চর্যাপদ: আধুনিক বাংলায় (অষ্টম কিস্তি)
চর্যা-৪১
ভুসুকুপাদ
আইএ অণুঅনা এ জগ রে ভাংতিএঁ সো পড়িহাই ।
রাজসাপ দেখি জো চমকিই ষারে কিং তং বোড়ো খাই ।।

অষ্ট মহাসিদ্ধ
অকট জোইআ রে মা কর হথা লোহা ।
আইস সভাবেঁ জই জগ বুঝষি তুট বাষণা তোরা ।।
মরুমরীচি-গন্ধনইরী দাপতিবিম্বু জইসা ।
বাতাবত্তেঁ সা দিট ভইআ অপেঁ পাথর জইসা ।।
বান্ধিসুআ জিম কেলি করই খেলই বহুবিহ খেড়া ।
বালুআ তেলেঁ সসর সিংগে আকাশ ফুলিলা ।।
রাউতু ভণই কট ভুসুকু ভণই কট সঅলা অইস সহায় ।
জই তো মুঢ়া অচ্ছসি ভান্তী পুচ্ছতু সদগুরু পাব ।।
আধুনিক বাংলায়:
আদিতে অনুৎপন্ন এ জগৎ রে, ভ্রান্তিতে সে প্রতিভাত হয়
রজ্জুসাপ* দেখে যে চমকায়, তাকে কি বোড়ো সাপে খায়!
আকাট যোগী রে, হাতকে কোরো না লোনা
এমন স্বভাবে জগৎকে বুঝলে, টুটবে তোর বাসনা ।
মরুমরীচিকা গন্ধর্বনগরী দর্পণবিম্ব যেমন
বাতাবর্তে তা দৃঢ় হয়ে পাথর হয় যেমন,
বন্ধ্যাসুত যেমন কেলি করে খেলে বহুবিধ খেলা
বালুর তেলে, শশশৃঙ্গে, আকাশফুলে মেলা।
রাউত বলে কি ভুসুকু বলে, সকলেরই এমন সহায়
যে মূঢ় আছে ভ্রান্তিতে, জিজ্ঞাসো সদ্গুরু পা’য়।
*দড়ির সাপ বা রজ্জুতে সর্পভ্রম
রূপকার্থ:
যাঁরা সত্যিকারের তত্ত্বজ্ঞ, তাঁরা জানেন, এ জগৎ আদৌ উৎপন্ন হয় নি; নিতান্ত ভ্রান্তিতেই মানুষের মনে জগতের অস্তিত্ব সম্পর্কিত জ্ঞান হয়। দড়ি দেখে সাপ বলে ভুল হতে পারে, কিন্তু সত্যি সত্যি তা সাপের মত দংশন করে না। অনুরূপভাবে জগতের অস্তিত্ব সম্পর্কে মিথ্যা জ্ঞান হতে পারে, কিন্তু সে-সংসার অসার। তাই যোগীকে সাবধান করা হচ্ছে, তিনি যেন এই অসার সংসারে হাত লোনা না করেন, অর্থাৎ নিজেকে বিব্রত না করেন। জগৎ মিথ্যা—এ ধারণা যদি মনে গেঁথে নিতে পারা যায়, জগতের আসল স্বভাব যদি জানতে পারা যায়, তবে জাগতিক সব বাসনায় মন থেকে দূর হয়ে যাবে। আসলে এ সংসার মরীচিকার মতো, গন্ধর্বনগরী বা আয়নায় দেখা প্রতিবিম্বের মতো অলীক। ঘূর্ণাবর্তে সৃষ্ট জলস্তম্ভকে যেমন পাথর বলে ভুল হয়, সংসারও তেমনি এক ভ্রান্তিমাত্র। বন্ধ্যাপুত্র নানারকম জিনিস নিয়ে খেলা করছে, এটা যেমন এক হাস্যকর মিথ্যা—বালির তেল, খরগোসের শিং, আকাশের ফুল যেমন অলীক, সংসারও তেমন মিথ্যা। ভুসুকুপাদ বলছেন, জগতের সবকিছুই এরকম মিথ্যা—যদি কেউ এ কথা বুঝতে না পারে, তার উচিত হবে, সদ্গুরুকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেয়া।
চর্যা-৪২
কাহ্নপাদ
চিঅ সহজ শুণ সংপুন্না ।
কান্ধ বিয়োএ মা হোহি বিসন্না ॥

গুরু রিমপোচে
ভণ কইসে কাহ্নু নাহি ।
ফরই অনুদিনং তৈলোএ পমাই ॥
মুঢ়া দিঠ নাঠ দেখি কাঅর ।
ভাঙ্গ তরঙ্গ কি সোষঈ সাঅর ॥
মুঢ়া অচ্ছন্তে লোঅ ন পেখই ।
দুধ মাঝেঁ লড় ণচ্ছংতেঁ দেখই ॥
ভব জাই ণ আবই এসু কোই ।
আইস বিলসই কাহ্নিল জোই ॥
আধুনিক বাংলায়:
চিত্ত সহজ, শূন্য সংপূর্ণ
স্কন্ধ বিয়োগে হয়ো না বিষণ্ণ।
বলো, কীভাবে কাহ্নু নেই
স্ফূরিত অনুদিন ত্রৈলোক্যে প্রবেশেই।
মূঢ়েরা দৃষ্টি নষ্ট দেখে কাতর
ভঙ্গ তরঙ্গ কি শোষে সাগর!
লোকেরা যে আছে মূঢ়েরা দেখে না
দুধের মাঝে সর আছে দেখতে পায় না।
এ ভবে আসে না, যায়ও না কেউই
কাহ্নু যোগী বিলসিত এমনই।
রূপকার্থ:
সিদ্ধাবস্থায় প্রবেশ করলে, চিত্ত সহজাবস্থায় বা অচিত্ততায় লীন হয়ে যায়, শূন্যতার সাধনা সম্পূর্ণ হয়। রূপ-বেদনা প্রভৃতি পঞ্চস্কন্ধ বিলুপ্ত—এ অবস্থায় কাহ্নুপাদের জন্যে বিষণ্ণ হওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ তিনি সমগ্র ত্রিলোকে প্রবেশ করেছেন। একবিন্দু জল যেমন মহাসাগরে পড়লে অসীমতায় লীন হয়ে যায়, কাহ্নুও সহজাবস্থায় সে-দশায় পৌঁছে গেছেন। দৃষ্ট বস্তু নষ্ট হচ্ছে দেখে মূর্খেরা কাতর হয়; কিন্তু এতে কাতর হওয়ার কিছু নেই, কারণ সমুদ্রে তরঙ্গ উঠে সমুদ্রেই মিলিয়ে যায়, সমুদ্রকে তা গ্রাস করতে পারে না। সেভাবে রূপের অপচয়ে বিলোপের পরিকল্পনা ভ্রমমাত্র। দুধের মধ্যে যেমন সর বা স্নেহপদার্থ প্রচ্ছন্ন, তেমনি অভাবের মধ্যেই ভাব লুকিয়ে আছে। পৃথিবীতে কিছু আসে না, যায়ও না—সবই আমাদের মোহ ও ভ্রান্তি। পৃথিবীর এ স্বরূপ কাহ্নপা বুঝেছেন বলেই তিনি এখানে বন্ধনমুক্ত হয়ে সুখে বিলাস করছেন।
চর্যা ৪৩
ভুসুকুপাদ
সহজ মহাতরু ফরিঅএ তৈলোএ।
খসমসভাবে রে বান্ধ মুকা কোএ ।।

বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুন ও সিদ্ধাচার্য আর্যদেব
জিম জলে পাণি আ টলিয়া ভেউ ন জাঅ ।
তিম মণরঅণা রে সমরসে গঅণ সমাঅ ।।
জাসু নাহি অপ্পা তাসু পরেলা কাহি ।
আই অণুঅণারে জাম মরণ তব ণাহি ।।
ভুসুকু ভণই কট রাউতু ভনই কট সঅলা এহ সহাব ।
এথু জাই ণ আবয়ি রে ণ তংহি ভাবাভাব ।।
আধুনিক বাংলায়:
সহজ মহাতরু স্ফূরিত ত্রিলোকে
খসম* স্বভাবে রে বন্ধনমুক্ত কে।
যেমন জলে পানি মিশলে ভেদ করা না যায়
তেমনি মনোরত্ন রে সমরসে গগনে সমায়**।
যার আপন নেই, তার পর কোথায়
আদৌ অনুৎপন্ন যা তার জন্মমরণ নাই।
ভুসুকু বলে কি রাউত বলে, সকলে এই স্বভাব
এখানে গেলে আর আসে না রে, নাই তার ভাবাভাব।
*খ মানে আকাশ; খসম মানে আকাশের সমান বা আকাশের মতো, অর্থাৎ শূন্যতাময়; **প্রবেশ করে
রূপকার্থ:
সহজানন্দরূপ মহাতরু স্ফূরিত হয়ে ত্রৈলোক্যে বিস্তৃত। সেই সহজানন্দে যাঁর চিত্ত অচিত্ততায় লীন, তিনি ভববন্ধন থেকে মুক্ত। তখন মনোরত্ন সমরসতায় মিশে যা, যেমন জলে মিশে যায় জল। তখন সাধকের আত্মপর ভেদজ্ঞান লুপ্ত। পৃথিবী আদৌ উৎপন্ন হয় নি, এই বোধ জন্মানোর ফলে জন্মমৃত্যুর কল্পনাও বিলুপ্ত। পৃথিবীতে কিছুই আসে না বা যায় না, সবই ভ্রান্তিমাত্র। তাই ভুসুকু বলছেন, পৃথিবীতে ভাবাভাব কিছুই নেই।
চর্যা-৪৪
কঙ্কণপাদ
সুনে সুন মিলিআ জবেঁ ।
সকল ধাম উইআ তবেঁ ।।

তন্ত্রাচারে পান-ভোজনের একটি প্রাচীন পটচিত্র
আচ্ছুহুঁ চউখণ সংবোহী ।
মাঝ নিরোহ অণুঅর বোহী ।।
বিদুণাদ ণ হিঁএ পইঠা ।
অণ চাহন্তে আণ বিণঠা ।।
জথাঁ আইলেঁসি তথা জান ।
মাঝেঁ থাকী সঅল বিহাণ ।।
ভণই কঙ্কণ কল এল সাদেঁ ।
সর্ব্ব বিচ্ছরিল তথতা নাদেঁ ।।
আধুনিক বাংলায়:
শূন্যে শূন্য মিলিলো যখন
সকল ধাম উদিলো তখন।
আছি চতুঃক্ষণ সংবোধিতে
মধ্য নিরোধে অনুত্তর বোধিতে।
বিন্দুনাদ না হৃদয়ে পশিলো
এক চাইতে গিয়ে অন্য বিনষ্ট হলো।
যেখান থেকে এলে তাকে জানো
মাঝে থাকুক সকল বিধান।
বলছে কঙ্কণ কলকল ছাঁদে*
বিচূর্ণ হলো সব তথতা নাদে**।
*ছন্দে; **শব্দে বা ধ্বনিতে
রূপকার্থ:
শূন্যের সঙ্গে শূন্য, অর্থাৎ সহজিয়া মতানুযায়ী স্বাধিষ্ঠান-শূন্যতার সঙ্গে যখন প্রভাস্বর-শূন্যতা মিলিত হয়, তখন বস্তুজগতের অনিত্যতা সম্পর্কে জ্ঞান হয়ে সকল ধর্মের সার মহাসুখ লাভ হয়। কবি সেই অবস্থায় পৌঁছে চরমতত্ত্বের খোঁজ পেয়েছেন। তখন গ্রাহ্য-গ্রাহক ভাব বিনষ্ট এবং দৃশ্যাদির উপলব্ধি না হওয়ায় চিত্তের অনুভবশক্তিও বিলুপ্ত। পরমার্থ বোধিচিত্ত থেকেই যে সাধকের জন্ম, তা তাঁকে অন্তর দিয়ে বুঝতে হবে; আর সেইসঙ্গে চিত্ত থেকে বিষয়বিকল্প দূর করে মহাসুখ ভোগ করতে হবে। এই তথতা বা অতীন্দ্রিয় ধর্মে অন্যান্য সব মতবাদ বিচূর্ণ হয়ে যায়—এ কথাই বলছেন কঙ্কণপাদ।
………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..
আগের কিস্তিগুলোর লিঙ্ক: