পুষপ চটরজীর ইতিবৃত্ত
[ধারাবাহিক এই লেখাটা আজ থেকে শুরু করলাম। এটা এবং পরবর্তী প্রতিটি কিস্তি পড়ার জন্যে পাঠকদের অনুরোধ জানাচ্ছি।]
১.
তাকে নাম জিজ্ঞেস করলে বলতো, “মোর-অ নাম-অ পুষপ চটরজী, বাবু।”
দত্তগিন্নি তখন মুখ ঝামটা দিয়ে বলতেন, “কিয়র চ্যাটার্জী, অ বুড়ি? ই’ন কী ক’র যে তুঁই?” (কিসের চ্যাটার্জী, বুড়ি? এগুলো কী বলছো তুমি?)
একগাল হেসে বুড়ি তখন বলতো, “হ হ, মোর-অ বিয়া হউচি ভুলি গলা, বাবু! মোর-অ নাম-অ পুষপ দাস-অ।”
গাঁয়ে সবাই ওকে চিনতো উড়িয়া বুড়ি নামে। ভারতের উড়িষ্যার এক ব্রাহ্মণকন্যার জীবনতরী চট্টগ্রামের এক গণ্ডগ্রামের ঘাটে এসে ভিড়লো, আর তার এই ভাসমান জীবনের শেষ পরিণতিই-বা কী হলো, তা নিয়েই এ কাহিনির অবতারণা।
২.
পুষপ আর তার স্বামী বগলাচরণ দাস যেদিন গ্রামে এসে পৌঁছলো, ওদের বাড়িতে একটা ভিড় জমে গেলো উৎসুক দর্শকদের। নাকে
সিকনিওয়ালা ছেলেপুলে থেকে মেয়েমর্দ, ঘাটের মড়া বুড়োবুড়ি কেউ বাদ নেই। সব একেবারে হামলে এসে হাঁ করে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে।
তা একটা দেখার মতো জিনিস বটে। কালোকিষ্টি, রোগাভোগা লোকে ভর্তি হাড়কুটে মরকুটে একটা পাড়ার মধ্যে ঝকঝকে তকতকে ফর্সা ফটফটে দুটো লোক। সঙ্গে গুচ্ছের লটবহর, আর সেগুলোর চেকনাইও দেখার মতো।
ঘোর কালো, হাড়জিরজিরে, ঝাঁকড়াচুলো নৃসিংহ চন্দ্র দাস ওরফে নিরা হঠাৎ তার বত্রিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি ফুলিয়ে, গলার শিরা ফুলিয়ে হাঁক দিলো, ”আঁ’র জেডা আ’ই গিয়েগোই…!” (আমার জ্যেঠা এসে গেছে)
তারপর পড়িমরি করে গিয়ে ছুটে গিয়ে প্রণত হলো জ্যেষ্ঠতাতের চরণে।
জ্যেঠা বগলাচরণ তাড়াতাড়ি ভাইপোকে পা থেকে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। নিরা উচ্চৈঃস্বরে রীতিমতো বিলাপ জুড়ে দিলো:
“তোঁয়ারা আঁ’রারে ফালাই এতদিন কে’নে আছিলা যে-এ-এ! আঁরার কথা তোঁয়ারারতে এক্কানা-অ মনৎ ন’ পড়ে যে না-আ-আ!” (তোমরা আমাদেরকে ফেলে এতদিন কেমন করে ছিলে বলো তো! আমাদের কথা তোমাদের কি একটুও মনে পড়ে নি!)
একটা কুকুরের কান্না শুরু হলে অন্য কুকুররাও যেমন সমস্বরে সুর মেলায়, ঠিক সেভাবেই নিরার সঙ্গে সুর মেলালো তার বউ আন্নাকালি আর ন্যাংটো, আধন্যাংটো তার গোটা পাঁচেক নেন্ডিগেন্ডি, যাদের বয়েস দুই থেকে বারোর মধ্যে। কালো নেংটি ইঁদুরের মতো আরো একটা বাচ্চা আন্নার মাই চুষছিলো গোপালের পুতনা রাক্ষসীর স্তন চোষার ভঙ্গীতে, যে এ সমবেত বিলাপে গলা মেলাতে পারে নি।
গ্রামবাসী গত বারো বছর একযুগ ধরে আন্নাকে এ রূপেই দেখছে– মাথায় জন্মে তেলের চিরুনির ছোঁয়া না পাওয়া একরাশ রুখু চুল হাওয়ায় উড়ছে, বøাউজহীন বুকের আঁচল সরে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে বৃহৎ কালো লাউয়ের মতো তার একটা স্তন, আর সেটা ধরে ঝুলছে নেংটি ইঁদুরের ছানার মতো একটা ছেলে। এসব কারণে গাঁয়ের লোকে তার নাম দিয়েছিলো পুতনা রাক্ষসী। আড়ালে আবডালে সবাই তাকে তাকে ও নামেই উল্লেখ করতো। তবে সামনে কেউ ও নাম উচ্চারণ করলে মহা খলস্বভাবা আন্নাকালি তার বাপের নাম ভুলিয়ে ছাড়তো।
নৃসিংহ দাসদের বাড়ির উঠোন থেকে এত কান্নাকাটির আওয়াজ শুনে পাড়ার যারা এতক্ষণ আসে নি, তারাও সব এসে জুটলো।
ততক্ষণে বগলা দাসের চোখ দিয়েও জল গড়াচ্ছিলো। এক হাতে ভাইপোকে জড়িয়ে রেখে, অন্য হাতে পকেট থেকে ধবধবে সাদা রুমাল বের করে চোখ মুছলেন। সেই রুমাল থেকে ভেসে আসা দামি সেন্টের খুশবু নাকে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নিরার বিলাপ বন্ধ হয়ে গেলো।
কাছ ঘেঁষে অন্য যারা ছিলো, তাদের নাকেও গেলো গন্ধটা। পাশের দত্তপাড়ার বাবুরা পুজোআচ্চার সময় শহর থেকে এলে, তাদের পোশাক-আশাক থেকে এধরনের মহার্ঘ্য সৌরভ পেয়েছে তারা। আর আজ এ স্বর্গীয় সুবাসের উৎস নৃসিংহ দাসের খোড়ো ঘরের উঠোনে, একেবারে তাদের নাকের সামনেই। বিস্ময়ে তাদের মুখে রা সরছিলো না– নিরার উঠোনে এ তো হাতির পা পড়েছে রে!
শেষে নিরার স্যাঙাতদের কয়েকজন এগিয়ে গিয়ে তাকে জ্যেঠার কাছ থেকে সরিয়ে আনলো। বয়োবৃদ্ধ একজন এগিয়ে গিয়ে গিয়ে বগলাচরণকে জিজ্ঞেস করলো– “আঁরে চিনর না!?” (আমাকে চিনতে পারছো?)
৩.
দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পর সস্ত্রীক দেশে ফিরেছে বগলা দাস। পঞ্চাশ বছর আগে সতের বছর বয়সে দত্তদের মেজবাবুর সঙ্গে আকিয়াব চলে গিয়েছিলো সে। সেখানে বাবুদের চালের আড়তে কিছুদিন কাজ করে কিছু পয়সা জমার পর সে চলে যায় তৎকালীন ব্রিটিশ বার্মার (বর্তমান মায়ানমারের) রাজধানী রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুনে)। সেখানে সে প্রথমে একটা ছোট মুদির দোকান খোলে রেঙ্গুনে চাটগেঁয়েদের বড় আস্তানা দশভূজা বাড়ি এলাকায়। কালক্রমে সে-দোকান আকারে আয়তনে অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন মালের পাইকারি আর খুচরো দুধরনের ব্যবসাই করতো সে। পরে মুদি দোকানের পাশে সে একটা কাঠের দোকানও খুললো। ইয়াঙ্গুনে কাঠের ব্যবসা সত্যিই লাভজনক। ক্রমে চট্টগ্রামে বার্মিজ টিক চালান দিতে শুরু করলো সে।
এভাবে মোটামুটি এক-দেড় দশকের মধ্যে বেশ ভালো রকমের পয়সাওয়ালা মানুষ হয়ে দাঁড়ালো বগলা দাশ। কিন্তু ততদিনে তার বয়েসও তিরিশ ছাড়িয়েছে। বিয়েশাদির তাগিদ দেয়ার মতো কোনো অভিভাবক বগলাচরণের ঘরে ছিলো না। কাজকর্মের চাপে এ ধরনের কোনো চিন্তা তার নিজের মাথাতেও আসে নি।
কিন্তু একবার এক রোববারের ছুটির দিনে রেঙ্গুনের শোয়ে ডাগন প্যাগোডায় বেড়াতে গিয়ে এক মেয়েকে দেখে তার মাথা ঘুরে গেলো। কয়েকজন বাঙালি বা ভারতীয় আর স্থানীয় বর্মী বান্ধবীর সঙ্গে প্যাগোডায় এসেছিলো মেয়েটা। ফর্সা ধবধবে গায়ের রঙ। সুস্বাস্থ্যের আভায় গাল দুটো লালচে, কাশ্মীরি মেয়েদের মতো। প্রথম দর্শনেই বগলাচরণ কুপোকাৎ। এ মেয়েকে বিয়ে করতে না পারলে বেঁচে থাকাই বৃথা– এই হয়ে দাঁড়ালো বগলার দিনরাতের ধ্যানজ্ঞান।
মেয়েটা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করলো সে। জানতে পারলো মেয়েটার নাম পুষ্প চট্টোপাধ্যায় ওরফে চ্যাটার্জী ওরফে পুষপ চটরজী– উড়িয়াভাষী এক বাঙালি ব্রাহ্মণের মেয়ে। ভদ্রলোক রেঙ্গুনের একটা ডাকঘরের পোস্টমাস্টার। খোঁজ নিয়ে বগলাচরণ এও জানতে পারলো যে, পোস্টমাস্টার শিবচরণ চটরজী তাঁর বিয়ের যুগ্যি মেয়ের জন্যে হন্যে হয়ে বাঙালি ব্রাহ্মণ পাত্র খুঁজছেন। সুন্দরী ব্রাহ্মণকন্যাকে বিয়ের এ সুযোগ যে করে হোক কাজে লাগানোর কড়া শপথ নিলো বগলাচরণ।
(চলবে)