Loading

ফরাসি কবিতা ও কবিরা

অবিভক্ত বাংলাদেশ (পশ্চিম বঙ্গসহ) কখনোই সরাসরি ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিলো না, তবুও গোড়া থেকেই ফ্রান্সের সঙ্গে বঙ্গদেশের একটা আত্মিক বন্ধন দেখা যায়। ১৭৫৭-তে পলাশিতে উপনিবেশকামী ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে ফরাসিরা স্থানীয়দের পক্ষে অস্ত্র ধরেছিলো, অবশ্য তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার্থেই। ইংরেজদের তাড়াতে পারলে বাংলা তথা ভারত ফরাসি উপনিবেশ হতে পারত, কিন্তু সেটা হয় নি। অথচ তারপরও ১৯৭১-এ আরেক ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির জনযুদ্ধেও ফরাসিরা সঙ্গ দিয়েছে, আঁদ্রে মালরো প্রমুখ শীর্ষ বুদ্ধিজীবিদের নেতৃত্বে। মালরো নিজেকে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা’ বলে ঘোষণা করেছিলেন।

ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি কাব্য-সাহিত্যের সঙ্গেও বাঙালি তথা বাংলা ভাষার সম্পর্ক নিবিড়। ইংরেজি ভাষার শেক্সপিয়র, বায়রন, মিল্টন, শেলি, কিটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, চার্লস ডিকেন্স, সমারসেট মম, বার্নার্ড শ প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকের পাশাপাশি ভিক্তর উগো, বালজাক, মপাসাঁ, বদল্যের, রাঁবো, মালার্মে , পল ভ্যালেরি প্রমুখ ফরাসি কবি-সাহিত্যিকেরাও বাংলা কাব্য-সাহিত্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল প্রভাব ফেলেছেন। এঁদের অনেকের রচনাবলী সম্পূর্ণ বা অধিকাংশ  বাংলায় অনূদিতও হয়েছে।

অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধ থেকে শুরু করে বিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত গরিয়সী ফরাসি ভাষার কয়েকজন প্রধান কবির কবিতার কিছু নিদর্শন এখানে দেয়া হলো বাংলা ভাষান্তরসহ। একটি ব্যতিক্রম বাদে প্রত্যেক কবির একটা করে কবিতা এবং তার অনুবাদ এখানে দেয়া হলো, অতিসংক্ষিপ্ত কবিপরিচিতিসহ।

মার্সেলিন দেবর্দ্-ভ্যালমোর

মার্সেলিন দেবর্দ্-ভ্যালমোর (Marceline Desbordes-Valmore)-এর জন্ম ১৭৮৬’র ২০ জুন, ফ্রান্সের দুয়ে-তে; মৃত্যু ১৮৫৯-এর ২৩ জুলাই প্যারিসে। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, উপন্যাসিক, অভিনেত্রী এবং গায়িকা। কিন্তু সত্যি বলতে কি, তাঁর কবি পরিচিতিই তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। ১৮১৯-এ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এলেজি এ র‍্যোমঁস’ (Élégies et Romances — শোকগাথা ও প্রেমগীতি) প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গেই সঙ্গেই মার্সেলিনের কবিতার ললিত লাবণ্য এবং গভীর আবেগের স্ফূরণ পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরে এ বই-ই তাঁকে এনে দেয় ফরাসি রোম্যান্টিক কবিতা ধারার অন্যতম প্রতিষ্ঠাত্রী কবির স্বীকৃতি। সাড়া জাগানো ফরাসি কবিতা সঙ্কলন ‘লে পোয়েৎ ম্যোজি’ (Les Poètes maudits — অভিশপ্ত কবিরা)-তে ঠাঁই পাওয়া একমাত্র নারী কবি তিনি।

এখানে মার্সেলিন দেবর্দ্-ভ্যালমোরের বিখ্যাত Les Roses de Saadi কবিতাটি বাংলা অনুবাদ করে দিলাম– অবশ্যই মূলসহ। তাঁর প্রায় ছয়শ বছর আগে জন্ম নেয়া ফার্সি ভাষার মহাকবি শেখ সাদির ‘গুলিস্তাঁ’ পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘সাদির গোলাপ’ নামের এ কবিতাটি লিখেছিলেন মার্সেলিন। এ থেকে কবিতাটার একটা আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও বিবেচনা করা যেতে পারে।

Les Roses de Saadi

J’ai voulu ce matin te rapporter des roses;
Mais j’en avais tant pris dans mes ceintures closes
Que les noeuds trop serrés n’ont pu les contenir.

Les noeuds ont éclaté. Les roses envolées
Dans le vent, à la mer s’en sont toutes allées.
Elles ont suivi l’eau pour ne plus revenir.

La vague en a paru rouge et comme enflammée.
Ce soir, ma robe encore en est toute embaumée . . .
Respires-en sur moi l’odorant souvenir.

সাদির গোলাপ

আজ সকালে তোমাকে কিছু গোলাপ এনে দিতে চেয়েছিলাম
কিন্তু আমার উত্তরীয়ে এত বেশি গোলাপ বেঁধে নিয়েছিলাম
গিঁটগুলো ওদের ধরে রাখতে পারলো না।

গিঁট ফেঁসে গেলো। গোলাপগুলো উড়ে গেলো
হাওয়ায়, সমুদ্রের দিকে চলে গেলো সব।
জলধারার পিছু নিলো তারা আর ফিরে আসবে না বলে।

ঢেউগুলোকে দেখাচ্ছিলো এত লাল যেন আগুন জ্বলছে।
আজ রাতে, আমার পোশাক এখনও সুবাসিত
সেই সুরভিত স্মৃতির নিঃশ্বাসে।

 

ভিক্তর উগো

ফরাসি সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ এবং মানবাধিকার কর্মী ভিক্তর উগো’র নামটা বাংলায় ভুল বানানে ভিক্টর হুগো লেখা হচ্ছে বহুদিন ধরে, এবং সেটাই এখন প্রচলিত হয়ে গেছে। তাঁর পুরো নাম ভিক্তর মারি-উগো; জন্ম ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৮০২, এবং মৃত্যু ২২ মে, ১৮৮৫।

তাঁকে উনিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী রোম্যান্টিক লেখক বলা হয়ে থাকে। পরবর্তী যুগের বহু দেশের অসংখ্য লেখক উগোকে অনুসরণ করেছেন, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন চার্লস ডিকেন্স, ফিয়োদর দস্তয়েভস্কি, আলবের কামু থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ি, মুন্সি প্রেমচন্দ, ফুলেশ্বরজি রেণু প্রমুখেরা পর্যন্ত।

‘লে মিজারেবল’, ‘নোত্র-দাম দ্য পারি’ (দা হাঞ্চব্যাক অব নটরডেম) প্রভৃতি যুগন্ধর উপন্যাস রচয়িতা হিসেবে আমরা তাঁকে মূলত ঔপন্যাসিক হিসেবেই জানি। কিন্তু নাট্যকার ও কবি হিসেবেও তিনি ছিলেন বহুলপরিচিত। উগো’র কবিতার দুটো নামকরা সংকলন হলো ‘লে কন্তেমপ্লাশিয়ঁ’ (দা কনটেমপ্লেশানস) এবং ‘লা লেজঁ দে সিয়েকল’ (দা লিজেন্ড অব দা এজেস)। ১৮৫৬ সালে প্রকাশিত ‘লে কন্তেমপ্লাশিয়ঁ’ থেকে তাঁর একটা কবিতা অনুবাদ করে দিলাম, মূল কবিতাসহ।

`Demain, dès l’aube’ (কাল রাত পোহালে) নামের এই কবিতাটি উগো লিখেছিলেন তাঁর মেয়ে লেওপল্দি‌ন উগো’র অকালমৃত্যুর চার বছর পর তার কবর দেখতে যাওয়া উপলক্ষে।

Demain, dès l’aube

Demain, dès l’aube, à l’heure où blanchit la campagne,
Je partirai. Vois-tu, je sais que tu m’attends.
J’irai par la forêt, j’irai par la montagne.
Je ne puis demeurer loin de toi plus longtemps.

Je marcherai les yeux fixés sur mes pensées,
Sans rien voir au dehors, sans entendre aucun bruit,
Seul, inconnu, le dos courbé, les mains croisées,
Triste, et le jour pour moi sera comme la nuit.

Je ne regarderai ni l’or du soir qui tombe,
Ni les voiles au loin descendant vers Harfleur,
Et quand j’arriverai, je mettrai sur ta tombe
Un bouquet de houx vert et de bruyère en fleur.

কাল রাত পোহালে

কাল রাত পোহালে গাঁগেরামে এলে ধলপহর
আমি চলে যাবো। দেখো, আমি জানি তুমি থাকবে প্রতীক্ষায়।
বনপথ ধরে আমি চলে যাবো পাহাড় পেরিয়ে।
তোমার নিকট থেকে অতদূরে আমি আর থাকতে পারি না।

ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলে যাবো, আপন চিন্তায় মগ্ন আমার দু চোখ,
চারপাশে কিছুই না করে গ্রাহ্য, না শুনে কোনোই শব্দ,
একা, অজ্ঞাত, পিছিয়ে পড়া, হাত মুঠো করা,
বিষণ্ণ, এবং যেন দিনটা আমার কাছে হয়ে যাবে রাত।

ঘনায়মান সন্ধ্যার স্বর্ণাভা তো দেখবো না আমি,
দেখবো না দূরে ওই হারফ্লর অভিমুখী যত তরণীর তোলা পাল
এবং যখন আমি পৌঁছে যাবো, রাখবো তোমার সমাধিতে
সবুজ হলি’র আর হিদার ফুলের একটি স্তবক।

শার্ল বদল্যের

শার্ল বদল্যের (Charles Baudelaire), পুরো নাম শার্ল -পিয়ের বদল্যের (Charles-Pierre Baudelaire) ফরাসী তথা বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে উজ্জ্বলতম নামগুলোর একটি। জন্ম: ৯ এপ্রিল, ১৮২১-এ, ফ্রান্সের প্যারিসে; মৃত্যু: ৩১ অগাস্ট, ১৮৬৭-তে র‍্যু দু দোমে। ফরাসি ভাষায় তিনি অন্যতম প্রধান কবি ও অনুবাদক। প্রাবন্ধিক ও শিল্প-সমালোচক হিসেবে তার কাজও উল্লেখের দাবি রাখে। ফরাসিতে এডগার অ্যালান পো’র প্রথম অনুবাদকদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার আধুনিক কাব্যধারায় বদল্যেরের প্রভাব বিপুল। বাংলায় পাঠকসাধারণের মধ্যে বদল্যেরকে জনপ্রিয় করে তোলেন বুদ্ধদেব বসু, তাঁর অপরূপ কাব্যসুষমামণ্ডিত অনুবাদের মধ্যে দিয়ে।

আমার খুব প্রিয় একটি কবিতা বদল্যেরের ‘অঁনিভ্রে-ভূ’ (মাতাল হও) এখানে অনুবাদ করে দেয়া হলো। কবিতাটি যৌবনে বলতে গেলে আমাদের জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। হয়তো — কিংবা হয়তো কেন, অবশ্যই — এ কবিতা সে-প্রজন্মের কাব্য-কবির মেজাজ নির্মাণে গূঢ়, গভীর, ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।

Enivrez-Vous

Il faut être toujours ivre.
Tout est là:
c’est l’unique question.
Pour ne pas sentir
l’horrible fardeau du Temps
qui brise vos épaules
et vous penche vers la terre,
il faut vous enivrer sans trêve.
Mais de quoi?
De vin, de poésie, ou de vertu, à votre guise.
Mais enivrez-vous.
Et si quelquefois,
sur les marches d’un palais,
sur l’herbe verte d’un fossé,
dans la solitude morne de votre chambre,
vous vous réveillez,
l’ivresse déjà diminuée ou disparue,
demandez au vent,
à la vague,
à l’étoile,
à l’oiseau,
à l’horloge,
à tout ce qui fuit,
à tout ce qui gémit,
à tout ce qui roule,
à tout ce qui chante,
à tout ce qui parle,
demandez quelle heure il est;
et le vent,
la vague,
l’étoile,
l’oiseau,
l’horloge,
vous répondront:
“Il est l’heure de s’enivrer!
Pour n’être pas les esclaves martyrisés du Temps,
enivrez-vous;
enivrez-vous sans cesse!
De vin, de poésie ou de vertu, à votre guise.”

মাতাল হও

সবসময় অবশ্যই মাতাল হতে হবে,
এই-ই হলো শেষ কথা!
এটাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য!
সময়ের ভয়ঙ্কর বোঝার ভার
তোমার কাঁধকে যে ক্ষতবিক্ষত করে তুলছে,
তোমাকে যে পিষে ফেলছে মাটির সঙ্গে
সেটা অনুভব না-করার জন্যে
মাতাল হও, আর সেভাবেই থাকো।
কী নিয়ে মাতাল হবে?
মদ, কবিতা, ন্যায়নীতি— যা-হোক কিছু নিয়ে।
কিন্তু কথা হলো মাতাল হও।
আর ঘটনাক্রমে যদি কখনো জেগে ওঠো
কোনো প্রাসাদের অলিন্দে,
কোনো মাঠের সবুজ ঘাসে,
তোমার নিজের ঘরে মন খারাপ করা একাকিত্বে,
তোমার নেশা যখন কেটে গেছে বা যাওয়ার পথে,
জিজ্ঞেস করো হাওয়াকে,
তরঙ্গকে,
তারাকে,
পাখিকে,
ঘড়িকে,
জিজ্ঞেস করো সেই সবকিছুকে,
যারা পালাচ্ছে,
যারা গোঙাচ্ছে
অথবা গড়াচ্ছে
অথবা গাইছে,
অথবা কথা বলছে,
জিজ্ঞেস করো এখন সময় কত;
এবং হাওয়া,
তরঙ্গ,
তারা,
পাখি,
ঘড়ি
তোমাকে জবাব দেবে
“এখন সময় মাতাল হওয়ার!
সময়ের শহিদ ক্রীতদাস না হয়ে
মাতাল হও,
মাতাল থাকো,
মদ, ন্যায়নীতি, কবিতা—যা-হোক কিছু নিয়ে!”


আর্ত্যু রাঁবো
আর্ত্যু রাঁবো (Arthur Rimbaud), পুরো নাম: জঁ নিকোলা আর্ত্যু রাঁবো (Jean-Nicholas Arthur Rimbaud; ২০ অক্টোবর, ১৮৫৪ – ১০ নভেম্বর, ১৮৯১) ফ্রান্সের তথা বিশ্বের সর্বকালের সেরা কবিদের একজন। মজার ব্যাপার হলো, রাঁব্যো তাঁর অধিকাংশ কবিতাই লিখেছিলেন তাঁর নিতান্ত কিশোর বা তরুণ বয়সে।মাত্র সতেরো বছর বয়সেই তুমুল আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবিতার মাধ্যমে তিনি পারি’র (প্যারিসের) কবিসমাজকে উদ্বেলিত করে তুলেছিলেন। তাঁর ‘মাতাল তরণী’ (Le Bateau ivre‌‌) কবিতাটি পড়ে সে-যুগের ফ্রান্সের অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় প্রতীকবাদী কবি পল ভর্লেন তাঁর প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়েও উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কিন্তু মাত্র ২০ বছর বয়সেই রাঁবো সবধরনের সৃষ্টিশীল লেখালেখি ছেড়ে দেন। এর পর তিনি আরব এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে ভ্রমণ করেন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত লেখনির মধ্যে ‘নরকে এক ঋতু’ (Une saison en enfer), ‘মাতাল তরণী’ এবং গদ্যকবিতা ‘ইলুমিনাস্যঁ’ (Illumination) অন্যতম।

রাঁবো’র দুটো পাঠকপ্রিয় কবিতা ‘L’Éternité’ ও ‘Rêvé Pour l’hiver’ যথাক্রমে ’মহাকাল’ এবং ‘এক শীতের স্বপ্ন’ নামে বাংলায় অনুবাদ করে দিলাম, ফরাসি ভাষায় মূল কবিতাসহ।

১.
L’Éternité

Elle est retrouvée.
Quoi? – L’Éternité.
C’est la mer allée
Avec le soleil.

Âme sentinelle,
Murmurons l’aveu
De la nuit si nulle
Et du jour en feu.

Des humains suffrages,
Des communs élans
Là tu te dégages
Et voles selon.

Puisque de vous seules,
Braises de satin,
Le Devoir s’exhale
Sans qu’on dise : enfin.

Là pas d’espérance,
Nul orietur.
Science avec patience,
Le supplice est sûr.

Elle est retrouvée.
Quoi ? – L’Éternité.
C’est la mer allée
Avec le soleil.

মহাকাল

আমি তাকে ফের খুঁজে পেয়েছি।
কাকে? – মহাকালকে।
সূর্যের সাথে পালিয়ে যাওয়া
সমুদ্রকে।

প্রহরী প্রাণ,
চলো, চুপিচুপি স্বীকার করি
শূন্যতায় ভরা রাত আর
আগুনে পুড়ে যাওয়া দিনের কথা।

মানুষের চাটুবাক্য থেকে,
নিত্যদিনের চাওয়া-পাওয়া থেকে
তুমি সরে আসো এখানে,
চাইলে উড়ে যেতেও পারো।

যেহেতু একা শুধু তোমার কাছ থেকে
সাটিনের মতো জ্বলজ্বলে জ্বলন্ত অঙ্গার,
কর্তব্যের ভারী নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে
শেষ পর্যন্ত কারো কিছু বলা ছাড়াই।

এখানে কোনো আশা নেই,
কোন ভাষা নেই।
জ্ঞান আর সহ্যশক্তি।
নিপীড়ন নিশ্চিত।

আমি তাকে ফের খুঁজে পেয়েছি।
কাকে? – মহাকালকে।
সূর্যের সাথে পালিয়ে যাওয়া
সেই সমুদ্রকে।

২.
Rêvé Pour l’hiver

L’hiver, nous irons dans un petit wagon rose
Avec des coussins bleus.
Nous serons bien. Un nid de baisers fous repose
Dans chaque coin moelleux.

Tu fermeras l’oeil, pour ne point voir, par la glace,
Grimacer les ombres des soirs,
Ces monstruosités hargneuses, populace
De démons noirs et de loups noirs.

Puis tu te sentiras la joue égratignée…
Un petit baiser, comme une folle araignée,
Te courra par le cou…

Et tu me diras : “Cherche !”, en inclinant la tête,
– Et nous prendrons du temps à trouver cette bête
– Qui voyage beaucoup…এক শীতের স্বপ্ন

শীতের জন্যে স্বপ্ন 

শীতে আমরা ঘুরে বেড়াবো নীল গদিওয়ালা
গোলাপি গাড়িতে।
আমাদের খুব ভালো লাগবে। একঝাঁক পাগলা চুমুও
প্রতীক্ষায় প্রতিটি মোড়ে।

তুমি চোখ বুঁজে রাখবে, যাতে দেখতে না-হয়
কাঁচের মধ্যে দিয়ে
সন্ধ্যার ভ্রূকুটিকুটিল ছায়াগুলো,
দাঁত-খিঁচানো ওই দানবগুলো, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া একদল
কালো নেকড়ে আর কালো প্রেতমূর্তি।

তারপর অনুভব করবে– গালে তোমার বেশ সুড়সুড়ি দিচ্ছে—
ছোট্ট একটা চুমু, পাগলা গোছের একটা মাকড়সার মতো
ছুটে যাচ্ছে তোমার ঘাড়ের ওপর দিয়ে—

আর তখন মাথা নুইয়ে তুমি বলবে: “ধরো ওটাকে!”
– আর প্রাণীটাকে খুঁজে বের করতে আমরা খানিকটা সময় নেবো
– কে যায় ঘুরে বেড়াতে অতদূর—

জুল ল্যাফর্গ

জুল ল্যাফর্গ (Jules Laforgue) একজন উরুগুয়েয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি কবি। জন্ম ১৬ আগস্ট ১৮৬০-এ উরুগুয়ের মন্টিভিডিওতে; মৃত্যু ২০ আগস্ট, ১৮৮৭-তে ফ্রান্সের প্যারিসে। দুরারোগ্য যক্ষ্মারোগে অকালমৃত এই কবিকে সাধারণত একজন প্রতীকবাদী (সিম্বলিস্ট) কবি হিসেবেই উল্লেখ করা হয়ে থাকে। তবে আলোচক-সমালোচকদের মতে, তাঁর কবিতায় অভিব্যক্তিবাদ বা ইম্প্রেশানিজমের সরাসরি প্রভাব দৃশ্যমান। এজন্যে লাফর্গকে “আধা-প্রতীকবাদী, আধা-অভিব্যক্তিবাদী” কবি বলাই তাঁরা যুক্তিযুক্ত মনে করেন।

মার্কিন ধ্রুপদী কবি ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্রভাবে লাফর্গ এবং তাঁর কবিবন্ধু গুস্তাভ ক্যান (Gustave Kahn, ১৮৫৯-১৯৩৬) ফরাসি কবিতায় ‘ফ্রী-ভার্স’ বা অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন।

এখানে অনূদিত লাফর্গের ‘Triste, Triste’ কবিতাটি প্রকাশিত হয় তাঁর মুত্যুর বহু পরে ১৯৬৭ সালে একই নামের একটি কাব্যগ্রন্থে।

Triste, Triste

Je contemple mon feu. J’étouffe un bâillement.
Le vent pleure. La pluie à ma vitre ruisselle.
Un piano voisin joue une ritournelle.
Comme la vie est triste et coule lentement.

Je songe à notre Terre, atome d’un moment,
Dans l’infini criblé d’étoiles éternelles,
Au peu qu’ont déchiffré nos débiles prunelles,
Au Tout qui nous est clos inexorablement.

Et notre sort! toujours la même comédie,
Des vices, des chagrins, le spleen, la maladie,
Puis nous allons fleurir les beaux pissenlits d’or.

L’Univers nous reprend, rien de nous ne subsiste,
Cependant qu’ici-bas tout continue encor.
Comme nous sommes seuls! Comme la vie est triste!

দুঃখের, দুঃখের

একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি আগুনের দিকে। একটা হাই চাপি।
বিলাপ করে হাওয়া। জানলা বেয়ে নামে বৃষ্টিধারা।
পাশের বাড়িতে পিয়ানোয় বাজে রিতুর্নেল।
জীবন কত দুঃখের আর কত মন্থর বয়ে যায়।

আমি ভাবি আমাদের পৃথিবীর কথা, মুহূর্তের এই পরমাণু
চিরায়ত তারাদের অসীম প্রহেলিকার মাঝখানে,
যাদের মধ্যে খুব অল্পকেই আমাদের ক্ষীণদৃষ্টি পড়তে পেরেছে,
অপ্রতিরোধ্যভাবে যারা চলে এসেছে আমাদের কাছে।

আর আমাদের নিয়তি! সবসময় সেই একই কমেডি,
পাপ, শোক, হতাশা, অসুস্থতা,
আর তারপর আমরা ফোটাই দারুণ সোনালি পিসঁ’লি ফুল।

মহাবিশ্ব ফের আমাদের দখল করে নেয়, আমাদের কিছুই টেকে না,
তারপরও অবশ্য এখানে নিচে সবকিছু চলতে থাকে।
আমরা কত যে একা ! জীবন কত যে দুঃখের !

গিয়োম অ্যাপোলিন্যার

[গিয়োম অ্যাপোলিন্যার (Guillaume Apollinaire)-কে মনে করা হয় বিংশ শতাব্দীর বিশ্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন হিসেবে। পোলিশ-বেলোরুশ বংশোদ্ভূত এই ফরাসি কবির জন্ম ১৮৮০’র ২৫ আগস্ট ইতালির রোমে; মৃত্যু ফ্রান্মের প্যারিসে ১৯১৮’র ৯ নভেম্বর। কবি পরিচয় ছাড়াও নাট্যকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং শিল্পসমালোচক হিসেবেও তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ। শিল্প-সাহিত্যে ঘনকবাদ বা কিউবিজমের সবচেয়ে আবেগদীপ্ত সমর্থক এবং পরাবাস্তববাদ বা সুররিয়ালিজমের পূর্বসুরী হিসেবেও তিনি সর্বস্বীকৃত।

অ্যাপোলিন্যারের একটি বিখ্যাত কবিতা Le Pont Mirabeau এখানে অনুবাদ করে দিলাম ’মিরাব্যো সেতু’ নামে। এখানে লক্ষণীয়, মূল ফরাসি কবিতাটাতে কোনো বিরামচিহ্নের ব্যবহার নেই, এবং বাংলা অনুবাদেও সে-রীতি বজায় রাখা হয়েছে। বিষয়বস্তু ও শৈলী– দুদিক থেকেই তিনি কঠোরভাবে আধুনিক, এটা প্রমাণ করার অ্যাপোলিন্যার কবিতায় কোনো যতিচিহ্ন ব্যবহার করতেন না।]

Le Pont Mirabeau

Sous le pont Mirabeau coule la Seine
Et nos amours
Faut-il qu’il m’en souvienne
La joie venait toujours après la peine

Vienne la nuit sonne l’heure
Les jours s’en vont je demeure

Les mains dans les mains restons face à face
Tandis que sous
Le pont de nos bras passe
Des éternels regards l’onde si lasse

Vienne la nuit sonne l’heure
Les jours s’en vont je demeure

L’amour s’en va comme cette eau courante
L’amour s’en va
Comme la vie est lente
Et comme l’Espérance est violente

Vienne la nuit sonne l’heure
Les jours s’en vont je demeure

Passent les jours et passent les semaines
Ni temps passé
Ni les amours reviennent
Sous le pont Mirabeau coule la Seine

Vienne la nuit sonne l’heure
Les jours s’en vont je demeure

মিরাব্যো সেতু

মিরাব্যো সেতুর নিচে যেখানে বইছে সিন নদী
আমাদের প্রেম মনে করে সেই স্মৃতি
কিভাবে সকল দুঃখের শেষে সুখ ফেরে নিরবধি

দিনশেষের ঘণ্টা বাজলে নেমে আসুক রাত্রি
দিনগুলো চলে যায় পাশ দিয়ে, আমি বসে থাকা যাত্রী

মুখোমুখি আর হাতে হাত–
হোক এভাবেই আমাদের দিন সারা
যখন আমাদের বাহু দিয়ে গড়া সেতুটির নিচে দিয়ে
অন্তবিহীন দেখার ক্লান্তি নিয়ে বয় নদীধারা

দিনশেষের ঘণ্টা বাজলে নেমে আসুক রাত্রি
দিনগুলো চলে যায় পাশ দিয়ে, আমি বসে থাকা যাত্রী

সব ভালোবাসা চলে যায়
যেন সমুদ্র অভিমুখে এক নদী
সব ভালোবাসা চলে যায়
জীবন যদি ছোটও মনে হয়
আশা তীব্রতমও হয় যদি

দিনশেষের ঘণ্টা বাজলে নেমে আসুক রাত্রি
দিনগুলো চলে যায় পাশ দিয়ে, আমি বসে থাকা যাত্রী

দিন-রাতগুলো চলে যায় ক্রমে দৃষ্টিসীমার বাইরে
অতীত ফেরে না, ভালোবাসাও কোনোদিন
মিরাব্যো সেতুর নিচে দিয়ে ধীরে বয়ে যায় নদী সিন

দিনশেষের ঘণ্টা বাজলে নেমে আসুক রাত্রি
দিনগুলো চলে যায় পাশ দিয়ে, আমি বসে থাকা যাত্রী

You must be logged in to post a comment.