আমাদের টেলিভিশন, রেডিও প্রভৃতি প্রচার মাধ্যমে সংবাদ পাঠক ও অন্যান্য ঘোষক ও উপস্থাপকদের কিছু উচ্চারণ বড় শ্রুতিকটু ঠেকে। নানা প্রসঙ্গ সূত্রে শব্দগুলো বার বার আসে এবং ভুল উচ্চারিত হয়ে সচেতন শ্রোতার মর্মপীড়ার কারণ ঘটায়। এধরনের কয়েকটি শব্দ হল ‘ব্যবসা’, ‘ব্যবসায়ী’, ‘মতবিনিময়’, ‘ব্রণ’ প্রভৃতি। চ্যানেল নির্বিশেষে সব পাঠক-ঘোষক-উপস্থাপক এগুলোর ভুল উচ্চারণের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছেন একই সারিতে।
‘ব্যবসা’ ও ‘ব্যবসায়ী’ শব্দ দুটোর উচ্চারণে দ্বিতীয় ‘ব’-টি হলন্ত উচ্চারিত হওয়ার কথা থাকলেও অ-কারান্ত উচ্চারণ করা হয়। যদিও রবীন্দ্রনাথের গানে আরো অনেক শব্দের মতো ‘ব্যবসা’ শব্দটিতে দ্বিতীয় ‘ব’-কে অ-কারান্ত উচ্চারণ করা হয়েছে (‘ব্যবসা মোর তোমার সাথে / চলবে বেড়ে দিনে রাতে’), কিন্তু এধরনের অত্যল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে শব্দটির শুদ্ধ উচ্চারণ হবে ‘ব্যব্সা’। অনুরূপভাবে, ‘ব্যবসায়ী শব্দটিরও শুদ্ধ উচ্চারণ হবে ‘ব্যব্সায়ী’।
অনুরূপভাবে, ‘মতবিনিময়’ শব্দটিতে ‘ত’ বর্ণটিকে হলন্ত উচ্চারণ করতে হবে। অর্থাৎ, শব্দটির উচ্চারণ হবে ‘মৎবিনিময়’। কারণ, এটা ‘মত’ আর ‘বিনিময়’ এ দুটো শব্দের সমাসবদ্ধ রূপ। আমরা জানি, বাংলা ভাষায় ‘মত’ শব্দটির দুটি অর্থ আর সে-অনুযায়ী দুটো উচ্চারণ রয়েছে। ‘মত’ শব্দের একটি অর্থ ‘অনুরূপ’, যার উচ্চারণ হবে ‘মতো’। ‘মত’ শব্দের আরেকটি অর্থ ‘অভিমত’ বা ‘মন্তব্য’ বা ‘বক্তব্য’, এবং এটির উচ্চারণ ‘মৎ’। ‘অমত’ শব্দের সাথে সন্ধিবদ্ধ হয়ে শব্দটি হতে পারে ‘মতামৎ’। এই ‘মত’ বা ‘মৎ’ বিনিময় হলে, সেই অর্থবাচক শব্দটির উচ্চারণ ‘মৎবিনিময়’-ই হবে, ‘মতোবিনিময়’ কিছুতেই হওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, একটা বিশেষ চর্মরোগ ‘ব্রণ’-এর নামটি অকারান্তভাবে উচ্চারিত হওয়ার কথা থাকলেও, বিশেষ করে চর্মরোগের প্রতিষেধক বিষয়ক বিজ্ঞাপনগুলোতে সেটাকে ভুলভাবে হলন্ত উচ্চারণ করা হয়। অর্থাৎ ‘ব্রণ’-কে উচ্চারণ করা হয় ‘ব্রণ্’।
এগুলো তো শুধু কয়েকটা শব্দের হলন্ত-অকারান্ত সম্পর্কিত কিছু উচ্চারণের ভুল। আরো একটা শব্দ প্রায়শ ভুল উচ্চারিত হতে দেখা যায়, সেটা হল ‘ন্যূনতম’। শব্দটাকে উচ্চারণ করা হয় ‘নুন্যতম’ হিসেবে, এবং প্রায়ই ভুল উচ্চারণ অনুযায়ী এ শব্দের বানানটাও ভুলই লিখতে দেখা যায় নানা পত্রপত্রিকায়। এ ছাড়াও রয়েছে নানা যুক্তবর্ণ আর ‘র’ ও ‘ড়’ বর্ণের ভুল উচ্চারণ। ভুলগুলো এমন সর্বজনীন ও বহুলপ্রচরিত হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, শ্রোতাসাধারণের মনে শব্দগুলোর এসব ভুল উচ্চারণ স্থায়ীভাবে বসত গাড়ছে। বিশেষ করে নবীন প্রজন্ম এসব শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণ শোনার আর শেখার সুযোগই পাচ্ছে না বললে চলে।
প্রচার মাধ্যমগুলো ভাষার বর্ণ ও শব্দ উচ্চারণে শিক্ষক বা পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে বললে অত্যুক্তি হবে না নিশ্চয়। এক্ষেত্রে দেশ ও জাতির সামনে তাদের কিছু গুরুদায়িত্ব রয়েছে। শব্দ বর্ণের উচ্চারণ যাতে ভুল বা বিকৃত না হয়, এ ব্যাপারে বেতার, টিভি ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমের আরো অনেক বেশি সচেতন হওয়া দরকার। ভাষাকে শুদ্ধ সুন্দরভাবে উপস্থাপনে তারা উত্তরোত্তর যত্নবান হবেন– এটাই শ্রোতাসাধারণের প্রত্যাশা।