MythologyPoemকবিতাপুরাকাহিনি

চর্যাপদ: আধুনিক বাংলায় (তৃতীয় কিস্তি)

Jyotirmoy Nandy
Jyotirmoy Nandy (জ্যোতির্ময় নন্দী)সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক
২৪ মে, ২০২০
পড়ার সময়: 6 মিনিট
শ্রবণ করুন (Listen with Voice Reader)

Text-to-Speech Voice Reader

বাংলা / EN

সাহিত্যকর্মটি অডিওতে শুনুন (Listen to this literary work)

চর্যা-১৯
কাহ্নপাদ

ভব নির্ব্বাণে পড়হ মাদলা ।
মণ পবণ বেণি করন্ড কশালা ।।
জঅ জঅ দুন্দুহি সাদ উছলিআঁ ।
কাহ্ন ডোম্বী বিবাহে চলিআ ।।
ডোম্বী বিবাহিআ অহারিউ জাম ।
জউতুকে কিঅ আণুতু ধাম ।।
অহণিসি সুরঅ পসঙ্গে জাঅ ।
জোইণি জালে রএণি পোহাঅ ।।
ডোম্বী-এর সঙ্গে জো জোই রত্তো ।
খণহ ন ছাড়ই সহজ উন্মত্তো ।।

আধুনিক বাংলায়:
ভব ও নির্বাণ* পটহ ও মাদল
মন ও পবন কাঁসি ও ঢোল।
দুন্দুভিতে জয় জয় ধ্বনি উছলিল
কাহ্ন ও ডোমনি বিবাহে চলিল।
ডোমনিকে বিয়ে করে নবজন্ম হলো
অনুত্তর ধাম যৌতুক দেয়া হলো।
অহর্নিশি সুরত প্রসঙ্গে যায়
যোগিনী জালে** রজনী পোহায়।
ডোমনির সঙ্গে যে যোগী অনুরক্ত
ক্ষণেক ছাড়ে না সহজে উন্মত্ত।

*ভব ও নির্বাণ স্বরূপত ভিন্ন নয়, ভবের স্বরূপ জানা গেলেই নির্বাণ পাওয়া যায় বলে সিদ্ধাচার্যরা মনে করতেন; **যোগিনীদের সঙ্গে।

রূপকার্থ:
বিয়ের রূপকে এখানে নৈরাত্মা দেবীর সঙ্গে কাহ্নপাদের মিলিত হওয়ার বা পরমতত্ত্ব জানার কথা বলা হয়েছে। বিয়ের প্রাক্কালে কাহ্নপাদ ভব ও নির্বাণকে বিকল্পমাত্রে পরিণত এবং মন ও চিত্তকে সংযত করেছেন। ডোমনিকে বিয়ে করে কাহ্নপাদের জন্ম সফল হলো, কারণ নৈরাত্মার সঙ্গে মিলিত হওয়ায় তাঁর আর পুনর্জন্ম হবে না। এ বিয়ের যৌতুক অনুত্তর ধাম বা নির্বাণ। নববধূর সঙ্গে বর যেমন সুরতানন্দে দিন-রাত কাটায়, তেমনি কাহ্নও নৈরাত্মার সঙ্গে মহাসুখে কাল কাটাচ্ছেন। জ্ঞানের আলোকে এভাবেই পার হয়ে যায় অজ্ঞানান্ধকারে আচ্ছন্ন রাত। যেসব যোগী এই নৈরাত্মার সঙ্গ পেয়েছেন, তাঁরা দুর্লভ সহজানন্দ পেয়ে ক্ষণমাত্রও তাঁকে ছাড়তে চান না।

চর্যা-২০
কুক্কুরীপাদ

হাঁউ নিরাসী খমণভতারে
মোহোর বিগোআ কহণ ন জাই ।।
ফেটলিউ গো মাএ অন্তউড়ি চাহি ।
জা এথু বাহাম সো এথু নাহি ।।
পহিল বিআণ মোর বাসনপূড় ।
নাড়ি বিআরন্তে সেব বায়ুড়া ।।
জাণ জৌবণ মোর ভইলেসি পূরা ।
মূল নখলি বাপ সংঘারা ।।
ভণথি কুক্কুরীপা এ ভব থিরা ।
জো এথু বুঝএঁ সো এথু বীরা ।।

আধুনিক বাংলায়:
আমি নিরাশ, ভাতার খমন*
আমার বিজ্ঞতা না যায় কহন**।
গর্ভ খুলি গো মা, আঁতুড়ঘর চাই
যা আমি চাই, তা এখানে নাই।
প্রথম বিয়ান*** আমার বাসনাপুট
নাড়ি বিচারান্তে সেও বিলুপ্ত।
জ্ঞান যৌবন হলো পরিপূর্ণ আমার
মূলকে নখলি**** দিয়ে করি সংহার।
কুক্কুরিপা বলছে, এ ভব স্থির
যে এখানে বোঝে, সে-ই এখানে বীর।

*‘খ’ বা আকাশ বা শূন্যতারূপ মন; **বলা; ***প্রসব; ****খন্তা

রূপকার্থ:
কুক্কুরিপাদ বলছেন, তিনি নিরাশ, আসক্তিহীন; সর্বশূন্যতায় পরিপূর্ণ তাঁর মন, তাঁর স্বামী। এই মনের সঙ্গে বা সর্বশূন্যতায় যুক্ত হয়্বে তিনি যে বিশেষ জ্ঞান লাভ করেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। পৃথিবীতে আঁতুড়ঘর দেখে বা মানুষকে জন্ম নিয়ে সারা জীবন দুঃখ পেতে দেখে তিনি বিষয়ের প্রতি মোহ ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বুঝেছেন, তিনি যে-নির্বাণ চাইছেন, এই সংসারসুখের মধ্যে দিয়ে তা পাওয়া সম্ভব হবে না। প্রথম যখন তিনি জ্ঞানলাভ করেছিলেন, তখন ভেবেছিলেন এই দেহ বা সংসারেই সব আনন্দ, কিন্তু পরে দেখলেন, তা সত্য নয়। তখন বিষয়কে সংহার করেই তিনি মুক্তির পথ দেখতে পেলেন। কুক্কুরিপাদ বলছেন, এ সংসার স্থির, এখানে কিছু যায় না, আসেও না। এ তত্ত্ব যিনি বুঝেছেন, তিনি জন্ম-মৃত্যুতে বিচলিত হন না, আর তাই তিনি প্রকৃত বীর।

চর্যা-২১
ভুসুকুপাদ

নিসিঅ অন্ধারী মুসার চারা ।
অমিঅ ভখঅ মুসা করঅ আহারা ।।
মার রে জোইআ মুসা পবণা ।
জেঁণ তুটঅ অবণাগবণা ।।
ভববিন্দারঅ মুসা খনঅ গাতী ।
চঞ্চল মুসা কলিআঁ নাশক থাতী ।।
কলা মুষা ঊহ ণ বাণ ।
গঅণে উঠি চরঅ অমণ ধাণ ।।
তাব সে মুষা হুঞ্চল পাঞ্চল ।
সদ্‌গুরু বোহে করিহ সো নিচ্চল ।।
জবেঁ মষাএর চার তুটঅ ।
ভুসূকু ভণঅ তবেঁ বান্ধন ফিটঅ ।।

আধুনিক বাংলায়:
নিশীথ আঁধারে মূষিক* চরে
অমৃতভক্ষ্য** মূষিক আহার করে।
মার রে যোগিয়া মূষিক পবন
যেন টুটে যায় গমনাগমন।
ভববিদারী*** মূষিক গর্ত খোঁড়ে,
চঞ্চল মূষিককে মারো স্থির করে।
কালো মূষিক— না উদ্দেশ, না বরণ,
গগনে উঠে অমনে**** ধ্যানমগন।
তবে সে মূষিক বড়ই চঞ্চল
সদ্‌গুরু বোধে তাকে করো নিশ্চল।
যখন মূষিকের চরা***** টুটে যায়
ভুসুকু ভনে, তখন বাঁধন কেটে যায়।

*ইঁদুর; **অমৃত ভক্ষণকারী; ***পৃথিবী বা মাটি বিদারণকারী; ****অমনস্কভাবে; *****বিচরণ

রূপকার্থ:
এ চর্যায় ভুসুকুপাদ মূষিক বা ইঁদুরকে মানবচিত্তের প্রতীক হিসেবে নিয়েছেন। কালের অন্ধকারে চিত্তরূপ মূষিক বিচরণ করে, যার আহার্য্য অমৃত হলেও চরেবরে সে নানা অখাদ্য খায়। বাতাসের মতো চঞ্চল এ মূষিককে যোগের শক্তিতে হত্যা করতে হবে। পৃথিবী বিদারণ করে মূষিক গর্ত খোঁড়ে, সে চঞ্চল—এটা জেনে স্থির লক্ষ্যে চিত্তরূপী মূষিককে বশ করতে হবে। অবয়বহীন চিত্তের উদ্দেশ বা বর্ণ বোঝা যায় না। চিত্তকে ঊর্ধ্বগামী করতে পারলে তবেই সে স্থিরভাবে ধ্যানমগ্ন হয়ে অমৃতের আস্বাদ পেতে পারে। সদ্‌গুরুর উপদেশ আত্মস্থ করে তবেই এই চঞ্চল চিত্তমূষিককে নিশ্চল বা স্থির করা যায়। চিত্তের ইতস্তত বিচরণ যখন বন্ধ হয়ে যাবে, তখন তার ভববন্ধনও কেটে যাবে।

চর্যা-২২
সরহপাদ

অপণে রচি রচি ভব নির্বাণা ।
মিছে লোঅ বন্ধাবএ অপণা ।।

35mm original

অম্ভে ন জানহূ অচিন্ত জাই ।
জাম মরণ ভব কইসণ হোই ।।
জইসো জাম মরণ বি তইসো।
জীবন্তে মঅলেঁ ণাহি বিশেসো ।।
জা এথু জাম মরণে বি সঙ্কা।
সো করউ রস রসানেরে কংখা ।।
জে সচরাচর তিঅস ভমন্তি ।
তে অজরামর কিমপি ন হোন্তি ।।
জামে কাম কি কামে জাম ।
সরহ ভণতি অচিন্ত সো ধাম ।।

আধুনিক বাংলায়:
আপনি রচি রচি ভবনির্বাণেরে
মিছাই লোকে বাঁধে আপনারে।
আমিও জানি না অচিন্ত্য যারে কয়
তার জন্ম-মরণ কেমন করে হয়।
যেমন জন্ম, মরণও তো তাই
জীয়ন্তে মরিলে বিশেষত্ব নাই।
যে হেথা জন্মে মরণে করে শংকা
সে করুক রস রসায়নের কাঙ্ক্ষা।
যে সচরাচর ত্রিদশে ভ্রমে
সে অজরামর কীভাবে হবে?
কর্মে জন্ম, নাকি জন্মে কর্ম—
সরহ বলছে, অচিন্ত্য সে ধর্ম।

রূপকার্থ:
যারা অবিদ্যায় আচ্ছন্ন, তারা মনে করে, ভব আর নির্বাণ, অর্থাৎ স্থিতি আর লয়, এ দুটি বুঝি পৃথক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ধারণাটি ঠিক নয়। কারণ, স্থিতি সম্পর্কে ধারণা হলেই নির্বাণ লাভ সহজ হয়। তত্ত্ব বিচারে দেখা যাচ্ছে, ভবের কোনো অস্তিত্ব নেই, কারণ তা কোনোদিনই উৎপন্ন হয়নি। আমরা যা দেখি, তা অবিদ্যামোহিত চিত্তের মিথ্যানুভূতিমাত্র। যোগীরা তাই বুঝতে পেরেছেন, ভবেরই যখন অস্তিত্ব নেই, তখন জন্ম-মৃত্যুর ধারণাও অলীক। জীবন ও মৃত্যুর মূলত কোনো তফাত নেই। জীবনে যা প্রাণের অভিব্যক্তি, মৃত্যুতে তা মহাপ্রাণে মিশে সমগ্র বিশ্বে পরিব্যপ্ত। যারা পৃথিবীতে মরতে ভয় পায়, তারাই নানারকম রস-রসায়ন খোঁজে, মরতে চায় না। কিন্তু পরমার্থতত্ত্ব যাঁরা বুঝেছেন, তাঁদের এ রসায়নের প্রয়োজন নেই। কারণ তাঁরা জন্ম-মৃত্যুর প্রকৃত স্বরূপ জানেন। যারা যাগযজ্ঞ মন্ত্রতন্ত্রের সাহায্যে চরাচরসহ দেবলোকে যেতে চায়, তারা কোনোমতেই অজরামর হতে পারে না। জন্ম থেকে কর্ম, নাকি কর্ম থেকে জন্ম, এই বিকল্পাত্মক বিচারের প্রয়োজন কী? সরহ বলছেন, অচিন্তনীয় গভীর এ ধর্মে তথাকথিত চিন্তার কোন স্থান নেই।

জ্যোতির্ময় নন্দী সাহিত্য সংগ্রহশালা

দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক পূর্বদেশ-এ দীর্ঘ ৪ দশক ধরে প্রকাশিত মূল রচনার অবিকল সংরক্ষণ

ওয়েবসাইটের মূল পাতায় যান →

আরও প্রাসঙ্গিক রচনা (Related Works)