অরু ও তরু দত্ত: বাংলার ব্রন্টি বোনেরা
অরু ও তরু দত্ত– এ দুই বাঙালি কন্যার নাম ইংরেজি ও ফরাসি সাহিত্যে একসময় একনিঃশ্বাসে উচ্চারিত হতো, অনেকটা ইংরেজি সাহিত্যের ব্রন্টি বোনদ্বয়ের মতো। দুই পিঠোপিঠি বয়সের বোন অরু ও তরু ছিলেন, ‘মহারাষ্ট্র জীবন প্রভাত’ ও ‘রাজপুত জীবন সন্ধ্যা’র লেখক, প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক রমেশ চন্দ্র দত্তের বড়ভাই, কবি ও ভাষাবিদ গোবিন্দ চন্দ্র দত্তের কন্যা।
গোবিন্দবাবুর এক পুত্র ও দুই কন্যার সকলেই স্বল্পায়ু ছিলেন। অরু ও তরু দু বোনের মধ্যে কবি-কথাশিল্পী হিসেবে খ্যাতিটা ছোটবোন তরুরই একটু বেশি ছিলো।
অসম্ভব প্রতিভাময়ী অথচ নিতান্ত স্বল্পায়ু বাঙালি কবি তরু দত্ত (Toru Dutt: ৪ মার্চ, ১৮৫৬ – ৩০ আগস্ট, ১৮৭৭) আজও আমাদের কাছে এক বিরাট বিস্ময়। পৃথিবীতে তিনি বেঁচে ছিলেন মাত্র ২১টি বছর, কিন্তু তারই মধ্যে দুটো বিদেশি ভাষা ইংরেজি ও ফরাসিতে যে-কাব্য-সাহিত্য রচনা করে গেছেন, তা এই বাঙালি তরুণীটিকে বিশ্বের সাহিত্য রসপিপাসুদের কাছে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
তাঁর উল্লেখ্য দুটো উপন্যাস– ইংরেজিতে লেখা ‘বিয়াংকা অর দা ইয়াং স্প্যানিশ মেইডেন’ (Bianca or the Young Spanish Maiden) এবং ফরাসিতে লেখা ‘ল্যো জুর্নাল দ্য মাদমোয়াজেল দার্ভের’ (Le Journal de Madmoiselle d’Arvers)। ‘এ শেফ গ্লিন্ড ইন ফ্রেঞ্চ ফিল্ড’ (A Sheaf Gleaned in French Field) তাঁর ফরাসিতে লেখা কবিতাবলীর ইংরেজি ভাষান্তরের সংকলন। সংস্কৃত সাহিত্য থেকে তাঁর অনুবাদ ও অভিযোজনের সংগ্রহ ‘অ্যানসিয়েন্ট ব্যালাডস অ্যান্ড লিজেন্ডস অব হিন্দুস্তান’ (Ancient Ballads and Legends of Hindustan)।
বড় বোন অরু দত্ত (Oru Dutt)-ও বেঁচে ছিলেন মাত্র ২০টি বছর। অরুর জন্ম ১৮৫৪-তে কলকাতার রামবাগানে দত্তদের পৈতৃক বাড়িতে, এবং মৃত্যুও কলকাতাতেই ১৮৭৪ সালের ২৩ জুলাই। তবে তার আগে দীর্ঘ চারটি বছর দত্ত পরিবার ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়ে এসেছে, এবং অরু-তরুর সাহিত্যি জীবনের সূত্রপাতও হয়েছে সেখানেই।
স্বল্পায়ু ও কালগ্রাস– এ দুটো জিনিস প্রধান ভূমিকা নিয়েছে অরু দত্তের সাহিত্যকর্মকে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে। প্রকৃতপক্ষে, তাঁর সাহিত্যকর্ম বা কাব্যকৃতির বড় একটা অংশ ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে বা ছোটবোন তরু দত্তের নামে প্রকাশিত হয়েছে, যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সম্ভব হয়েছে এ ভুল পরে শুধরে নেয়ার। অথচ অনেক সমালোচকের মতে অকালপ্রয়াতা অরুর কবিতা অনেক ক্ষেত্রে তরুর চেয়েও সরস।

তরু দত্ত
এখানে তরু দত্তের একটি সনেট তাঁর মাতৃভাষা বাংলায় অনুবাদ করে অকালপ্রয়াতা এই মহান কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। এ-কবিতা ভিনদেশি ভাষায় লেখা হলেও এতে কবি পরম মমতায় তাঁর স্বদেশ বাংলাদেশের ছবিই এঁকেছেন।
গোবিন্দ চন্দ্র দত্তের স্মৃতিকথায় তাঁর বড় মেয়ে অরু দত্তের আটটা কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো, এবং সেগুলোই আপাতত তাঁর কাজের প্রত্যক্ষ নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে। সেখান থেকেই তাঁর ‘Romance of Nina’ কবিতাটিও এখানে অনুবাদ করে দিলাম।
তরু দত্তের কবিতা:
SONNET
A sea of foliage girds our garden round,
But not a sea of dull unvaried green,
Sharp contrasts of all colors here are seen;
The light-green graceful tamarinds abound
Amid the mango clumps of green profound,
And palms arise, like pillars gray, between;
And o’er the quiet pools the seemuls lean,
Red–red, and startling like a trumpet’s sound.
But nothing can be lovelier than the ranges
Of bamboos to the eastward, when the moon
Looks through their gaps, and the white lotus changes
Into a cup of silver. One might swoon
Drunken with beauty then, or gaze and gaze
On a primeval Eden, in amaze.
চতুর্দশপদী
আমাদের বাগানকে ঘনিষ্ঠ বাঁধনে জড়িয়েছে পত্রপল্লবের অবাধ পাথার,
তবে সে সাগর নয় বৈচিত্র্যবিহীন সবুজের রাজ, একঘেয়ে নীরস বিস্তার,
সকল রঙের তীব্র বৈপরীত্য দেখতে তুমি পাবে এ-বাগানে;
গভীর সবুজ আম্রকুঞ্জগুলোর এখানে ওখানে
হালকা সবুজ লাবণ্যময় তিন্তিড়ী তরুদের ভিড়,
আর তার মধ্যে মধ্যে ধূসর থামের মতো তাল গাছ উচ্চশির;
পুকুরের শান্ত জলে নুয়ে আছে শিমুল গাছেরা ফুলে ভরা
লালে লাল, যেন চমক জাগানো তুর্যধ্বনি উঠেছে নিঃস্বরা।
সবচেয়ে মনোরম কিন্তু সারিবদ্ধ বাঁশবন পূর্বদিক জুড়ে
যার ফাঁকে ফাঁকে বিহ্বলের মতো মরে ঘুরে ঘুরে
আর থেকে থেকে উঁকি মারে চাঁদ, আর শ্বেতকমলেরা
রঙ পাল্টে হয়ে যায় রুপোর পেয়ালা। যে-কেউ লাগাম ছেঁড়া
বেহেড মাতাল হবে এ-সৌন্দর্য পানে, কিম্বা শুধু বাক্যহীন হয়ে
দেখবে আর দেখবে এক আদিম স্বর্গোদ্যান বিপুল বিস্ময়ে।
অরু দত্তের কবিতা:
ROMMANCE OF NINA
When back the well-loved shall return
To her who pines though once so dear,
The spring from its abundant turn
Shall scatter blossoms far and near.
I watch, I wait—in vain, in vain,
The loved and lost comes not again.
Ye birds far sweeter shall ye sing
When you shall catch his tender tone:
Then haste the well-loved back to bring,
IÕll teach ye songs of love alone.
I watch, I wait—in vain, in vain,
The loved and lost comes not again.
O echo whose repose I mar
With my regrets and mournful cries.
He comes—I hear his voice afar
Or is it thine that thus replies?
Peace! hark he calls! in vain, in vain,
The loved and lost comes not again.
নিনার প্রেম
আসবে যখন ফিরে প্রিয়তম, তার কাছে যার ’পরে তার
অভিমান, অথচ একদা ছিলো কত ভালোবাসা।
বসন্ত নিজের বিপুল প্রাচুর্য থেকে দেবে উপহার
ছড়াবে যে কত ফুল কাছে আর দূরে যেখানেই বাসা।
আমি দেখি, অপেক্ষায় থাকি– বৃথাই, বৃথাই,
হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মানুষ আর ফেরে না হেথায়।
তোমরা পাখিরা গাইবে আরো অনেক বেশি মিষ্টি গান
যখন শুনতে পাবে তার কোমল মধুর কণ্ঠস্বর;
তোমাদেরকে শিখিয়ে দেবো শুধুই ভালোবাসার গান
তাই গেয়ে তাড়াতাড়ি প্রিয়তমকে ফিরিয়ে আনবে তারপর।
আমি দেখি, প্রতীক্ষায় থাকি– বৃথাই, বৃথাই,
হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মানুষ আর ফেরে না হেথায়।
ওহে প্রতিধ্বনি, যার শান্তি নষ্ট করে দিই আমি
আমার অনুশোচনা আর বিলাপে-কান্নায়,
সে আসে– শুনি তার স্বর দূরগামী
নাকি তা তোমার স্বর এভাবেই উত্তর দিয়ে যায়?
চুপ করো! সে ডাকছে শোনো! বৃথাই, বৃথাই,
হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মানুষ আর ফেরে না হেথায়।
ছবি: অরু দত্ত (বসে) ও তরু দত্ত।