সে চিৎকার করে বললো, “চা তৈরি শেষ হলো, রাম সিন্ধা?”
“এখনো কোথায় হলো রে বেটা কুমোরের চাক্কি!”
রব নওয়াজ জাতে ছিলো কুমোর। এ ব্যাপারে কেউ কোনো ইশারা-ইঙ্গিত করলে গোস্সায় তার রক্ত টগবগ করতে থাকতো। শুধুমাত্র রাম সিংহের মুখ থেকে সে এসব সহ্য করে নিতো, যেহেতু সে ছিলো তার অভিন্নহৃদয় বন্ধু।
একই গাঁয়ের জল-মাটি-হাওয়ায় তারা বেড়ে উঠেছে। দুজনের বয়সের মধ্যে মাত্র অল্প কটি দিনের ফারাক। দুজনেরই বাপেরা, আবার বাপদের বাপেরাও ছিলো পরস্পরের বন্ধু। একই স্কুলে তারা প্রাইমারি পর্যন্ত পড়েছে, একই দিনে সেনাবাহিনীকে ভর্তি হয়েছে আর বিগত মহাযুদ্ধে কয়েকটি রণক্ষেত্রে একসঙ্গে লড়েছে।
রব নওয়াজ তার জওয়ানদের চোখে তার নিজের একটু হালকা হয়ে যাওয়াটা অনুমান করে বিড়বিড়োলো, “শালার শুয়োরের লেজ… এখনও শেষ করতে পারলি না!” ফের সে রাম সিংহের দিকে মুখ তুলে চেঁচালো, “বাজে বকিস না, বেটা প্যাঁচের উকুন!”
রাম সিংহের অট্টহাস্য জোরদার হলো। রব নওয়াজ এমনিতে বন্দুক তাক করে বসেছিলো। হঠাৎ যেন খেলার ছলেই সে ট্রিগার চেপে দিলো। বন্দুকের গুড়ুম শব্দের সাথে সাথে এক আকাশ ফাটা আর্তনাদ শোনা গেলো। রব নওয়াজ সঙ্গে সঙ্গে চোখে দুরবিন লাগিয়ে দেখলো যে, একজন লোক, আরে না, রাম সিংহ পেট চেপে ধরে পাথরের জাঙাল থেকে কিছুটা সরে গিয়ে দুভাঁজ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলো।
রব নওয়াজ প্রচণ্ড জোরে চেঁচিয়ে উঠলো, “রাম সিংহ…!” আর লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। সাথে সাথেই ওধার থেকে তিন বার ফায়ার হলো। একটা গুলি রব নওয়াজের ডান বাহু চেটে দিয়ে বেরিয়ে গেলো। সাথে সাথেই সে মাটিতে পড়ে গেলো উপুড় হয়ে।
এখন দুদিক থেকেই ফায়ার শুরু হয়ে গেলো। ওপাশে কয়েকজন সেপাই এই গোলমালের সুযোগে পাথরগুলোর পেছন থেকে বেরিয়ে গিয়ে পালাতে চাইলো। এদিক থেকে গুলি চলছিলো, কিন্তু ওধারে নিশানায় কেউ বসে ছিলো না। রব নওয়াজ তার জওয়ানদের নিচে নামার হুকুম দিলো। তিনজন সাথে সাথেই মারা পড়লো, তবে ঝরে পড়া পাতার মতো বাকি জওয়ানরা অন্য পাহাড়টায় পৌঁছে গেলো।
রাম সিংহ রক্তে মাখামাখি হয়ে পাথুরে জমির ওপর পড়ে গোঙাচ্ছিলো। গুলি লেগেছিলো তার পেটে। রব নওয়াজকে দেখে তার চোখ চকচক করে উঠলো। মুচকি হেসে বললো সে, “ওরে বেটা কুমোরের চাক, এটা তুই কী করে বসলি?”
রাম সিংহের জখম নিজের পেটে অনুভব করছিলো রব নওয়াজ, কিন্তু তারপরও সে হেসে রাম সিংহের ওপর ঝুঁকে পড়লো আর হাঁটু গেড়ে বসে কার পেটি খুলতে লাগলো, “শালা শুয়োরের লেজ। তোমাকে বাইরে বেরিয়ে আসতে কে বলেছিলো!”
পেটিটা খুলে নেয়ার সাথে সাথেই রাম সিংহের ভীষণ কষ্ট হতে লাগলো। যন্ত্রণায় সে চেঁচাতে লাগলো। পেটি খুলে ফেলার পর রব নওয়াজ রাম সিংহের চোটটা পরীক্ষা করে দেখলো ওটা খুবই মারাত্মক। রাম সিংহ রব নওয়াজের হাত চেপে ধরে বললো, “আমি নিজেকে দেখানোর জন্যে বাইরে বেরিয়েছিলাম, আর তুই… ওরে রবের বেটা, ফায়ার করে দিলি!”
রব নওয়াজ গলা যেন রুদ্ধ হয়ে এলো, “লা শরিক আল্লাহর কসম… আমি এমনি এমনি বন্দুক চালিয়েছিলাম… আমি বুঝতে পারিনি তুই সিংহের পুত বাইরে বেরিয়ে আসছিস… বড় আফসোস হচ্ছে!”
অনেকটা রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিলো রাম সিংহের। রব নওয়াজ আর তার সঙ্গীরা ওখানে পৌঁছেছে কয়েক ঘণ্টা পর। এ ফাঁকে তো পুরো এক গামলা রক্ত বেরিয়ে যাওয়ার কথা।
একক্ষণ পর্যন্ত যে রাম সিংহ বেঁচে আছে, সেটাই রব নওয়াজকে অবাক করছিলো। তার ধারণাই ছিলো না যে, সে বেঁচে থাকবে। ওকে নাড়াচাড়া করা ঠিক হতো না, তাই সে তাড়াতাড়ি ওয়্যারলেসে প্লাটুন কমান্ডারকে আবেদন জানালো, জলদি একটা ডাক্তারকে এদিকে রওনা করিয়ে দিতে। তার দোস্ত রাম সিংহ আহত হয়েছে।
ডাক্তারের ওখানে পৌঁছা, আর তাও সময়মতো পৌঁছা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিলো। রব নওয়াজ বুঝতে পারছিলো, রাম সিংহ আর মাত্র অল্পক্ষণের মেহমান। তারপরও সে ওয়্যারলেসে খবর পাঠিয়ে দিয়ে রাম সিংহকে হেসে বললো, “ডাক্তার আসছে… চিন্তা করিস না!”
রাম সিংহ ভাবতে ভাবতে দুর্বল গলায় বললো, “কিছুর জন্যেই ভাবছি না… এখন বল্ তোরা আমার কজন জওয়ানকে মেরেছিস?”
রব নওয়াজ জবাব দিলো, “স্রেফ একজন!”
রাম সিংহের কণ্ঠস্বর আরো ক্ষীণ হয়ে এলো, “তোদের কজন মারা গেছে?”
রব নওয়াজ মিথ্যে করে বললো, “ছয়জন!” এটা বলে সে অনুসন্ধানী চোখে নিজের জওয়ানদের দিকে তাকালো।
“ছয়জন… ছয়জন!” রাম সিংহ একজন-একজন করে নিজের মনের ভেতর লোকগুলোকে গুণলো, “আমি চোট পাওয়ার পর মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিলো… তারপর আমি বললাম… নিজের আর দুশমনের জান নিয়ে খেলে যাও… ছয়জন… ঠিক আছে!”
অতীত স্মৃতির আলো-আঁধারীর মধ্যে আবার হারিয়ে গেলো সে, “রব নওয়াজ… মনে আছে তোমার সেই দিনগুলোর কথা…?”
আর রাম সিংহ সেই কেটে যাওয়া দিনগুলো স্মরণ করা শুরু করে দিলো। খেত-খামারের কথা। স্কুলের গল্প। ৬/৯ জাট রেজিমেন্টের কাহিনি। কমান্ডিং অফিসারদের নিয়ে চুটকি আর বাইরের দেশের অচেনা মেয়েদের সাথে প্রেম-ভালোবাসা। এসব কথা বলতে বলতে রাম সিংহের অনেক মজার মজার ঘটনা মনে পড়ে গেলো। হাসতে গিয়ে তার যন্ত্রণা হচ্ছিলো, কিন্তু তার পরোয়া না করে ওই জখমি অবস্থাতেই হেসে বলতে লাগলো, “আরে বেটা শুয়োরের তেল… ওই ম্যাডামের কথা তোমার মনে আছে…?”
রব নওয়াজ জিজ্ঞেস করলো, “কোন্ ম্যাডাম?”
রাম সিংহ বললো, “ওই যে… ইটালির… আমরা তার কী নাম রেখেছিলাম যেন… বড় মারখোর মেয়েছেলে ছিলো!”
সাথে সাথেই রব নওয়াজের মনে পড়ে গেলো মেয়েছেলেটার কথা, “হ্যাঁ, হ্যাঁ… ও… ম্যাডাম মনিতা ফন্তো… পয়সা খতম, তামাশা খতম… কিন্তু তোর কাছ থেকে কখনো কখনো পয়সা নিতো না ওই মুসোলিনির বাচ্চি!”
রাম সিংহ উচ্চস্বরে হেসে উঠলো… আর তার জখমের জায়গা থেকে জমাট হয়ে যাওয়া রক্তের একটা দলা বেরিয়ে এলো। রব নওয়াজ তাড়াহুড়ো করে যে-পট্টিটা বেঁধেছিলো, সেটা ঢিলে হয়ে গিয়েছিলো। ওটাকে আবার ঠিক করে বেঁধে সে রাম সিংহকে বললো, “এখন চুপ করে থাকো।”
রাম সিংহের খুব জ¦র এসে গিয়েছিলো। এ কারণে তার মগজ খুব দ্রæত কাজ করছিলো। কথা বলার শক্তি ছিলো না, তবুও কিন্তু বলেই যাচ্ছিলো। কখনো কখনো থেমে যাচ্ছিলো, যেন যাচাই করে দেখছিলো ট্যাঙ্কে আর কতটুকু পেট্রল অবশিষ্ট আছে।
কিছুক্ষণ পর জ¦রের তাড়সে তার ভুল বকাবকি শুরু হযে গেলো, তবে ফাঁকে ফাঁকে এমনকিছু সময়ও আসছিলো যখন তার হুঁশ-জ্ঞান ফিরে আসছিলো। এরকম একটা অবকাশে সে রব নওয়াজকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো,“আচ্ছা দোস্ত, একদম সত্যি করে বলো তো, তোমাদের কি কাশ্মীরটা আসলেই চাই?”
রব নওয়াজ সম্পূর্ণ অকপটভাবে বললো, “হ্যাঁ, রাম সিন্ধা!”
রাম সিংহ মাথা নেড়ে বললো, “না… আমি এটা মানতে পারি না… তোমাদেরকে মিষ্টি মিষ্টি মিথ্যে বলে ভোলানো হয়েছে।”
রব নওয়াজ তাকে বিশ^স করানোর ইচ্ছায় বললো, “তোমাদেরকে ভোলানো হয়েছে… পঞ্জতন পাকের কসম…!”
রাম সিংহ রব নওয়াজের হাত ধরে ফেললো, “কসম খাস নে, দোস্ত… ঠিক বলেছিস হয় তো!” কিন্তু ওর কথা বলার ধরন থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিলো, রব নওয়াজের কসমে তার আস্থা নেই।
প্লাটুন কমান্ডার মেজর আসলাম এলো সন্ধ্যে নামার একটু আগে। তার সঙ্গে অল্প কয়েকজন সেপাই ছিলো, কিন্তু ডাক্তার ছিলো না। অন্তিমকাল ঘনিয়ে আসা রাম সিংহ প্রায় বেহুঁশ অবস্থায় কী যেন বিড়বিড় করছিলো। কিন্তু তার গলার আওয়াজ এত কমজোর আর ভাঙা ছিলো যে, কথাগুলো কিছুই বোঝা যাচ্ছিলো না।
মেজর আসলামও একসময় ৬/৯ জাট রেজিমেন্টে ছিলো আর রাম সিংহকে খুব ভালোভাবে চিনতো। রব নওয়াজের কাছ থেকে পুরো অবস্থার খবরাখবর নেয়ার পর রাম সিংহকে ডাক দিলো, “রাম সিংহ… রাম সিংহ!”
রাম সিংহ চোখ খুলে তাকালো। তারপর শোয়া অবস্থাতেই অ্যাটেনশান হয়ে মেজর আসলামকে স্যাল্যুট করলো। কিন্তু আরো একবার চোখ খুলে সে একপলকের জন্যে আরো গভীরভাবে তাকালো মেজরের দিকে। তার অভিবাদনরত আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া হাত একদম নিচে পড়ে গেলো। বিরক্ত হয়ে সে বিড়বিড় করতে লাগলো, “কিচ্ছু হয়নি তোর, রামুয়া… ভুলেই গিয়েছিস তুই শুয়োরের নলা… কিসের এ লড়াই… এই লড়াই?”
রাম সিংহ নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে পারলো না। বন্ধ হতে থাকা চোখে কিছুটা জিজ্ঞাসার ভাব এনে সে রব নওয়াজের দিকে তাকালো আর ঠান্ডা হয়ে গেলো।