কবিতাপুরাকাহিনিসাহিত্য

চর্যাপদ: আধুনিক বাংলায় (ষষ্ঠ কিস্তি)

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক
৩০ মে, ২০২০
পড়ার সময়: 5 মিনিট
শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)

Text-to-Speech Voice Reader

বাংলা / EN

সাহিত্যকর্মটি অডিওতে শুনুন (Listen to this literary work)

চর্যা-৩৩ 
ঢেণ্ঢণপাদ

টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী ।
হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী ।।
বেঙ্গসঁ ষংসার বড্‌হিল জাঅ ।
দুহিল দুধু কি বেন্টে ষামায় ।।
বলদ বিআএল গবিআ বাঁঝে।
পিটা দুহিএ এ তিনা সাঝে ।।
জো সো বুধী সো ধনি বুধী ।
জো ষো চৌর সোই সাধী ।।
নিতে নিতে ষিআলা ষিহে ষম জুঝঅ ।
ঢেন্ঢন পাএর গীত বিরলে বুঝঅ ।।

আধুনিক বাংলায়:
টিলায় আমার ঘর, নেই পড়শি
হাঁড়িতে ভাত নেই, নিত্য উপোসী।
ব্যাঙের সংসার বেড়েই চলেছে
দোয়ানো দুধ কি বাঁটে ঢুকেছে!
বলদ বিয়ালো, গাভীরা বন্ধ্যা
পাত্রে দুইলাম তা তিন সন্ধ্যা।
যার আছে বুদ্ধি, সে ধন্যবুদ্ধি
যে কিনা চোর, সে-ই সাধ্বী।
নিতি নিতি শিয়াল সিংহসম যুঝে
ঢেণ্ঢনপাদের গীত বিরলে বুঝে।

রূপকার্থ:
এখানে টিলা মানে দেহরূপ সুমেরুশিখর। হাঁড়ি বলতে টিকায় বোঝানো হয়েছে: “হুণ্ডীতি স্বকায়াধারম”, নিজ কায়া-আধার বা দেহ।‘ভাত’ মানে “সংবৃত্তিবোধিচিত্তম-বিজ্ঞানাধিরূপম”, জাগতিক জ্ঞানে বিভোর চিত্তই সংবৃত্তিবোধিচিত্ত। ‘গবিআ বাঁঝে’ বা ‘বন্ধ্যা গাভী’ মানে হলো ‘নৈরাত্মা’। টিকায় বলা হয়েছে, “গাবীতি যোগীন্দ্রস্য গৃহিনী বন্ধ্যা নৈরাত্মা”।

চর্যা-৩৪
দারিকপাদ

সুনকরুণরি অভিন চারে কাঅবাকচিঅ।
বিলসই দারিক গঅণত পারিমকূলে ।।
অলক্ষ লখচিত্তা মহাসুহে ।
বিলসই দারিক গঅণত পারিমকূলে ।।
কিন্তো মন্তে কিন্তো তন্তে কিন্তো রে ঝাণবখানে ।
অপইঠান মহাসুহলীণে দুলখ পরম নিবাণেঁ ।।
দুংখেঁ সুখেঁ একু করিআ ভুঞ্জই ইন্দিজানী ।
স্বপরাপর ন চেবই দারিক সঅল সঅনুত্তর মাণী ।।
রাআ রাআ রাআ রে অবর রাঅ মোহেরা বাধা ।
লুইপাঅপএ দারিক দ্বাদশ ভূষণেঁ লধা ।।

আধুনিক বাংলায়:
শূন্যকরুণারই অভিন্ন আচারে কায়বাকচিত্তে
বিলাস করে দারিক গগনের পরপারে।
অলক্ষ্যে লক্ষ্যচিত্ত হয়ে মহাসুখে
বিলাস করে দারিক গগনের পরপারে।
কী হবে মন্ত্রে, কী হবে তন্ত্রে, কী হবে রে ধ্যান-ব্যাখ্যানে
অপ্রতিষ্ঠান মহাসুখলীলায় দুর্লক্ষ্য পরম নির্বাণে।
দুঃখে-সুখে একই করে ভুঞ্জে ইন্দ্রিয় জ্ঞানী
স্বপর-অপর বোঝে না দারিক, সকল স-অনুত্তর মানি।
রাজা রাজা রাজা রে, অবর রাজ আমার বদ্ধ
লুইপাদপদ্মে দারিক তার দ্বাদশ ভুবন লব্ধ।

রূপকার্থ:
শূন্য ও করুণা মিলিত হয়ে একীভূত, যোগীর কায়বাকচিত্ত পরিশুদ্ধ—এ অবস্থায় যোগী দারিকপাদ মহাসুখলোকে প্রবেশ করেছেন। মন্ত্রে-তন্ত্রে বা ধ্যান ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে এই মহাসুখ লাভ করা যায় না; আবার তেমন মহাসুখে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারলে পরম নির্বাণও লাভ করা যায় না। জ্ঞানীজন বিষয়-ইন্দ্রিয়াদি ভোগ করেন সুখ-দুঃখ সমজ্ঞান করে। সিদ্ধাচার্য দারিকপাদ এই চরম সিদ্ধি লাভ করেছেন বলেই তাঁর কাছে আর আত্মপর ভেদাভেদ নেই। ঐশ্বর্যবানরা সবাই নিজেকে রাজা বলে মনে করে, কারণ তারা বিষয়সুখে প্রমত্ত, আর তাই সংসারের অন্ধকূপেই আবদ্ধ। কিন্তু দারিক তাঁর গুরু লুইপাদের কৃপায় বা তাঁর নির্দেশিত পথে সাধনার মধ্যে দিয়ে মহানির্বাণ লাভ করে সকল ভুবনে আধিপত্য বিস্তার করেছেন।

চর্যা-৩৫
ভাদেপাদ

এতকাল হাউ অচ্ছিলেঁ স্বমোহেঁ ।
এবেঁ মই বুঝিল সদ্ গুরু বোহেঁ ।।
এবেঁ চিঅরাঅ মকুঁ ণঠা ।
গণ সমুদে টলিয়া পইঠা ।।
পেখমি দহদিহ সর্ব্বই শুন ।
চিঅ বিহুন্নে পাপ ন পুন্ন ।।
বাজুলে দিল মোহকখু ভণিআ ।
মই অহারিল গঅণত পণিআঁ ।।
ভাদে ভণই অভাগে লইআ ।
চিঅরাঅ মই আহার কএলা ।।

আধুনিক বাংলায়:
এতকাল আমি ছিলাম স্বমোহে
এবার আমি বুঝলাম সদ্গু‌রুবোধে।
এখন চিত্তরাজ আমার নষ্ট
গগনসমুদ্রে টলে হলো প্রবিষ্ট।
দেখি দশদিক সকলই শূন্য
চিত্ত বিহনে না পাপ না পুণ্য।
বাজুল* দিলো মোহকক্ষ বলে
আমি পান করলাম গগনে জল।
ভাদে বলছে অভাগ্য নিয়ে
চিত্তরাজ আমি নিলাম খেয়ে।

*ভাদেপা’র গুরু বা গুরুস্থানীয়ের নাম

রূপকার্থ:
ভাদেপাদ বলছেন, বিষয়সঙ্গের কারণে এতকাল তিনি মোহাবিষ্ট ছিলেন, এখন সদগুরুর উপদেশে চিত্তের স্বরূপ তিনি বুঝেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, চিত্তের কারণেই এই জগৎ সম্পর্কিত বোধ জন্মায়, এবং চিত্ত বিনষ্ট হলে বাহ্য বিষয়ের ধারণাও নষ্ট হয়ে যায়। ভাদেপা এ সত্য বুঝেছেন, তাই এখন তাঁর চিত্ত অচিত্ততায় লীন। জগতের অস্তিত্ব সংক্রান্ত ধারণা তাঁর লুপ্ত, পাপ-পুণ্যের সংস্কারও তাঁর অন্তর থেকে অন্তর্হিত। প্রকৃত মোক্ষের সন্ধান পেয়ে তিনি গগনসমুদ্রে বা সর্বশূন্যতায় প্রবেশ করেছেন। ভাদেপা বলছেন, জগত বলে কিছু আদৌ উৎপন্ন হয় নি, এবং চিত্তই-যে জগৎ সম্পর্কিত ধারণার সৃষ্টি করে—এ তত্ত্ব বুঝতে পেরে তিনি চিত্তকে গ্রাস করেছেন।

চর্যা-৩৬
কাহ্নপাদ

সুণ বাহ তথতা পহারী ।
মোহভন্ডার লুই সঅল অহারী ।।
ঘুমই ণ চেবই সপরবিভাগা ।
সহজ নিদালু কাহ্ণিলা লাঙ্গা ।।
চেঅণ ণ বেঅন ভর দিন গেলা।
সঅল সুফল করি সুহে সুতেলা ।।
স্বপণে মই দেখিল তিহুবণ সুণ ।
ঘানিঅ অবণাগমণ বিহন ।।
শাখি করিব জালন্ধরি পাএ ।
পাখি ণ রাহঅ মোরি পান্ডিআচাদে ।।

আধুনিক বাংলায়:
শূন্য বাসে করে তথতা* প্রহার
মোহভাণ্ডার নিয়ে সকল আহার।
ঘুমাই না করে আত্মপর বিভাজন
সহজে নিদ্রালু কাহ্নিলা নগ্ন মন।
চেতনা-বেদনাহীন ভর দিন গেলো
সকল সুফল করে সুখেই শুলো।
স্বপ্নে দেখলাম ত্রিভুবন শূন্য
ঘানিতে গমনাগমন বিহন।
সাক্ষী করবো জালন্ধরিপাদে**
দেখে না আমাকে পণ্ডিতাচার্যে।

*নির্বাণরূপ খড়্গ, **কাহ্নপাদের গুরু

রূপকার্থ:
তথতা বা নির্বাণরূপ খড়্গের আঘাতে কাহ্নপাদের সকল বাসনা নির্মূল হয়েছে, তাঁর মোহের ভাণ্ডার নিঃশেষিত, আত্মপরভেদ তাঁর মন থেকে বিলুপ্ত; সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত বা নগ্ন কাহ্নপা যোগনিদ্রায় অচেতন। তাঁর চেতন বেদনা লুপ্ত, জাগতিক সমস্ত ব্যাপার নিঃশেষ করে তিনি সহজানন্দে প্রবিষ্ট। এ অবস্থায় ত্রিভুবন তাঁর কাছে শূন্য, স্বপ্নের মতো অলীক। গমনাগমন বা জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে তাঁকে আর পড়তে হবে না। গুরু জালন্ধরিপাদের নির্দেশে তিনি এই মুক্ত অবস্থায় পৌঁছেছেন। তাঁর এই বন্ধনমুক্ত অবস্থা শাস্ত্রসম্বল তথাকথিত পণ্ডিতেরা বুঝতে পারবেন না।
……………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………

আগের কিস্তিগুলোর লিঙ্ক:

https://banglapro.xyz/%e0%a6%9a%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%86%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a7%9f/

https://banglapro.xyz/%e0%a6%9a%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%86%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%a6%e0%a7%8d/

https://banglapro.xyz/%e0%a6%9a%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%86%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%aa%e0%a6%9e/

https://banglapro.xyz/%e0%a6%9a%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%86%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%9a%e0%a6%a4/

https://banglapro.xyz/%e0%a6%9a%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%86%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%b8%e0%a6%aa/

জ্যোতির্ময় নন্দী সাহিত্য সংগ্রহশালা

দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ-এ দীর্ঘ ৪ দশক ধরে প্রকাশিত মূল রচনার অবিকল সংরক্ষণ

ওয়েবসাইটের মূল পাতায় যান →

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)