আর্টিস্টদের কথা: সাদাত হাসান মান্টো’র গল্প

মাহমুদ জামিলাকে প্রথম দেখে বাগ-এ-জিন্নাহ্য়। জামিলা তখন তার দুই বান্ধবীর সাথে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছিলো। ওদের সবার পরনে ছিলো কালো বোরকা। কিন্তু ওগুলোর নেকাব ওল্টানো ছিলো। মাহমুদ ভাবছিলো, শরীর বোরকায় ঢাকা কিন্তু চেহারা খোলা– এ পর্দার অর্থটা কী? জামিলার রূপে কিন্তু মাহমুদ খুবই মুগ্ধ হলো।
সে তার বান্ধবীদের সঙ্গে হাসিখুশিভাবে হেঁটে যাচ্ছিলো। মাহমুদ তার পেছনে পেছনে চলতে লাগলো। এটা যে একটা অনৈতিক কাজ হচ্ছে, সেটা তার একদম হুঁশই ছিলো না। সে কয়েকশ বার ঘুরে ঘুরে জামিলাকে দেখলো। এ ছাড়া সে দু-একবার তাকে চোখের ইশারাও করলো। কিন্তু জামিলা তার এত ইশারা-ইঙ্গিত কিছু বুঝলোই না এবং নিজের বান্ধবীদের সঙ্গে সামনে এগিয়ে গেলো।
ওর বান্ধবী দুজনও যথেষ্ট সুন্দরী ছিলো। কিন্তু মাহমুদ ওর প্রতি এমন এক টান অনুভব করলো যেমনটা চুম্বকের সাথে লোহার হয়ে থাকে। সে ওর পেছনে একেবারে সেঁটে রইলো।
এক জায়গায় পৌঁছে বুকে সাহস সঞ্চয় করে সে জামিলাকে বললো, “হুজুর, আপনার নেকাব তো সামলান! হাওয়ায় উড়ছে তো!”
এটা শুনে জামিলা হৈচৈ ফেরে দিলো। এর পর দুজন পুলিশ কনস্টেবল, যারা সে-সময়ে পার্কটায় ডিউটিতে ছিলো, ছুটে এসে জামিলাকে জিজ্ঞেস করলো, “কী হয়েছে, বোন?”
জামিলা তখনও ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা মাহমুদের দিকে তাকিয়ে বললো, “এই ছেলেটা আমাকে বিরক্ত করছে। যখন থেকে আমি পার্কে এসেছি, সে আমার পিছু নিয়েছে।”
পুলিশরা সাথে সাথেই মাহমুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গ্রেফতার করে নিলো। কিন্তু খানিকক্ষণ পরে তার জামিন হয়ে গেলো।
এবার মামলা শুরু হলো, যেটার বিস্তারিত বিবরণে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সংক্ষেপে কাহিনি হলো এই যে, মাহমুদের অপরাধ প্রমাণিত হলো এবং তার দুমাসের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ হয়ে গেলো।
তার বাবা-মা ছিলো অত্যন্ত দরিদ্র, যেজন্যে সে দায়রা আদালতে আপিল করতে পারলো না। কিন্তু তার অপরাধটা কী, এটা ভেবে মাহমুদের ভীষণ মন খারাপ হচ্ছিলো। কারো যদি কোনো মেয়েকে পছন্দ হয় আর তার সাথে গিয়ে একটু কথাবার্তা বলতে চায় সেটা কি কোনো অপরাধ, যার দায়ে আজ তাকে দুমাসের জেল খাটতে হচ্ছে!
জেলখানায় সে কয়েকবার বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করলো। তার শখের কাজ ছিলো ছবি আঁকা, কিন্তু জেলে তাকে দিয়ে করানো হতো জাঁতা পেষানোর কাজ।
কারাবন্দী অবস্থায় তার দিন কুড়ি কেটে যাওয়ার পর একদিন তাকে জানানো হলো, ওর একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী এসেছে। মাহমুদ ভাবলো, এটা কে হতে পারে? তার বাবা তো তার ওপর ভীষণ অসন্তুষ্ট ছিলো। মা ছিলো পঙ্গু, আর কোনো আত্মীয়-স্বজনও ছিলো না। সে তাকিয়ে দেখলো, শিকগুলোর ওপাশে জামিলা দাঁড়িয়ে আছে।
জেলের সিপাই তাকে দরজার কাছে নিয়ে গেলো, যেটা ছিলো লোাহার শিক দিয়ে বানানো। জমিলাকে খুব ক্লান্ত আর বিষণœ দেখাচ্ছিলো। মাহবুব ভাবলো সে হয়তো আর কারো সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। কিন্তু জামিলা শিকগুলোর কাছে এসে বললো, “আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”
মাহমুদের বিভ্রান্তি আরো বেড়ে গেলো, “আমার সঙ্গে…!”
“জী হ্যাঁ… আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি। সেদিন আমি বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলাম, যেজন্যে আপনাকে এখানে আসতে হয়েছে।”
মাহমুদ হাসলো, “‘হায় ইস জুদ-এ-পশোমাঁ কা পশোমাঁ হোনা (হায় ভুলের এ দ্রæত অনুতাপ যদি আরো দ্রট্টু হতো)।”
জামিলা বললো, “এটা তো গালিবের লেখা?”
“জী হ্যাঁ, গালিব ছাড়া আর কে আমাদের ভাবনাগুলোকে এমন অনুবাদ করতে পারে!… আমি আপনাকে মাফ করে দিয়েছি, কিন্তু আমি এখানে আপনার কোনো সেবা করতে পারবো না। কারণ এটা আমার ঘর নয়, সরকারের ঘর।… এজন্যে আমিই আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।”
জামিলার চোখে জল এসে গেলো, “আমিই আপনার সেবা করতে চাই।”
ওদের দুজনের মধ্যে কয়েক মিনিট ধরে আরো কিছু কথাবার্তা হলো, যেগুলো ছিলো পারস্পরিক প্রেমের বুলি আর শপথে ভরপুর।… জামিলা তাকে একটা সাবান দিলো, কিছু মিঠাইও দিলো। এর পর থেকে সে প্রতি পনেরো দিন পর পর মাহমুদকে দেখতে আসতে লাগলো। ইত্যবসরে দুজনের প্রেম একেবারে পাকাপোক্ত হয়ে গেলো।
জামিলা মাহমুদকে একদিন জানালো, “আমার গান শেখার খুব শখ… বর্তমানে আমি খাঁ সাহেব সালামত আলি খাঁ থেকে তালিম নিচ্ছি।”
মাহমুদ বললো, “আমার শখ ছবি আঁকার। এখানে এই জেলখানার মধ্যে আমার আর কোনো কষ্ট নেই… হাড়ভাঙা খাটুনিকেও আমি ভয় পাই না। কিন্তু আমার মনমানসিকতা যে-শিল্পের দিকে ঝুঁকে আছে, তা মেটানোর কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই। এখানে না আছে কোনো রঙ, না কোনো রঙ্গ। না আছে কোনো কাগজ, না কোনো কলম।… ব্যস্, শুধু জাঁতা ঘোরাতেই থাকো।”
দুটি মাস জেল খেটে মাহমুদ যখন বেরিয়ে এলো, জামিলা তখন জেল ফটকে হাজির।… তার সেই কালো বোরকা এখন ময়লা মেটে রঙের হয়ে পড়েছিলো আর জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গিয়েছিলো।
তারা দুজনেই ছিলো আর্টিস্ট। তাই তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। অতএব দুজনের বিয়ে হয়ে গেলো। জামিলার বাবা-মা কিছু টাকাপয়সা রেখে গিয়েছিলো। ওগুলো দিয়ে তারা ছোট একটা বাড়ি বানালো আর পুরো হাসি-আনন্দে জীবন কাটাতে লাগলো।
মাহমুদ এক আর্ট স্টুডিয়োতে যেতে শুরু করলো, যাতে তার ছবি আঁকার শখ পূরণ করতে পারে। জামিলা আবার খাঁ সাহেবের কাছে তালিম নিতে লাগলো।
একবছর ধরে দুজনেই শিক্ষা নিতে লাগলো। মাহমুদ শিখতে লাগলো ছবি আঁকা আর জামিলা শিখতে লাগলো গান। এর পর সব টাকাপয়সা শেষ হয়ে গেলো আর না খেয়ে থাকার সময় এসে গেলো। কিন্তু তারা দুজনেই ছিলো আর্টের অনুরাগী। তারা মনে করতো, অনাহারে থেকেও কেউ সঠিক সময়ে-সুযোগে আর্টের ওপরের সোপানে পৌঁছে যেতে পারে। এজন্যে তারা তাদের এই অভাবগ্রস্ত সময়েও ছিলো বেশ খুশিমনে।
একদিন জামিলা তার স্বামীকে সুখবর দিলো যে, এক বড়লোকের বাড়িতে সে একটা গানের টিউশনি পেতে যাচ্ছে। এ কথা শুনে মাহমুদ তাকে বললো, “এসব টিউশানি-ফিউশানি বাজে কাজ… আমরা হলাম আর্টিস্ট।”
তার বউ বড় ভালোবাসার সঙ্গে বললো, “কিন্তু জান, ঘরের খরচপাতি চলবে কী করে?”
মাহমুদ তার রোঁয়া ওঠা কোটের কলার ঠিক করতে করতে জবাব দিলো, “আর্টিস্টদের এসব ফালতু কথা মনে রাখা উচিত না। আমরা আর্টের জন্যে বেঁচে থাকি… আর্ট আমাদের জন্যে বেঁচে থাকে না।”
জামিলা এটা শুনে খুশি হলো, “কিন্তু জান, আপনি তো ছবি আঁকা শিখছেন… প্রতি মাসে আপনাকে ফিস দিতে হয়। এরও তো একটা বন্দোবস্ত করতে হবে… তারপর আছে খাবার-দাবার। তার খরচ আলাদা।”
“ছবি আঁকা শেখা আমি এখন বন্ধ করে দিয়েছি।… অবস্থা ফিরলে তখন আবার দেখা যাবে।”
পরদিন জামিলা ঘরে ফিরলো তার পার্সে পনেরো টাকা নিয়ে। টাকাগুলো সে তার স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে বললো, “আমি আজ থেকে টিউশনি শুরু করে দিয়েছি। এ পনেরো টাকা পেয়েছি অগ্রীম হিসেবে।… আপনি ফটোগ্রাফি শেখাটা চালু রাখুন।”
মাহমুদের পৌরুষে একটা বড় ঘা লাগলো, “আমি চাই না যে তুমি রোজগারে নামো… রোজগার তো আমারই করা উচিত।”
জামিলা এক বিশেষ ভঙ্গীতে বললো, “হায়… আমি কি আপনার থেকে ভিন্ন! আমি যদি কিছু সময়ের জন্যে কোথাও থেকে কিছু রোজগার করি, এতে লোকসানটাই-বা কী?… অনেক ভালো ভালো লোক আছ্ েযে-মেয়েটাকে আমি গান শেখাই, সে খুব আদুরে আর বুদ্ধিমতী।”
এসব শুনে মাহমুদ চুপ করে গেলো। আর কথা বাড়ালো না।
দ্বিতীয় সপ্তাহের পর সে পঁচিশ টাকা নিয়ে এলো আর তার বউকে বললো, “আমি আজকে আমার আঁকা একটা ছবি বিক্রি করেছি। ছবিটা খদ্দেরের খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু বেটা বড় কিপটে। মাত্র পঁচিশটা টাকা দিয়েছে। এখন একটু ভরসা হচ্ছে যে, আমার ছবির জন্যে একটা মার্কেট তৈরি হয়ে যাবে।”
জামিলা মুচকি হেসে বললো, “তাহলে তো আমরা অনেক বড়লোক হয়ে যাবো।”
মাহমুদ তাকে বললো, “আমার ছবি বিক্রি শুরু হয়ে গেলে তোমাকে আর টিউশনি করতে দেবো না।”
জামিলা তার স্বামীর টাইয়ের নট ঠিক করতে করতে বড় ভালোবাসার সঙ্গে বললো, “আপনি আমার মালিক, যে-হুকুমই দেবেন মেনে নেবো।”
দুজনেই খুব খুশি ছিলো, কারণ তারা পরস্পরকে ভালোবাসতো। মাহমুদ জামিলাকে বললো, “এখন আর চিন্তা কোরো না। আমার কাজ চালু হয়ে গেছে… কাল-পরশুর মধ্যে চারটে ছবি বিক্রি হয়ে যাবে আর ভালো দামই পাবো। তখন তুমি আবার তোমার গানের তালিমা নেয় চালিয়ে যেতে পারবে।”
একদিন সন্ধ্যায় জামিলা যখন ঘরে এলো, তার মাথায় চুলের মধ্যে ধুনে নেয়া তুলোর কুচি এমনভাবে লেগে ছিলো, যেভাবে মাঝবয়েসি লোকের দাড়ির মধ্যে সাদা কয়েকগাছি দাড়ি উঁকি দেয়।
মাহমুদ তাকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি তোমার চুলের এ কি অবস্থা বানিয়েছো?… গান শেখাতে যাও, নাকি কোনো ভাঙারি কারখানায় কাজ করে এলে?”
জামিলা এতক্ষণ মাহমুদের নতুন লেপের পুরোনো তুলোগুলো ধুনছিলো। মুচকি হেসে সে বললো, “আমরা আর্টিস্ট। আমাদের কোনোকিছুই হুঁশ থাকে না।”
মাহমুদ হুঁকোর নলটা মুখে পুরে নিজের বউয়ের দিকে তাকালো। তারপর বললো, “সত্যিই হুঁশ থাকে না।”
জামিলা তার আঙুল দিয়ে মাহমুদের চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললো, “এই ধোনা তুলোর কুচি আপনার মাথাতেও কী করে এলো?”
মাহমুদ হুঁকোয় একটা টান দিয়ে বললো, “যেভাবে তোমার মাথায় এসেছে, সেভাবেই।… আমরা দুজন তো একই ভাঙারি কারখানায় কাজ করি, স্রেফ আর্টের খাতিরেই।”