চর্যাপদ: আধুনিক বাংলায় (পঞ্চম কিস্তি)
চর্যা-২৯
লুইপাদ
ভাব ন হোই অভাব ণ জাই ।
আইস সংবোহেঁ কো পতিআই ।।
লুই ভণই বট দুলক্খ বিণাণা ।
তিঅ ধাএ বিলসই উহ লাগে ণা ।।
জাহের বানচিহ্ন রূব ণ জাণী ।
সো কইসে আগম বেএঁ বখাণী ।।
কাহেরে কিষভণি মই দিবি পিরিছ্ছা ।
উদক চান্দ জিম সাচন মিচ্ছা ।।
লূই ভণই ভাবই কীয্ ।
জা লই অচ্ছম তাহের উহ ণ দিস্ ।।
আধুনিক বাংলায়:
ভাব হয় না, অভাব যায় না,
এমন সংবোধে কেউ প্রত্যয় পায় না।
লুই বলছে বটে বিজ্ঞান দুর্লক্ষ্য
তিন ধাতু বিলাসে উদ্দেশ অপ্রত্যক্ষ।
যার বর্ণ-রূপ কিছুই না জানি
তা কী করে আগম বেদে বাখানি।
কাকে কী বলে আমি দেবো পরিচয়?
জলে চন্দ্রবিম্ব না সত্য, না মিথ্যা হয়।
লুই বলছে, আমি ভাববো কী নিয়ে
যা নিয়ে আছি তার দিশা না জানিয়ে?
রূপকার্থ:
জগতের কোনো অস্তিত্ব নেই, এই সম্যক বোধ নিয়ে অনেকে মনে করেন, জগতের অভাবেও কিছু লোপ পায় না। কিন্তু এই বোধের দ্বারা সহজানন্দের প্রত্যক্ষ অনুভূতি পাওয়া যায় না। সহজানন্দের বিজ্ঞান আলাদা, তা ইন্দ্রিয়াতীত। তাই তিন ধাতু, অর্থাৎ দেহ-মন-বাক্যের সাহায্যে যাঁরা এই অতীন্দ্রিয় অনুভূতির ব্যাখ্যা করতে চান, তাঁরা আসলে ব্যাপারটা ঠিক জানেন না। অন্যদিকে, যুক্তিবাদীরা হৃদয়ানুভূতির ধার দিয়েও যান না। যুক্তি দিয়েই তাঁরা বিশ্বজগতকে মিথ্যে বলেন, যুক্তি দিয়েই পেতে চান সহজানন্দকে। আনন্দের রহস্যময় অনুভূতি থেকে তাঁরা বঞ্চিত। যাঁর স্বরূপ সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না, যাঁর বর্ণ, চিহ্ন, রূপ—সবই বর্ণনাতীত ও অজানা, তাঁকে কি বেদ বা আগম শাস্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে! জলে বিম্বিত চাঁদ যেমন সত্য নয়, আবার মিথ্যাও নয়, যোগীর হৃদয়ে জগৎ সম্পর্কে ধারণাও তেমনি না সত্য, না মিথ্যা। আসলে যতক্ষণ যুক্তির প্রাধান্য, ততক্ষণ সংশয়েরও প্রাধান্য। চিত্তকে যদি অচিত্ততায় লীন করা যায়, যুক্তির চেয়ে হৃদয়ানুভূতিকেই যদি বড় করে দেখা হয়, তবেই যোগী সহজানন্দে লীন হতে পারেন। সে-অবস্থায় উপনীত হতে পেরেছেন বলেই লুইপাদ আর কী ভাববেন, কী বলবেন, তা নিয়ে দিশাহারা।
চর্যা-৩০
ভুসুকুপাদ
করুন মেহ নিরস্তর ফরিআ ।
ভাবাভাব দ্বন্দল দলিয়া ।।
উইত্তা গঅণ মাঝেঁ অদভুআ ।
পেখরে ভুসুকু সহজ সরুআ ।।
জাসু সুনন্তে তুট্টই ইন্দিআল ।
নিহুরে ণিঅ মন ণ দে উলাস ।।
বিসঅ বিশুদ্ধিঁ মই বুঝ্ঝিঅ আনন্দে ।
গঅনহ জিম উজোলি চান্দে।।
এ তৈলোএ এত বিষারা ।
জোই ভুসুকু ফেড়ই অন্ধকরা ।
আধুনিক বাংলায়:
করুণা মেঘ নিরন্তর স্ফূরিত
ভাবাভাবের দ্বন্দ্ব দলিত।
উদিত গগন মাঝে অদ্ভুত
দেখ রে ভুসুক সহজ স্বরূপ।
যাকে শুনলে টুটে ইন্দ্রিয়পাশ
নিভৃতে নিজ মন দেয় উল্লাস।
বিষয় বিশুদ্ধি আমি বুঝলাম আনন্দে
গগনে যেমন উজলিল চাঁদে।
এই ত্রিলোকে এটাই হলো সার
যোগী ভুসুকু ফাড়ে* অন্ধকার।
* ফেড়ে ফেলে বা বিদীর্ণ করে
রূপকার্থ:
ভাব-অভাবের দ্বন্দ্ব যখন মিটে গেছে, গ্রাহ্য-গ্রাহক ভাব সাধকের মন থেকে অবলুপ্ত, তখনই করুণা-মেঘ বা নির্বাণের আনন্দ চিদাকাশে প্রস্ফূরিত। চিত্তের আকাশে তখন সহজানন্দের বিকাশ, বিষয়বোধ সম্পূর্ণ বিনষ্ট, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বাঁধন ছিন্ন—এ অবস্থায় মন তো উল্লসিত হবেই। আকাশে চাঁদ উঠলে যেমন নিবিড় অন্ধকার কেটে যায়, তেমনি ভুসুকুপাদের মনে জ্ঞানোদয়ের উজ্জ্বল আলোকে অজ্ঞানান্ধকার দূর হয়ে গেছে। তিন ভুবনে এই আনন্দই হলো সার বস্তু। মায়াবৃত পৃথিবীর মোহান্ধকার বিদীর্ণ করে ভুসুকুপাদ এই সহজানন্দের স্বাদ পেয়েছেন।
চর্যা-৩১
আর্যদেব
জহি মণ ইন্দিঅ পবণ হো ণঠা ।
ণ জানমি অপা কঁহি গই পইঠা ।।
অকট করুণ ডমরুলি বাজঅ ।
আজদেব ণিরাসে রাজই ।।
চান্দরে চান্দকান্তি জিম পতিভাসঅ ।
চিঅবি বিকরণে তহি টলি পইসই ।।
ছাড়িঅ ভয় ঘিন লোআচার ।
চাহন্তে চাহন্তে সুণ বিআর ।।
আজদেবেঁ সঅল বিহরিউ ।
ভয় ঘিণ দুর ণিবরিউ ।।
আধুনিক বাংলায়:
যেখানে ইন্দ্রিয়পবন হয়ে নষ্ট মন
জানি না কোথায় আত্মার প্রবেশন।
অদ্ভুত করুণা-ডমরু* বাজে
আর্যদেব নিরালে** বিরাজে।
চন্দ্রে যেমন চন্দ্রকান্তি প্রতিভাস
চিত্ত বিকরণে তথায় টলে নিবাস।
ছেড়ে দিয়ে ভয় ঘৃণা লোকাচার
চেয়ে চেয়ে দেখি শূন্যে বিহার।
আর্যদেব সকল করেছে বারিত
ভয় ঘৃণা সব দূরে নিবারিত।
*করুণারূপ ডমরু, টিকায় যাকে বলা হয়েছে অনাহত নাদ; **নিরালায় বা নিরালম্বে
রূপকার্থ:
অজ্ঞানান্ধকার দূর হয়ে যখন তত্ত্বজ্ঞানের আবির্ভাব ঘটে, তখন পবনের মতো চঞ্চল প্রধান ইন্দ্রিয় মনের কাজ লোপ পায়। চিত্ত তখন কোথায় লোপ পায় তার খোঁজ পাওয়া যায় না। সে-অবস্থায় পৌঁছলে করুণা-ডমরুর অনাহত ধ্বনির সৃষ্টি হয়, অর্থাৎ কার্যকারণবোধ লুপ্ত হয়। আর্যদেব এ অবস্থায় পৌঁছে গেছেন বলেই নিরালম্বে বিরাজ করছেন। চাঁদ অস্ত গেলে যেমন জ্যোৎস্নাও মিলিয়ে যায়, তেমনি চিত্ত অচিত্ততায় লীন হয়ে গেলে চিত্তের বিকল্পগুলো নষ্ট হয়ে যায়। আর্যদেবের চিত্তের ভাব-বিকল্পগুলো বিনষ্ট, তাই তিনি ভয়, ঘৃণা, লোকাচারকে ত্যাগ করতে পেরেছেন। গুরু-নির্দেশিত সাধনার পথে তাকিয়ে তাকিয়ে তিনি দেখতে পাচ্ছেন, সমস্ত ভাবগুলি অস্তিত্বহীন। সংসারের সকল দোষকে তিনি বিফল করতে পেরেছেন, ভয় ও ঘৃণাকেও পেরেছেন নিবৃত্ত করতে।
চর্যা-৩২
সরহপাদ
নাদন বিন্দুন রবি ন শশিমন্ডল ।
চিঅরাঅ সহাবে মুকুল ।।
উজুরে উজু ছাড়ি মা লেহুরে বাঙ্ক ।
নিঅহি বোহি মা জাহু রে লাঙ্ক ।।
হাথেরে কাঙ্কাণ মা লোড দাপণ ।
আপণে অপা বুঝতু নিঅমণ ।।
পার উআরে সোই গজিই ।
দুজ্জণ সাঙ্গে অবসরি জাই ।।
বাম দাহিণ জো খাল বিখলা।
সরহ ভণই বপা উজুবাট ভাইলা ।।
আধুনিক বাংলায়:
না নাদ, না বিন্দু, না রবি-শশিমণ্ডল
চিত্তরাজ স্বভাবে মুক্ত হল।
ঋজু রে ঋজু, নিয়ো না পথ বাঁকা
নিকটেই বোধি, যেতে হবে না লঙ্কা।
হাতের কাঁকন দেখতে লাগে না দর্পণ
আপনা আপনি বোঝো তুমি নিজ মন।
পার উত্তরণে সে-ই তো যায়
দুর্জনের সঙ্গে সে অধোগতি পায়।
বামে-দক্ষিণে খাল-বিল এড়িয়ে চল
সরহ বলছে, বাপু ঋজুবাট* পাওয়া গেল।
*সোজা পথ
রূপকার্থ:
চিত্তের সমস্ত বিকল্প ত্যাগ করেই সাধক মুক্ত হতে পারেন। এই সোজা পথ বা সহজিয়া সাধনার সাহায্যেই সাধক বোধিজ্ঞান লাভ করতে পারেন। এর জন্যে অন্যপথ অবলম্বন করার দরকার হয় না। বোধি কাছেই আছে, তাকে পাওয়ার জন্যে অনেক জপতপ, ধ্যান, সাধনার প্রয়োজন নেই। হাতের কাঁকন দেখার জন্যে যেমন আয়না ব্যবহারের দরকার নেই, তেমনি আত্মতত্ত্ব বোঝার জন্য অন্যের উপদেশেরও দরকার নেই; আত্মস্বরূপ নিজে-নিজেই উপলব্ধি করতে পারা যায়। এভাবে যে পরমার্থ তত্ত্বের অনুগামী হয়, সে মোহমুক্ত হয়ে পরলোকে যেতে পারে; কিন্তু যে মোহস্বরূপ সদুর্জনের সঙ্গ নেয়, সে অধঃপাতে যায়। সহজ সাধনার পথ ঋজু বা সোজা, সে পথে বিচলিত হওয়া চলে না। তাই সরহপাদ বলছেন, বিপথ, বাঁকা পথ ছেড়ে সোজা পথ নেয়াই সহজিয়া সাধনার জন্যে সবচেয়ে ভালো।
……………………………………………………………………………………..
আগের কিস্তিগুলোর লিঙ্ক: