উর্দুর উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ-১
আমির খসরু
উর্দু ভাষার ভিতটা প্রথম গড়েছিলেন আমির খসরু (১২৫৩-১৩২৫)। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি উত্তর ভারতের স্থানীয় ভাষা হিন্দি’র বাগ্বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ফার্সি আর আরবির মিশেলে এক ভাষা তৈরি করে তিনি কবিতা লিখতে থাকেন। ভাষাটার তিনি নাম দেন ‘হিন্দাবি’ বা ‘হিন্দাওয়ি’। আবুল হাসান ইয়ামিন-উদ-দিন খুসরাও, আমির খসরু (বা খুসরো) দেহলবি (দিল্লিওয়ালা) নামেই যিনি সমধিক পরিচিত, তিনি ছিলেন ত্রয়োদশ শতকের সুবিখ্যাত সুফি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ ও পণ্ডিত। ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তিনি একজন কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। কবিতায় ফার্সি ও হিন্দির মিশ্রিত প্রয়োগের পাশাপাশি আরবি ও ফার্সি সঙ্গীতের মিশ্রণ ঘটিয়ে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকেও তিনি আরো সমৃদ্ধ করে তোলেন। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে খেয়াল ও তারানার প্রবর্তনের পাশাপাশি তিনি সর্বাধিক প্রচলিত তালবাদ্য তবলারও উদ্ভাবন করেন। তাঁকে কাওয়ালির জনক বলা হয়ে থাকে। গজল, মসনবি, কতা, খাঈ দো-বেতি প্রভৃতি ধারায় তিনি বহু কাব্য রচনা করেন। তাঁর প্রধান কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: তুহফা-তুস-সিগর, বসতুল-হায়াত, গুররাতুল কামাল, নেহায়তুল-কামাল প্রভৃতি।
অতীন্দ্র্রিয় সুফি সাধক নিজামউদ্দিন আউলিয়ার এই প্রসিদ্ধ শিষ্য জন্ম নেন ১২৫৩ খ্রিস্টাব্দে পাতিয়ালায়, এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে। সেখানে তাঁর গুরুর দরগাহতেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
‘হিন্দাওয়ি’ সৃষ্টির গোড়ার দিকে খসরুর গজলে ফার্সি আর দেহাতি হিন্দির পাশাপাশি প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে তাঁর বিখ্যাত গজল ‘জেহাল-এ-মিসকীন মাকুঁ তাঘাফুল’-এর কথা বলা যেতে পারে। এ গজলে প্রতি চার পংক্ত্রির এক-একটি চার লাইনের অনুচ্ছেদে দু লাইন ফার্সিতে এবং দু লাইন তৎকালীন দেহাতি হিন্দিতে লেখা হয়েছে। নিচে গজলটি পুরো তুলে ধরা হলো বাংলা অনুবাদসহ।
জেহাল-এ-মিসকীন মাকুঁ তাঘাফুল,
দুরায়ে নয়না বনায়ে বাতিয়াঁ।
কে তাব-এ হিজরান নাদারাম আয় জান,
না লেহো কাহে লাগায়ে ছাতিয়াঁ ॥
শাবান-এ-হিজরান দরাজ চুস জুলফ্,
ওয়া রোজ-এ-ওয়াসলত চো উমের কোটাহ্।
সখি, পিয়া কো জো ম্যাঁয় না দেখুঁ,
তো ক্যায়সে কাটুঁ অন্ধেরি রাতিয়াঁ ॥
য়্যাকায়াক আজ দিল দো চশম-এ-জাদু
বসদ ফারেবাম বাবুর্দ তাসকিন।
কিসে পারি হাই জো যা সুনাওয়ে
পিয়ারে পি কো হমারি বাতিয়াঁ ॥
চো শামা সোজাঁ চো জরা হয়রান
হমেশা গিরায়াঁ বে ইশক্ আন মেহ্।
না নিন্দ নয়না না অঙ্গ্্ চৈনা,
না আপ আওয়েঁ না ভেজেঁ পাতিয়াঁ ॥
বহক-এ-রোজ-এ-বিসাল-এ দিলবার
কে দাদ মারা গরিব খুসরো।
সপেৎ মান কে বারায়েঁ রাখুঁ
জো যায়ে পাউঁ পিয়া কে খতিয়াঁ ॥

গুরু নিজামউদ্দিন আউলিয়ার সঙ্গে শিষ্য আমির খসরু
বাংলায়:
আমার দুঃখকে উপেক্ষা কোরো না
চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আর মিথ্যে গল্প ফেঁদে।
আমার ধৈর্য আর বাঁধ মানছে না, প্রিয়তমা,
কেন আমাকে নিচ্ছো না তোমার বুকে বেঁধে?
কুঞ্চিত কেশের মতো দীর্ঘ এই বিরহের রাত,
জীবনের মতো স্বল্পায়ু আমাদের মিলনের দিন।
সখী, প্রিয়কে যদি দেখতে না পাই
কী করে কাটবে এই অন্ধকার রাত কেঁদে কেঁদে।
আচমকা ওই মোহিনী নয়ন জাদু করে
লুট করে নিলো আমার মনের সব শান্তি।
কার গরজ পড়েছে যে গিয়ে শোনাবে
এ কাহিনী আমার প্রিয়াকে সংবেদে।
দপদপিয়ে জ্বলছে মোমবাতি, প্রতি অণু উত্তেজিত,
আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি প্রেমের আগুনের মধ্যে দিয়ে।
চোখ নিদ্র্রাহীন, দেহ স্বস্তিহীন–
না তো সে আসে, না পাঠায় কোনো খবর কী জেদে।
আমার প্রিয়ার সাথে দেখা হওয়ার দিনটির সম্মানে–
যে আমাকে নিয়ত টানছে কতকাল ধরে, হে খসরু–
আমার মনটাকে আমি দমিয়ে রাখবো
যদি একবার পাই তার ঠিকানা নির্বেদে।
পরে মূলত এই ফার্সি আর দেহাতি হিন্দির মিশ্রণেই উর্দু ভাষা গড়ে ওঠে। এটা ছিলো প্রধানত ‘উর্দ্’ বা সেনাছাউনির ভাষা। আসলে উর্দ্ থেকেই ‘উর্দি’ (ইউনিফর্ম) ও ‘উর্দু’ শব্দ দুটো এসেছে। তৎকালীন মোগল সেনাবাহিনীতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের তো বটেই, ইরান, আরব, তুরস্ক, উজবেক, কাজাখ, এমনকি ইউরোপের নানা দেশের সৈন্যেরা অন্তর্ভুক্ত্র ছিলো। তাদের মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের জন্যে একটা ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ বা সাধারণ (common) ভাষার দরকার ছিলো। উর্দু সেই প্রয়োজন মেটাতে থাকে।
ছয় শতাব্দীর সুদীর্ঘ পথপরিক্রমার পর ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে উর্দু ভাষা একটি কাব্যিক বা সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে পূর্ণ প্রস্ফূটিত ফুল হয়ে ওঠে। উর্দু সাহিত্যিক রাক্শান্দা জলিল এ ব্যপারে বলেছেন, “বাদশাহ্’র দরবার থেকে গরিবগুর্বোর রসুইঘর, হাটবাজার সর্বত্র মানুষের মুখে মুখে ফিরতো কবিতা (যার ভাষা অবশ্যই উর্দু)।” এমনকি সব্জিবিক্রেতারা পর্যন্ত তাদের পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে মুখে মুখে ‘লটকা’ বা ছড়া কাটতো: ‘লয়লা কি পসলিয়াঁ অউর মজনু কি উঙ্গলিয়াঁ’ (লায়লার পাঁজর আর মজনুর আঙুল)। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত সাইফ মাহমুদের বই ‘বিলাভ্ড্ দিল্লি’ (Beloved Delhi)-তে এসবের সুন্দর বর্ণনা আছে।
ভারতবর্ষে মোগল যুগের ইতিহাসের সঙ্গে যাঁরা সুপরিচিত, তাঁরা নিশ্চয় স্বীকার করবেন যে, আওরঙ্গ্জেব আলমগিরের শাসনামলেই মোগল সাম্রাজ্যে ভাঙনের সূত্রপাত হয়। আওরঙ্গ্জেব নিজ বাহুবলে এ ভাঙন সাময়িক ঠেকিয়ে রাখতে পারলেও, তাঁর উত্তরাধিকারীদের আমলে বিশাল এই সাম্রাজ্যের তথা রাজধানী দিল্লি শহরের ক্রমক্ষয়িষ্ণুতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর ঠিক এ সময়েই খসরুর হিন্দাওয়ি থেকে উদ্ভূত পরবর্তিকালের উর্দু ‘জবান-এ-গোয়া’ বা ‘উৎকর্ষমণ্ডিত ভাষা’ হয়ে ওঠে। সাধারণত দেখা যায়, একটি রাজ্য বা সাম্রাজ্য উৎকর্ষের চরমে উঠলেই তার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে। কিন্তু উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এর উল্টোটাই ঘটেছে বলতে হবে। একটি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিলয়কালেই এ ভাষাটি তার উৎকৃষ্টতম রূপ পেলো। হয়তো এ কারণেই উর্দু কবিতার মূল চরিত্র করুণ, বিষণ্ণ, বেদনাদীর্ণ, অশ্রুসিক্ত। দুঃখী প্রাণ স্বভাবতই এ কবিতায় একটা আশ্রয় খুঁজে পায়।

বাদশাহ্ ফররুখশিয়রের সেই সিক্কা টাকা, যেটাতে উৎকীর্ণ কবিতায় তাঁর প্রশংসার বদলে নিন্দা করায় তিনি কবি জাফর জাত্তালিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।
জাফর জাত্তালি
উর্দু কবিতার এ চরিত্রটি সৃষ্টি হয়েছিলো ‘শের-আশোবর’ (দুর্ভাগ্যের কবিতা) নামে উর্দু কাব্যের প্রধান একটি ধারা থেকে। প্রকৃতপক্ষে মোগল বংশের শেষ পরাক্রমশালী সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগিরের মৃত্যুর পর তাঁর দুর্বল উত্তরাধিকারীদের আমলে দিল্লি বার বার বহিরাগত নাদির শাহ্, আহমদ শাহ্ আবদালি প্রমুখদের হানাদার লুটেরা বাহিনীর ভয়াবহতম ধ্বংসকাণ্ডের শিকার হয়েছে। দিল্লির দুর্ভাগ্য আসলে তখন নতুন বা দুর্লভ কিছু ছিলো না। সম্ভবত এই প্রপঞ্চ থেকেই ‘শের-আশোবর’ ধারার কবিতা লেখার সূত্রপাত হয়। এ ধারার সূচনাকারী হিসেবে গণ্য করা হয় আওরঙ্গজেব আলমগিরের সমসাময়িক জাফর জাত্তালি (১৬৫৮-১৭১৩)-কে। জাত্তালি জন্ম নেন দিল্লির কাছে নার্নাউল নামের একটা গ্রামে (বর্তমানে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত) এক সৈয়দ পরিবারে। তাঁর আসল নাম মির মুহাম্মদ জাফর, এবং জাত্তালি হলো তাঁর কলমি নাম বা তখল্লুস। ‘জাত্তালি’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থ হলো, ‘যে আবোলতাবোল বকে’। নিজের এই নামকরণ থেকেই বোঝা যায় তিনি তাঁর কাব্যকৃতির স্বরূপ সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিলেন। ফার্সি ও হিন্দি ভাষা ও ‘রেখতা’ শৈলীর কাব্যে সুশিক্ষিত জাত্তালি তাঁর কবিতায় মোগলশাহির ক্রমক্ষয়িষ্ণুতার সুতীব্র সমালোচনা করেন। নির্ভীক, ক্রুদ্ধ, প্রতিবাদমুখরভাবে তিনি লিখে গেছেন, যার উচিত মূল্যও তাঁকে চুকোতে হয়েছে। আওরঙ্গজেবের উত্তরাধিকারী বাদশাহ্ ফররুখশিয়র তাঁর নতুন প্রচলন করা সিক্কা টাকায় উদ্ধৃত কবিতায় তাঁর প্রচণ্ড বিরূপ সমালোচনা করার জন্যে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন (এ ধরনের কবিতা সাধারণত সম্রাটের প্রশংসামূলক হওয়াটাই প্রচলিত রীতি)।
জাত্তালির কবিতা সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হলে তাঁর সময়কার পরিবেশ-পরিস্থিতিটাকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। আওরঙ্গ্জেবের সঙ্গে জাত্তালির ছিলো যুগপৎ প্রেম ও ঘৃণার সম্পর্ক। যদিও তিনি তাঁর কবিতায় কঠোরভাবে আওরঙ্গ্জেবের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু তার পাশাপাশি তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশংসাও করেছেন। আওরঙ্গ্জেবের মৃত্যুর পর শুরু হলো একের পর এক বিপর্যয় ও পতনের কাল। কবিতার জন্যে জাত্তালির খোরাকের তখন কোনো অভাব ছিলো না। আলমগির-পরবর্তী মোগল সম্রাটদের সমস্ত ব্যর্থতা, পরাভব আর অকৃতকার্যতাকে তিনি চাবুকপেটা করেছেন নির্দ্বিধভাবে।
উদীয়মান উর্দু তখন এক রূপান্তরের সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো। কথ্য ও লিখিত উভয় ক্ষেত্রে তখন নতুন নতুন শব্দ জায়গা করে নিচ্ছিলো। সমাজের শিক্ষিত অভিজাতরা তখনও ফার্সি ভাষাই ব্যবহার করে যাচ্ছিলো, আর মুষ্টিমেয় কবি ও লেখক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন খসরুর অনুসরণে হিন্দি ও ফার্সির এক মিশ্রিত ভাষা নিয়ে। এ ভাষাকে বলা হতো রেখ্তা। একটি অভিজাত ভাষা হিসেবে উর্দু কথাটার তখনও তেমন প্রচলন হয় নি বা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে নি। জাত্তালি তাঁর জীবন্ত ভাষায় এ পরিস্থিতির নিপুণ বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন:
“অগরছে হুমা কুদাও কর্করতস্ত্
বা হিন্দি-দাশিন্দি জুবান
ওয়া লেকিন কিসি নে ভলি ইয়েহ্ কহি
জিসে পিয়ু চাহে, সুহাগন ওয়হি।”
বাংলায়:
যদিও এটাকে মনে হয় যেন আবর্জনা
এই হিন্দি ছোটলোকের ভাষা।
তবু কেউ কেউ বলে থাকে
যাকে তুমি ভালোবাসো
সে-ই তোমার বধূ হবে।
নিজের কবিতায় তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, কঠোর সমালোচনার উপস্থিতির পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে জাত্তালি বলেছেন:
“জব গুস্সা হদ্ পর কর জায়ে
তোহ্ আদমি গালিয়াঁ হি বকতা হ্যায়।”
বাংলায়:
রাগ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়
তখন লোকে শুধু গালাগালিই দেয়।
নিজের জীবদ্দশায় আওরঙ্গজেবের যে-কজন উত্তরাধিকারীকে পেয়েছেন, তাঁদের কাউকে জাত্তালি রেয়াত করেন নি। আওরঙ্গজেবের পর সিংহাসনে আসীন প্রথম বাহাদুর শাহ্ সম্পর্কে জাত্তালি তাঁর কবিতার বই ‘গাণ্ডুনামা’য় লিখেছেন:
“বাদশাহি হ্যায় বাহাদুর শাহ্ কি
বনবনাকর গাঁড় মারাওয়া খেলিয়ে।
পির সে, বাপ সে, উস্তাদ সে
চুপ চুপ আকর গাঁড় মারাওয়া খেলিয়ে।”
বাংলায়:
বাহাদুর শাহের রাজত্ব এসেছে
বনবন করে পাছামারানি খেলা খেলো।
চুপচাপ এসে পিরের সঙ্গে, বাপের সঙ্গে,
শিক্ষকের সঙ্গে পাছামারানি খেলা খেলো।
অযোগ্য ক্ষমতাধারীদের তীব্রতম ভাষায় আক্রমণ করতে গিয়ে জাত্তালি অনেক সময়েই শ্লীলতা ও শালীনতার সীমা অতিক্রম করে গেছেন। তবে তাঁর মানসিক যন্ত্রণার গভীরতার দিকটা বিবেচনা করলে সেটাকে আর অপ্রত্যাশিত বা অবাঞ্ছিত মনে হয় না। হত্যা করে জাত্তালির কণ্ঠরোধ করা হলেও তাঁর কাব্যধারা প্রতিধ্বনিত হয়েছে তাঁর উত্তরসুরী হাতিম, মির্জা রফি সওদা, মির তকি মির প্রমুখের কবিতায়। এ ধারার শেষতম ও উজ্জ্বলতম শেষ দুই প্রতিভূ ছিলেন স্বয়ং শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফর এবং তাঁর শাহি দরবারের সেরা রত্ন বা উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক মির্জা আসাদুল্লাহ্ খান গালিব। দিল্লির ক্রমক্ষয়িষ্ণুতা, দুর্ভাগ্য ও দুর্দশা এঁদের সবার কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
বাহাদুর শাহ্ জাফর
এর পর এলো সিপাহি বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম– ১৮৫৭-তে। এই মহাবিদ্রোহের ধাক্কায় খসে গলো ক্রমক্ষয়িষ্ণু মোগল শাহির শেষ কটি ইট। সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফর বা দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ ( ২৪ অক্টোবর, ১৭৭৫ – ৭ নভেম্বর, ১৮৬২) পরাক্রান্ত মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট। শক্তিশালী মোগল বংশের সবচেয়ে দুর্বল উত্তরাধিকারী ছিলেন তিনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোম্পানির বিদ্রোহী সৈন্যেরা তাঁকেই তাদের সর্বাধিনায়ক মনোনীত করেছিলো। সৈন্যদের এ সিদ্ধান্তে বাহাদুর শাহের নিজের কোনোই ভূমিকা ছিলো না। তবুও এ অপরাধে সিপাহি বিদ্রোহের পরের বছর ব্রিটিশ শাসকেরা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠায়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় আরো প্রায় চার বছর পর।
তাঁর পূর্বপুরুষদের সাম্রাজ্য একসময় আসমুদ্র্রহিমাচল ভারতবর্ষের বাইরে পর্যন্ত বিস্তারিত হয়েছিলো। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের আমলে তা ক্ষুদ্র্র

বৃদ্ধ অথর্ব অশক্ত বাদশাহ্ বাহাদুর শাহ জাফর ও তাঁর দুই পুত্রের সঙ্গে একজন ব্রিটিশ অফিসার।
থেকে ক্ষুদ্র্রতর হতে হতে শুধু দিল্লি শহরে, এবং তারপর শুধু লালকেল্লার অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ হয়ে আসে। একসময় লালকেল্লার সীমার ভেতরেও ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ প্রভুরা তাদের রেসিডেন্ট বা প্রতিনিধিকে বসিয়ে দিয়েছিলো, নখদন্তহীন বুড়ো বাঘ নামেমাত্র মুঘল সম্রাটের ওপর চোখ রাখার জন্যে। সিপাহি বিদ্র্রোহের পর সেই সীমিত আধিপত্যটুকুও হাতছাড়া হয়ে যায়। তাঁর যুবক দুই পুত্রকে ব্রিটিশরা গুলি করে হত্যা করে, তাঁকে পাঠায় নির্বাসনে।
এসব কথা চিন্তা করলে বাহাদুর শাহকে সবচেয়ে হীন, সবচেয়ে দুর্ভাগা মোগল শাসক বলতে হয়। কিন্তু তাঁর আগেকার দুশো বছরেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা মোগল সংস্কৃতির সরটুকু জমা হয়েছিলো তাঁর মধ্যে। সাম্রাজ্য তাঁর ছিলো না, কোষাগারে সম্পদের পাহাড়ও ছিলো না। কিন্তু তাঁর দরবারে ছিলো সদারঙ-অদারঙের মতো ওস্তাদ সঙ্গীতজ্ঞ, মির্জা গালিবের মতো যুগন্ধর কবি। বাহাদুর শাহ্ জাফর নিজেও যে উচ্চমানের কবি ছিলেন, সে-কথা সর্বজনস্বীকৃত। মোগল ঐতিহ্যের ক্ষয়িষ্ণুতা তাঁর মধ্যে যে স্থায়ী বিষাদের সঞ্চার করেছিলো, তাঁকে তিনি নিপুণ লেখনীতে কবিতায় রূপায়িত করে গেছেন।
শত্রুর কাছে পরাজয় মেনে সব হারিয়ে বিদেশে নির্বাসনে শেষনিঃশ্বাস ফেলেছেন তিনি। বিদেশের মাটিতেই কবর হয়েছে তাঁর। স্বদেশের মাটিতে দাফনের জন্যে দু গজ জমিও না পাওয়ায় জীবনের শেষ কবিতায় দুঃখ করে গেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর সব দুঃখ, জীবনের সব কাঁটা কুসুম হয়ে ফুটেছে তাঁর কবিতায়। অসীম শৌর্য আর ঐশ্বর্যের অধীশ্বর তাঁর পূর্বপুরুষদের মানুষ স্মরণ করবে কদাচিত। কিন্তু তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে ছিলেন, আছেন, থাকবেন কাব্যপ্রেমীদের হৃদয়ে। দুঃখী মানুষ তাঁর কবিতায় খুঁজে নেবে সান্ত¡না, যা তাঁর বলদৃপ্ত, সুখী পূর্বপুরুষরা কখনোই দিতে পারেন নি, পারবেনও না। এখানেই তাঁর চিরকালের জয়, এখানেই তাঁর সাম্রাজ্য, মানুষের হৃদয়জগতে, যা কখনও কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। এখানে তাঁর বহুলপরিচিত কিছু ‘শের’ বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হলো।

শেষশয্যায় সম্রাট-কবি বাহাদুর শাহ্ জাফর
১.
উমর-এ-দরাজ সে মাঙ্গ্ কে লায়া থে চার দিন–
দো আরজু মে গুজর গয়ে, দো ইন্তেজার মেঁ।
হ্যায় কিৎনা বদনসীব জাফর, দাফন কে লিয়ে
দো গজ জমীন ভি ন মিলি কূ-এ-ইয়ার মেঁ।
বাংলায়:
দীর্ঘ আয়ু মেগে এনেছিলাম চারটি দিন–
দুদিন গেলো প্রার্থনায়, দুদিন প্রতীক্ষায়।
কী যে দুর্ভাগা জাফর, দাফনের জন্যে
দুগজ জমিও মিললো না বন্ধুদের দুনিয়ায়।
২.
না কিসী কী আঁখ কা নূর হু, না কিসী কে দিল কা কারার হুঁঁ
জো কিসী কে কাম না আ সকে ম্যাঁয় উও এক মুশাত-এ-গুবর হুঁ
না তো ম্যাঁয় কিসী কা হবীব হুঁ, না তো ম্যাঁয় কিসী কা রকীব হুঁ
জো বিগর গয়া উও নসীব হুঁ, জো উজাড় গয়া উও দায়ার হুঁ।
বাংলায়:
কোনো চোখের আলো নই, কোনো হৃদয়ের সান্ত্বনা নই,
ধুলোয় মেশা ধুলো আমি কারো কোনো কাজের নই,
আমি কারো মিত্র নই, আমি কারো শত্রু নই
আমি শুধু এক নষ্ট ভাগ্য, উজাড় বাগান বই তো নই!
৩.
হমনে দুনিয়া মেঁ আ কে ক্যা দেখা?
দেখা জো কুছ, সো খোয়াব-সা দেখা।
হ্যায় জো ইনসান খাক কা পুতলা
লেকিন পানী কা বুলবুলা দেখা।
বাংলায়:
দুনিয়ায় এসে আমি কী দেখলাম?
যা-কিছু দেখলাম, স্বপ্নের মতো দেখলাম।
মানুষ তো মাটি দিয়ে বানানো পুতুল,
কিন্তু আমি তো জলের বুদবুদ দেখলাম।
৪.
কহাঁ উও মাহাজাবীন অউর হম, কহাঁ উও ওয়সল কি রাতেঁ
মগর হম নে কভি থা এক ইয়ে ভি খোয়াব সা দেখা,
জাফর, কি সাইর ইস গুলশান মেঁ হাম নে পর কিসি গুল মেঁ
না কুছ উলফৎ কি বূ পায়ি, না কুছ রঙ্গ্-এ-ওয়াফা দেখা।
বাংলায়:
কোথায় সে চাঁদ আর আমি, কোথায় সেসব ভালোবাসার রাত?
কিন্তু আমি কি কখনো ছিলাম, নাকি স্বপ্নের মতো দেখেছিলাম?
জাফর, এ বাগানে ঘুরতে গিয়ে আমি না পেলাম কোনো ফুলের
ভালোবাসার সুবাস, না কোনো বিশ্বাসের রং দেখতে পেলাম।
৫.
কিৎনা হি বন কে শহর অউর গাঁও কে নিশান,
ইয়ুঁ মিট গয়ে জমীন পে কে ইয়ুঁ পাওঁ কে নিশান।
গর নখল-এ-খুশ্ক্ কোই কহিঁ রহ্ গয়া, জাফর,
পায়ে না উসকে পাওঁ তলে ছাওঁ কে নিশান।
বাংলায়:
কত-না তৈরি শহর আর কত-না গাঁয়ের নিশানা
মুছে গেছে এখানে মাটিতে, পাবে না তাদের নিশানা।
তবুও এক কাটা গাছের গুঁড়ি কোথাও রয়ে গেছে, জাফর,
পাবে না যার পায়ের তলায় ছায়ার কোনো নিশানা।

মির্জা আসাদুল্লাহ্ খান গালিব
উর্দু সাহিত্যের সদাসক্রিয় পৃষ্ঠপোষক মোগলদের একদার আনন্দ-আড়ম্বর, জাঁকজমক-হইহুল্লোড়, সঙ্গীত-কাব্য মুখরিত ‘কিলা-এ-মুয়াল্লা (শান্তিনিকেতন) ১৮৫৭-য় দখল করে নিলো ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। দিল্লির ভাগ্যাকাশে বছরটি এমন ভয়াল করাল চেহারা নিয়ে আবির্ভুত হলো যে, বুকফোটা রোদন আর হাহাকার ছাড়া দিল্লির কবিদের আর কিছু করার ছিলো না। চোখের সামনেই তাঁরা দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁদের প্রিয় নগরীকে নিঃস্ব রিক্ত ধ্বংসপ্রায় করে দেয়া সেই মহাবিপর্যয়ের ভয়াবহ রূপ। স্বভাবতই এই হৃদয়বিদারক ক্রান্তিকালের প্রতিফলন তাঁরা রেখে গেছেন তাঁদের বুক নিংড়ানো কবিতার ছত্রে ছত্রে। তবে এর প্রধান রূপকার হিসেবে সর্বাগ্রে নামোল্লেখ করতে হবে মির্জা আসাদুল্লাহ্ খানের, যাঁকে আমরা তাঁর কলমি নাম গালিব পরিচয়ে চিনি। ফার্সি ও উর্দু (রেখ্তা) দু ভাষাতেই লিখতেন তিনি। কিন্তু বিশেষ করে গালিবের উর্দু লেখাগুলোতেই ফুটে উঠেছে অবক্ষয়জনিত হাহাকার, তীব্রতমভাবে, যখন তিনি বলেন:
“ন গুল-এ-নগমা হুঁ, না পর্দা-এ-সাজ,
ম্যাঁয় হুঁ অপনি শিকস্ত কি আওয়াজ।
বাংলায়:
গানের ফুল নই আমি, নই আবরণের সাজ,
আমি শুধু নিজের ভেঙে পড়ার আওয়াজ।
[সঙ্গের ছবিটি মোগল আমলের একটি মুশায়েরা বা কবিতা পাঠের আসরের। ১৬৪০ থেকে ‘৫০-এর মধ্যে আঁকা]