Loading

ঠান্ডা গোশত: সাদাত হাসান মান্টো’র গল্প

[উর্দু সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল সাদাত হাসান মান্টো’র পরিচয় নতুন করে দেয়ার অবকাশ কম। খ্যাতিমান এই লেখক রচিত ছোটগল্পগুলোর মধ্যে ‘ঠান্ডা গোশত’’-কে সেরাদের একটা বললে বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। ভারত বিভাজন-কেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার এক মর্ম ন্তুদ পরোক্ষ চিত্র রচিত হয়েছে এ কাহিনিতে।
ফেসবুক বন্ধুদের জন্যে গল্পটা অনুবাদ করে দিলাম।]
…………………………………………………………….

ঈশর সিংহ জুঁই হোটেলের কামরায় এসে ঢুকলে, খাটে শুয়ে থাকা কুলবন্ত্ কৌর উঠে বসল। ধারালো চোখ দুটো ঈশরের দিকে ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে, খাট থেকে নেমে দরজার ছিটকিনি বন্ধ করল সে। তখন রাত বারোটা বেজে গিয়েছে, শহরের কেন্দ্রস্থল ছেয়ে গিয়েছে এক অদ্ভুত ধরনের নীরবতায়।

কুলবন্ত্ কৌর খাটের উপর বসে পড়ল আসনপিঁড়ি হয়ে। ঈশর সিংহ সম্ভবত তার বিভ্রান্তিকর চিন্তার জট পাকানো সুতোগুলো খুলতে খুলতে এককোণায় দাঁড়িয়ে ছিল কৃপাণ হাতে। কয়েকটা মুহূর্ত চুপচাপ কেটে গেল এভাবেই। খানিকক্ষণ পর নিজের বসার ঢঙটা কুলবন্তের পছন্দ হল না। তখন দুই পা খাট থেকে ঝুলিয়ে দিয়ে দোলাতে লাগল সে। ঈশর সিংহ তখনও কিছু বলল না।

কুলবন্ত্ কৌর ভরভরন্ত হাত-পাওয়ালা একজন মেয়েছেলে। চওড়া গোলগাল পাছা, থলথলে মাংসে ভরপুর আর অনেকটা বেশিই উঁচিয়ে ওঠা বুক, ধারালো চোখ। ঠোঁটের ওপরে যেন সুর্মা দিয়ে আঁকা গোঁফের সরু নীলচে রেখা, চিবুকের দৃঢ়তা দেখে মনে হয় বড় বেপরোয়া মেয়েছেলে সে।

ঈশর সিংহ মাথা নিচু করে চুপচাপ এককোণায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার মাথায় কষে বাঁধা পাগড়িটা ক্রমশ ঢিলে হয়ে যাচ্ছিল। কৃপাণ ধরে রাখা তার হাত একটু একটু কাঁপছিল। কিন্তু তার দেহের গঠন আর উচ্চতা দেখে মনে হচ্ছিল, কুলবন্ত্ কৌরের মতো মেয়েছেলের জন্যে উপযুক্ত মরদদের মধ্যে সে-ই সেরা।

আরো কয়েক মুহূর্ত এভাবে চুপচাপ কেটে যাওয়ার পর কুলবন্ত্ কৌর গভীর আবেগে উথলে উঠল, তবে ধারালো চোখ দুটো আড়াল করে কেবল এতটুকুই বলতে পারল, “ঈশর, প্রিয়তম।”

ঈশর সিংহ মাথা তুলে কুলবন্ত্ কৌরের দিকে তাকাল, কিন্তু তার চোখে চোখ না রেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

কুলবন্ত্ কৌর চিৎকার করে বলল, “ঈশর প্রিয়তম।” কিন্তু দ্রুত সে স্বরটা নামিয়ে নিল আর খাট থেকে নেমে ঈশর সিংহের কাছে গিয়ে বলল, “কোথায় ছিলে তুমি এতদিন?”

শুকনো ঠোঁটে বোল ফুটিয়ে ঈশর সিংহ বলল, “আমি জানি না।”

কুলবন্ত্ কৌর চটে গেল, “এটাও কোনো একটা জবাব হল?”

ঈশর সিংহ হাতের কৃপাণ একধারে ফেলে দিয়ে খাটে শুয়ে পড়ল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল কয়েক দিনের অসুস্থ সে। কুলবন্ত্ কৌর খাটের দিকে তাকাল, যেটা এখন পুরোপুরি ঈশর সিংহের দখলে। তার মনে একটা সমবেদনার আবেগের সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। তাই ঈশর সিংহের মাথায় হাত রেখে বড় ভালোবাসার সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করল, “জান, কী হয়েছে তোমার?”

ঈশর সিংহ চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেখান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে সে কুলবন্ত্ কৌরের ভরাট শরীরটাকে হাতড়াতে শুরু করল, “কুলবন্ত্!”

এ কণ্ঠস্বরে দরদ ছিল। কুলবন্ত্ কৌরের সারা সত্তা নিংড়ে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “বলো, জান,” এ কথা বলে সে তার দাঁত দিয়ে ঈশরকে একটু একটু করে কামড়াতে লাগল।

ঈশর সিংহ তার মাথার পাগড়ি খুলে ফেলল। কুলবন্ত্ কৌরের দিকে তাকাল প্রশ্রয়প্রার্থীর দৃষ্টিতে, তার মাংসল পাছায় জোরে থাপ্পড় মারল আর মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের মনে বলল, “এ মেয়ের মাথাটাই খারাপ।”

মাথা ঝাঁকি দেয়ায় তার চুলগুলো খুলে গেল। কুলবন্ত্ কৌর তার আঙুলগুলো দিয়ে ঈশর সিংহের চুলে বিলি কাটতে লাগল। এটা করতে করতে সে অনেক আদর করে জিজ্ঞেস করল, “ঈশর, প্রিয়তম, কোথায় ছিলে তুমি এতদিন?”

“খারাপের মায়ের বাড়ি।” ঈশর সিংহ ঘুরে তাকাল কুলবন্ত্ কৌরের দিকে আর সাথে সাথেই দুহাত দিয়ে তার উপচে পড়া স্তন দুটো কচলাতে লাগল, “ওয়াহ্ গুরুর কসম, বড় টগবগে মেয়েমানুষ তুমি!”

কুলবন্ত্ কৌর এক মধুর ভঙ্গিতে ঈশর সিংহের হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমাকে আমার মাথার দিব্যি, কোথায় ছিলে বল? … শহরে গিয়েছিলে।”

ঈশর সিংহ তার মাথার চুলগুলোকে একসঙ্গে জড়ো করে ঝুঁটি বাঁধতে বাঁধতে জবাব দিল, “না।”

কুলবন্ত্ কৌর চটে গেল, “না, তুমি নিশ্চয় শহরে গিয়েছিলে… আর তুমি অনেক টাকা লুটেছ, যা আমার কাছে লুকাচ্ছ।”

“যে তোমাকে মিথ্যে বলে সে তার বাপের পয়দা নয়।”

কুলবন্ত্ কৌর অল্পক্ষণের জন্যে চুপ হয়ে গেলেও শিগগিরই আবার ফুঁসে উঠল।

“কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, ওই রাতে তোমার কী হয়েছিল?… বেশ ভালোই তো আমার সঙ্গে শুয়ে ছিলে, আমাকে তুমি সেই সব গয়নাগুলো পরিয়েছিলে, যেগুলো তুমি শহর থেকে লুট করে নিয়ে এসেছিলে। আমার মাইগুলো নিয়ে খেলছিলে, কিন্তু হঠাৎ তোমার কী হয়েছিল কে জানে, উঠে কাপড় পরে সোজা বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলে।”

ঈশর সিংহের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কুলবন্ত্ কৌর এ পরিবর্তন দেখে বলল, “দেখো রঙটা কেমন নীলচে হয়ে গেছে… ঈশর প্রিয়, ওয়াহ্ গুরুর দিব্যি, নিশ্চয় এর ভেতরে গোলমেলে কোনো ব্যাপার আছে?”

“তোমার জানের কসম, কিচ্ছু নেই।”

ঈম্বর সিংহের গলার আওয়াজ ছিল নিষ্প্রাণ। কুলবন্ত্ কৌরের সন্দেহ আরো ঘনীভূ‚ত হল। ঠোঁট চেপে একেকটা শব্দে জোর দিয়ে দিয়ে সে বলল, “ঈশর প্রিয়তম, ব্যাপারটা কী! আট দিন আগে তুমি যা ছিলে, আজ তো সেই একই মানুষ নও?”

ঈশর সিংহ এক ঝটকায় পুরোপুরি উঠে বসল, যেন কেউ তার ওপর হামলা করেছে। কুলবন্ত্ কৌরকে নিজের সবল বাহুতে বেঁধে পূর্ণোদ্যমে তাকে কামড়াতে শুরু করল। “জান, আমি একই রকম আছি… ঘট ঘট পা জফিয়াঁ, তেরী নিকলে হডাঁ দী গর্মী…”

কুলবন্ত্ কৌর কোনো বাধা দিল না, কিন্তু প্রশ্ন করতেই থাকল, “ওই রাতে তোমার কী হয়ে গিয়েছিল?”

“খারাপের মায়ের ওটা হয়ে গিয়েছিল।”

“বলবে না?”

“কিছু বলার থাকরে তবে তো বলব।”

“যদি মিথ্যে বল তো আমার মরা মুখ দেখবে।”

ঈশর সিংহ নিজের বাহুপাশে কুলবন্ত্ কৌরের গলা জড়িয়ে ধরে নিজের ঠোঁট তার ঠোঁটে চেপে ধরল। তার গোঁফের চুল কুলবন্ত্ কৌরের নাকের ফুটোয় ঢুকে যাওয়ায় তার হাঁচি পেয়ে গেল। হাসতে লাগল তারা দুজন।

ঈশর সিংহ তার গা থেকে হাতকাটা কুর্তিটা খুলে ফেলে গভীর কামনার দৃষ্টিতে কুলবন্ত্ কৌরের দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে চলো-ও-ও, একদান তাস খেলা হয়ে যাক!”

কুলবন্ত্ কৌরের ঠোঁটের ওপরে ঘামের ছোট ছোট বিন্দু ফুটে উঠছিল। এক মোহনীয় ভঙ্গিতে সে তার চোখের তারা ঘুরিয়ে বলল, “চলো, তাস বাঁটো।”

ঈশর সিংহ তার ভরভরন্ত পাছায় জোরে একটা চিমটি কাটল। কুলবন্ত্ কৌর ধড়ফড়িয়ে একপাশে সরে গেল। “এমন কোরো না, ঈশর প্রিয়তম, আমি ব্যথা পাচ্ছি।”

ঈশর সিংহ এগিয়ে গিয়ে কুলবন্ত্ কৌরের ওপরের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে একটু করে পিষতে লাগল। কুলবন্ত্ কৌর একেবারে গলে গেল। ইশর সিংহ এবার গায়ের কোর্তা খুলে ফেলে দিয়ে বলল, “নাও, এবার শুরু হবে তুরুপ ফেলা…”

কুলবন্ত্ কৌরের ওপরের ঠোঁটটা দপদপ করছিল। ঈশর সিংহ দুহাতে কুলবন্ত্ কৌরের কামিজের ঘের ধরে ছাগলের চামড়া ছাড়ানোর মতো করে সেটা খুলে নিয়ে একধারে রেখে দিল। তারপর ঘুরে তাকিয়ে তার নগ্ন শরীর দেখতে দেখতে তার বাহু দুটোতে চিমটি কাটতে কাটতে বলল, “কুলবন্ত্, ওয়াহ্ গুরুর কসম, বড় কড়া জওয়ানির মেয়েছেলে তুই।”

কুলবন্ত্ কৌর নিজের বাহুতে ফুটে ওঠা লাল লাল দাগগুলো দেখতে দেখতে বলল, “তুই বড় জালিম, ইশ^র জান।”

ইশ^র সিংহ তার ঘন কালো গোঁফের ফাঁকে হাসল, “আজ কিছু জুলুম হতে দিবি?” এই বলেই সে আরো বেশি জুলুম করা শুরু করে দিল। দাঁতের নিচে কুলবন্ত কৌরের ঠোঁটটা সে আরো জোরে পিষতে লাগল। কানের লতিতে কামড় দিল, উপচে পড়া স্তন দুটোকে দলাই মলাই করল, উপচে পড়া পাছাটায় সশব্দে চাপড় মারল। গাল দুটো ভরিয়ে দিল চুমায় চুমায়। স্তনের বোঁটাগুলো চুষতে চুষতে সারা বুক ভিজিয়ে দির মুখের লালায়।

কুলবন্ত্ কৌর জোরালো আঁচে বসিয়ে দেয়া হাঁড়ির মতো টগবগ করে ফুটছিল। কিন্তু তার এতসব হেলদোল সত্তে¡ও ঈশর সিংহ নিজের মধ্যে কোনো উত্তাপের সৃষ্টি করতে পারল না। যত শৃঙ্গারকৌশল আর আলিঙ্গন-চুম্বন তার জানা ছিল, সব সে প্রয়োগ করল কুস্তি করতে নামা পালোয়ানের মতো, কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হল না। কুলবন্ত্ কৌরের দেহের তারগুলো টান টান হয়ে গিয়ে নিজে নিজেই বেজে চলেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত এসব অপ্রয়োজনীয় মর্দন-পেষণে বিরক্ত হয়ে বলল, “ঈশর সঁইয়া, অনেকক্ষণ তো তাসালি, এবার পাত্তি ফেল্!”

এটা শোনার পরই ঈশর সিংহের হাত থেকে যেন তাসের পুরো গোছাটাই খসে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে কুলবন্ত্ কৌরের পাশে শুয়ে পড়ল সে আর তার মাথায় জমে উঠতে লাগল ঠান্ডা ঘামের প্রলেপ। তাকে গরম করে তোলার অনেক চেষ্টা করল কুলবন্ত্ কৌর, কিন্তু সফল হল না। এতক্ষণ পর্যন্ত সবকিছু তো মুখে কিছু না বলেই হচ্ছিল, কিন্তু এখন যখন কুলবন্ত্ কৌরের সব প্রতীক্ষা নিষ্ফল বলে প্রতীয়মান হতে যাচ্ছিল, খেপে গিয়ে সে খাট থেকে নিচে নেমে পড়ল। সামনে খুঁটির ওপর চাদর ঝোলানো ছিল, সেটাকে টেনে নামিয়ে সে গায়ে জড়িয়ে নিল, তারপর নাক ফুলিয়ে, ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, “ঈশর প্রিয়তম, সে কোন্ হারামজাদি, যার কাছে তুই এতদিন থেকে এসেছিস, যে তোর সব রস নিঙড়ে নিয়েছে?”

ঈশর সিংহ খাটের ওপর শুয়ে শুয়ে হাঁফাতে লাগল এবং কোনো জবাব দিল না।

কুলবন্ত্ কৌর রাগে ফুলছিল, “আমি জিজ্ঞেস করছি, ওই বেশ্যাটা… ওই খানকিটা, ওই চোরা তাসটা কে?”

ঈশর সিংহ ক্লান্ত স্বরে জবাব দিল, “কেউ নয়, কুলবন্ত্, কেউই নয়।”

কুলবন্ত্ কৌর নিজের ভরাট নিতম্বে হাত রেখে দৃঢ়নিশ্চয়তার সঙ্গে বলল, “ঈশর জান, আমি আজ সত্যি-মিথ্যে সব জেনেই ছাড়ব… ওয়াহ্ গুরুজির কসম খেয়ে বল্, এর ভেতরে কি কোনো মেয়েছেলে লুকানো নেই?”

ঈশর সিংহ কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কুলবন্ত্ কৌর তার সুযোগ দিল না। “কসম খাওয়ার আগে মনে রাখিস যে, আমি সর্দার নিহাল সিংহের মেয়ে… মিথ্যে বলবি তো কেটে কুচি কুচি করে ফেলব। নে, এখন ওয়াহ্ গুরুজির কসম খা… বল্, এর ভেতরে কি কোনো মেয়েছেলে লুকানো নেই?”

ঈশর সিংহ বড় দুঃখের সঙ্গে হ্যাঁ-বোধকভাবে মাথা নাড়লে, কুলবন্ত্ কৌর পুরোপুরি পাগল হয়ে গেল। লাফ দিয়ে ঘরের কোণ থেকে কৃপাণ উঠিয়ে নিল সে, তার খাপটা কলার খোসার মতো একটানে খুলে ফেলে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিল, আর তারপর সোজা পোঁচ দিয়ে বসল ঈশর সিংহের ঘাড়ে।

দেখতে দেকতে রক্তের ফোয়ারা ছুটল। কুলবন্ত্ কৌর এতেও শান্ত না হয়ে বনবেড়ালের মতো ঈশর সিংহের চুল ধরে টানতে লাগল। সাথে সাথে সে তার অজানা সতিনকে বিশ্রী বিশ্রী গাল দিয়ে যাচ্ছিল। একটুক্ষণ পর ঈশর সিংহ দুর্বল কণ্ঠে মিনতি করল, “বাদ দে এসব, কুলবন্ত্! বাদ দে।”

তার কণ্ঠস্বরে যন্ত্রণার ছাপ ছিল। কুলবন্ত্ কৌর পিছে হটল।

রক্ত ঈশর সিংহের গলা থেকে উড়ে উড়ে তার গোঁফে গিয়ে পড়ছিল। নিজের কম্পমান ঠোঁট খুলে ধন্যবাদ আর অভিযোগের মিলিত দৃষ্টিতে কুলবন্ত্ কৌরের দিকে তাকিয়ে বলল, “জান, তুমি বড় জলদি করে ফেলেছ… তবে যা করেছ ঠিকই করেছ।”

কুলবন্ত্ কৌরের ঈর্ষার আগুন ফের জ¦লে উঠল, “কিন্তু তোমার মা ওই বেটিটা কে?”

রক্ত ঈশর সিংহের জিভ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। যখন সে তার স্বাদ পেল, তার শরীর কেঁপে উঠল।

“আর আমি… আর আমি… ছজন মানুষকে মেরে ফেললাম… এ কৃপাণ দিয়েই…”

কুলবন্ত্ কৌরের মাথার ভেতরে ছিল শুধু অন্য মেয়েমানুষটাই, “আমি জিজ্ঞেস করছি, ওই হারামজাদিটা কে ছিল?”

ঈশর সিংহের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। এক হালকা চমকের জন্ম হয়েছিল তার মধ্যে। কুলবন্ত্ কৌরকে সে বলল, “ওই মাগীটাকে গাল দিস না।”

কুলবন্ত্ চেঁচিয়ে বলল, “আমি জিজ্ঞেস করছি, মাগীটা কে?”

ঈশর সিংহের গলার আওয়াজ রুদ্ধ হযে এলে, “বলছি।” এ কথা বলে সে নিজের ঘাড়ে হাত বোলাল আর তাতে নিজের তাজা রক্ত দেখে মুচকি হাসল, “মানুষ মা– এও এক আজব চিজ।”

কুরবন্ত্ কৌর তার জবাবের প্রতীক্ষায় ছিল। “ঈশর প্রিয়তম, তুই আসল কথাটা বল্।”

ঈশর সিংহের মুচকি হাসি তার রক্তে ভরা ঠোঁটে আরো বেশি করে ছড়িয়ে পড়ল, “আসল কথাটাই বলছি… আমার গলা চিরে গেছে মা… এখন ধীরে ধীরে সব কথা বলে ফেলব।”

আর যখন ও কথাগুলো তৈরি করতে লাগল, ওর কপালে জমে উঠতে লাগল ঘাম।

“কুলবন্ত্, আমার জান… আমি তোমাকে বলতে পারছি না, আমার সঙ্গে কী হয়েছিল। মানুষের মেয়েরাও এক আজব চিজ… শহরে লুটপাট শুরু হওয়ার পর সবার মতো আমিও তাতে যোগ দিলাম… গয়নাপাতি, টাকাপয়সা যা-ই হাতে এসেছে তা তো তোকে দিয়ে দিয়েছি… কিন্তু একটা কথা তোকে বলিনি।”

ঈশর সিংহের জখমের জায়গাটায় যন্ত্রণা হচ্ছিল। কুলবন্ত্ কৌর সেদিকে নজরই দিল না, আর বড় নির্দয়ভাবে জিজ্ঞেস করল, “কোন্ কথা?”

ঈশর সিংহ গোঁফের ওপর জমতে থাকা রক্তগুলোকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে দিতে বলল, “যে বাড়িতে আমি হানা দিয়েছিলাম… সেখানে সাতজন… সাকজন মানুষ ছিল… ছয়জনকে আমি খুন করলাম… এই কৃপাণ দিয়ে, যেটা দিয়ে তুই আমাকে… বাদ দে সে-কথা… শোন… ওখানে একটা মেয়ে ছিল খুব সুন্দর… তাকে আমি উঠিয়ে নিয়ে চলে এসেছিলাম।

কুলবন্ত্ কৌর সব চুপচাপ শুনে গেল। ঈশর সিংহ আবার একবার ফুঁ মেরে গোঁফের ওপর থেকে রক্ত সরাল, “কুলবন্ত্ জান, তোমাকে কী বলব, কত সুন্দর ছিল মেয়েটা… ওকেও মেরে ফেলতাম, কিন্তু মনে মনে নিজেকে বললাম, না ঈশর প্রিয়তম, কুলবন্ত্ কৌরের মজা তো সবসমইে নাও, এখন এই মেওয়াটাও একটু চেখে দেখ।”

কুলবন্ত্ কৌর এবার শুধু বলল, “হুঁ…!”

“আর আমি তাকে কাঁধে ফেলে হাঁটতে শুরু করলাম… রাস্তায়… কী বলছিলাম আমি?… হ্যাঁ, রাস্তায়… খালপাড়ের ধারে অড়হড় ঝোপের নিচে আমি তাকে শুইয়ে দিলাম… প্রথমে ভাবলাম কতক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করব, কিন্তু পরে আবার ভাবলাম, না…” এসব কথা বলতে বলতে ঈশর সিংহের জিভ শুকিয়ে এল।

কুলবন্ত্ কৌর থুতু গিলে নিজের গলা ভিজিয়ে ফের শুধালো, “তারপর কী হল?”

ঈশার সিংহের গলা থেকে অনেক কষ্টে এই শব্দগুলো বেরুল, “আমি… আমি পাত্তি ফেললাম… কিন্তু… কিন্তু…”

তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে গেল।

কুলবন্ত্ কৌর ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, “তারপর কী হল?”

ঈশর সিংহ নিজের বন্ধ হয়ে যেতে থাকা চোখ দুটো খুলল আর কুলবন্ত্ কৌরের দেহের দিকে তাকাল, যা তার প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে কেঁপে কেঁপে উঠছিল।

“ও আমার হয়েছিল… একটা লাশ… একেবারে ঠান্ডা গোশত… জান, আমাকে তোমার হাতটা দাও…”

কুলবন্ত্ কৌর তার হাত ঈশর সিংহের হাতের ওপর রাখল, যেটা ছিল বরফের চেয়েও বেশি ঠান্ডা।

You must be logged in to post a comment.