পুষপ চটরজীর ইতিবৃত্ত (দ্বিতীয় কিস্তি)
(পূর্বানুবৃত্তি)
৪.
ছোট-বড় অসংখ্য ক্যাঙ, প্যাগোডা রয়েছে রেঙ্গুনে। মহামতি বুদ্ধের প্রতি বর্মিদের ভক্তি-ভালোবাসার কোনো অভাব নেই। প্যাগোডাগুলো সেই বুদ্ধপ্রেমের প্রতীক। ওগুলোর মধ্যে সেরার সেরাটি হলো শোয়েডাগন প্যাগোডা বা স্বর্ণ প্যাগোডা। রেঙ্গুনের কেন্দ্রস্থলে একটা ছোট পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই প্যাগোডার কেন্দ্রীয় স্তূপটি বর্মী বৌদ্ধ স্থাপত্যমালার মধ্যমণি, রেঙ্গুন তথা সমগ্র বার্মার প্রতীকস্বরূপ, পৃথিবীর আশ্চর্যতম ও সুন্দরতম ধর্মীয় স্থাপত্যগুলোর একটি। ৯৯ মিটার উঁচু এ স্তূপের চুড়ো থেকে ভিৎ পর্যন্ত আগাগোড়া সোনার পাতে মোড়া এবং স্বর্ণমণ্ডিত শিখরটি একের পর এক হীরকমাল্যখচিত। সূর্যের উদয় এবং অস্তকালে যারা একবার এ প্যাগোডা দেখেছে, জীবনে ভুলবে না। সন্ধ্যার পর অসংখ্য দীপের আলোয় আর ক্রমঘনায়মান আঁধারের আবছায়ায় এক অতীন্দ্রিয় চেহারা নেয় প্যাগোডাটি।
পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা প্যাগোডাটি রেঙ্গুন শহরের প্রায় সব জায়গা থেকে দেখা যায়। বগলাচরণ দাসের দোকান কাম বাড়ি থেকেও। রোজ ঘুম থেকে উঠে দুর্গা দুর্গা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে পূর্বাকাশে নবোদিত সূর্য প্রণামের পাশাপাশি স্বর্ণ প্যাগোডার সূর্যকরোজ্জ্বল চুড়োর দিকেও একটা পেন্নাম ঠুকে দিয়ে তবেই দিনের কাজ শুরু করতো বগলা।
রেঙ্গুনে প্রথম আসার পর পর একদিন শোয়েডাগন দেখতে গিয়েছিলো বগলা। দেখে একদম হাঁ হয়ে গিয়েছিলো। তাদের চট্টগ্রামেও ঢের ঢের ক্যাঙ আছে শহরে, গ্রামেগঞ্জে, পাহাড়ে। তাদের গ্রামের পাশে ক্যাঙে ক্যাঙে ভর্তি বাঙালি বৌদ্ধ বড়–য়াদের গ্রাম মহামুনিতে অতিকায় বুদ্ধমূর্তিও দেখেছে সে, যেটাকে দেখতে গেলে মাথা ঝুঁকিয়ে নত হয়ে মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকতে হয়। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সে-মূর্তির পুরোটা দেখা যায় না।
রেঙ্গুনে আসার আগে আকিয়াবে থাকাকালেও কত সুন্দর সুন্দর ক্যাঙ প্যাগোডা দেখেছে বগলা। কিন্তু শোয়েডাগন দেখে তার চোখ একেবারে টেরিয়ে গেলো। সঙ্গে আসা বন্ধুটা– বগলার গাঁয়ের ছেলে, আগে থেকেই রেঙ্গুনে থাকে– বললো, এই পুরো প্যাগোডাটা আগাপাশতলা সোনায় মোড়া। আর ওই যে চুড়োয় তাকে তাকে মালার মতো সব চকচক করছে, ওগুলো সব হিরে। কত মণ সোনা আর কত হিরে আছে এ প্যাগোডায়, সেটা আঁচ করে দেখতে বললো সে বগলাচরণকে।
আঁচ করবে কী! দেখে সেই যে হাঁ করেছে বগলা, তা আর বন্ধই হচ্ছিলো না। তবে একটা জিনিস সে অনুভব করলো যে, এত সোনা-হিরের ঔজ্জ্বল্যে লোভ-লালসার প্রখরতার বদলে জ্যোৎস্নার মতো এক প্রশান্তি। মনে মনে সে স্থির করেছিলো, সে এখানে রোজ না পারলেও প্রায়ই আসবে।
কিন্তু বগলার এ সিদ্ধান্ত কাজির গরুর মতো কেতাবেই রয়ে গেলো, গোয়ালে গেলো না। নতুন ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে কাজেকম্মে সে এমন ডুবে গেলো যে শোয়েডাগনে যাওয়ার ফুরসত পরের দশ বছরে তার আর হয়ে উঠলো না। বোধিতরুমূলে বুদ্ধের মতো ভাগ্যতরুমূলে ‘ইহাসনে শুষ্যতু মে শরীরম্’ গোছের কঠোর সাধনায় মগ্ন হয়ে গিয়েছিলো সে।
৫.
দশ বছরে বগলার ভাগ্যতরু আকাশ না ছুঁলেও যথেষ্ট ডালপালাবিস্তারি যখন হয়ে উঠলো, তখন একদিন তার মনে হলো এবারের প্রবারণা পূর্ণিমায় সে শোয়েডাগনে বুদ্ধের মূর্তির সামনে বাতি জ্বালাতে যাবে।
হিন্দুদের সেদিন কোজাগরি পূর্ণিমা। কদিন আগেই মহাসমারোহে দুর্গাপূজা হয়ে গেছে রেঙ্গুনের বাঙালি পাড়াগুলোতে। বাতাসে ছড়িয়ে শারদোৎসবের রেশ। অনেকটা বাংলাদেশের মতোই প্রকৃতি বার্মার। আকাশ এখন ঘননীল। ইরাবতী নদীর তীরে কাশফুলের সমারোহ দেখে বাংলার কোনো নদী বলে ভুল হয়ে যায়।
কোজাগরি লক্ষ্মীপুজোটা বেশ ধুমধামের সঙ্গেই করে ঐশ্বর্যদাত্রী দেবীর প্রসাদকামী বগলাচরণ। বাসা কাম দোকানের সামনে ফাঁকা
জায়গাটায় প্যান্ডেল বানিয়ে লক্ষ্মীর প্রতিমা বসিয়ে পুজো করে সে। দশভুজা বাড়ির চাটগেঁয়ে পরিবারগুলোসহ বন্ধুবান্ধব, খদ্দের, ভারতীয়-বাঙালি, স্থানীয বর্মী নির্বিশেষে সবাইকে নিমন্ত্রণ করে ভরপেট ফলমূল, লুচি-পায়েস, পাঁচ রকমের মিষ্টি প্রসাদ খাওয়ায়।
প্রত্যেক বার লক্ষ্মীপুজোয় এলে দশভুজা বাড়ির চাটগেঁয়ে দাদা-বউদিদের কেউ কেউ বলতো, “লক্ষ্মীপূজা ত খুব করর! মা লক্ষ্মীয়ে কৃপা-অ বউত করের! তোই তোঁয়ার ঘরর লক্ষ্মীউয়া কঁ’ত্তে আনিবা, অ বগলা?” (লক্ষ্মীপুজো তো খুব করছো! মা লক্ষ্মী কৃপাও অনেক করছে! তো তোমার ঘরের লক্ষ্মী আনবে কখন, বগলা?)
কোনো উত্তর দিতে না পেরে বগলা মাথা নিচু করে থাকতো বা আমতা আমতা করে বলতো, “আইন্নম্… আইন্নম্। অ’নারা মুরুব্বিহ’লে উগ্গা ভালা মাইয়া চ’ন-না।” (আনবো আনবো। আপনারা মুরুব্বিরা একটা ভালো মেয়ে দেখুন-না!)
সবাই মাথা নেড়ে সায় দিতো। মেয়ে দেখবে বলে কথা দিতো। দু-একট মেয়ে ওরা দেখিয়েছেও ওখানকার চাটগেঁয়ে সমাজের, জাতে-বংশে বগলাদের পাল্টি ঘরের। কিন্তু তার পছন্দ হয় নি।
এবার লক্ষ্মীপুজোর সন্ধ্যেয় যখন তার আর আশেপাশের আরো কয়েকটি প্যান্ডেলে আর গেরস্তবাড়িতে ধুম আরতি চলছে, বগলাচরণ একটা লাইঞ্ছা, মানে হাতে টানা রিকশা চেপে বেড়িয়ে পড়লো। চালককে বললো শোয়েডাগন প্যাগোডার দিকে যেতে।
লাইঞ্ছাটা যখন ধীরে ধীরে শোয়েডাগনের দিকে এগুচ্ছিলো, বগলাচরণ চারপাশে চেয়ে চেয়ে দেখছিলো আর মুগ্ধ হচ্ছিলো। সারা রেঙ্গুন শহর, সারা বার্মা আজ আলোর মালায় সেজেছে। ক্যাঙগুলো ঝলমল করছে আলোয় আলোয়। আকাশে উড়ছে রঙবেরঙের শয়ে শয়ে ফানুস। রাস্তায় সুবেশ নর-নারীর ভিড়। বিশেষ করে সুন্দরী বর্মী মেয়েরা আজ যেন তাদের রূপের জৌলুসে সবার চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।
বগলাচরণের বড় ভালো লাগছিলো, যেমনটা তার এই তিরিশোর্ধ্ব জীবনে আর কখনও লাগে নি। ব্যবসায় বড় দাঁও মারলেও তার খুব আনন্দ হয়। কিন্তু এটা একদম অন্যরকমের একটা অনুভূতি! যেন তার জীবনে মহার্ঘ্য কিছু-একটা, কেউ-একটা আসছে, যার আসার কথা ছিলো।
কোজাগরি-প্রবারণা পূর্ণিমার সেই রাতে অদূরে আকাশের পটে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকা শোয়েডাগনের চুড়ো তাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিলো তার জীবনের অনিবার্য কোনো প্রাপ্তি বা পরিণতির দিকে।
লাইঞ্ছাটা শোয়েডাগনের পাহাড়ের পাদদেশে এসে দাঁড়ালে, বগলচরণ তাকে দাঁড়াতে বলে প্রধান ফটক দিয়ে প্যাগোডার হাতায় ঢুকে পড়লো। তার আগে ফটকের পাশের একটা দোকান থেকে বড় বড় কয়েকটা মোমবাতি আর ধুপকাঠির প্যাকেট কিনতে ভুললো না।
প্যাগোডায় ঢুকে মূল স্তূপের সামনে নির্দিষ্ট জায়গায় মোমবাতি আর ধূপকাঠিগুলো জ্বালিয়ে, বুদ্ধের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে মাথা তোলার সঙ্গে সঙ্গেই বগলা তাকে দেখতে পেলো। শাড়ি পড়া একটি মেয়ে– বয়েস মনে হলো ষোলো-সতেরোর বেশি হবে না। সঙ্গে সমবয়সী আরা কয়েকটি মেয়ে, কারো পরনে শাড়ি, কারো বর্মী মেয়েদের পোশাক ব্লাউজ আর থামি।
মেয়েটা বাতি জ্বালিয়ে সোজা হওয়ামাত্র বগলার সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো। বগলার প্রতিটি শিরার মধ্যে দিয়ে যেন একটা বিদ্যুৎ বয়ে গেলো! তার রক্তের ভেতর থেকে কেউ যেন জানান দিলো– এই তো সে! একেই তোমার পেতে হবে, বগলাচরণ! সামনে অমিতাভ গৌতমের মহাকায় মূর্তির দিকে তাকালো সে। দেখলো, প্রভু তাকে আশীর্বাদ করছেন অভয় মুদ্রায়। তাঁর অর্ধনিমীলিত চোখে করুণা আর কৌতুক।
এবং এভাবেই এক কোজাগরী-প্রবারণা পূর্ণিমার রাতে বগলাচরণ দাসের জীবনে আবির্ভাব ঘটলো পুষপ চটরজীর। বগলাচরণের জীবন তাতে পূর্ণতর হয়েছিলো নিঃসন্দেহে। কিন্তু পুষপ’র জীবনে সে-রাতের পূর্ণচন্দ্র আসলে ছিলো নষ্টচন্দ্র। না হলে তার পরবর্তী জীবনে কৃষ্ণপক্ষ কেন এত দীর্ঘ তমসাময় হলো? কেন সে আর পূর্ণিমার দেখা পেলো না?
তবুও পুষপ চটরজীর জীবনেও রেঙ্গুনের শোয়েডাগন প্যাগোডায় সেই রাতই ছিলো তার জীবনের শ্রেষ্ঠ পূর্ণিমারাত, বা পূর্ণতার রাত, যে-রাতে সে চোখ রেখেছিলো বগলাচরণের চোখে। আসলে সে-রাতের কোজাগরি-প্রবারণার চাঁদ পুষপের জীবনে একই সঙ্গে বয়ে নিয়ে এসেছিলো এক পূর্ণ-শূন্য কূটাভাসের আগামীর শুরুয়াত।